বাংলাদেশে সশস্ত্র হামলার নীলনকশা উগ্রবাদী ‘মিটআপ’ গ্রুপের
কীভাবে এনক্রিপ্টেড অ্যাপ আর প্রবাসীদের টার্গেট করে তৈরি করা হচ্ছিলো এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক? সন্ত্রাসবিরোধী আইনের পুরোনো মামলার আসামি শিহাব কীভাবে ৫ই অগাস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে নতুন নামে সংগঠিত করছিলেন তরুণদের?
দীপু সারোয়ার
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৯ এএমআপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
বিদ্যমান সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ‘কুফরি’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন বাহিনী, প্রশাসন এবং অমুসলিমদের ওপর হামলা চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে নতুন উগ্রবাদী সংগঠন ‘মিটআপ’ গ্রুপ।
ঢাকার তেজগাঁও কলেজ মসজিদ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দলনেতা মো. শিহাব উদ্দিনসহ ১২ সদস্যকে রিমান্ডে এনে সিটিটিসির দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে সংগঠনের ৮ দফার ভয়াবহ এই উগ্র মতাদর্শ।
গত ১৮ই সেপ্টেম্বর গোপন তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তেজগাঁও কলেজের মসজিদে অভিযান চালায় ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলে দলনেতা মো. শিহাব উদ্দিনসহ ২৩ জনকে আটক করা হয়। পরে তাদের মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
সেখানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এবং চলমান তদন্তে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য।
“সশস্ত্রবাহিনী, পুলিশ-প্রশাসন-কোনো বাহিনী বা সংস্থাই বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত নয়। চলছে কুফরি শাসন ব্যবস্থা। আর এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র জিহাদ। অমুসলিমদের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি না থাকায় আক্রমণের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে তারা,”- মিটআপ গ্রুপের সদস্যরা এমন পরিকল্পনা করেছেন বলে তদন্তে নেমে এসব তথ্য পেয়েছেন সিটিটিসির কর্মকর্তারা।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলাপ-কে বলেন, “মিটআপ’ গ্রুপের ৮ দফায় শাসন ব্যবস্থা, শাসক, জিহাদ, অমুসলিমদের বসবাস, প্রচলিত রাজনৈতিক দল, গোয়েন্দা সংস্থা, সশস্ত্রবাহিনী, প্রশাসন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল নিয়ে সুস্পষ্ট মতামত রাখা হয়েছে।”
তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির পরিদর্শক আক্তার মোর্শেদ আলাপ-কে বলেন, “গ্রেপ্তার হওয়া ‘মিটআপ’ গ্রুপের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। তবে তাদের কাছ থেকে পাওয়া ‘ডিভাইস’-এর ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে বিস্তারিত জানা যাবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, এই ধরণের উগ্রবাদী সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি নিয়ে শুধু যে নিজেদের মধ্যেই আলোচনা-সমালোচনা করে তা নয়, তারা এটি নিয়ে প্রচারণাও চালায়। এই প্রচারণার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে তোলে।
উগ্রবাদীদের মতাদর্শিক প্রচার বন্ধে রাজনৈতিক মতৈক্যের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মিটআপ গ্রুপের ১২ জনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ
গ্রেপ্তার ১২ জনকে ১৯এ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমানের আদালতে হাজির করে সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত শুনানি শেষে পৃথকভাবে তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
প্রথম দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় পাঁচজনকে। তারা হলেন-শিহাব উদ্দিন, মারজুক আহমেদ, সাইফুর রহমান খান, রাম্মি মিয়া ও কামিছুল ইসলাম। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২২এ সেপ্টেম্বর তাদের আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
অন্য সাতজনের মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন, আফিফ আহমেদ, মোহাইমিনুল হক, জাওজি চৌধুরী, শাহাদাত হোসেন, সাব্বির আহমেদ ও জুনায়েদ আহমেদকে ২৪এ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২৫এ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
মিটআপ গ্রুপের ৮ দফায় যা আছে
গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সিটিটিসির কর্মকর্তারা তদন্ত নেমে জানতে পেরেছেন, আট দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে মিটআপ গ্রপ। এসব দফা হলো:
১. বাংলাদেশ দারুল কুফর। এদেশের শাসনব্যবস্থা কুফরি ও জাহেলি শাসনব্যবস্থা।
২. এদেশের শাসকবর্গ কাফের ও তাগুত।
৩. এদেশের প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিফেন্স ফোর্স তাগুতের বাহিনী এবং দলগতভাবে কাফের।
৪. সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো দলগতভাবে কাফের। আর তথাকথিত ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো পথভ্রষ্ট।
৫. দীন কায়েমের নববী মানহাজ হলো দাওয়াত ও জিহাদের সমন্বিত পদ্ধতি।
৬. জিহাদ আমাদের উপরে ফরযে আইন হয়ে আছে।
৭. এদেশের অমুসলিমরা মহারিব কাফের। তাদের সাথে আমাদের কোনো নিরাপত্তা চুক্তি নেই। সে হিসাবে তারা আমাদের আক্রমণের বৈধ লক্ষ্যবস্তু।
৮. ইমান ও কুফরের মধ্যকার চলমান লড়াইয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফের মুশরিকদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে দেওয়া যাবে না। ধ্বংস করতে হবে তাদের।
কে এই শিহাব উদ্দিন?
সিটিটিসির একাধিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, জঙ্গি কর্মকাণ্ডের পুরোনো নেটওয়ার্কই নতুন নামে সচল করেছিলেন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের আড়াল গ্রামের বাসিন্দা মো. শিহাব উদ্দিন। তার বাবার নাম মো. সোলাইমান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে কর্মী সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও নেতা তৈরি এবং জিহাদ পরিচালনার অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগের অংশ হিসাবে শিহাবের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠা হয় ‘মিটআপ’ গ্রুপ। পাশাপাশি চলে দেশের বিভিন্ন এলাকা সফর।
এমনকি কর্মী সংগ্রহে প্রবাসীদেরও টার্গেট করেছে ‘মিটআপ’ গ্রুপ।
পুলিশ বলছে, ‘মিটআপ’ গ্রুপের বিস্তৃতি ঘটাতে আরো নানা গ্রুপের সাথে সংযোগ তৈরি করেছেন শিহাব।
এসব গ্রুপের মধ্যে আছে ‘দ্বীনি কমিউনিটি সিলেট বিভাগ’, ‘দ্বীনি কমিউনিটি ঢাকা জেলা’, ‘এসো জামায়াতবদ্ধ হই’ এবং ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’।
শিহাবের বিরুদ্ধে উগ্র মতবাদ প্রচারের অভিযোগ বেশ পুরোনো। উগ্রবাদী প্রকাশনাসহ গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। নরসিংদীর একটি পুরোনো মামলার আসামিও তিনি।
নরসিংদীর পলাশ থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে এই মামলা হয় ২০১৯ সালের ১৬ই মার্চ। মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে সিটিটিসি।
২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট পরবর্তী সময়ে শিহাব মনে করেছিলেন নরসিংদীর মামলায় কিছুই হবে না তার। আর ওই ভাবনা থেকেই নতুন করে ‘মিটআপ’ গ্রুপ নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তিনি।
গ্রুপ সদস্য বাছাইয়ে তরুণদেরই প্রাধান্য দিয়েছেন শিহাব।
ঢাকার শেরেবাংলা থানায় দায়ের হওয়া সাধারণ ডায়েরি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তার সাথে গ্রেপ্তার হওয়া সবার বয়স ১৯ থেকে ৩৬ বছরের মধ্যে।
সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ‘ভিডিও কনটেন্ট’ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন ‘মিটআপ’ গ্রুপের সদস্যরা। পাশাপাশি বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া ‘ধর্মভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’, যারা ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পরে জামিনে বেরিয়ে এসেছেন, তাদের ‘ভিডিও কনটেন্ট’ও মিটআপ গ্রুপের সদস্যদের প্রভাবিত করেছে।
সিটিটিসির একাধিক সূত্র জানায়, শিহাবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হলেন সাব্বির আহমেদ। তার বিরুদ্ধে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কাছ থেকে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ আছে।
২০২৩ সালের ২৭এ এপ্রিল ঢাকার তেজগাঁও থানায় এ সংক্রান্ত মামলা হয় সাব্বিরের বিরুদ্ধে।
সাব্বির ঢাকার শেরেবাংলা থানার ফার্মগেইট এলাকার ইন্দিরা রোডের স্থায়ী বাসিন্দা। তার বাবার নাম আবদুস সামাদ।
তিনটি কারণে এদেশে উগ্রবাদীদের তৎপরতা বন্ধ পুরোপুরি সম্ভব নয় বলে মনে করেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও এ জন্য দায়ী বলে মনে করেন তিনি।
তৌহিদুল হক বলেন, “উগ্রবাদী তৎপরতার বন্ধ না হওয়ার প্রথম কারণ হলো, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান। চারপাশে যারা আছে, কাছে বা দূরের সেইসব দেশে উগ্রবাদীদের তৎপরতা আছে। তাদের সাথে এখানকার উগ্রবাদীদের সংযোগ তৈরি হয়। ফলে উগ্রবাদীরা শক্তিশালী হয়ে উঠে।”
“দ্বিতীয় কারণ হলো, বহুধারায় বিভক্ত এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা। বহুধারায় যারা শিক্ষা গ্রহণ করেন তারা রাষ্ট্র, জনগণ, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি হিসাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি কখনোই ঐক্যমতে আসতে পারে না। আরেকটি কারণ হলো এখানকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিদ্বেষ বিরাজমান। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে নিঃশেষ করে দিতে চায়। আর এই নিঃশেষ প্রক্রিয়ায় উগ্রবাদীদেরও ব্যবহার করে তারা”, বলেন তিনি।
তৌহিদুল হক মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনোভাবেই উগ্রবাদীদের উত্থান ঠেকানো সম্ভব না। তবে এই প্রক্রিয়া শুরু করতে কারো আগ্রহ আছে বলেও মনে করেন না তিনি।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে গড়ে ওঠা ‘মিটআপ’ গ্রুপ কেবল সাধারণ ধর্মীয় আলোচনা বা যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম ছিল না। বরং বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবলয় ও অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে ধ্বংস করার মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে সংগঠনের সদস্যদের।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় বড় ধরনের নাশকতার আগেই এই চক্রটির মূল সারির সদস্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও, সাইবার জগতে তাদের তৈরি করা উগ্র মতাদর্শিক প্রভাব এখনো উদ্বেগজনকভাবে রয়ে গেছে বলে জানাচ্ছে পুলিশ।
জব্দকৃত ডিজিটাল ডিভাইসের ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পেলে এই নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন এবং অন্য কোনো আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসূত্রের আরও বিস্তারিত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে আশা করছে সিটিটিসি।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সামাজিক মাধ্যমে তরুণদের চরমপন্থায় ঝুঁকে পড়ার মনস্তাত্ত্বিক কারণ উদঘাটন এবং এই ধরনের নেটওয়ার্কের শেকড় উপড়ে ফেলাটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ বলে জানাচ্ছেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে সশস্ত্র হামলার নীলনকশা উগ্রবাদী ‘মিটআপ’ গ্রুপের
কীভাবে এনক্রিপ্টেড অ্যাপ আর প্রবাসীদের টার্গেট করে তৈরি করা হচ্ছিলো এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক? সন্ত্রাসবিরোধী আইনের পুরোনো মামলার আসামি শিহাব কীভাবে ৫ই অগাস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে নতুন নামে সংগঠিত করছিলেন তরুণদের?
বিদ্যমান সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ‘কুফরি’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন বাহিনী, প্রশাসন এবং অমুসলিমদের ওপর হামলা চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে নতুন উগ্রবাদী সংগঠন ‘মিটআপ’ গ্রুপ।
ঢাকার তেজগাঁও কলেজ মসজিদ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দলনেতা মো. শিহাব উদ্দিনসহ ১২ সদস্যকে রিমান্ডে এনে সিটিটিসির দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে সংগঠনের ৮ দফার ভয়াবহ এই উগ্র মতাদর্শ।
গত ১৮ই সেপ্টেম্বর গোপন তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তেজগাঁও কলেজের মসজিদে অভিযান চালায় ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলে দলনেতা মো. শিহাব উদ্দিনসহ ২৩ জনকে আটক করা হয়। পরে তাদের মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
সেখানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এবং চলমান তদন্তে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য।
“সশস্ত্রবাহিনী, পুলিশ-প্রশাসন-কোনো বাহিনী বা সংস্থাই বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত নয়। চলছে কুফরি শাসন ব্যবস্থা। আর এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র জিহাদ। অমুসলিমদের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি না থাকায় আক্রমণের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে তারা,”- মিটআপ গ্রুপের সদস্যরা এমন পরিকল্পনা করেছেন বলে তদন্তে নেমে এসব তথ্য পেয়েছেন সিটিটিসির কর্মকর্তারা।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলাপ-কে বলেন, “মিটআপ’ গ্রুপের ৮ দফায় শাসন ব্যবস্থা, শাসক, জিহাদ, অমুসলিমদের বসবাস, প্রচলিত রাজনৈতিক দল, গোয়েন্দা সংস্থা, সশস্ত্রবাহিনী, প্রশাসন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল নিয়ে সুস্পষ্ট মতামত রাখা হয়েছে।”
তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির পরিদর্শক আক্তার মোর্শেদ আলাপ-কে বলেন, “গ্রেপ্তার হওয়া ‘মিটআপ’ গ্রুপের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। তবে তাদের কাছ থেকে পাওয়া ‘ডিভাইস’-এর ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে বিস্তারিত জানা যাবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, এই ধরণের উগ্রবাদী সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি নিয়ে শুধু যে নিজেদের মধ্যেই আলোচনা-সমালোচনা করে তা নয়, তারা এটি নিয়ে প্রচারণাও চালায়। এই প্রচারণার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে তোলে।
উগ্রবাদীদের মতাদর্শিক প্রচার বন্ধে রাজনৈতিক মতৈক্যের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মিটআপ গ্রুপের ১২ জনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ
গ্রেপ্তার ১২ জনকে ১৯এ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমানের আদালতে হাজির করে সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত শুনানি শেষে পৃথকভাবে তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
প্রথম দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় পাঁচজনকে। তারা হলেন-শিহাব উদ্দিন, মারজুক আহমেদ, সাইফুর রহমান খান, রাম্মি মিয়া ও কামিছুল ইসলাম। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২২এ সেপ্টেম্বর তাদের আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
অন্য সাতজনের মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন, আফিফ আহমেদ, মোহাইমিনুল হক, জাওজি চৌধুরী, শাহাদাত হোসেন, সাব্বির আহমেদ ও জুনায়েদ আহমেদকে ২৪এ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২৫এ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
মিটআপ গ্রুপের ৮ দফায় যা আছে
গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সিটিটিসির কর্মকর্তারা তদন্ত নেমে জানতে পেরেছেন, আট দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে মিটআপ গ্রপ। এসব দফা হলো:
১. বাংলাদেশ দারুল কুফর। এদেশের শাসনব্যবস্থা কুফরি ও জাহেলি শাসনব্যবস্থা।
২. এদেশের শাসকবর্গ কাফের ও তাগুত।
৩. এদেশের প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিফেন্স ফোর্স তাগুতের বাহিনী এবং দলগতভাবে কাফের।
৪. সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো দলগতভাবে কাফের। আর তথাকথিত ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো পথভ্রষ্ট।
৫. দীন কায়েমের নববী মানহাজ হলো দাওয়াত ও জিহাদের সমন্বিত পদ্ধতি।
৬. জিহাদ আমাদের উপরে ফরযে আইন হয়ে আছে।
৭. এদেশের অমুসলিমরা মহারিব কাফের। তাদের সাথে আমাদের কোনো নিরাপত্তা চুক্তি নেই। সে হিসাবে তারা আমাদের আক্রমণের বৈধ লক্ষ্যবস্তু।
৮. ইমান ও কুফরের মধ্যকার চলমান লড়াইয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফের মুশরিকদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে দেওয়া যাবে না। ধ্বংস করতে হবে তাদের।
কে এই শিহাব উদ্দিন?
সিটিটিসির একাধিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, জঙ্গি কর্মকাণ্ডের পুরোনো নেটওয়ার্কই নতুন নামে সচল করেছিলেন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের আড়াল গ্রামের বাসিন্দা মো. শিহাব উদ্দিন। তার বাবার নাম মো. সোলাইমান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে কর্মী সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও নেতা তৈরি এবং জিহাদ পরিচালনার অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগের অংশ হিসাবে শিহাবের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠা হয় ‘মিটআপ’ গ্রুপ। পাশাপাশি চলে দেশের বিভিন্ন এলাকা সফর।
এমনকি কর্মী সংগ্রহে প্রবাসীদেরও টার্গেট করেছে ‘মিটআপ’ গ্রুপ।
পুলিশ বলছে, ‘মিটআপ’ গ্রুপের বিস্তৃতি ঘটাতে আরো নানা গ্রুপের সাথে সংযোগ তৈরি করেছেন শিহাব।
এসব গ্রুপের মধ্যে আছে ‘দ্বীনি কমিউনিটি সিলেট বিভাগ’, ‘দ্বীনি কমিউনিটি ঢাকা জেলা’, ‘এসো জামায়াতবদ্ধ হই’ এবং ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’।
শিহাবের বিরুদ্ধে উগ্র মতবাদ প্রচারের অভিযোগ বেশ পুরোনো। উগ্রবাদী প্রকাশনাসহ গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। নরসিংদীর একটি পুরোনো মামলার আসামিও তিনি।
নরসিংদীর পলাশ থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে এই মামলা হয় ২০১৯ সালের ১৬ই মার্চ। মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে সিটিটিসি।
২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট পরবর্তী সময়ে শিহাব মনে করেছিলেন নরসিংদীর মামলায় কিছুই হবে না তার। আর ওই ভাবনা থেকেই নতুন করে ‘মিটআপ’ গ্রুপ নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তিনি।
গ্রুপ সদস্য বাছাইয়ে তরুণদেরই প্রাধান্য দিয়েছেন শিহাব।
ঢাকার শেরেবাংলা থানায় দায়ের হওয়া সাধারণ ডায়েরি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তার সাথে গ্রেপ্তার হওয়া সবার বয়স ১৯ থেকে ৩৬ বছরের মধ্যে।
সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ‘ভিডিও কনটেন্ট’ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন ‘মিটআপ’ গ্রুপের সদস্যরা। পাশাপাশি বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া ‘ধর্মভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’, যারা ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পরে জামিনে বেরিয়ে এসেছেন, তাদের ‘ভিডিও কনটেন্ট’ও মিটআপ গ্রুপের সদস্যদের প্রভাবিত করেছে।
সিটিটিসির একাধিক সূত্র জানায়, শিহাবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হলেন সাব্বির আহমেদ। তার বিরুদ্ধে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কাছ থেকে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ আছে।
২০২৩ সালের ২৭এ এপ্রিল ঢাকার তেজগাঁও থানায় এ সংক্রান্ত মামলা হয় সাব্বিরের বিরুদ্ধে।
সাব্বির ঢাকার শেরেবাংলা থানার ফার্মগেইট এলাকার ইন্দিরা রোডের স্থায়ী বাসিন্দা। তার বাবার নাম আবদুস সামাদ।
তিনটি কারণে এদেশে উগ্রবাদীদের তৎপরতা বন্ধ পুরোপুরি সম্ভব নয় বলে মনে করেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও এ জন্য দায়ী বলে মনে করেন তিনি।
তৌহিদুল হক বলেন, “উগ্রবাদী তৎপরতার বন্ধ না হওয়ার প্রথম কারণ হলো, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান। চারপাশে যারা আছে, কাছে বা দূরের সেইসব দেশে উগ্রবাদীদের তৎপরতা আছে। তাদের সাথে এখানকার উগ্রবাদীদের সংযোগ তৈরি হয়। ফলে উগ্রবাদীরা শক্তিশালী হয়ে উঠে।”
“দ্বিতীয় কারণ হলো, বহুধারায় বিভক্ত এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা। বহুধারায় যারা শিক্ষা গ্রহণ করেন তারা রাষ্ট্র, জনগণ, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি হিসাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি কখনোই ঐক্যমতে আসতে পারে না। আরেকটি কারণ হলো এখানকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিদ্বেষ বিরাজমান। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে নিঃশেষ করে দিতে চায়। আর এই নিঃশেষ প্রক্রিয়ায় উগ্রবাদীদেরও ব্যবহার করে তারা”, বলেন তিনি।
তৌহিদুল হক মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনোভাবেই উগ্রবাদীদের উত্থান ঠেকানো সম্ভব না। তবে এই প্রক্রিয়া শুরু করতে কারো আগ্রহ আছে বলেও মনে করেন না তিনি।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে গড়ে ওঠা ‘মিটআপ’ গ্রুপ কেবল সাধারণ ধর্মীয় আলোচনা বা যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম ছিল না। বরং বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবলয় ও অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে ধ্বংস করার মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে সংগঠনের সদস্যদের।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় বড় ধরনের নাশকতার আগেই এই চক্রটির মূল সারির সদস্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও, সাইবার জগতে তাদের তৈরি করা উগ্র মতাদর্শিক প্রভাব এখনো উদ্বেগজনকভাবে রয়ে গেছে বলে জানাচ্ছে পুলিশ।
জব্দকৃত ডিজিটাল ডিভাইসের ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পেলে এই নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন এবং অন্য কোনো আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসূত্রের আরও বিস্তারিত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে আশা করছে সিটিটিসি।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সামাজিক মাধ্যমে তরুণদের চরমপন্থায় ঝুঁকে পড়ার মনস্তাত্ত্বিক কারণ উদঘাটন এবং এই ধরনের নেটওয়ার্কের শেকড় উপড়ে ফেলাটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ বলে জানাচ্ছেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।