অপরাধের অভয়ারণ্য: কলম্বিয়ার মেডেলিন বনাম মোহাম্মদপুর

চব্বিশের পট পরিবর্তনের পরও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির দাপট চলছে। মধ্যবিত্তের এই আবাসিক এলাকায় দিনে-দুপুরে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ কিছুই আর বাদ যায় না। কিশোর গ্যাংয়ের সাথে পুরোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ আর তাদের সহযোগীদের ফিরে আসাও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে মোহাম্মদপুরকে।

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম

মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান। পাশেই তুরাগ হাউজিং। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষা এলাকা। সেখানে ডেল্টা গার্মেন্টসের পেছনে অভিযান চালাচ্ছিলো মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। সবার আগেই ছিলেন ওসি। একটা ঘরে ঢুকতেই চাপাতির কোপ শুরু হয় পুলিশের ওপর। ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ আহত হন।

আত্মরক্ষায় পালটা গুলি চালায় পুলিশ। আহত দুই সন্দেহভাজন ছিনতাইকারীসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। এটা মঙ্গলবারের ঘটনা। এই দিন সকালেই আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় এক বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে তিন লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

পুলিশের দাবি, আটক হওয়া ব্যক্তিরা ‘কবজি কাটা গ্রুপ’-এর সদস্য। এই অভিযান যখন হচ্ছিলো, তখন চারিদিক আলোকোজ্জ্বল। সূর্য অস্ত যেতে ঢের বাকি।বাসিন্দারা বলেন, মোহাম্মদপুরে এখন আর অপরাধের দিন-রাত নেই।

গত ১২ই এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। দেখা যায়, একদল মানুষ অস্ত্র হাতে একজনকে তাড়া করছে।দৌড়াতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে তাকে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। এক পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে মারা যান তিনি। হত্যার শিকার যুবকের নাম ইমন, যিনি ‘অ্যালেক্স ইমন’ নামে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে দুইটি হত্যা, চাঁদাবাজিসহ ১৮টি মামলা আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘনবসতি, বহুভাষার মানুষের সম্মিলন, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান, সর্বোপরি বিচার না হওয়ার চর্চাই ধীরে ধীরে মোহাম্মদপুরকে করে তুলেছে অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়নারণ্য। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত চেষ্টাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।দিন নেই, রাত নেই। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি কী হয় না মোহাম্মদপুরে!

কলম্বিয়ার মেডেলিন

গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের কথা। কলম্বিয়ায় গ্রামাঞ্চলে সহিংসতা কেবলই বাড়ছিলো। নিরাপত্তার খোঁজে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ বসতি গড়ে মেডেলিন শহরে।

পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গড়ে ওঠা এই ঘিঞ্জি এলাকার ভৌগোলিক অবস্থানই তার জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্গম ও আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ রাস্তার কারণে এলাকাটি ছিলো মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন আর পুলিশের নজরদারির বাইরে।

অপরিকল্পিত এই বসতিতে পর্যাপ্ত রাস্তা, স্কুল, কর্মসংস্থান বা নাগরিক সেবা ছিলো না। অনেক তরুণ নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়নি।

এই শূন্যস্থান পূরণ করতে শুরু করে গ্যাং, মাদকচক্র, গেরিলা ও আধাসামরিক গোষ্ঠীগুলো। তারা অর্থ, পরিচয় এবং ক্ষমতার প্রতিশ্রুতিতে কিশোর-তরুণদের দলে টানতে থাকে। পুরো এলাকাটি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

এই সুযোগটিই কাজে লাগায় ‘ড্রাগ লর্ড’ পাবলো এসকোবার ও তার মেডেলিন কার্টেল। আশির দশকে মেডেলিনের কামুনা থার্টিন অঞ্চল হয়ে ওঠে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের প্রধান ট্রানজিট রুট।

এখানকার দরিদ্র ও বেকার তরুণদের অর্থের লোভ দেখিয়ে নিজেদের ‘হিটম্যান’ বা ভাড়াটে খুনি বানায়। এসকোবারের পতনের পর নব্বইয়ের দশকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে বামপন্থি গেরিলা গোষ্ঠী এবং ডানপন্থি আধা-সামরিক বাহিনী একে অপরের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

গ্যাং ওয়ার, অপহরণ আর লাশের মিছিলে কামুনা থার্টিন পরিণত হয় অন্যায়ের অভয়রাণ্যে, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন ছিল কার্যত জিম্মি।

নব্বই দশকের মোহাম্মদপুর

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ঢাকার পশ্চিম অংশে ধানমন্ডি ও লালমাটিয়া তুলনামূলক উন্নত আবাসনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অংশের মানুষ সেখানে বাস করতে শুরু করে।

পাশের মোহাম্মদপুর তখনও শহরের অংশ ছিলো না। ছিলো বন্যাপ্রবণ ও নিচু এলাকা।

ষাটের দশকের শুরুতে মোহাম্মদপুরের আটটি গ্রামকে একত্রিত করে নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার।

ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রাজর্ষি দাসগুপ্তের এক গবেষণায় মোহাম্মদপুরের আর্থসামাজিক অবস্থা ও ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

এতে বলা হয়, ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে সরকার আটটি ছোট গ্রামকে একত্রিত করে মোহাম্মদপুর নামে একটি নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়।

দেশভাগের পর ভারতের বিহারি বা আটকে পড়া পাকিস্তানিদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা হয় সেখানে। বন্যা থেকে রক্ষার জন্য একটি বেড়িবাঁধও তৈরি করা হয়। যেটি বর্তমানে রিং রোড নামে পরিচিত।

মোহাম্মদপুর ছিলো জলাভূমি, টিলা আর জঙ্গলে ভরা অঞ্চল। গবেষণা বলছে, সত্তরের দশকে স্বাধীনতার পর বিহারিদের বরাদ্দ দেওয়া কিছু বাড়িঘর তারা বিক্রি করে দেয়।

এরপর অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। আবার অনেক বিহারি বাড়ি দখল হয়ে যাওয়ায়, তারা জেনেভা ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

ভৌগোলিক অবস্থা, শিক্ষার সুযোগের অভাবে কিশোর-তরুণরা অপরাধে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

নব্বই দশকে ছোট ছোট দল জড়িয়ে যেতে থাকে বড় অপরাধে। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, ওই সময় দেশজুড়ে যে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিস্তার ঘটে তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিলো মোহাম্মদপুর।

ঢাকায় অপরাধীদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ে। একদিকে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে আধিপত্য বিস্তার। দুইয়ে মিলে নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যের লড়াইয়ের, খুন হয়ে ওঠে নৈমিত্তিক ঘটনা।

নব্বইয়ের দশকে মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদপুরের অপরাধ চক্র নিয়ন্ত্রণ করতেন তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ।

১৯৯৩ সালে ছাত্রনেতা মোর্শেদকে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন। তার ভাই হারিস আহমেদ ছিলো আলোচনায়।

জোসেফ গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন সানজিদুল ইসলাম (ইমন),নাঈম আহমেদ (টিটন) এবং ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল।

এদের মধ্যে ইমন ও পিচ্চি হেলাল পরবর্তীতে আলাদা গ্রুপ গঠন করেন এবং পুলিশের তালিকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মোহাম্মদপুরে নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যের জেরে অন্তত সাতজন নিহত হন। ওই বছরের ১৩ই মার্চ জোসেফের ভাই আবু সাঈদ টিপু ও তার বন্ধু ইমরান ইমনের গ্রুপের হাতে নিহত হন।

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পুলিশ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকায় ইমন, টিটন, পিচ্চি হেলাল ও হারিস আহমেদের নাম ছিল। হারিস ছাড়া বাকিরা গ্রেপ্তার হন।

২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত স্থানীয় আধিপত্যের বিরোধে ৩০ জন খুন হয়। ২০০৪ সালে র‍্যাব গঠিত হলে একের পর এক ‘ক্রসফায়ারে’অনেক অপরাধী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

ওয়ান ইলেভেন সরকারের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মোহাম্মদপুরের চিত্র ফের পালটে যেতে শুরু করে।

কিশোর গ্যাং ছড়িয়ে যেতে শুরু করে। হিন্দি সিরিজ ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’-এর সাথে মিলিয়ে অনেকে মোহাম্মদপুরকে বলেন ‘গ্যাংস অব আসিফপুর’।

এই আসিফ মোহাম্মদপুরের সাবেক কাউন্সিলর। কিশোর গ্যাংয়ের রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়ার বিস্তর অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

অপরাধের বাহারি গ্রুপ

চব্বিশের পট পরিবর্তনের পরও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির দাপট চলছে। মধ্যবিত্তের এই আবাসিক এলাকায় দিনে-দুপুরে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ কিছুই আর বাদ যা না।

কিশোর গ্যাংয়ের সাথে পুরোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ আর তাদের সহযোগীদের ফিরে আসাও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে মোহাম্মদপুরকে।

২০২৪ সালের ২০এ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি জোড়া খুনের ঘটনায় ‘পিচ্চি হেলাল’কে অভিযুক্ত করা হয়।

২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিলে শের শাহ সূরি রোডে এক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় পিচ্চি হেলাল ও ইমনের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।

সংঘবদ্ধ অপরাধ ছাড়াও ছোটোখাটো অপরাধের মোট সংখ্যা আর ভুক্তভোগীর সংখ্যা আর ছোট নেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য বলছে, মোহাম্মদপুরে এখন পঞ্চাশটিও বেশি দল বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। এর মধ্যে অন্তত ১৫টি দল বড়। প্রতি দলেই আছে ১৫ থেকে ২০ জন।

অপরাধী দলগুলোর নামও বিচিত্র। পাটালি গ্রুপ, অ্যালেক্স গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, কবজি কাটা গ্রুপ, আর্মি আলমগীর গ্রুপ, নবী গ্রুপ, আকবর গ্রুপ এমন বাহারি নামে গ্রুপ ছড়িয়ে আছে মোহাম্মদপুরজুড়ে।

মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল, অপরাধের কাজে ভাড়া খাটা ইত্যাদিই তাদের আয়ের উৎস।

সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা মনে করেন কেউ না কেউ অপরাধীদের পেছন থেকে সমর্থন দেয়, সেজন্যই তারা বেড়ে উঠতে পারছে।

“ওখানে তো এগুলোকে কেউ প্যাট্রোনাইজ করে এবং ওইটার অপজিশন খুব নাই ওখানে হয়তো”, বলেন নূরুল হুদা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ মনে করেন অপরাধপ্রবণ এলাকা হওয়ার জন্য যা যা ‍উপাদান দরকার সবই আছে মোহাম্মদপুরে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে মানুষ আসে। নানা ভাষার মানুষ থাকে। বিশাল একটা অংশ বেকার। রাজনৈতিক বাস্তবতার বিষয়ও আছে। সব মিলিয়ে জায়গাটি অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠেছে।”

গত এপ্রিল মাসে মোহাম্মাদপুর থানায় ১২টি ছিনতাই ও ১০টি চুরির মামলা হয়েছে। আদাবর থানায় হয়েছে ছয়টি ছিনতাই, একটি চুরি ও একটি অপহরণ মামলা।

মে মাসে মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলাসহ ১০টি ছিনতাই ও পাঁচটি চুরির মামলা হয়েছে। এই সময়ে আদাবর থানায় হয়েছে চারটি ছিনতাই এবং তিনটি চুরির মামলা।

জুন মাসে এখন পর্যন্ত মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যাসহ ১১টি ছিনতাই এবং পাঁচটি চুরির মামলা হয়েছে। আদাবর থানায় হয়েছে একটি হত্যাসহ দুইটি ছিনতাই ও দুইটি চুরির মামলা।

তবে প্রকৃত ঘটনা এই সংখ্যার চেয়েও বেশি। কারণ জটিলতার কারণে অনেকেই আইনি সাহায্য নিতে চান না।

জেনেভা ক্যাম্প

মোহাম্মদপুরের অপরাধ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম একটি কারণ হিসাবে দেখা হয় জেনেভা ক্যাম্পকে।

সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা বলেন, “এখানে উর্দু স্পিকিং রেফিউজিস থাকতো। সাতচল্লিশের পর তারা যখন চলে গেলো, তখন যারা আসলো তারা কারা আসলো। এইসব দেখলে আন্দাজ করা যায় সাধারণত উচ্ছেদ হওয়া লোকরাই এখানে থেকেছে।”

“যাদের মনে অনেক দুঃখ আছে বা প্রশ্ন আছে তারা অপরাধ করতে উৎসাহিত বোধ করে।”

মোহাম্মদপুরের আয়তন সাড়ে সাত বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৭০,৯৩৯ জন। যা ঢাকার গড় ঘনত্বের দ্বিগুণেরও বেশি।

মোহাম্মদপুরের মধ্য ও পশ্চিম এলাকায় জেনেভা ক্যাম্পে অপরাধের হার বেশি। যেখানে নিম্নআয়ের ও উদ্বাস্তু মানুষের বসবাস বেশি।

ডিএমপির আটটি বিভাগের মধ্যে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও মাদকের মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি তেজগাঁও বিভাগে। মোহাম্মদপুর থানা এই তেজগাঁও বিভাগেরই অন্তর্ভুক্ত।

জেনেভা ক্যাম্পে শিশু-কিশোরদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত। তাদের পরিবারও দরিদ্র। তাই সহজেই তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এই ক্যাম্পটি ঢাকার মাদক ব্যবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাদক পাচারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে জেনেভা ক্যাম্পেই ১০ জন নিহত হয়েছেন।

রাজনৈতিক সমর্থন ও বিচারহীনতা

অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন এসব অপরাধের পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন নিয়ামক হিসাবে কাজ করে।

সাবেক আইজিপি নূরুল হুদার মতে, “রাজনীতিবিদদের লোক দরকার কাজকর্ম করার জন্য। এই ধরনের লোকদের রেডিলি পাওয়া যায়। অতএব একটা সন্দেহ থাকে যে অপরাধের পেছনে তাদের ইন্ধন থাকে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের শিক্ষক রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, “ক্রিমিনাল পলিটিশিয়ান নেক্সাস এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধীরাতো কোনো না কোনো জায়গার সাপোর্ট পাচ্ছে। পলিটিশিয়ান কখনো সরাসরি ইনভলভ হয় না। অপরাধীরা রুলিং পার্টির সাথে সাইলেন্ট নেক্সাসের মাধ্যমেই সাম্রাজ্যটা টিকিয়ে রাখে।”

অপরাধ বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখানে বিচারহীনতাকেও অন্যতম কারণ হিসাবে দেখছেনে এই দুই বিশ্লেষক।

রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, “অপরাধীরা ভয় পাবে কোনটা। শাস্তিকে। তারা যদি জেনে ফেলে যে ধরা পড়লেও জেল থেকে বেরিয়ে যাওয়া যাবে। তখন তারা কস্ট বেনিফিট হিসাব করে। তাই অপরাধ বেড়ে যায়।”

“এই যে ইমন মারা গেলো, তার নামে ১৮টা মামলা। সে কেন জাস্টিসের বাইরে থাকলো।”

অপরাধ কমাতে অপরাধীদের থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এগিয়ে থাকতে হবে বলে মনে করেন নূরুল ‍হুদা।

তিনি বলেন, “এখানে রাজনীতিবিদদের একটা রোল আছে। তাদের সদিচ্ছা থাকলে অপরাধ দমন হবে সহজে।”

জঙ্গল সলিমপুরের প্রসঙ্গ টানেন রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বলেন, “ওখানে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিলো। যখন রাজনীতিবিদ আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একসাথে মুভ করলো, জায়গাটা নিয়ন্ত্রণে চলে এলো।”

মেডেলিন যেভাবে সুধরে গেলো

কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরের কামুনা থার্টিনের কথা বলছিলাম। ২০০২ সালের অক্টোবরে দেশটির সরকার এই এলাকাকে অপরাধী মুক্ত করতে ‘অপারেশন ওরিয়ন’ নামে একটি বিশাল সামরিক অভিযান চালায়।

হেলিকপ্টার ও ট্যাংক নিয়ে চালানো এই অভিযানে গ্যাংগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে যায়। যদিও এর জন্য অনেক সাধারণ মানুষকেও প্রাণ দিতে হয়েছিল। এজন্য বিতর্কও হয়েছে ঢের।

তবে কামুনা থার্টিনকে সামরিক শক্তিতে ঠিক করা যায়নি। করা গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় মানুষের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের হাত ধরে।

২০১১ সালে মেডেলিন নগর কর্তৃপক্ষ এই দুর্গম পাহাড়ের বাসিন্দাদের জন্য চলন্ত সিঁড়ি এবং ক্যাবল কার স্থাপন করে।

যে পাহাড় বেয়ে উঠতে আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যেতো, তা চোখের পলকে কয়েক মিনিটে নে যার হওয়া যায়। অঞ্চলটি মূল অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হয়ে যায়।

একসময়ের বুলেটবিক্ষত ধূসর দেয়ালগুলো ভরে ওঠে চোখ ধাঁধানো সব রঙিন গ্রাফিতিতে। যা তাদের অতীতের ভয়াবহতা ভুলিয়ে নতুন আশার গল্প বলতে শুরু করে।

এক সময়ের খুনিদের আস্তানা এখন প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকের মুখরিত এক প্রাণবন্ত শিল্পনগরী।

মোহাম্মদপুর কি মেডেলিন হবে?