বাবা ঘুমালেই কি তাজমিনদের মেরে ফেলা যাবে

গভীর রাত। তাজমিনের বাবা তখন গভীর ঘুমে। ওদিকে অচেনা গন্তব্যে অটোরিকশায় বিপদের প্রহর গুনছিলো ১৪ বছরের জান্নাতুল তাজমিন। এক অটোচালক কেড়ে নিলো এক নিষ্পাপ প্রাণ। এই মৃত্যু কি কেবল একজন চালকের অপরাধ, নাকি নির্জন সড়কে সুরক্ষার অভাবের প্রশ্ন?

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০২ পিএম

চৌদ্দ বছর বয়সী জান্নাতুল তাজমিন হয়তো বিপদ আঁচ করতে পেরেছিলো। বাবা আব্দুল আলিমের মুঠোফোনে কল দিয়েছিলো বারবার। বাসায় ফেরার জন্য অটোরিকশায় উঠে যখন অচেনা পথে যাত্রা দেখেছিলো তখন গুগল লোকেশন পাঠিয়ে রেখেছিলো বাবাকে। কিন্তু বাবা তখন গভীর ঘুমে।

বৃহস্পতিবার সকালে যখন আব্দুল আলিমের ঘুম ভাঙে তখন আর পৃথিবীতে নেই তাজমিন। জৈবিক লালসার শিকার হয়ে শ্বাসরোধে মৃত্যুর পর অন্য এক ভুবনের বাসিন্দা হয়েছে সে। যে ভুবন সম্পর্কে কারো কিছুই জানা নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম হোসেন বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার ফসলি মাঠে গিয়েছিলেন। সেখানেই শিশু তাজমিনের বিবস্ত্র মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর আশপাশ তাকিয়ে দেখলেন অন্তত পাঁচটি ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির চিহ্ন।

নিজের মনেই প্রশ্ন করলেন আকরাম, মৃত্যুর আগে মেয়েটি কি সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করে যাচ্ছিলো? কন্যা শিশুটি হয়তো কোনো পাষণ্ডের কাছে শেষ পর্যন্ত পরাজয় মানতে বাধ্য হয়, নিজের অজান্তেই বলে ফেলেন তিনি। মেয়েটি কি চিৎকার করেছিলো, আর ওই চিৎকার কেন কারো কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি, নিজেকেই জিজ্ঞাসা করেন আকরাম। যদিও কোনো প্রশ্নেরই উত্তর জানা নেই তার।

আকরামের ভাষায়, “সড়কের পাশে বিলে ধানখেতের মাঝে পড়ে আছে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এগিয়ে যেতেই দেখি এর ২০-৩০ গজ দূরে পড়ে আছে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ। খেতের মাঝে ধস্তাধস্তির চিহ্ন, অনুসরণ করে এগোতেই দেখতে পাই কাদায় মাথা গোঁজানো এক কন্যা শিশুর বিবস্ত্র মরদেহ। তার গলায় গামছা প্যাঁচানো। ওই গামছা দিয়েই মরদেহ ঢেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে জানাই।”

পরে সকাল ৮টায় পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।

তাজমিন কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলো। তার বাবা আব্দুল আলিম ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রেনেটার কুমিল্লা অঞ্চলের কর্মী। কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন আলিম। তার গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে।  

ঘটনার চারদিন আগে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলো তাজমিন। পরে তার কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে সে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নামে। এরপর অটোরিকশায় বাসায় ফেরার পথে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয় তাকে।

তাজমিনের মৃত্যু বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাসায় ফেরার সময় অটোরিকশা যখন তাকে অচেনা পথে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন সড়কে কি পুলিশের টহল ছিলো? রাত গভীর হওয়ায় মানুষের চলাচল ছিলো না বললেই চলে। ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে সড়কে পুলিশের কোনো উপস্থিতি চোখে পড়েনি তাজমিনের। আর মানুষের উপস্থিতি ছিলো না বলেই তো সাহায্য চাইতে পারেনি সে।

তাহলে কি অটোরিকশা চালককে বিশ্বাস করাই ছিলো সবচেয়ে বড় ভুল। আর সে কারণেই অকালেই ঝরে পড়তে হলো তাকে।

যা জানালো পুলিশ

১০ই অক্টোবর তাজমিন হত্যাকাণ্ডের কারণ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ। কুমিল্লা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পংকজ বড়ুয়া। 

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৮ই (বৃহষ্পতিবার) অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য অটোরিকশায় উঠে তাজমিন। অটোরিকশা চালক ৩০০ টাকা ভাড়া চেয়েছিলো।

পথে তাজমিন চালককে ১০০ টাকা দিয়ে কলা-রুটি আনিয়ে খেয়েও নেয়।

কিন্তু হঠাৎই সুমন অটোরিকশাটি নির্ধারিত পথ থেকে সরিয়ে চাঁদপুরগামী সড়ক দিয়ে বিজরা বাজার হয়ে লালমাইয়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছে জায়গাটি অপরিচিত বুঝতে পেরে তাজমিন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নেমে পালানোর চেষ্টা করলে সুমন তাকে বাধা দেয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় তাজমিন চিৎকার করলে সুমন তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরে।

ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাজমিন দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে ধানখেতে নিয়ে ধর্ষণ করে বলে সুমনের বরাত দিয়ে জানায় পুলিশ।

পুলিশ আরো জানায়, হত্যার পর তাজমিনের আইফোনটি নিয়ে হাতব্যাগটি ধানখেতে ফেলে দেয় সুমন। এরপর ঘটনাস্থলে নিজের অটোরিকশা রেখে কাচিকাটা মসজিদের সামনে একটি পুকুরে গোসল করে সে। পরে অন্য একটি অটোরিকশা করে বাখরাবাদ এলাকায় যায়। সেখানে একটি পুকুরপাড়ের ঝোপে আইফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে চলে যায়।

শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকেই সুমনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে নিয়ে বাখরাবাদ এলাকার পুকুরপাড়ের ঝোপের ভেতর লুকিয়ে রাখা তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয়। সুমন এরই মধ্যে ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কি

হত্যার রহস্য উদঘাটনে তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সামাজিক মাধ্যমে কক্সবাজারের দুবাই রিসোর্টের কর্মচারী চল্লিশ বছর বয়সী রাজু চৌধুরীর সঙ্গে তাজমিনের যোগাযোগের তথ্যও মিলেছে প্রাথমিক তদন্তে। মাত্র ১৭ দিন আগে এই পরিচয় হয়। রাজুর বাড়ি চকরিয়া-লামা এলাকার কুমারী ইউনিয়নের বরছনখোলা গ্রামে।  

তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বিকালে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিলো, এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে সে। মা বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন কেয়া খাতুন। তাজমিন সেসব বিষয়ে কিছুই জানায়নি।

তাজমিনের মৃত্যু যে কারণেই হোক না কেন, শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউই নিরাপদ নয়। সব জায়গায় ওঁত পেতে বসে আছে অপরাধীরা। সুযোগ পেলেই নৃশংস হয়ে উঠছে তারা। মাত্র কিছুদিন আগেই এই লালমাইয়ে ঘটে গেছে আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে যাওয়া স্কুলছাত্র তেরো বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিলো লালমাইয়ের নির্জন এলাকা থেকে ২০এ সেপ্টেম্বর। ১৮ই সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলো সে।

অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে। হত্যাকারীরা অপ্রতিমের পূর্ব পরিচিত ছিলো।

অপ্রতিমের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই লালমাইয়ে শিশু তাজমিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সেখানকার নিরাপত্তার এক ভিন্ন চিত্রই বলে দিচ্ছে।