মতামত

কেমন হলো এবারের দুর্গাপূজা

বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীরা এ দেশের নাগরিক, ইতিহাস ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা কারও দয়ার দান নিয়ে বসবাস করছেন না; তাদের অধিকার সংবিধানস্বীকৃত নাগরিক অধিকার।

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম

এ বছরের দুর্গাপূজা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য তুলনামূলক স্বস্তি ও আনন্দের আবহ নিয়ে শেষ হয়েছে। পূজার আগে মন্দিরের সামনে গরু জবাইয়ের অভিযোগ কিংবা পূজায় অংশ না নেওয়ার পক্ষে ধর্মীয় বক্তৃতা ও ফতোয়ার মতো ঘটনাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবু সামগ্রিক চিত্রে স্বস্তির যে জায়গা তৈরি হয়েছে, সেটিও অস্বীকার করা যায় না। এটিও সত্য। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ইতিবাচক বক্তব্য, পূজার ছুটি বৃদ্ধি, নিরাপত্তার উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মণ্ডপ পরিদর্শন—সব মিলিয়ে এবারের উৎসব একটি বার্তা দিয়েছে: মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশেও হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব বৃহত্তর সামাজিক উৎসবে পরিণত হতে পারে, যদি রাষ্ট্র ও রাজনীতি আন্তরিক হয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও যথারীতি দুর্গাপূজার ব্যাপক আয়োজন হয়েছে। কলকাতার মণ্ডপ, প্রতিমার শিল্পকর্ম, আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বরাবরের মতো মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র। সেখানে দুর্গাপূজা ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি অর্থনীতিরও বড় উপলক্ষ। প্রতিমাশিল্পী, কারিগর, আলোকসজ্জার কর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহনশ্রমিক—অনেক মানুষের জীবিকা এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত। পূজা এলে কাজ বাড়ে, আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু কলকাতায় পদদলিত হয়ে মানুষের প্রাণহানির ঘটনা সেই আনন্দে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। এমন দুর্ঘটনা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

এবারের পূজায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। রাষ্ট্রপতি ও বিএনপি নেতাদের বক্তব্যেও দুর্গাপূজাকে ইতিবাচকভাবে দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। রাষ্ট্রপতি দেবী দুর্গার অসুরবিনাশী প্রতীককে অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বৃহত্তর মানবিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে কিছু ধর্মীয় বক্তা আপত্তি জানান। কিন্তু অন্যায় দমনের প্রতীক হিসাবে দেবী দুর্গার উল্লেখ করলেই কারও ধর্মীয় পরিচয় বিপন্ন হয়—এমন ধারণা বহুত্ববাদী সমাজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। 

বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির মসজিদে বসে দেবী দুর্গার প্রশংসা কিংবা মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এলাকায় পূজার নিরাপত্তা নিয়ে সাহস জোগানোর ঘটনাও রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে এমন বক্তব্য জনপরিসরে বিকল্প দৃষ্টান্ত তৈরি করে।

তবে এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে রাজনৈতিক হিসাব নেই, এমন ভাবার কারণও নেই। পূজা উপলক্ষে তারকাদের মণ্ডপে যাওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানো কিংবা নেতাদের প্রশংসাসূচক বক্তব্যের পেছনে আন্তরিকতা যেমন থাকতে পারে, তেমনি থাকতে পারে জনসমর্থন অর্জনের কৌশল। কিন্তু কারও আনন্দে অংশ নেওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখা ঠিক নয়। দীর্ঘদিনের ভয়, অনিশ্চয়তা ও সহিংসতার স্মৃতি নিয়ে মানুষ অনন্তকাল বাঁচতে পারে না। মানুষের উৎসব করার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে। আনন্দে অংশ নেওয়া মানেই কোনো দলের পক্ষে সনদ দেওয়া নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবারের পূজাকে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা যায়। কিছু বিতর্ক ও অপ্রীতিকর ঘটনা পুরো উৎসবের ইতিবাচক চিত্র মুছে দেয় না। তবে সাফল্য নিয়ে আত্মতুষ্টিরও কারণ নেই। ভালো অভিজ্ঞতা ধরে রেখে দুর্বলতাগুলো দূর করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। পূজার সময়ে ওয়াজ মাহফিল আয়োজন না করার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে। একজন ধর্মীয় বক্তা পূজার কারণে তার মাহফিল বাতিল করার কথা জানিয়েছেন। ধর্মীয় মাহফিলের অধিকার অবশ্যই আছে; কিন্তু অন্যের উৎসবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উচ্চ শব্দে প্রচার চালিয়ে অস্বস্তি তৈরির প্রবণতা থাকলে তা বন্ধ হওয়া দরকার। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের অধিকার রক্ষা করা, পাশাপাশি শব্দদূষণ ও উসকানি ঠেকানো।

সামাজিক মাধ্যমে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর পূজাবিষয়ক বক্তব্যও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠেছে। অতীতের পূজায় হামলার দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপানো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে। কিন্তু কোনো ঘটনার দায় নির্ধারণে প্রমাণ, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন; দলীয় অভিযোগই চূড়ান্ত সত্য নয়। একইভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাম্প্রদায়িক হামলার অভিযোগ, প্রশাসনের ব্যর্থতা কিংবা প্রভাবশালী নেতাদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতার অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতাসীন দলের অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ের দাবি আর বাস্তব নিরাপত্তার মধ্যে ফারাক থাকতে পারে। যে দল নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচয় দেয়, তার কাছ থেকে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় বেশি আন্তরিকতা প্রত্যাশিত। শুধু বিবৃতি নয়, প্রয়োজন দ্রুত ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীর শাস্তি।

এখানে বিএনপির জন্যও শিক্ষা রয়েছে। দলটির ডানপন্থি রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে অতীতের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু সেই পরিচয় বিএনপিকে অসাম্প্রদায়িক নাগরিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় না। ক্ষমতায় থেকে দলটি যদি দেখাতে পারে যে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপদে ধর্ম পালন করতে পারেন, তবে সেটিই হবে রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ। উৎসবের সময় ইতিবাচক বক্তব্য দেওয়া সহজ; কঠিন কাজ হলো বছরের অন্য দিনগুলোতেও একই নীতি কার্যকর রাখা। জমি দখল, মন্দিরে হামলা, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে হয়রানি কিংবা সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ না হলে পূজার কয়েক দিনের সৌহার্দ্য দীর্ঘস্থায়ী আস্থা তৈরি করতে পারবে না।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধির জায়গা রয়েছে। কোনো সরকার ভালো নিরাপত্তা দিলেই নিজেদের ভবিষ্যত পুরোপুরি তার সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। আবার কোনো সরকার ব্যর্থ হলেই দেশত্যাগকে একমাত্র সমাধান ভাবাও ঠিক নয়। বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীরা এ দেশের নাগরিক, ইতিহাস ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা কারও দয়ার দান নিয়ে বসবাস করছেন না; তাদের অধিকার সংবিধানস্বীকৃত নাগরিক অধিকার। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রের মালিকানার দলিল হিসেবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে স্পষ্ট করে বলতে হবে—বাংলাদেশ কোনো একক সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে দলীয় ক্ষমতার পালাবদলের বাইরে নিজেদের স্বার্থে শক্তিশালী হতে হবে। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে, নির্বাচনে সমর্থন কিংবা বিরোধিতা থাকবে; কিন্তু নিরাপত্তা ও অধিকার আদায়ের প্রশ্নে কোনো দলের স্থায়ী অনুগত হয়ে থাকা চলবে না। স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন, আইনি সহায়তা, নির্যাতনের তথ্য সংরক্ষণ, প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি দাবি এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে সহযোগিতার মধ্য দিয়েই বাস্তব শক্তি তৈরি হয়। কোন সরকার ভালো, কোন নেতা মণ্ডপে গেলেন, কে শুভেচ্ছা জানালেন—শুধু এই হিসাবের মধ্যে আটকে থাকলে নিজেদের অধিকার অন্যের রাজনৈতিক প্রচারের উপকরণে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

তবে এবারের পূজায় মানুষ যে তুলনামূলক স্বস্তি পেয়েছে, সেটি স্বীকার করা দরকার। সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের প্রশংসা করা মানে তার সব নীতির প্রতি সমর্থন জানানো নয়; অতীতের ব্যর্থতা তুলে ধরা মানে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করাও নয়। রাজনৈতিক পরিপক্বতা হলো প্রতিপক্ষের ভালো কাজ থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং নিজের দলের ভুল স্বীকার করার সাহস রাখা। আওয়ামী লীগ যদি আবার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে চায়, তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিতে হবে। ‘আমরা সেক্যুলার’—এই পরিচয়কে আত্মপক্ষসমর্থনের অপরাধবোধে নয়, নাগরিক সমতার ইতিবাচক অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরতে হবে। বিএনপিকেও বুঝতে হবে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কোনো গোষ্ঠীর প্রতি অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দায়িত্ব।

সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের উপাদান হতে পারে, যদি তা নাগরিক অধিকার ও নীতির প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের মেরুকরণে আটকে গেলে তার পরিণতি হবে সামাজিক অবিশ্বাস, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের দুর্বলতা।

দুর্গাপূজার প্রকৃত সাফল্য তাই কয়েক দিনের আনন্দে নয়, সেই আনন্দের নিরাপত্তা সারা বছরের নাগরিক জীবনে কতটা বজায় থাকে, তার মধ্যে। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিজের উৎসব পালনের জন্য সরকারের প্রশংসা কিংবা রাজনৈতিক দলের আনুকূল্য অর্জন করতে হবে—এমন পরিস্থিতি থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়: নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সমান অধিকার। যে সরকারই এই নিশ্চয়তা দিতে পারবে, সে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি গণতন্ত্রকেও শক্তিশালী করবে। আর যে দল সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে ক্ষমতার সিঁড়ি বানাবে, শেষ পর্যন্ত তার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে।

লেখক: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী 

[মতামত লেখকের নিজস্ব]