নাঈম কিবরিয়া হত‍্যা: অসহিষ্ণুতার বার্তা, অপরাধপ্রবণ সমাজ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি 

নাঈম কিবরিয়ার হত্যাকাণ্ড নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সমাজের সহনশীলতা নিয়ে। “পাবলিক বিহেভিয়ার সূচকে আমরা একেবারে তলানিতে। সামান্য ভুল বুঝাবুঝি হলে তা মীমাংসার যে সামাজিক চর্চা দরকার, তা আমরা হারিয়ে ফেলেছি,” বলছেন একজন বিশ্লেষক।

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:১০ পিএম

বন্ধুর গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন নাঈম কিবরিয়া। ৩৫ বছর বয়সী এই আইনজীবী জানতেনও না আর হয়তো বাড়ি ফেরা হবে না তার। মোটরসাইকেলে ধাক্কা মারার অপরাধে প্রাণ হারান নাঈম।

একটা সামান্য ধাক্কা, কয়েক মিনিটের ক্ষোভ আর তার পরিণতি, এক তরুণের মৃত্যু। এই ঘটনাকে সমাজের গভীরে জমে ওঠা অসহিষ্ণুতার ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি বলছেন বিশ্লেষকরা। পরিসংখ্যানও তাই বলছে; ২০২৫ সালে এভাবে গণপিটুনি বা ‘মব সন্ত্রাসের’ শিকার হয়ে অন্তত ১৯৭ জনের প্রাণ গেছে বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

পুলিশের তথ্যমতে, নাঈম কিবরিয়ার বাড়ি পাবনা সদর উপজেলায়। ঘটনার দিন এক বন্ধুর গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলেন তিনি। মোটরসাইকেলে ধাক্কা লাগায় ঘটনার শুরু। মোটরসাইকেলের চালকসহ কয়েকজন তরুণ নাঈমকে গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামায়। মারধর করে ফেলে রেখে চলে যায়।

রাত বাড়তে থাকলেও নাঈমের খোঁজ মিলছিল না। নাঈমের ফোনে তার বন্ধু ফোন করলে সেটি ধরেন এলাকার এক নিরাপত্তাকর্মী। তিনি জানান, একজনকে মারধর করে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছে। বন্ধু দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নাঈমকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা জানান তিনি বেঁচে নেই।

বিচ্ছিন্ন নয়, ধারাবাহিকতা

বিশ্লেষকরা বলছেন এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না বরং অনেকদিন ধরে চলে আসা ঘটনার ধারাবাহিকতা। তারা বলছেন, সামান্য ভুল, তর্ক কিংবা সন্দেহ থেকেই এখন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।  

বিগত মাসগুলোতে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ ২০২৫-এর ১৮ই ডিসেম্বর রাতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কারখানা কর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে কারখানা থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের একটি গাছে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

তারও আগে অগাস্টে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় রূপলাল দাস এবং প্রদীপ দাসকে ভ্যানচোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। 

বাড়ছে গণপিটুনি ও সহিংসতা

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ২০২৫ সাল জুড়ে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশজুড়ে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক ভিন্ন আদর্শের মানুষ এবং মাজার, দরগা ও বাউলদের ওপর হামলা-নিপীড়নের ঘটনা ক্রমাগত বাড়লেও এর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসেবে অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মব জাস্টিস এবং 'ম্যাস বিটিং' বা গণপিটুনির ঘটনা তিনগুণ বেড়েছে। তারা বলছে, মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে ২০২৪ সালে ১২৬ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটে, আর কেবল গত বছরই তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬০ জনে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল জুড়ে মব সন্ত্রাস আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, গত বছর মব করে গণপিটুনিতে ঢাকাসহ আট বিভাগে ১৯৭ জন নিহত হয়েছে। তার আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১২৮।

আসকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ২০২৫ সালে ঢাকা জেলায় সর্বাধিক ২৭, গাজীপুরে ১৭, নারায়ণগঞ্জে ১১, চট্টগ্রামে ৯, কুমিল্লায় ৮, ময়মনসিংহ, বরিশাল, নোয়াখালী, গাইবান্ধা ও শরীয়তপুরে ৬ জন করে; লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে ৫ জন করে, নরসিংদী ও যশোরে ৪ জন করে সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন।

কেন বাড়ছে অসহিষ্ণুতা?

অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। তিনি বলেন, “পাবলিক বিহেভিয়ার সূচকে আমরা একেবারে তলানিতে। সামান্য ভুল বোঝাবুঝি হলে তা মীমাংসার যে সামাজিক চর্চা দরকার, তা আমরা হারিয়ে ফেলেছি।”

ড. তৌহিদুল হক“চলার পথে, অন্য আরেকজন ব্যক্তির সাথে কোনো প্রসঙ্গে কথা বলা বা কোনো ঘটনা সৃষ্টি হলে তা মীমাংসায় যে যৌক্তিক আচরণ করা দরকার তা আমরা দেখি না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দেখি যে সবাই ক্ষমতা দেখাতে চান”, আলাপকে  বলেন ড. তৌহিদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই শিক্ষক বলেন, মানুষ এখন নিজের পরিচয়, রাজনৈতিক সংযোগ কিংবা ক্ষমতার দাপট দেখাতে চায়। “কার দাপট বেশি—এই লড়াই থেকেই শেষ পর্যন্ত একজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

সহনশীলতার পরিবেশ ও সংস্কৃতি তৈরি করা যাচ্ছে না এবং এটা তৈরি না হলে এমন ঘটনাই ঘটতে থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তার মতে, আইনের প্রয়োগ ছাড়া সামাজিক সহনশীলতার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ রাষ্ট্র নিতে পারেনি। আর আইন প্রয়োগও অনেক সময় ধারাবাহিক নয়।

মানুষের মধ্যে সহনশীলতার সংস্কৃতি বা চর্চা বা সৌহার্দ্য বোধ বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রের কোনো কাজ দৃশ্যমান নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, "শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ ছাড়া এই সমস্যা সমাধানের কোনো প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাই না। আবার আইনের প্রয়োগও সবসময় ঠিকঠাক হয় না।" 

ক্ষোভ ও হতাশায় তরুণরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল বলেন, দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভই এই সহিংসতার মূল চালিকাশক্তি।  আর মব সহিংসতায় যারা জড়িত তাদের বেশিরভাগই ২০ থেকে ৩৫ বছরের তরুণ। 

“একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখবেন, যারা এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত তারা একটা বয়সের। ২০ থেকে ৩৫ বছর। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর কাজে যুক্ত থাকার কথা। কিন্তু তারা কাজে না থাকার কারণে হতাশ হয়ে পড়ছে এবং এই হতাশাকে বিশেষ একটা গোষ্ঠী বা ব্যক্তি ব্যবহার করছে ও তাদের উসকে দিচ্ছে, ” আলাপ-কে বলেন এই মনোবিদ।অধ্যাপক কামাল চৌধুরী

তার মতে রাষ্ট্র যদি কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করত, তাহলে এই 'মব কালচার' অনেক আগেই কমে যেত।

“মানুষ যদি দেখে অপরাধ করে পার পাওয়া যায় না, তাহলে অপরাধের প্রবণতাও কমে আসে”, বলেন অধ্যাপক কামাল চৌধুরী।

প্রয়োজন সামাজিক শিক্ষা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, সামাজিকও।

ড. তৌহিদুল হকের ভাষায়, “কারণটা খুব ছোট, কিন্তু ক্ষতিটা হয় ভয়াবহ। আমরা ঘটনার পর হায় হায় করি, কিন্তু যে কারণে ঘটনা ঘটছে, সেই জায়গায় সংস্কার আনতে চাই না।”

তিনি বলেন, “পুরো দেশের প্রেক্ষাপটে বলুন, সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিংবা মানুষের জন আচরণের ক্ষেত্রে রাজনীতি, সমাজ সংস্কৃতির প্রভাবের জায়গা থেকেও যদি আমরা দেখি, একটা দেশের মানুষের জন আচরণের ক্ষেত্রে যা শেখানো জরুরি, আমরা তা করতে পারিনি।”

আর এ জন্যই অপরাধ বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ড. তৌহিদ বলেন, “আমাদের সমাজে শ্রেণীগত দ্বন্দ্বের সর্বোচ্চ উপস্থিতি দেখি। জাতীয়ভাবে সামাজিক সুস্থতা কিংবা সামাজিক সহনশীলতা প্রশ্নে এটা একটা বড় অসুখে পরিণত হয়েছে। এই অসুখ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সহনশীলতার শিক্ষা কিংবা জন আচরণ-ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা একেবারে স্পষ্ট।”

অপরাধ কমাতে আইনের চেয়ে সামাজিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা বেশি জরুরি বলে মত দেন ড. তৌহিদ।