জাতিসংঘ তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট

রাশিয়া-উক্রেইন যুদ্ধ: মানবপাচারের শিকার বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিক

গত চার বছর ধরে উক্রেইনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোর নির্বিচারে সামরিক হামলার কারণে যে অমানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, তাকে আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ।

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম

“আমার বাবা-মা জানেও না আমি বাইচা আছি কি-না। তারা হয়তো মনে করসে আমি মইরা গেসি। বাইচা আছি জানলে তারা শান্তি পাবে।”

উক্রেইনের বন্দিশিবিরে বসে ধীরলয়ে বলছিলেন রিমেল মিয়া। বয়স ২৭ বছর। বাড়ি বাংলাদেশের গাইবান্ধা। ভালো জীবনের আশায়, চাকরি নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলে রাশিয়ায়।

কিন্তু ঘটনাচক্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধে। যোগ দিয়েছিলেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে। তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিলো সম্মুখ সমরে।

উক্রেইন সেনার হাতে ধরা পড়ে বাংলাদেশি রিমেল মিয়া এখন ‘যুদ্ধবন্দি’। আটক আছেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে।

গত ৩০এ জুলাই ভিডিও কলে রিমেল মিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলো আলাপ।

রাশিয়া যেতে রিমেল মিয়া ধার-কর্য করে ছয় লাখ টাকা দিয়েছিলেন ঢাকার একটি ট্রেনিং সেন্টারকে। ট্রেনিংয়ের পর নয় মাসের ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গিয়েছিলেন রাশিয়ার তায়মন সিটিতে। চাকরি পেয়েছিলেন একটি গ্যাস কোম্পানিতে।

রিমেল মিয়া বলছিলেন, “ছয় মাস না যাইতেই আমাদের চলে যাইতে বলা হয়। তারপর এক বন্ধুর সহায়তায় মস্কো আসি।”

রিমেল জানিয়েছিলেন তার প্রতারিত হওয়ার গল্প। শহরের দেওয়ালে সাঁটানো পোস্টার আর ইন্টারনেটজুড়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে রিমেল মিয়ার।

সিকিউরিটি গার্ডের কাজ। বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই লাখ টাকা বেতন আর এককালীন ২০ লাখ রাশিয়ান রুবলের লোভ। যোগাযোগ করে চলে যান উফা শহরে।

সিকিউরিটি গার্ডের কথা বলা হলেও তাকে যোগ দিতে বাধ্য করা হয় রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে। এরপর থেকেই অনিশ্চয়তার জীবন তার।

দিন কাটাচ্ছেন উক্রেইনের যুদ্ধবন্দি শিবিরে। রিমেল মিয়ার মতো আরো অন্তত দুইজন বাংলাদেশি আছেন সেখানে।

তবে এই গল্প শুধু বাংলাদেশিদের নয়। রাশিয়ার হয়ে উক্রেইনযুদ্ধে ঠেলে দিতে, অন্তত ২৯টি দেশের নাগরিক মানবপাচারের শিকার হয়েছেন।

উক্রেইন নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে এই তথ্য উঠে এসেছে।

কার্যত, রাশিয়া ও উক্রেইনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন কেবল দুই দেশের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। বরং ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে।

এই যুদ্ধ গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ নাগরিকদের মানবপাচারের জালের মধ্যে আটকে ফেলছে।

উক্রেইন নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের একটি রিপোর্টে উঠে এসেছে রাশিয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিক্রুটিং এজেন্সি ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তরুণদের উচ্চ বেতনের লোভনীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে উক্রেইনের যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দিচ্ছে।

একই সাথে, গত চার বছর ধরে উক্রেইনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোর নির্বিচারে সামরিক হামলার কারণে যে অমানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, তাকে আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ।

আন্তর্জাতিক মানবপাচার নেটওয়ার্ক ও অভিনব প্রতারণা

জাতিসংঘের এই রিপোর্টে জানা গেছে, বিদেশ থেকে কর্মী সংগ্রহের নামে এক মানবপাচার চক্রের তৎপরতা। ২০২৪ সাল থেকেই সুনির্দিষ্ট কিছু দেশ ও অঞ্চলকে টার্গেট করে এই চক্রগুলো সক্রিয়।

তদন্ত কমিশন এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার মোট ৪৮টি দেশের নাগরিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান বা মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণা, জবরদস্তি এবং মানবপাচারের প্রমাণ পেয়েছে।

এই চক্রের খপ্পরে পড়া ব্যক্তিদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তাদের বেশিরভাগই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সচেতনতার মাত্রা তুলনামূলক কম।

এই বাস্তবতাকে পুঁজি করে পাচারকারীরা সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করে। রাশিয়ায় সিকিউরিটি গার্ড, গাড়িচালক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, কনস্ট্রাকশন শ্রমিক বা ওয়েল্ডারের মতো বেসামরিক চাকরিতে লোভনীয় বেতনের কথা বলা হয়।

কোথাও খেলাধুলা, কৃষি বা তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিশেষ ক্ষেত্রের কাজের সুযোগ দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাসও দেওয়া হয়।

তদন্ত কমিশন বলছে, প্রতারণার এই ফাঁদ এতটাই নিখুঁত ও বিশ্বাসযোগ্য হয় যে, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় পরিচিত মানুষ, এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা সরকার অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমেও প্রলুব্ধ হয়েছেন।

কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের ভুয়া অফার লেটার বা গ্যারান্টি পেপার দেওয়া হতো, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকত যে তাদের কোনো অবস্থাতেই রাশিয়া-উক্রেইন যুদ্ধক্ষেত্রে বা সামরিক কার্যক্রমে পাঠানো হবে না।

তদন্ত কমিশন কিছু বাংলাদেশিকে দেওয়া বিজনেস ভিসার কপি পেয়েছে, যেটি রাশিয়ার বেসামরিক কোম্পানিতে কাজের কথা বলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ায় পা রাখার পরেই তাদের সমস্ত চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়।

কেনিয়ার নাগরিকদের দুই সপ্তাহ থেকে দুই মাস মেয়াদী ট্যুরিস্ট ভিসার দেওয়ার তথ্য পেয়েছে কমিশন। যাদের কাজে জড়ানোর আইনগত সুযোগ নেই।

বাহরাইন, ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, তুরস্ক কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে বা কখনো কখনো নজরদারি এড়াতে সড়কপথে প্রতিবেশী দেশে নিয়ে সেখান থেকে বিমানে তাদের রাশিয়ায় জড়ো করা হতো।

এজন্য দালালরা জনপ্রতি ৪০০ থেকে ৮,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত কমিশন বা যাতায়াত খরচ আদায় করেছিল, যা পরবর্তীতে তাদের বেতন থেকে কেটে নেওয়ার চুক্তি ছিল।

বিমানবন্দর থেকে রণাঙ্গন: জবরদস্তি এবং বন্দিদশা

রাশিয়ার বিমানবন্দরগুলোতে পা রাখার মুহূর্ত থেকেই ভুক্তভোগী বিদেশি নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সম্পূর্ণ কেড়ে নেওয়া হয়। স্থানীয় সংযোগকারী এজেন্টরা তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে প্রথমে কোনো অস্থায়ী আবাসস্থল বা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরে সরাসরি রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করে। শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।

অধিকাংশ ভুক্তভোগীরই রুশ ভাষা জানা ছিল না। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই যখন তাদের রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়, তখন তারা এর আসল অর্থ বুঝতে পারেননি।

চুক্তিপত্রের শিরোনাম ছিল, "রাশিয়ান সশস্ত্র বাহিনীতে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার চুক্তি"। এই চুক্তি সইয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে তাদের মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করা হতো, যাতে তারা চাইলেও অনলাইনে অনুবাদ করে দেখতে না পারেন বা পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে না পারেন।

চুক্তি সই করতে কেউ অস্বীকৃতি জানালে বা প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর চালানো হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।

রিপোর্টে এক ভুক্তভোগীর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে এক তরুণ প্রতিবাদ করায় তাকে ১০০ মিটার দূরে নিয়ে, তার সামনে চারজন রাশিয়ানকে গুলি করা হয়। তাকে বলা হয়, “যদি সই না করো তাহলে এরপর তুমি।”

নিরুপায় হয়ে প্রাণ বাঁচাতে সেই তরুণ দলিলে সই করতে বাধ্য হন। এছাড়া, যারা আগে থেকেই কোনো না কোনো কাজে বা অভিবাসী হিসেবে রাশিয়ায় ছিলেন এবং আইনি জটিলতা বা পুলিশি আটকের মুখে পড়েছিলেন, তাদের মাদক চোরাচালান বা অবৈধ কাজের মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে এই সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়েছে।

কারাগারগুলোতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা নিয়মিত গিয়ে বন্দিদের মুক্তির প্রলোভন দেখিয়ে বা সাজা বাড়ানোর হুমকি দিয়ে রণাঙ্গনে যাওয়ার চুক্তি করাতেন।

রণাঙ্গনে মানবঢাল হিসাবে ব্যবহার

চুক্তিতে সই করার পর এই বিদেশিদের সামান্য সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, যার মেয়াদ ২০ মিনিট থেকে শুরু করে এক মাস পর্যন্ত। এই স্বল্প প্রস্তুতি নিয়েই তাদের সরাসরি উক্রেইন যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং সম্মুখসারিতে মোতায়েন করা হতো।

যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে ছিল ট্রেঞ্চ বা পরিখা খনন করা, সামনের দিকে আক্রমণ পরিচালনা করা, সৈন্যদের জন্য খাবার ও পানি সরবরাহ করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সেনা ও সহযোদ্ধাদের মৃতদেহ ও দেহের টুকরো সংগ্রহ করে দাফন করা।

রাশিয়ার সৈন্যদের সাথে ড্রোন ক্যামেরার নজরদারিতে সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করা হতো। সামান্য পিছু হটার চেষ্টা করলেই নিজেদের বা প্রতিপক্ষের গুলিতে মৃত্যুর মুখে পড়তে হতো। খাবার ও সুপেয় পানির অভাবে দিনের পর দিন তাদের কাটাতে হতো।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মোটা অঙ্কের বেতন, বোনাস কিংবা রাশিয়ান নাগরিকত্বের যে লোভ দেখানো হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ জবরদস্তি তুলে নেওয়া হতো বা অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হতো।

৩০ জনের একটি দলের উদাহরণ দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, ওই দলের ১৭ জন ইতোমধ্যে সম্মুখ সমরে নিহত হয়েছেন, ৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন এবং মাত্র একজন কোনোমতে আহত অবস্থায় ফিরে আসতে পেরেছেন।

জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা

রিপোর্টের একটি বড় অংশে উঠে এসেছে উক্রেইনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর রাশিয়ার লাগাতার সামরিক হামলা নিয়ে। ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের তীব্র শীতে এবং তার আগের বছরগুলোতে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে উক্রেইনের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, সাবস্টেশন, পাওয়ার গ্রিড এবং গ্যাস সরবরাহ লাইনগুলোর ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে।

রুশ বাহিনীর এসব হামলার ফলে উক্রেইনের বেশ কিছু অঞ্চলে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল। ২০২৫-২০২৬ সালের শীতকালে তাপমাত্রা যখন মাইনাস ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গিয়েছিল, তখন বড় বড় শহরগুলোতে দফায় দফায় বিদ্যুৎ, পানি এবং কেন্দ্রীয় তাপব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল।

কিয়েভ, খারকিভ, দানপ্রো, ওডেসা এবং ঝাপোরিজ্জিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর লাখ লাখ মানুষ দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে কাটাতে বাধ্য হন। ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ার কারণে বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং রোগীরা চরম শারীরিক সংকটের মুখে পড়েন।

তীব্র ঠাণ্ডায় হাইপোথার্মিয়া এবং ফ্রস্টবাইটের শিকার হয়ে অনেকের অঙ্গহানি ঘটেছে কিংবা মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে একা বসবাসকারী প্রবীণ নাগরিক এবং যারা বহুতল ভবনের ওপরের তলায় লিফট বন্ধ থাকার কারণে আটকা পড়েছিলেন, তারা বাইরে গিয়ে কোনো নিরাপদ আশ্রয়েও পৌঁছাতে পারেননি।

ছোট ছোট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে জেনারেটরের জ্বালানি সংকটের কারণে চিকিৎসা, সার্জারি, এক্সরে এবং ওষুধ, ভ্যাকসিন ও রক্তের সংরক্ষণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কেমোথেরাপি নিতে গিয়ে ক্যানসার রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। বিদ্যুৎহীনতার কারণে ট্রাফিক সিগন্যাল বন্ধ থাকায় দুর্ঘটনা বেড়েছে। ঘর গরম রাখার জন্য হিটার ব্যবহার করতে গিয়ে কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া ও আগুনে বহু মানুষ মারা গেছেন।

জাতিসংঘের কমিশন আইনি পর্যালোচনায় জানিয়েছে যে, এই হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো যে কেবল সামরিক ছিল তা নয়, বরং বেসামরিক জনগণের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বস্তুগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শোইগু এবং বর্তমান নেতৃত্ব ও জেনারেল স্টাফদের পরিকল্পনা ও নির্দেশে এই হামলাগুলো পরিচালিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে।

তদন্ত কমিশন বলছে, রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ উক্রেইনের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ইচ্ছাকৃত আক্রমণ চালিয়ে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছে। একই সাথে, ইউক্রেনীয় বাহিনীও রাশিয়ার কিছু সীমান্ত অঞ্চলে বা দখল করা ক্রাইমিয়ায় পাল্টা জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত করেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সুপারিশ

জাতিসংঘের স্বাধীন এই তদন্ত কমিশন রিপোর্টে বলছে, প্রতারণা ও জবরদস্তির শিকার হয়ে রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগদানকারী এই বিদেশি নাগরিকরা কোনোভাবেই আইন অনুযায়ী ‘ভাড়াটে সেনা’ বা ‘মার্সেনারি’ নন।

যেহেতু তারা ভুয়া চুক্তির মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করতে বাধ্য হয়েছেন এবং সামরিক কাঠামোর অংশ হয়ে কমব্যাট্যান্ট বা লড়াকু হিসেবে গণ্য হবেন।

যুদ্ধক্ষেত্রে তারা যদি ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে বন্দি হন, তাহলে তাদের সাথে সাধারণ বন্দির মতো আচরণ করা যাবে না। বরং তৃতীয় জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধবন্দি হিসাবে তাদের সব সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

অন্যদিকে, বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষেত্রে এটি স্পষ্টতই মানবপাচারের অপরাধ, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।

জাতিসংঘের কমিশন সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু সুপারিশ দিয়েছে। বলা হয়েছে রাশিয়াকে বেসামরিক বা জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। বিদেশ থেকে বা দেশের ভেতর থেকে বিদেশি নাগরিকদের প্রতারণা ও জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা যাবে না। মানবপাচারের শিকার বিদেশি নাগরিকদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে এই মানবপাচারের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

উক্রেইন সরকারের প্রতিও সুপারিশ আছে কমিশনের। যুদ্ধবন্দি হিসাবে আটক থাকা মানবপাচারের শিকার বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে জেনেভা কনভেনশন কঠোরভাবে মেনে চলার সুপারিশ করেছে কমিশন। তাদের নিজ দেশে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা পরিচালনা করতে হবে। অপ্রত্যাবর্তন বা ননরিফাউলমেন্ট নীতি মেনে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশসহ যেসকল দেশের নাগরিকরা এই পাচারের শিকার হয়েছেন, সে দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক পাচারবিরোধী 'পালের্মো প্রোটোকল বা সমমানের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিজ দেশের মানবপাচাররোধ সংক্রান্ত আইন ও নীতি পর্যালোচনা ও সংশোধনের সুপারিশ করেছে এই তদন্ত কমিশন।

রাশিয়ায় আটকে পড়া বা যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহত নাগরিকদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে কূটনৈতিক উপায়ে তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে রিপোর্টে।

যারা প্রতারণার শিকার হয়ে বাধ্য হয়ে যুদ্ধে জড়িয়েছেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার পর অপরাধী হিসেবে বিচার না করে বরং মানবপাচারের 'ভুক্তভোগী' হিসেবে গণ্য করে পুনর্বাসন ও আইনি সুরক্ষা প্রদান করতে হবে।

উক্রেইনের সাধারণ মানুষের ওপর চলমান মানবিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তা অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তদন্ত কমিশন। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মানবপাচারকারী আন্তঃদেশীয় চক্রগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে সহযোগিতার বিষয়ও আছে কমিশনের সুপারিশমালায়।