পুলিশিংয়ের চেয়ে যখন তারা ‘ভিউখোর’ ও ‘মোরাল’ হতে বেশি ব্যস্ত
কাউকে আটক করা হয়েছে, অতএব তার মুখ দেখিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা যাবে, এমন সমীকরণ কোথা থেকে এলো? আদালতের দেওয়া শাস্তির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনির্দিষ্টকালের অপমান যোগ করার কর্তৃপক্ষ কে? পুলিশের নিজের করা বা তাদের সরবরাহ করা ভিডিও কত ভিউ পেল তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই ভিউ’র মূল্য কার জীবনের বিনিময়ে এল?
তন্ময় ইমরান
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪১ পিএমআপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫১ পিএম
পুলিশের নিজের করা বা তাদের সরবরাহকৃত ভিডিও কত ভিউ পেল সেটির চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সেই ভিউয়ের মূল্য কার জীবন থেকে নেওয়া হলো?
ধরুন, ঢাকার বাইরে থেকে আপনার বোন এসেছেন, চাকরি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিতে। আপনি থাকেন মেসে। খরচ বাঁচাতে দুজন একই হোটেলকক্ষে উঠলেন। রাতে পুলিশের রেইড পড়ল। সঙ্গে ক্যামেরা। আপনারা ভাইবোন কি না, যাচাই হওয়ার আগেই সাংবাদিক কিংবা কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ক্যামেরায় দুজনের মুখ ধরা পড়লো।
কিংবা আপনার মদ্যপানের বৈধ অনুমতি আছে। মদপান করে গাড়ি চালাচ্ছেন না, ট্যাক্সিতে চড়ে বাড়ি ফিরছেন। চেকপোস্টে গাড়ি থামলো। পুলিশের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, পাশ থেকে একজন ভিডিও করছেন।
কিংবা গভীর রাতে আপনার বান্ধবী যাত্রাবাড়ীতে নেমেছেন। তাকে নিরাপদে পৌঁছে দিতে গেছেন। এবার ক্যামেরার সামনে আপনাদের সম্পর্কের ব্যাখ্যা দেওয়ার পালা। পরদিন একটি ভিডিও দেখলেন। নীচে লেখা, ‘রাজধানীতে দুই বোতল মদসহ একজন গ্রেপ্তার’। ভিডিওতে সেই একজনের পাশাপাশি আপনি ও আপনার বান্ধবীর মুখও। যাদের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের অভিযোগ নেই, তারাও অভিযানের দৃশ্যের অংশ। দর্শক কীভাবে বুঝবেন, কে অভিযুক্ত আর কে শুধু বাড়ি ফিরছিলেন?
গল্পগুলো কাল্পনিক হলেও আমার আপনার আশপাশে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার সঙ্গেই মিলে যাবে। প্রশ্নটি হচ্ছে, পুলিশ প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে কি আপনার ব্যক্তিগত জীবন জনসমক্ষে প্রদর্শনের অনুমতিও পেয়ে গেল?
সমস্যাটি পুলিশের বডিক্যামে সীমাবদ্ধ নয়। নিজেরা ধারণ করা কিংবা অন্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা ভিডিও ফুটেজ পুলিশ গণমাধ্যমকে সরবরাহ করছে, তার নজির এবং অভিযোগও রয়েছে।
আবার অভিযানে সাংবাদিক বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে সঙ্গে নিয়ে দৃশ্য ধারণের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সেখান থেকে ফুটেজ পৌঁছে যাচ্ছে গণমাধ্যমের পর্দায়, ফেইসবুকে, ইউটিউবে।
এই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে ২০এ অক্টোবর ২০২৬ পূর্বাচলের একটি বাড়িতে অভিযান এবং আটক ব্যক্তিদের ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা। সেইসব ছবি-ভিডিও সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপে এসেছে পুলিশের কাছ থেকেই। এমনকি ঢাকার একটি প্রধান দৈনিকে সেই আটককৃতদের নাম, ঠিকানা, পিতৃপরিচয়ের বিস্তারিত যে বিবরণ ছাপা হয়েছে, তার সূত্রও পুলিশ ছাড়া আর কেউ হবার কোন কারণ নেই।
ফেনীর নুসরাত জাহান রাফির কথা মনে আছে? সেই তরুণী, যার গায়ে আগুন দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
যৌন হয়রানির অভিযোগ জানাতে তিনি থানায় গিয়েছিলেন। সেখানেও তার মর্যাদা সুরক্ষিত থাকেনি। তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন তার বক্তব্য ভিডিও করেছিলেন। পরে অনুমতি ছাড়াই তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ জানাতে গিয়ে নুসরাত নিজেই হয়ে উঠেছিলেন প্রকাশিত ভিডিওর বিষয়। সেই ভিডিও ধারণ ও প্রচারের ঘটনায় ২০১৯ সালে বিচারিক আদালত মোয়াজ্জেমকে আট বছরের কারাদণ্ড দেন।
পুলিশি ক্ষমতার অধীনে পাওয়া একজন মানুষের অসহায় মুহূর্তের ফুটেজ কীভাবে জনসমক্ষে পৌঁছে তার জীবন কেড়ে নিতে পারে সেটির প্রতীক নুসরাতের ঘটনাটি।
পূর্বাচলে সামাজিক বিচার
২০এ অক্টোবর পূর্বাচলের পুলিশ হাউজিং–১-এর একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি ৮৫ জনকে আটক করে। তাদের মধ্যে ৫৯ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী।
ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই দিন সংক্ষিপ্ত বিচারপ্রক্রিয়ায় পুরুষদের এক মাস এবং নারীদের ১৫ দিন করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সঙ্গে করা হয় জরিমানাও।
আটক একজনের বাবা, ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে যার ছদ্মনাম রাজীব হোসেন, তিনি প্রশ্ন তুলেছেন তার ছেলের ছবি ও ভিডিও প্রচার নিয়ে।
তার অভিযোগ, মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণের পরীক্ষা ছাড়াই তার ছেলেকে সাজা দেওয়া হয়েছে।
ডিবিপ্রধান বলেছেন, মাদক গ্রহণ ও বিশৃঙ্খল আচরণের অভিযোগে তাদের আটক করে বিশেষ আদালতে দণ্ড দেওয়া হয়।
আইনজীবী সারা হোসেন অপরাধের প্রমাণ এবং ছবি-ভিডিও প্রকাশের জনস্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ঘটনাটির স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছেন ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিক ও চারটি অধিকার সংগঠন। তারা আটক ও বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের অভিযোগ, পুলিশের বক্তব্য, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি, প্রতিটি বিষয়ই যাচাইযোগ্য। কিন্তু ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দর্শকের বিচার তার আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
কাউকে আটক করা হয়েছে, অতএব তার মুখ দেখিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা যাবে, এমন সমীকরণ কোথা থেকে এল? এমনকি দণ্ড হলেও তার ব্যক্তিগত মর্যাদা শেষ হয়ে যায় না। আদালতের দেওয়া শাস্তির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনির্দিষ্টকালের অপমান যোগ করার কর্তৃপক্ষ কে?
এখানে আরেকটি প্রশ্ন জরুরি। পূর্বাচলের সব ভিডিও কে ধারণ করেছেন, কার মাধ্যমে কোন সংবাদমাধ্যমে পৌঁছেছে, তার সম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতা দূর করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রকাশকদের।
ফুটেজের উৎস অনিশ্চিত বলে নাগরিকের ক্ষতিটিও অনিশ্চিত হয়ে যায় না।
অভিযোগ ও প্রদর্শনী দুটোই পুরোনো
ঢাকার আবদুল্লাহপুরের নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলে ১২ই অগাস্টের অভিযানের ভিডিও নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদন আরও সরাসরি বিষয়টি এসেছে।
সেখানে আটক নারীরা মুখ ঢাকতে চাইছিলেন। প্রকাশিত দৃশ্যে তাদের মুখের আবরণ সরাতে বাধ্য করার বর্ণনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তা জোর করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
একই প্রতিবেদনে পুলিশ ও ইউটিউবার সূত্রের বরাতে কিছু কর্মকর্তা অভিযানের আগে ইউটিউবারদের খবর দেন বলেও জানানো হয়।
পরিচয় যাচাই করতে পুলিশকে মুখ দেখাতে হতে পারে। কিন্তু সেই মুখ ইউটিউবের দর্শকদের দেখানো কেন প্রয়োজন?
একজন নারী মুখ ঢাকছেন মানেই কি তিনি অপরাধ স্বীকার করছেন? নাকি তিনি বুঝতে পারছেন, মামলা শেষ হওয়ার অনেক পরও তার মুখ নিয়ে মানুষের বিচার চলবে?
পুলিশের সংগ্রহ করা ফুটেজ সংবাদমাধ্যমে পৌঁছানোর নজিরও নতুন নয়।
২০১৭ সালে ফরহাদ মজহারের নিখোঁজ ও উদ্ধারের ঘটনাসংক্রান্ত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে একটি ভিডিওর দৃশ্যকে সরাসরি পুলিশের সরবরাহ করা বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
সেটি ছিল একটি মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের দোকানের দৃশ্য। এখানে সেই বিতর্কের নিষ্পত্তি করা উদ্দেশ্য নয়। উদাহরণটি দেখায়, কেবল পুলিশের বডিক্যাম নয়, অন্য উৎস থেকে পাওয়া ফুটেজও পুলিশের মাধ্যমে সাংবাদিকের কাছে পৌঁছায়।
কাজেই শুধু বডিক্যামের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সংখ্যা দিয়ে সমস্যার মাপ নেওয়া যাবে না।
পুলিশের ক্যামেরা, সংগ্রহ করা সিসিটিভি, মোবাইলের ভিডিও, সঙ্গে থাকা সাংবাদিকের দৃশ্য এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রকাশনা, এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে জোর আলোচনার সময় এসেছে।
আর পূর্বাচলের ঘটনাটি হতে পারে এই আলোচনার 'হুইসেল ব্লোয়িং মোমেন্ট'।
খুলনার একটি মেসে অভিযান
খুলনার একটি মেসের ঘটনায় একাত্তর টিভির প্রকাশিত শিরোনাম ছিল, ‘খুলনায় মেস থেকে তরুণীসহ জামায়াত নেতার ছেলে আটক’।
এই শিরোনামের মধ্যেই দুটি আলাদা তথ্যকে পাশাপাশি বসানো হয়েছে: একজন তরুণীর সঙ্গে থাকা এবং তার বাবার রাজনৈতিক পরিচয়।
এই ভিডিওটি দেখলে বোঝা যাবে, ভিডিওর তরুণীটি কতটা অসহায় ছিলেন পুরো ঘটনায়। আর সেখানে তথাকথিত আপত্তিকর কোনও ব্যাপার তো দূরে থাক, বরং ভিডিও ধারণকারী সীমালঙ্ঘন করছেন বলেই প্রতীয়মান হয়।
অথচ পুলিশের সামনেই এ অপরাধ ভিডিওধারণ করা ব্যক্তিটি করছেন। নাকি পুলিশই এই ভিডিও করিয়েছে?
এখানে জামায়াতের জায়গায় বিএনপি, এনসিপি কিংবা আওয়ামী লীগ, যে কোনও দলের নেতার নাম বসতে পারে। প্রশ্ন বদলাবে না। বাবার রাজনৈতিক পদ কি অভিযোগটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত? ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব খাটানো বা অপরাধে সহযোগিতার তথ্য আছে? নাকি পরিচয়টি কেবল দর্শকের আগ্রহ ও দলীয় বিদ্বেষ বাড়ানোর জন্য?
প্রাসঙ্গিকতা না থাকলে এটি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নৈতিক কলঙ্ক ছড়ানোর কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।
সম্পর্কের সূত্রে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর এই যুক্তিকে ইংরেজিতে ‘গিল্ট বাই অ্যাসোসিয়েশন’ বলা হয়। ব্যক্তির কথিত আচরণ দিয়ে পরিবার ও দলকে বিচার করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার জন্য ব্যক্তিগত জীবনকে উপকরণ বানালে তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ‘মোরাল পুলিশিং’ বলা যায়।
কোনও নেতার সন্তান আইন ভাঙলে অবশ্যই বিচার হবে। কিন্তু তার অপরাধ প্রমাণের বিকল্প হিসেবে বাবার দলীয় পরিচয় ব্যবহার করা যায় না।
একইভাবে একজন তরুণী কারও মেসে আছেন, এই তথ্য নিজে কোনও অপরাধের পূর্ণ বিবরণ নয়।
‘অসামাজিক কাজ’ বললেই পুলিশের দায়িত্ব শেষ হয় না। কোন কাজটি কোন আইনের অপরাধ, তা বলতে হবে।
তথাকথিত আপত্তিকর অবস্থায় পাওয়া যায়নি, নির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণও নেই, তবু বাসার দরজা খুলিয়ে সম্পর্কের কৈফিয়ত নেওয়া এবং সেটি প্রচারের আয়োজন করা হলে প্রশ্ন উঠবে: পুলিশ আইন প্রয়োগ করছে, নাকি সমাজের নামে ব্যক্তি জীবনের স্বাধীনতার গণ্ডি পাহারা দিচ্ছে?
অভিযুক্ত নয় তবু ফুটেজে ফেঁসে যাওয়া
মদের বারসংক্রান্ত সাম্প্রতিক অভিযানগুলোও এই প্রশ্ন থেকে মুক্ত নয়।
৩০এ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাতে ঢাকার ফুয়াং ক্লাব, রুচিতা, ব্লেজার ক্লাউস ও কয়লা বারে অভিযানের কথা জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমান।
পরদিন প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার বক্তব্য ছিল, রুচিতায় কয়েকজনকে পারমিট ছাড়া পাওয়া গেছে। তবে পারমিট ছাড়া দেদারসে মদ বিক্রির যে অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল, ওই দিনের অভিযানে তেমন চিত্র পাওয়া যায়নি; কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে।
এই বক্তব্য থেকে ফুয়াংয়ে উপস্থিত সবার কিংবা অধিকাংশের পারমিট ছিল, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। কিন্তু এটুকু বোঝা যায়, বারগুলোতে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষকে একইভাবে অপরাধী ধরে নেওয়ার ভিত্তি নেই।
প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, মদের বৈধ উৎস, শুল্ক পরিশোধ, ব্যক্তির পান করার পারমিট এবং ঘটনাস্থলে তার ভূমিকা পৃথক বিষয়।
প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেখানে উপস্থিত প্রত্যেক অতিথি সেই অপরাধে দায়ী হয়ে যান না। কর্মচারী, চালক কিংবা অতিথির মুখ দেখিয়ে ‘অবৈধ মদের আস্তানা’ ধরনের শিরোনাম দিলে দর্শকের কাছে এই পার্থক্যগুলো আর থাকে না।
অভিযানের ফুটেজে অনুমতিপত্রধারী কিংবা অভিযোগহীন মানুষকে দেখানো হলে তাদের ক্ষতির দায় কে নেবে?
অভিযান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পরিচালনা করলে সেই সংস্থার ভূমিকা পরীক্ষা করতে হবে। পুলিশ বা অন্য বাহিনী যুক্ত থাকলে তাদেরও। সব অভিযানকে পুলিশের অভিযান বললে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাটি আড়ালে থেকে যেতে পারে।
প্রশ্ন তাই নির্দিষ্ট - কার নিয়ন্ত্রণে অভিযান হয়েছে? কে ক্যামেরাকে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছেন? কে ফুটেজ সরবরাহ করেছেন? প্রকাশক কী যাচাই করেছেন?
একটি সত্য দৃশ্যও বিভ্রান্তিকরভাবে ব্যবহার করা যায়। ‘একজন গ্রেপ্তার’ শিরোনামের নিচে দশজনের মুখ দেখালে বাকি নয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ না এনেও তাদের সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।
প্রকাশিত ফুটেজের এই ক্ষতি বোঝার জন্য ভিডিও জাল হওয়া জরুরি নয়।
সাংবাদিক সঙ্গে থাকলেই কি দায় শেষ?
পুলিশি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সাংবাদিকের উপস্থিতির মূল্য আছে। পুলিশের অনিয়ম, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা মিথ্যা দাবির প্রমাণ সাংবাদিকের ক্যামেরাতেই ধরা পড়তে পারে। এই স্বাধীনতা সংকুচিত করা যাবে না।
কিন্তু সাংবাদিককে খবর দেওয়া, ব্যক্তিগত ঘরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া এবং কাউকে মুখ দেখাতে বাধ্য করা এক কাজ নয়।
একইভাবে কোনও ঘটনার তথ্য জানানো এবং নাগরিককে প্রকাশ্য চরিত্র পরীক্ষার মুখে ফেলা এক নয়।
পুলিশ নিজের ক্যামেরায় ধারণ করে ফুটেজ সরবরাহ করলে সেই সিদ্ধান্তের জবাব দিতে হবে।
সাংবাদিক নিজে ধারণ করলে প্রকাশের দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমের। কিন্তু পুলিশ যদি মানুষকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করায়, মুখের আবরণ সরায় বা ব্যক্তিগত জায়গায় অন্যকে প্রবেশের সুযোগ দেয়, সেই ভূমিকাও জবাবদিহির বাইরে নয়।
সংবাদমাধ্যমেরও ‘পুলিশ দিয়েছে’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। পুলিশের দাবি যাচাই করাই সাংবাদিকতার কাজ।
পুলিশকে তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা আর পুলিশের তৈরি বয়ানের প্রচারক হয়ে যাওয়া আলাদা বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর বিপদ আরও বাড়ে। মূল প্রতিবেদন থেকে দৃশ্য কেটে নেওয়া হয়, নতুন শিরোনাম বসে, মুখের স্ক্রিনশট ছড়ায়। পরে সংশোধনী দিলেও পুরোনো দৃশ্যের সব কপি ফিরিয়ে আনা যায় না।
যে ব্যক্তি একবার ভিডিওতে আটকা পড়লেন, তাকেই বারবার নিজের নির্দোষ প্রমাণ করতে হয়।
‘লিক হয়েছে’ কোনও পূর্ণাঙ্গ জবাব নয়
পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন ফুটেজ অনুমতি ছাড়া বাইরে গেলে সেটি তথ্যসুরক্ষার ব্যর্থতা, যার তদন্ত প্রয়োজন।
কে ফুটেজ দেখেছেন, কপি করেছেন বা অন্যকে পাঠিয়েছেন, সেই হিসাব কোথায়?
ইচ্ছাকৃত সরবরাহ, অবহেলায় ‘লিক’ হওয়া এবং বাইরের অনুপ্রবেশের দায় এক নয়। তদন্ত ছাড়া কোনও কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট অপরাধে দায়ী করা যাবে না। কিন্তু এই পার্থক্য দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষণ ও তদারকির দায়িত্বও অস্বীকার করা যাবে না।
একই সঙ্গে সাংবাদিকের নিজের ধারণ করা ভিডিওকে ‘পুলিশি নথি ফাঁস’ বলা যাবে না।
অনিয়ম উন্মোচনকারী সাংবাদিকের সূত্রের সুরক্ষাও জরুরি। প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যেখানে জনস্বার্থে পুলিশের জবাবদিহি সম্ভব হবে, অথচ নাগরিকের ব্যক্তিগত দৃশ্য নির্বিচারে ছড়াবে না।
রাষ্ট্রের কাছে তথ্য থাকার অর্থ সেটি সবার বিনোদনের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া নয়।
‘দ্য বডি-ক্যাম হাসল’: এপ্রিলের হারানো জীবন
পুলিশের ফুটেজ সরবরাহ নিয়ে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের ‘দ্য বডি-ক্যাম হাসল’প্রতিবেদনে এপ্রিল নামের এক তরুণীর গল্প আছে।
মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার পর তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে আসক্তি কাটিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন, শিক্ষকতায় যোগ দেন।
এর বেশ কিছুদিন পর তার সেই গ্রেপ্তারের ঘটনার প্রায় ৪০ মিনিটের বডিক্যাম ভিডিও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় দুই লাখবার দেখা হয়। নাম-মুখসহ প্রকাশিত দৃশ্যে অপমানজনক মন্তব্য জমে। জীবন বদলালেও পুরোনো মুহূর্তটি তাকে কখনো ছাড়েনি।
‘হাসল’ এখানে নিছক বিড়ম্বনা বোঝাচ্ছে না। মানুষের দুর্বল মুহূর্তকে ব্যবহার করে দর্শক ও আয় পাওয়ার তৎপরতার ইঙ্গিত আছে। এ কারণেই ‘বডিক্যাম হাসল’ বলে শুধু প্রযুক্তির ঝামেলায় বিষয়টি নামিয়ে আনা ঠিক হবে না।
এপ্রিলের ঘটনায় অপরাধের অভিযোগ ছিল। তারপরও প্রশ্ন থাকে, আইন নির্ধারিত প্রক্রিয়ার পর একজন মানুষের নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ কি থাকবে না?
তার অতীতের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তকে অন্য কেউ কত দিন লাভের উপকরণ বানাতে পারবেন?
বাংলাদেশে এই প্রশ্নের সঙ্গে আরও একটি সমস্যা যুক্ত হয়। এখানে অপরাধের অভিযোগ না থাকা মানুষকে অভিযানের ভিডিওতে দেখা যেতে পারে। একজনের ক্ষেত্রে পুরোনো অপরাধ অনন্তকাল ফিরে আসে; অন্যজনের ক্ষেত্রে কোনও অপরাধ ছাড়াই সন্দেহের পরিচয় তৈরি হয়।
গবেষক ব্রাইস ক্লেটন নিউয়েলও বেলিংহামের মদ্যপান যাচাই ও যৌনকর্মসংক্রান্ত অভিযানের বডিক্যাম ফুটেজ ইউটিউবে প্রকাশিত হওয়ার উদাহরণ দিয়েছেন।
সরকারি নথি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত ভিডিওতে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত পরিস্থিতিও উন্মুক্ত হয়েছিল। জবাবদিহির জন্য তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সংঘাতটি সেখানেই।
মাসান সিনেমার হোটেল অভিযানের দৃশ্যও এই ভয় মনে করিয়ে দেয়। সেটি কল্পকাহিনি, বাস্তব বডিক্যাম মামলা নয়। কিন্তু পুলিশি ক্যামেরায় ধরা পড়া ব্যক্তিগত মুহূর্ত যে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হতে পারে, সেই আশঙ্কাটি বাস্তব আলোচনারই অংশ।
বাংলাদেশে কত ক্যামেরা, কী প্রশিক্ষণ
বাংলাদেশে বডিক্যাম ব্যবহার শুরু হয় ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক সার্জেন্টদের ১৫টি ক্যামেরা দিয়ে সূচনা। পরে বিভিন্ন মহানগর ও জেলা পুলিশের ইউনিটে এর ব্যবহার বিস্তৃত হয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নির্বাচন সামনে রেখে প্রায় ৪০ হাজার ক্যামেরা সংগ্রহের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছিল। তবে অনুমোদিত সংখ্যা ও সরবরাহের সংখ্যা এক নয়।
২১এ জানুয়ারি ২০২৬ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানান, নির্বাচনের জন্য ২৫ হাজার ৫০০ ক্যামেরা সরবরাহ ও ব্যবহারোপযোগী করা হয়েছে।
জুনের একটি প্রতিবেদনে পুলিশের কাছে মোট প্রায় ২৫ হাজার ক্যামেরা থাকার কথা বলা হয়। সংখ্যার এই পার্থক্যসহ বর্তমানে কতটি সচল, তার হালনাগাদ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণেরও প্রমাণ আছে। পঞ্চগড়ে ২০২২ সালে বডিক্যাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ হয়েছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সরকারি বৈঠকে জানানো হয়, মজুত ক্যামেরা দিয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। পরবর্তী নির্বাচনি প্রশিক্ষণ মডিউলেও হাতে-কলমে বডিক্যাম ব্যবহার শেখানোর কথা প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু সেখানে নৈতিকতা শেখানো হয় কি? ব্যক্তিগত ঘরে রেকর্ডিংয়ের সীমা, অভিযোগকারীর গোপনীয়তা, শিশু বা যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তির পরিচয়, ফুটেজ প্রকাশের অনুমতি এবং সাংবাদিককে সরবরাহের বিধান কতটা আছে?
পূর্ণাঙ্গ মডিউলের প্রকাশ্য কপি না পাওয়ায় নিশ্চিত উত্তর দেওয়া যাচ্ছে না। নথি না পাওয়াকে প্রশিক্ষণ হয়নি বলার প্রমাণও বানানো যাবে না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পুলিশ সদর দপ্তরে দেওয়া প্রয়োজন। ক্যামেরার বোতাম চালানো শেখানোর সঙ্গে নাগরিকের অধিকার রক্ষা শেখানো সমান জরুরি।
যন্ত্র ব্যবহারের দক্ষতা আছে, কিন্তু তার সীমা সম্পর্কে ধারণা নেই, এমন প্রশিক্ষণ অসম্পূর্ণ।
পুলিশ যখন কনটেন্ট ক্রিয়েটর
‘এই পুলিশেরা কনটেন্ট ক্রিয়েটর, লাখ লাখ ফলোয়ার তাদের, নির্দেশিকা মানছেন কি’ শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রতিবেদক আব্দুল্লাহ আল মামুন একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন।
২৪এ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে পুলিশ সদস্যদের পরিচালিত ১০৭টি ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করার কথা এসেছে। সংশ্লিষ্ট সদস্যদের কেউ কেউ বলেছেন, তারা সচেতনতা তৈরি বা মানুষকে সহায়তার উদ্দেশ্যে ভিডিও করেন।
কিন্তু একই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা–২০২৫ অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া অপারেশনাল কার্যক্রমের ছবি-ভিডিও আপলোড করা যায় না। বিধিভঙ্গে বিভাগীয় ব্যবস্থার কথাও রয়েছে।
তাহলে এসব ভিডিওর অনুমোদন কে দেন? ব্যক্তিগত পেজে সরকারি দায়িত্বের দৃশ্য প্রকাশের প্রয়োজন কী? সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তির দুঃখের বিবরণ প্রকাশ না করেও কি তাকে সাহায্য করা যায় না?
একজন নাগরিক থানায় বা রাস্তায় পুলিশের কাছে গেলে দুজনের ক্ষমতা সমান থাকে না। ক্যামেরায় কথা বলতে না চাইলে পুলিশ অসন্তুষ্ট হবে কি না, এমন ভয়ও কাজ করতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে আপত্তি না করাকে স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ধরে নেওয়া কঠিন।
সব কর্মকর্তা আয় করছেন, এমন প্রমাণ নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, অনুসারী বৃদ্ধি এবং দর্শকের প্রশংসাও প্রণোদনা। সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে সেই ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের সুযোগ থাকলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়।
যথেচ্ছ ভিডিও করা কি আইনসিদ্ধ?
‘অনুমতি ছাড়া ভিডিও করলেই অপরাধ’ এবং ‘জনসমক্ষে আছেন, তাই যা খুশি করা যাবে’, দুটিই অতিসরল দাবি। কোথায় ধারণ করা হয়েছে, কী উদ্দেশ্যে, কী দেখানো হয়েছে, কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং কার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এসব বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ আইনসাপেক্ষ যুক্তিসংগত সীমার মধ্যে গৃহে নিরাপত্তা ও যোগাযোগের গোপনতা রক্ষার অধিকার দিয়েছে।
৩৫(৫) অনুচ্ছেদ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা ব্যবহারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। পুলিশি অভিযানের প্রয়োজন এই অধিকারগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয় না।
২০১২ সালে হাইকোর্ট আটক বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে প্রদর্শন না করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে বিচারের আগে কাউকে প্রদর্শনের প্রশ্নটি বহু পুরোনো।
দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় কথার পাশাপাশি দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমেও মানহানির বিধান রয়েছে। সুনাম ক্ষতির উদ্দেশ্য বা ক্ষতির সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞান এবং আইনের ব্যতিক্রমগুলো এখানে বিবেচ্য।
অপরাধের শিরোনামের সঙ্গে অভিযোগহীন ব্যক্তির মুখ এমনভাবে যুক্ত করা হলে, যাতে তার বিরুদ্ধে অপবাদ তৈরি হয়, সেটি মানহানির উপাদান পূরণ করে কি না পরীক্ষা করতে হবে।
দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় নারীর শালীনতাকে অপমান করার উদ্দেশ্যে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় অনুপ্রবেশের বিধানও রয়েছে।
যেকোনও ভিডিওর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই ধারা প্রযোজ্য নয়; নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও আচরণ প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু নারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতিকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অপমানের উপকরণ করা হলে বিষয়টি কেবল রুচির প্রশ্নে সীমিত থাকে না।
সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন বা সেক্সটর্শনের নির্দিষ্ট অভিপ্রায়ে ক্ষতিকর বা ভীতিপ্রদ তথ্য, ছবি ও ভিডিও প্রকাশ বা প্রকাশের হুমকিকে অপরাধ করা হয়েছে।
তাই ফুটেজ দিয়ে ব্ল্যাকমেইল বা যৌন হয়রানির উপাদান থাকলে এই ধারার প্রশ্ন আসে। সাধারণ সংবাদ প্রকাশকে নির্বিচারে এই ধারায় ফেলা যায় না।
একই আইনের ৩৯ ধারায় ওই আইনের অধীনে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার বাধ্যবাধকতা এবং লঙ্ঘনের শাস্তি আছে। এর প্রয়োগক্ষেত্র নির্দিষ্ট; সব মাদক অভিযান বা সব পুলিশি ফুটেজে ধারাটি বসিয়ে দেওয়া যাবে না। তবু এটি দেখায়, তদন্তে পাওয়া তথ্য প্রকাশের ওপর আইনি সীমা একটি স্বীকৃত বিষয়।
নুসরাতের ঘটনার পুরোনো রায়কে বর্তমান আইনের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলেও বলা যায়, পুলিশি দায়িত্বের মধ্যে পাওয়া ভিডিওর অপব্যবহার ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে।
সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন, বিভাগীয় অসদাচরণ ও ফৌজদারি অপরাধ পৃথক পরীক্ষা। প্রতিটি ঘটনায় প্রযোজ্য আইন ও প্রমাণ মিলিয়ে দায় নির্ধারণ করতে হবে।
নৈতিকতার পাহারা থেকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ
নৈতিক পুলিশিংয়ে রাষ্ট্র বা সামাজিক গোষ্ঠী ব্যক্তির আচরণকে নিজেদের নৈতিক মানদণ্ডে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এর সঙ্গে প্রকাশ্য অপমান যুক্ত হলে আইন ভাঙার প্রশ্নের চেয়ে ‘লোকটি কেমন মানুষ’ সেই বিচার বড় হয়ে ওঠে।
‘অসামাজিক’, ‘চরিত্রহীন’ বা ‘মাদকসেবী’ তকমা একবার বসলে ব্যক্তির অন্য পরিচয় চাপা পড়ে। দর্শকের ক্ষোভ যত বাড়ে, একই ধরনের ভিডিও প্রকাশের উৎসাহও বাড়তে পারে। তখন পুলিশ তদন্তকারীর পাশাপাশি উপস্থাপক ও নৈতিক বিচারকের ভূমিকায় হাজির হন।
এর রাজনৈতিক ক্ষতি হলো, নাগরিকের অধিকার ক্রমে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নৈতিক অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
কার সঙ্গে বের হবেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে বিনোদন করবেন, প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপর সম্ভাব্য অপমানের ভয় পেয়ে বসে।
একই ক্ষমতা বাছাই করে ব্যবহার করা যায়। কোনও রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানকে নিয়ে দৃশ্য ছড়ানো হয়, অন্য কারও পরিচয় আড়াল থাকে। তখন আইন সমানভাবে প্রয়োগের বদলে নৈতিক ক্ষোভ রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে।
মানুষ অভিযোগ জানাতেও ভয় পেতে পারেন। নিজের পারিবারিক সমস্যা বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতা পুলিশের পেজে প্রকাশিত হবে, এই আশঙ্কা থাকলে সহায়তা চাইতে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। এতে কোনও কর্মকর্তার জনপ্রিয়তা বাড়লেও প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমতে পারে।
ক্যামেরার হিসাব চাই, নাগরিকের অপমান নয়
পুলিশের কাছে কতটি ক্যামেরা আছে, সেটি জানা প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন জানা, সেগুলো কখন চালু থাকে, কে ফুটেজ দেখেন, কে কপি করেন এবং কত দিন সংরক্ষিত থাকে।
ব্যক্তিগত ফোনে ফুটেজ নেওয়া যায় কি না, সাংবাদিককে দেওয়ার অনুমতি কে দেন, ফাঁস হলে কী তদন্ত হয়, এসবের প্রকাশ্য নীতি দরকার।
প্রকাশের আগে মুখ, নাম ও অন্য পরিচয়সূচক তথ্য দেখানোর প্রয়োজন আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। জনস্বার্থে পুলিশের অনিয়মের প্রমাণ প্রকাশ এবং নিরুপায় নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবন প্রদর্শনকে একই যুক্তিতে বৈধতা দেওয়া যাবে না।
সংবাদমাধ্যমেরও নিজস্ব সম্পাদনা নীতি প্রয়োজন। অভিযানের ফুটেজ পাওয়া মানেই সবটুকু প্রচার করা নয়। অভিযোগহীন মানুষের মুখ, অভিযোগকারীর সংবেদনশীল বক্তব্য কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের অপ্রাসঙ্গিক দৃশ্য বাদ দেওয়াও সাংবাদিকতার কাজ।
কোনও অপরাধের তদন্ত বন্ধ হোক, এই দাবি নয়। দাবি হলো, তদন্তের নামে নতুন অন্যায় যেন না ঘটে। আইন ভাঙার অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে আইনি প্রক্রিয়ায়। সঙ্গে অপমানের অনলাইন অনুষ্ঠান জুড়ে দেওয়া পুলিশের দায়িত্ব নয়।
ভাইবোনের হোটেলকক্ষ থেকে চেকপোস্টের উবার, বান্ধবীকে পৌঁছে দেওয়া থেকে নুসরাতের অভিযোগ জানাতে যাওয়া, প্রতিটি পরিস্থিতিতে একজন নাগরিক ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি। ক্যামেরার কাজ সেই ক্ষমতার ব্যবহার নথিভুক্ত করা। নাগরিকের অসহায়ত্বকে অন্যের জনপ্রিয়তার উপকরণ বানানো নয়।
পুলিশের নিজের করা বা তাদের সরবরাহকৃত ভিডিও কত ভিউ পেল সেটির চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সেই ভিউয়ের মূল্য কার জীবন থেকে নেওয়া হলো?
পুলিশিংয়ের চেয়ে যখন তারা ‘ভিউখোর’ ও ‘মোরাল’ হতে বেশি ব্যস্ত
কাউকে আটক করা হয়েছে, অতএব তার মুখ দেখিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা যাবে, এমন সমীকরণ কোথা থেকে এলো? আদালতের দেওয়া শাস্তির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনির্দিষ্টকালের অপমান যোগ করার কর্তৃপক্ষ কে? পুলিশের নিজের করা বা তাদের সরবরাহ করা ভিডিও কত ভিউ পেল তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই ভিউ’র মূল্য কার জীবনের বিনিময়ে এল?
ধরুন, ঢাকার বাইরে থেকে আপনার বোন এসেছেন, চাকরি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিতে। আপনি থাকেন মেসে। খরচ বাঁচাতে দুজন একই হোটেলকক্ষে উঠলেন। রাতে পুলিশের রেইড পড়ল। সঙ্গে ক্যামেরা। আপনারা ভাইবোন কি না, যাচাই হওয়ার আগেই সাংবাদিক কিংবা কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ক্যামেরায় দুজনের মুখ ধরা পড়লো।
কিংবা আপনার মদ্যপানের বৈধ অনুমতি আছে। মদপান করে গাড়ি চালাচ্ছেন না, ট্যাক্সিতে চড়ে বাড়ি ফিরছেন। চেকপোস্টে গাড়ি থামলো। পুলিশের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, পাশ থেকে একজন ভিডিও করছেন।
কিংবা গভীর রাতে আপনার বান্ধবী যাত্রাবাড়ীতে নেমেছেন। তাকে নিরাপদে পৌঁছে দিতে গেছেন। এবার ক্যামেরার সামনে আপনাদের সম্পর্কের ব্যাখ্যা দেওয়ার পালা। পরদিন একটি ভিডিও দেখলেন। নীচে লেখা, ‘রাজধানীতে দুই বোতল মদসহ একজন গ্রেপ্তার’। ভিডিওতে সেই একজনের পাশাপাশি আপনি ও আপনার বান্ধবীর মুখও। যাদের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের অভিযোগ নেই, তারাও অভিযানের দৃশ্যের অংশ। দর্শক কীভাবে বুঝবেন, কে অভিযুক্ত আর কে শুধু বাড়ি ফিরছিলেন?
গল্পগুলো কাল্পনিক হলেও আমার আপনার আশপাশে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার সঙ্গেই মিলে যাবে। প্রশ্নটি হচ্ছে, পুলিশ প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে কি আপনার ব্যক্তিগত জীবন জনসমক্ষে প্রদর্শনের অনুমতিও পেয়ে গেল?
সমস্যাটি পুলিশের বডিক্যামে সীমাবদ্ধ নয়। নিজেরা ধারণ করা কিংবা অন্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা ভিডিও ফুটেজ পুলিশ গণমাধ্যমকে সরবরাহ করছে, তার নজির এবং অভিযোগও রয়েছে।
আবার অভিযানে সাংবাদিক বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে সঙ্গে নিয়ে দৃশ্য ধারণের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সেখান থেকে ফুটেজ পৌঁছে যাচ্ছে গণমাধ্যমের পর্দায়, ফেইসবুকে, ইউটিউবে।
এই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে ২০এ অক্টোবর ২০২৬ পূর্বাচলের একটি বাড়িতে অভিযান এবং আটক ব্যক্তিদের ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা। সেইসব ছবি-ভিডিও সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপে এসেছে পুলিশের কাছ থেকেই। এমনকি ঢাকার একটি প্রধান দৈনিকে সেই আটককৃতদের নাম, ঠিকানা, পিতৃপরিচয়ের বিস্তারিত যে বিবরণ ছাপা হয়েছে, তার সূত্রও পুলিশ ছাড়া আর কেউ হবার কোন কারণ নেই।
ফেনীর নুসরাত জাহান রাফির কথা মনে আছে? সেই তরুণী, যার গায়ে আগুন দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
যৌন হয়রানির অভিযোগ জানাতে তিনি থানায় গিয়েছিলেন। সেখানেও তার মর্যাদা সুরক্ষিত থাকেনি। তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন তার বক্তব্য ভিডিও করেছিলেন। পরে অনুমতি ছাড়াই তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ জানাতে গিয়ে নুসরাত নিজেই হয়ে উঠেছিলেন প্রকাশিত ভিডিওর বিষয়। সেই ভিডিও ধারণ ও প্রচারের ঘটনায় ২০১৯ সালে বিচারিক আদালত মোয়াজ্জেমকে আট বছরের কারাদণ্ড দেন।
পুলিশি ক্ষমতার অধীনে পাওয়া একজন মানুষের অসহায় মুহূর্তের ফুটেজ কীভাবে জনসমক্ষে পৌঁছে তার জীবন কেড়ে নিতে পারে সেটির প্রতীক নুসরাতের ঘটনাটি।
পূর্বাচলে সামাজিক বিচার
২০এ অক্টোবর পূর্বাচলের পুলিশ হাউজিং–১-এর একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি ৮৫ জনকে আটক করে। তাদের মধ্যে ৫৯ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী।
ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই দিন সংক্ষিপ্ত বিচারপ্রক্রিয়ায় পুরুষদের এক মাস এবং নারীদের ১৫ দিন করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সঙ্গে করা হয় জরিমানাও।
আটক একজনের বাবা, ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে যার ছদ্মনাম রাজীব হোসেন, তিনি প্রশ্ন তুলেছেন তার ছেলের ছবি ও ভিডিও প্রচার নিয়ে।
তার অভিযোগ, মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণের পরীক্ষা ছাড়াই তার ছেলেকে সাজা দেওয়া হয়েছে।
ডিবিপ্রধান বলেছেন, মাদক গ্রহণ ও বিশৃঙ্খল আচরণের অভিযোগে তাদের আটক করে বিশেষ আদালতে দণ্ড দেওয়া হয়।
আইনজীবী সারা হোসেন অপরাধের প্রমাণ এবং ছবি-ভিডিও প্রকাশের জনস্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ঘটনাটির স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছেন ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিক ও চারটি অধিকার সংগঠন। তারা আটক ও বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের অভিযোগ, পুলিশের বক্তব্য, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি, প্রতিটি বিষয়ই যাচাইযোগ্য। কিন্তু ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দর্শকের বিচার তার আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
কাউকে আটক করা হয়েছে, অতএব তার মুখ দেখিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা যাবে, এমন সমীকরণ কোথা থেকে এল? এমনকি দণ্ড হলেও তার ব্যক্তিগত মর্যাদা শেষ হয়ে যায় না। আদালতের দেওয়া শাস্তির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনির্দিষ্টকালের অপমান যোগ করার কর্তৃপক্ষ কে?
এখানে আরেকটি প্রশ্ন জরুরি। পূর্বাচলের সব ভিডিও কে ধারণ করেছেন, কার মাধ্যমে কোন সংবাদমাধ্যমে পৌঁছেছে, তার সম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতা দূর করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রকাশকদের।
ফুটেজের উৎস অনিশ্চিত বলে নাগরিকের ক্ষতিটিও অনিশ্চিত হয়ে যায় না।
অভিযোগ ও প্রদর্শনী দুটোই পুরোনো
ঢাকার আবদুল্লাহপুরের নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলে ১২ই অগাস্টের অভিযানের ভিডিও নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদন আরও সরাসরি বিষয়টি এসেছে।
সেখানে আটক নারীরা মুখ ঢাকতে চাইছিলেন। প্রকাশিত দৃশ্যে তাদের মুখের আবরণ সরাতে বাধ্য করার বর্ণনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তা জোর করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
একই প্রতিবেদনে পুলিশ ও ইউটিউবার সূত্রের বরাতে কিছু কর্মকর্তা অভিযানের আগে ইউটিউবারদের খবর দেন বলেও জানানো হয়।
পরিচয় যাচাই করতে পুলিশকে মুখ দেখাতে হতে পারে। কিন্তু সেই মুখ ইউটিউবের দর্শকদের দেখানো কেন প্রয়োজন?
একজন নারী মুখ ঢাকছেন মানেই কি তিনি অপরাধ স্বীকার করছেন? নাকি তিনি বুঝতে পারছেন, মামলা শেষ হওয়ার অনেক পরও তার মুখ নিয়ে মানুষের বিচার চলবে?
পুলিশের সংগ্রহ করা ফুটেজ সংবাদমাধ্যমে পৌঁছানোর নজিরও নতুন নয়।
২০১৭ সালে ফরহাদ মজহারের নিখোঁজ ও উদ্ধারের ঘটনাসংক্রান্ত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে একটি ভিডিওর দৃশ্যকে সরাসরি পুলিশের সরবরাহ করা বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
সেটি ছিল একটি মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের দোকানের দৃশ্য। এখানে সেই বিতর্কের নিষ্পত্তি করা উদ্দেশ্য নয়। উদাহরণটি দেখায়, কেবল পুলিশের বডিক্যাম নয়, অন্য উৎস থেকে পাওয়া ফুটেজও পুলিশের মাধ্যমে সাংবাদিকের কাছে পৌঁছায়।
কাজেই শুধু বডিক্যামের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সংখ্যা দিয়ে সমস্যার মাপ নেওয়া যাবে না।
পুলিশের ক্যামেরা, সংগ্রহ করা সিসিটিভি, মোবাইলের ভিডিও, সঙ্গে থাকা সাংবাদিকের দৃশ্য এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রকাশনা, এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে জোর আলোচনার সময় এসেছে।
আর পূর্বাচলের ঘটনাটি হতে পারে এই আলোচনার 'হুইসেল ব্লোয়িং মোমেন্ট'।
খুলনার একটি মেসে অভিযান
খুলনার একটি মেসের ঘটনায় একাত্তর টিভির প্রকাশিত শিরোনাম ছিল, ‘খুলনায় মেস থেকে তরুণীসহ জামায়াত নেতার ছেলে আটক’।
এই শিরোনামের মধ্যেই দুটি আলাদা তথ্যকে পাশাপাশি বসানো হয়েছে: একজন তরুণীর সঙ্গে থাকা এবং তার বাবার রাজনৈতিক পরিচয়।
এই ভিডিওটি দেখলে বোঝা যাবে, ভিডিওর তরুণীটি কতটা অসহায় ছিলেন পুরো ঘটনায়। আর সেখানে তথাকথিত আপত্তিকর কোনও ব্যাপার তো দূরে থাক, বরং ভিডিও ধারণকারী সীমালঙ্ঘন করছেন বলেই প্রতীয়মান হয়।
অথচ পুলিশের সামনেই এ অপরাধ ভিডিওধারণ করা ব্যক্তিটি করছেন। নাকি পুলিশই এই ভিডিও করিয়েছে?
এখানে জামায়াতের জায়গায় বিএনপি, এনসিপি কিংবা আওয়ামী লীগ, যে কোনও দলের নেতার নাম বসতে পারে। প্রশ্ন বদলাবে না। বাবার রাজনৈতিক পদ কি অভিযোগটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত? ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব খাটানো বা অপরাধে সহযোগিতার তথ্য আছে? নাকি পরিচয়টি কেবল দর্শকের আগ্রহ ও দলীয় বিদ্বেষ বাড়ানোর জন্য?
প্রাসঙ্গিকতা না থাকলে এটি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নৈতিক কলঙ্ক ছড়ানোর কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।
সম্পর্কের সূত্রে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর এই যুক্তিকে ইংরেজিতে ‘গিল্ট বাই অ্যাসোসিয়েশন’ বলা হয়। ব্যক্তির কথিত আচরণ দিয়ে পরিবার ও দলকে বিচার করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার জন্য ব্যক্তিগত জীবনকে উপকরণ বানালে তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ‘মোরাল পুলিশিং’ বলা যায়।
কোনও নেতার সন্তান আইন ভাঙলে অবশ্যই বিচার হবে। কিন্তু তার অপরাধ প্রমাণের বিকল্প হিসেবে বাবার দলীয় পরিচয় ব্যবহার করা যায় না।
একইভাবে একজন তরুণী কারও মেসে আছেন, এই তথ্য নিজে কোনও অপরাধের পূর্ণ বিবরণ নয়।
‘অসামাজিক কাজ’ বললেই পুলিশের দায়িত্ব শেষ হয় না। কোন কাজটি কোন আইনের অপরাধ, তা বলতে হবে।
তথাকথিত আপত্তিকর অবস্থায় পাওয়া যায়নি, নির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণও নেই, তবু বাসার দরজা খুলিয়ে সম্পর্কের কৈফিয়ত নেওয়া এবং সেটি প্রচারের আয়োজন করা হলে প্রশ্ন উঠবে: পুলিশ আইন প্রয়োগ করছে, নাকি সমাজের নামে ব্যক্তি জীবনের স্বাধীনতার গণ্ডি পাহারা দিচ্ছে?
অভিযুক্ত নয় তবু ফুটেজে ফেঁসে যাওয়া
মদের বারসংক্রান্ত সাম্প্রতিক অভিযানগুলোও এই প্রশ্ন থেকে মুক্ত নয়।
৩০এ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাতে ঢাকার ফুয়াং ক্লাব, রুচিতা, ব্লেজার ক্লাউস ও কয়লা বারে অভিযানের কথা জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমান।
পরদিন প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার বক্তব্য ছিল, রুচিতায় কয়েকজনকে পারমিট ছাড়া পাওয়া গেছে। তবে পারমিট ছাড়া দেদারসে মদ বিক্রির যে অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল, ওই দিনের অভিযানে তেমন চিত্র পাওয়া যায়নি; কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে।
এই বক্তব্য থেকে ফুয়াংয়ে উপস্থিত সবার কিংবা অধিকাংশের পারমিট ছিল, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। কিন্তু এটুকু বোঝা যায়, বারগুলোতে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষকে একইভাবে অপরাধী ধরে নেওয়ার ভিত্তি নেই।
প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, মদের বৈধ উৎস, শুল্ক পরিশোধ, ব্যক্তির পান করার পারমিট এবং ঘটনাস্থলে তার ভূমিকা পৃথক বিষয়।
প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেখানে উপস্থিত প্রত্যেক অতিথি সেই অপরাধে দায়ী হয়ে যান না। কর্মচারী, চালক কিংবা অতিথির মুখ দেখিয়ে ‘অবৈধ মদের আস্তানা’ ধরনের শিরোনাম দিলে দর্শকের কাছে এই পার্থক্যগুলো আর থাকে না।
অভিযানের ফুটেজে অনুমতিপত্রধারী কিংবা অভিযোগহীন মানুষকে দেখানো হলে তাদের ক্ষতির দায় কে নেবে?
অভিযান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পরিচালনা করলে সেই সংস্থার ভূমিকা পরীক্ষা করতে হবে। পুলিশ বা অন্য বাহিনী যুক্ত থাকলে তাদেরও। সব অভিযানকে পুলিশের অভিযান বললে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাটি আড়ালে থেকে যেতে পারে।
প্রশ্ন তাই নির্দিষ্ট - কার নিয়ন্ত্রণে অভিযান হয়েছে? কে ক্যামেরাকে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছেন? কে ফুটেজ সরবরাহ করেছেন? প্রকাশক কী যাচাই করেছেন?
একটি সত্য দৃশ্যও বিভ্রান্তিকরভাবে ব্যবহার করা যায়। ‘একজন গ্রেপ্তার’ শিরোনামের নিচে দশজনের মুখ দেখালে বাকি নয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ না এনেও তাদের সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।
প্রকাশিত ফুটেজের এই ক্ষতি বোঝার জন্য ভিডিও জাল হওয়া জরুরি নয়।
সাংবাদিক সঙ্গে থাকলেই কি দায় শেষ?
পুলিশি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সাংবাদিকের উপস্থিতির মূল্য আছে। পুলিশের অনিয়ম, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা মিথ্যা দাবির প্রমাণ সাংবাদিকের ক্যামেরাতেই ধরা পড়তে পারে। এই স্বাধীনতা সংকুচিত করা যাবে না।
কিন্তু সাংবাদিককে খবর দেওয়া, ব্যক্তিগত ঘরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া এবং কাউকে মুখ দেখাতে বাধ্য করা এক কাজ নয়।
একইভাবে কোনও ঘটনার তথ্য জানানো এবং নাগরিককে প্রকাশ্য চরিত্র পরীক্ষার মুখে ফেলা এক নয়।
পুলিশ নিজের ক্যামেরায় ধারণ করে ফুটেজ সরবরাহ করলে সেই সিদ্ধান্তের জবাব দিতে হবে।
সাংবাদিক নিজে ধারণ করলে প্রকাশের দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমের। কিন্তু পুলিশ যদি মানুষকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করায়, মুখের আবরণ সরায় বা ব্যক্তিগত জায়গায় অন্যকে প্রবেশের সুযোগ দেয়, সেই ভূমিকাও জবাবদিহির বাইরে নয়।
সংবাদমাধ্যমেরও ‘পুলিশ দিয়েছে’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। পুলিশের দাবি যাচাই করাই সাংবাদিকতার কাজ।
পুলিশকে তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা আর পুলিশের তৈরি বয়ানের প্রচারক হয়ে যাওয়া আলাদা বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর বিপদ আরও বাড়ে। মূল প্রতিবেদন থেকে দৃশ্য কেটে নেওয়া হয়, নতুন শিরোনাম বসে, মুখের স্ক্রিনশট ছড়ায়। পরে সংশোধনী দিলেও পুরোনো দৃশ্যের সব কপি ফিরিয়ে আনা যায় না।
যে ব্যক্তি একবার ভিডিওতে আটকা পড়লেন, তাকেই বারবার নিজের নির্দোষ প্রমাণ করতে হয়।
‘লিক হয়েছে’ কোনও পূর্ণাঙ্গ জবাব নয়
পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন ফুটেজ অনুমতি ছাড়া বাইরে গেলে সেটি তথ্যসুরক্ষার ব্যর্থতা, যার তদন্ত প্রয়োজন।
কে ফুটেজ দেখেছেন, কপি করেছেন বা অন্যকে পাঠিয়েছেন, সেই হিসাব কোথায়?
ইচ্ছাকৃত সরবরাহ, অবহেলায় ‘লিক’ হওয়া এবং বাইরের অনুপ্রবেশের দায় এক নয়। তদন্ত ছাড়া কোনও কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট অপরাধে দায়ী করা যাবে না। কিন্তু এই পার্থক্য দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষণ ও তদারকির দায়িত্বও অস্বীকার করা যাবে না।
একই সঙ্গে সাংবাদিকের নিজের ধারণ করা ভিডিওকে ‘পুলিশি নথি ফাঁস’ বলা যাবে না।
অনিয়ম উন্মোচনকারী সাংবাদিকের সূত্রের সুরক্ষাও জরুরি। প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যেখানে জনস্বার্থে পুলিশের জবাবদিহি সম্ভব হবে, অথচ নাগরিকের ব্যক্তিগত দৃশ্য নির্বিচারে ছড়াবে না।
রাষ্ট্রের কাছে তথ্য থাকার অর্থ সেটি সবার বিনোদনের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া নয়।
‘দ্য বডি-ক্যাম হাসল’: এপ্রিলের হারানো জীবন
পুলিশের ফুটেজ সরবরাহ নিয়ে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের ‘দ্য বডি-ক্যাম হাসল’ প্রতিবেদনে এপ্রিল নামের এক তরুণীর গল্প আছে।
মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার পর তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে আসক্তি কাটিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন, শিক্ষকতায় যোগ দেন।
এর বেশ কিছুদিন পর তার সেই গ্রেপ্তারের ঘটনার প্রায় ৪০ মিনিটের বডিক্যাম ভিডিও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় দুই লাখবার দেখা হয়। নাম-মুখসহ প্রকাশিত দৃশ্যে অপমানজনক মন্তব্য জমে। জীবন বদলালেও পুরোনো মুহূর্তটি তাকে কখনো ছাড়েনি।
‘হাসল’ এখানে নিছক বিড়ম্বনা বোঝাচ্ছে না। মানুষের দুর্বল মুহূর্তকে ব্যবহার করে দর্শক ও আয় পাওয়ার তৎপরতার ইঙ্গিত আছে। এ কারণেই ‘বডিক্যাম হাসল’ বলে শুধু প্রযুক্তির ঝামেলায় বিষয়টি নামিয়ে আনা ঠিক হবে না।
এপ্রিলের ঘটনায় অপরাধের অভিযোগ ছিল। তারপরও প্রশ্ন থাকে, আইন নির্ধারিত প্রক্রিয়ার পর একজন মানুষের নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ কি থাকবে না?
তার অতীতের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তকে অন্য কেউ কত দিন লাভের উপকরণ বানাতে পারবেন?
বাংলাদেশে এই প্রশ্নের সঙ্গে আরও একটি সমস্যা যুক্ত হয়। এখানে অপরাধের অভিযোগ না থাকা মানুষকে অভিযানের ভিডিওতে দেখা যেতে পারে। একজনের ক্ষেত্রে পুরোনো অপরাধ অনন্তকাল ফিরে আসে; অন্যজনের ক্ষেত্রে কোনও অপরাধ ছাড়াই সন্দেহের পরিচয় তৈরি হয়।
গবেষক ব্রাইস ক্লেটন নিউয়েলও বেলিংহামের মদ্যপান যাচাই ও যৌনকর্মসংক্রান্ত অভিযানের বডিক্যাম ফুটেজ ইউটিউবে প্রকাশিত হওয়ার উদাহরণ দিয়েছেন।
সরকারি নথি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত ভিডিওতে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত পরিস্থিতিও উন্মুক্ত হয়েছিল। জবাবদিহির জন্য তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সংঘাতটি সেখানেই।
মাসান সিনেমার হোটেল অভিযানের দৃশ্যও এই ভয় মনে করিয়ে দেয়। সেটি কল্পকাহিনি, বাস্তব বডিক্যাম মামলা নয়। কিন্তু পুলিশি ক্যামেরায় ধরা পড়া ব্যক্তিগত মুহূর্ত যে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হতে পারে, সেই আশঙ্কাটি বাস্তব আলোচনারই অংশ।
বাংলাদেশে কত ক্যামেরা, কী প্রশিক্ষণ
বাংলাদেশে বডিক্যাম ব্যবহার শুরু হয় ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক সার্জেন্টদের ১৫টি ক্যামেরা দিয়ে সূচনা। পরে বিভিন্ন মহানগর ও জেলা পুলিশের ইউনিটে এর ব্যবহার বিস্তৃত হয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নির্বাচন সামনে রেখে প্রায় ৪০ হাজার ক্যামেরা সংগ্রহের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছিল। তবে অনুমোদিত সংখ্যা ও সরবরাহের সংখ্যা এক নয়।
২১এ জানুয়ারি ২০২৬ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানান, নির্বাচনের জন্য ২৫ হাজার ৫০০ ক্যামেরা সরবরাহ ও ব্যবহারোপযোগী করা হয়েছে।
জুনের একটি প্রতিবেদনে পুলিশের কাছে মোট প্রায় ২৫ হাজার ক্যামেরা থাকার কথা বলা হয়। সংখ্যার এই পার্থক্যসহ বর্তমানে কতটি সচল, তার হালনাগাদ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণেরও প্রমাণ আছে। পঞ্চগড়ে ২০২২ সালে বডিক্যাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ হয়েছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সরকারি বৈঠকে জানানো হয়, মজুত ক্যামেরা দিয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। পরবর্তী নির্বাচনি প্রশিক্ষণ মডিউলেও হাতে-কলমে বডিক্যাম ব্যবহার শেখানোর কথা প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু সেখানে নৈতিকতা শেখানো হয় কি? ব্যক্তিগত ঘরে রেকর্ডিংয়ের সীমা, অভিযোগকারীর গোপনীয়তা, শিশু বা যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তির পরিচয়, ফুটেজ প্রকাশের অনুমতি এবং সাংবাদিককে সরবরাহের বিধান কতটা আছে?
পূর্ণাঙ্গ মডিউলের প্রকাশ্য কপি না পাওয়ায় নিশ্চিত উত্তর দেওয়া যাচ্ছে না। নথি না পাওয়াকে প্রশিক্ষণ হয়নি বলার প্রমাণও বানানো যাবে না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পুলিশ সদর দপ্তরে দেওয়া প্রয়োজন। ক্যামেরার বোতাম চালানো শেখানোর সঙ্গে নাগরিকের অধিকার রক্ষা শেখানো সমান জরুরি।
যন্ত্র ব্যবহারের দক্ষতা আছে, কিন্তু তার সীমা সম্পর্কে ধারণা নেই, এমন প্রশিক্ষণ অসম্পূর্ণ।
পুলিশ যখন কনটেন্ট ক্রিয়েটর
‘এই পুলিশেরা কনটেন্ট ক্রিয়েটর, লাখ লাখ ফলোয়ার তাদের, নির্দেশিকা মানছেন কি’ শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রতিবেদক আব্দুল্লাহ আল মামুন একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন।
২৪এ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে পুলিশ সদস্যদের পরিচালিত ১০৭টি ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করার কথা এসেছে। সংশ্লিষ্ট সদস্যদের কেউ কেউ বলেছেন, তারা সচেতনতা তৈরি বা মানুষকে সহায়তার উদ্দেশ্যে ভিডিও করেন।
কিন্তু একই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা–২০২৫ অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া অপারেশনাল কার্যক্রমের ছবি-ভিডিও আপলোড করা যায় না। বিধিভঙ্গে বিভাগীয় ব্যবস্থার কথাও রয়েছে।
তাহলে এসব ভিডিওর অনুমোদন কে দেন? ব্যক্তিগত পেজে সরকারি দায়িত্বের দৃশ্য প্রকাশের প্রয়োজন কী? সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তির দুঃখের বিবরণ প্রকাশ না করেও কি তাকে সাহায্য করা যায় না?
একজন নাগরিক থানায় বা রাস্তায় পুলিশের কাছে গেলে দুজনের ক্ষমতা সমান থাকে না। ক্যামেরায় কথা বলতে না চাইলে পুলিশ অসন্তুষ্ট হবে কি না, এমন ভয়ও কাজ করতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে আপত্তি না করাকে স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ধরে নেওয়া কঠিন।
সব কর্মকর্তা আয় করছেন, এমন প্রমাণ নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, অনুসারী বৃদ্ধি এবং দর্শকের প্রশংসাও প্রণোদনা। সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে সেই ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের সুযোগ থাকলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়।
যথেচ্ছ ভিডিও করা কি আইনসিদ্ধ?
‘অনুমতি ছাড়া ভিডিও করলেই অপরাধ’ এবং ‘জনসমক্ষে আছেন, তাই যা খুশি করা যাবে’, দুটিই অতিসরল দাবি। কোথায় ধারণ করা হয়েছে, কী উদ্দেশ্যে, কী দেখানো হয়েছে, কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং কার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এসব বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ আইনসাপেক্ষ যুক্তিসংগত সীমার মধ্যে গৃহে নিরাপত্তা ও যোগাযোগের গোপনতা রক্ষার অধিকার দিয়েছে।
৩৫(৫) অনুচ্ছেদ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা ব্যবহারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। পুলিশি অভিযানের প্রয়োজন এই অধিকারগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয় না।
২০১২ সালে হাইকোর্ট আটক বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে প্রদর্শন না করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে বিচারের আগে কাউকে প্রদর্শনের প্রশ্নটি বহু পুরোনো।
দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় কথার পাশাপাশি দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমেও মানহানির বিধান রয়েছে। সুনাম ক্ষতির উদ্দেশ্য বা ক্ষতির সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞান এবং আইনের ব্যতিক্রমগুলো এখানে বিবেচ্য।
অপরাধের শিরোনামের সঙ্গে অভিযোগহীন ব্যক্তির মুখ এমনভাবে যুক্ত করা হলে, যাতে তার বিরুদ্ধে অপবাদ তৈরি হয়, সেটি মানহানির উপাদান পূরণ করে কি না পরীক্ষা করতে হবে।
দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় নারীর শালীনতাকে অপমান করার উদ্দেশ্যে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় অনুপ্রবেশের বিধানও রয়েছে।
যেকোনও ভিডিওর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই ধারা প্রযোজ্য নয়; নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও আচরণ প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু নারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতিকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অপমানের উপকরণ করা হলে বিষয়টি কেবল রুচির প্রশ্নে সীমিত থাকে না।
সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন বা সেক্সটর্শনের নির্দিষ্ট অভিপ্রায়ে ক্ষতিকর বা ভীতিপ্রদ তথ্য, ছবি ও ভিডিও প্রকাশ বা প্রকাশের হুমকিকে অপরাধ করা হয়েছে।
তাই ফুটেজ দিয়ে ব্ল্যাকমেইল বা যৌন হয়রানির উপাদান থাকলে এই ধারার প্রশ্ন আসে। সাধারণ সংবাদ প্রকাশকে নির্বিচারে এই ধারায় ফেলা যায় না।
একই আইনের ৩৯ ধারায় ওই আইনের অধীনে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার বাধ্যবাধকতা এবং লঙ্ঘনের শাস্তি আছে। এর প্রয়োগক্ষেত্র নির্দিষ্ট; সব মাদক অভিযান বা সব পুলিশি ফুটেজে ধারাটি বসিয়ে দেওয়া যাবে না। তবু এটি দেখায়, তদন্তে পাওয়া তথ্য প্রকাশের ওপর আইনি সীমা একটি স্বীকৃত বিষয়।
নুসরাতের ঘটনার পুরোনো রায়কে বর্তমান আইনের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলেও বলা যায়, পুলিশি দায়িত্বের মধ্যে পাওয়া ভিডিওর অপব্যবহার ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে।
সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন, বিভাগীয় অসদাচরণ ও ফৌজদারি অপরাধ পৃথক পরীক্ষা। প্রতিটি ঘটনায় প্রযোজ্য আইন ও প্রমাণ মিলিয়ে দায় নির্ধারণ করতে হবে।
নৈতিকতার পাহারা থেকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ
নৈতিক পুলিশিংয়ে রাষ্ট্র বা সামাজিক গোষ্ঠী ব্যক্তির আচরণকে নিজেদের নৈতিক মানদণ্ডে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এর সঙ্গে প্রকাশ্য অপমান যুক্ত হলে আইন ভাঙার প্রশ্নের চেয়ে ‘লোকটি কেমন মানুষ’ সেই বিচার বড় হয়ে ওঠে।
‘অসামাজিক’, ‘চরিত্রহীন’ বা ‘মাদকসেবী’ তকমা একবার বসলে ব্যক্তির অন্য পরিচয় চাপা পড়ে। দর্শকের ক্ষোভ যত বাড়ে, একই ধরনের ভিডিও প্রকাশের উৎসাহও বাড়তে পারে। তখন পুলিশ তদন্তকারীর পাশাপাশি উপস্থাপক ও নৈতিক বিচারকের ভূমিকায় হাজির হন।
এর রাজনৈতিক ক্ষতি হলো, নাগরিকের অধিকার ক্রমে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নৈতিক অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
কার সঙ্গে বের হবেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে বিনোদন করবেন, প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপর সম্ভাব্য অপমানের ভয় পেয়ে বসে।
একই ক্ষমতা বাছাই করে ব্যবহার করা যায়। কোনও রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানকে নিয়ে দৃশ্য ছড়ানো হয়, অন্য কারও পরিচয় আড়াল থাকে। তখন আইন সমানভাবে প্রয়োগের বদলে নৈতিক ক্ষোভ রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে।
মানুষ অভিযোগ জানাতেও ভয় পেতে পারেন। নিজের পারিবারিক সমস্যা বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতা পুলিশের পেজে প্রকাশিত হবে, এই আশঙ্কা থাকলে সহায়তা চাইতে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। এতে কোনও কর্মকর্তার জনপ্রিয়তা বাড়লেও প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমতে পারে।
ক্যামেরার হিসাব চাই, নাগরিকের অপমান নয়
পুলিশের কাছে কতটি ক্যামেরা আছে, সেটি জানা প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন জানা, সেগুলো কখন চালু থাকে, কে ফুটেজ দেখেন, কে কপি করেন এবং কত দিন সংরক্ষিত থাকে।
ব্যক্তিগত ফোনে ফুটেজ নেওয়া যায় কি না, সাংবাদিককে দেওয়ার অনুমতি কে দেন, ফাঁস হলে কী তদন্ত হয়, এসবের প্রকাশ্য নীতি দরকার।
প্রকাশের আগে মুখ, নাম ও অন্য পরিচয়সূচক তথ্য দেখানোর প্রয়োজন আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। জনস্বার্থে পুলিশের অনিয়মের প্রমাণ প্রকাশ এবং নিরুপায় নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবন প্রদর্শনকে একই যুক্তিতে বৈধতা দেওয়া যাবে না।
সংবাদমাধ্যমেরও নিজস্ব সম্পাদনা নীতি প্রয়োজন। অভিযানের ফুটেজ পাওয়া মানেই সবটুকু প্রচার করা নয়। অভিযোগহীন মানুষের মুখ, অভিযোগকারীর সংবেদনশীল বক্তব্য কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের অপ্রাসঙ্গিক দৃশ্য বাদ দেওয়াও সাংবাদিকতার কাজ।
কোনও অপরাধের তদন্ত বন্ধ হোক, এই দাবি নয়। দাবি হলো, তদন্তের নামে নতুন অন্যায় যেন না ঘটে। আইন ভাঙার অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে আইনি প্রক্রিয়ায়। সঙ্গে অপমানের অনলাইন অনুষ্ঠান জুড়ে দেওয়া পুলিশের দায়িত্ব নয়।
ভাইবোনের হোটেলকক্ষ থেকে চেকপোস্টের উবার, বান্ধবীকে পৌঁছে দেওয়া থেকে নুসরাতের অভিযোগ জানাতে যাওয়া, প্রতিটি পরিস্থিতিতে একজন নাগরিক ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি। ক্যামেরার কাজ সেই ক্ষমতার ব্যবহার নথিভুক্ত করা। নাগরিকের অসহায়ত্বকে অন্যের জনপ্রিয়তার উপকরণ বানানো নয়।
পুলিশের নিজের করা বা তাদের সরবরাহকৃত ভিডিও কত ভিউ পেল সেটির চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সেই ভিউয়ের মূল্য কার জীবন থেকে নেওয়া হলো?