উৎসবের বাড়ি থেকে মৃত্যুর ঘর: গাজীপুরে স্ত্রী-সন্তানসহ ৫ খুনের নেপথ্যে যত প্রশ্ন
স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মো. ফোরকানের বিরুদ্ধে। ঘটনার আগে যে বাড়ি ছিল স্বাভাবিক ও উৎসবমুখর, রাতেই সেটি হয়ে ওঠে মৃত্যুর ঘর। ফোরকান পলাতক থাকায় হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন।
মাহাদী হাসান, কাপাসিয়া থেকে ফিরে
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএমআপডেট : ১২ মে ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম
ঘটনার দিন শুক্রবারও বাড়ির পাশের দোকান থেকে সন্তানদের জন্য চকলেট-চিপস কিনেছিলেন ফোরকান।
গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা। ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। প্রত্যন্ত এই এলাকার একটি বাড়ি এখন স্থানীয়দের কৌতূহলের কেন্দ্র। দূর-দূরান্ত থেকে কেউ রিকশায়, কেউ অটোতে করে আসছেন বাড়িটি দেখতে। কেন এসেছেন জানতে চাইলে অনেকে বলছেন, ‘নেটে ভিডিও দেখে এসেছি’।
‘নেটের যে ভিডিও বা সংবাদের’ কথা তারা বলছেন, সেটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের নৃশংসতম ঘটনাগুলোর একটি।
৮ই মে, শুক্রবার রাতের সেই ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো দেশ। সেদিন সকাল, দুপুর কিংবা বিকালেও যে বাড়ি ছিল উৎসবের আমেজে ভরা, রাত নামতেই সেই বাড়িই হয়ে ওঠে মৃত্যুর ঘর। এখন তালাবদ্ধ সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ তাকিয়ে থাকে, অবিশ্বাস, আতঙ্ক আর প্রশ্ন নিয়ে।
রাউৎকোনার ওই বাড়িতেই থাকতেন মো. ফোরকান। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ও তিন শিশু সন্তান।
প্রতিবেশীদের ভাষ্য, পরিবারটি ছিল শান্ত। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, এই বাড়ির ভেতরে জমে আছে কোনো অস্থিরতা বা অশান্তি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তারা এই বাসায় ওঠেন। চার মাসের মধ্যে কখনো ঝগড়া বা পারিবারিক কলহের শব্দ শোনেননি বলে জানান আশপাশের মানুষ।
যে বাড়িতে তারা ভাড়া থাকতেন, তার মালিক প্রবাসী। বাড়ির মালিকের স্ত্রী আলাপ-কে বলেন, “বাসায় সবসময় উচ্চস্বরে টিভি চলতো। উঠানে খেলা করতো তার বাচ্চারা।”
তার ভাষ্যেও, এই পরিবারে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েনি।
ফোরকানের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্কও ছিল স্বাভাবিক ও স্নেহময়, এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা। বাড়ির পাশের দোকান থেকে তিনি প্রায়ই বাচ্চাদের জন্য চিপস, চকলেট কিনতেন। ঘটনার দিন শুক্রবারও দোকান থেকে চিপস কিনেছিলেন তিনি।
সেই দোকানের মালিক সুরমা। নিজেই দোকান চালান। তিনি জানান, ফোরকান প্রায়ই তার দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে দোকানে যেতেন।
আলাপ-কে সুরমা বলেন, “আমি তারে অনেকবার দেখছি। তার বাচ্চা আমার দোকানে খেলা করছে। সে এই চেয়ারে বসে চা খাইছে। কখনোই তারে দেখে মনে হয়নি যে এমন কাম করতে পারে সে।”
প্রতিবেশীরাও একই কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, ফোরকান ছিলেন শান্ত স্বভাবের। আসিফ নামে এক স্থানীয় বলেন, “তারে আমি অনেকবার দেখছি, কথা বলছি। খুবই শান্ত স্বভাবের। কেমনে এই কাজ করলো, কিছুই বুঝতেছি না।”
কেন করেছেন ফোরকান? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে পুলিশ, স্থানীয়রা এবং স্বজনরা।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে নিজ হাতে স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে হত্যা করেন ফোরকান। এরপর পালিয়ে যান তিনি।
পুলিশ ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান নিজ ভাইকে ফোন করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, “সবাইকে শেষ করে দিয়েছি। আমাকে আর খুঁজে পাবে না।”
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। আর ছোট শিশুটিকে গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, সন্তান ও শ্যালকের মরদেহ ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। ফোরকানের স্ত্রীকে পাওয়া যায় জানালার সঙ্গে বাঁধা অবস্থায়। তার পরনে ছিল উৎসবের শাড়ি ও গয়না।
অথচ সেদিন বিকালেও পুরো পরিবার ঘুরতে বেরিয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ঘরে রান্না হয়েছিল পোলাও ও গরুর মাংস। দোকান মালিক সুরমা জানান, ফোরকান নিজেই পাশের দোকান থেকে পোলাওয়ের চাল ও কিসমিস কিনেছিলেন।
তাই প্রশ্ন উঠছে, কী এমন ঘটেছিল সেই রাতে? কয়েক ঘণ্টা আগেও যে বাড়িতে উৎসবের প্রস্তুতি ছিল, সেখানে কীভাবে নেমে এলো এমন বিভীষিকা? সবকিছু স্বাভাবিক থাকার পরও কেন স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করা হলো? আর হত্যার পর ফোরকান কোথায় গেলেন?
এক প্রতিবেশী জানিয়েছেন, ফোরকান নিজেই শ্যালককে ফোন করে আসতে বলেছিলেন। টাকা ছিল না জানালে, ফোরকান তাকে আসা-যাওয়ার ভাড়াও দিয়ে দেন। আর সেদিন রাতেই ঘটে সেই নৃশংস ঘটনা।
ফোরকানের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাদের স্থায়ী ঠিকানা গোপালগঞ্জের গোপিনাথপুর। সেখান থেকে প্রায় ২১৭ কিলোমিটার দূরে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাসা ভাড়া নেন তিনি।
বাড়ির মালিকের পরিবার জানায়, স্থানীয় একজনের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে বাসাটি ভাড়া নেন ফোরকান। তবে কেন এত দূরে এসে তিনি বাসা নিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তার কর্মস্থলও এই এলাকায় ছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কেউ।
আসিফ নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, “শুনেছি তিনি গাড়ি চালাতেন। সাত থেকে দশ দিন পরপর বাড়িতে আসতেন।”
তবে প্রতিবেশীদের অনেকেই জানিয়েছেন, ফোরকানের স্ত্রীকে তারা খুব একটা দেখেননি। পরিবারের বড় মেয়ে মিম খানম পড়ত রাউৎকোনা মাদ্রাসায়। ঘটনার আগের দিন বৃহস্পতিবারও নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ক্লাস করেছে।
মিমের শ্রেণিশিক্ষক তকবীর হোসেন জানান, মিম ছিল অত্যন্ত শান্ত ও মনোযোগী শিক্ষার্থী। সহপাঠীরাও বলছে, মিম ছিল হাসিখুশি স্বভাবের।
মিমের বান্ধবী রুকাইয়া বলে, “আমরা বৃহস্পতিবারও একসাথে ক্লাস করেছি। সেদিনও অনেক মজা করতে করতে আমরা বাসায় গেলাম। আমার বিশ্বাসই হয় না যে মিম নাই।”
তবে মিম কখনো বাড়িতে বড় কোনো সমস্যার কথা বলেনি বলে জানায় তার সহপাঠীরা। শুধু জানিয়েছিল, ঈদের আগেই তাদের গোপালগঞ্জে ফিরে যেতে হবে। আর সেখানে গেলে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পরিবার তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে পারে, এমন আশঙ্কাও জানিয়েছিল মিম।
গোপালগঞ্জ থেকে ২১৭ কিলোমিটার দূরে এসে বাসা নেওয়া, চার মাস পর আবার ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা, মিমের পড়াশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে ঘটনাটির পেছনে আরও অনেক অজানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
কেন ফোরকান পরিবার নিয়ে রাউৎকোনায় এসেছিলেন? কেন আবার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল? আর সেই ফেরার আগেই কেন শেষ হয়ে গেল পুরো পরিবার?
কাপাসিয়া থানার ওসি মো. শাহিনুল আলম জানিয়েছেন, ফোরকানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কেন তিনি এই এলাকায় থাকতেন, সে বিষয়েও এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আলাপকে ওসি বলেন, “আমরা তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। আশা করি শিগগিরই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। তখন রহস্যের জট খুলতে শুরু করবে।”
রাউৎকোনার সেই বাড়িটি এখন তালাবদ্ধ। উঠানে আর শিশুদের খেলাধুলা নেই। উচ্চস্বরে টিভির শব্দ নেই। নেই দোকান থেকে চিপস কিনে ফেরার দৃশ্যও।
আছে শুধু মানুষের ভিড়, ফিসফাস আর একটাই প্রশ্ন। যে মানুষকে সবাই শান্ত বলছে, সে কীভাবে নিজের ঘরকেই এমন মৃত্যুর ঘরে পরিণত করল? নাকি এই ঘটনার পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো সত্য?
উৎসবের বাড়ি থেকে মৃত্যুর ঘর: গাজীপুরে স্ত্রী-সন্তানসহ ৫ খুনের নেপথ্যে যত প্রশ্ন
স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মো. ফোরকানের বিরুদ্ধে। ঘটনার আগে যে বাড়ি ছিল স্বাভাবিক ও উৎসবমুখর, রাতেই সেটি হয়ে ওঠে মৃত্যুর ঘর। ফোরকান পলাতক থাকায় হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন।
গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা। ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। প্রত্যন্ত এই এলাকার একটি বাড়ি এখন স্থানীয়দের কৌতূহলের কেন্দ্র। দূর-দূরান্ত থেকে কেউ রিকশায়, কেউ অটোতে করে আসছেন বাড়িটি দেখতে। কেন এসেছেন জানতে চাইলে অনেকে বলছেন, ‘নেটে ভিডিও দেখে এসেছি’।
‘নেটের যে ভিডিও বা সংবাদের’ কথা তারা বলছেন, সেটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের নৃশংসতম ঘটনাগুলোর একটি।
৮ই মে, শুক্রবার রাতের সেই ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো দেশ। সেদিন সকাল, দুপুর কিংবা বিকালেও যে বাড়ি ছিল উৎসবের আমেজে ভরা, রাত নামতেই সেই বাড়িই হয়ে ওঠে মৃত্যুর ঘর। এখন তালাবদ্ধ সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ তাকিয়ে থাকে, অবিশ্বাস, আতঙ্ক আর প্রশ্ন নিয়ে।
রাউৎকোনার ওই বাড়িতেই থাকতেন মো. ফোরকান। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ও তিন শিশু সন্তান।
প্রতিবেশীদের ভাষ্য, পরিবারটি ছিল শান্ত। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, এই বাড়ির ভেতরে জমে আছে কোনো অস্থিরতা বা অশান্তি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তারা এই বাসায় ওঠেন। চার মাসের মধ্যে কখনো ঝগড়া বা পারিবারিক কলহের শব্দ শোনেননি বলে জানান আশপাশের মানুষ।
যে বাড়িতে তারা ভাড়া থাকতেন, তার মালিক প্রবাসী। বাড়ির মালিকের স্ত্রী আলাপ-কে বলেন, “বাসায় সবসময় উচ্চস্বরে টিভি চলতো। উঠানে খেলা করতো তার বাচ্চারা।”
তার ভাষ্যেও, এই পরিবারে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েনি।
ফোরকানের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্কও ছিল স্বাভাবিক ও স্নেহময়, এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা। বাড়ির পাশের দোকান থেকে তিনি প্রায়ই বাচ্চাদের জন্য চিপস, চকলেট কিনতেন। ঘটনার দিন শুক্রবারও দোকান থেকে চিপস কিনেছিলেন তিনি।
সেই দোকানের মালিক সুরমা। নিজেই দোকান চালান। তিনি জানান, ফোরকান প্রায়ই তার দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে দোকানে যেতেন।
আলাপ-কে সুরমা বলেন, “আমি তারে অনেকবার দেখছি। তার বাচ্চা আমার দোকানে খেলা করছে। সে এই চেয়ারে বসে চা খাইছে। কখনোই তারে দেখে মনে হয়নি যে এমন কাম করতে পারে সে।”
প্রতিবেশীরাও একই কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, ফোরকান ছিলেন শান্ত স্বভাবের। আসিফ নামে এক স্থানীয় বলেন, “তারে আমি অনেকবার দেখছি, কথা বলছি। খুবই শান্ত স্বভাবের। কেমনে এই কাজ করলো, কিছুই বুঝতেছি না।”
কেন করেছেন ফোরকান? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে পুলিশ, স্থানীয়রা এবং স্বজনরা।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে নিজ হাতে স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে হত্যা করেন ফোরকান। এরপর পালিয়ে যান তিনি।
পুলিশ ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান নিজ ভাইকে ফোন করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, “সবাইকে শেষ করে দিয়েছি। আমাকে আর খুঁজে পাবে না।”
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। আর ছোট শিশুটিকে গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, সন্তান ও শ্যালকের মরদেহ ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। ফোরকানের স্ত্রীকে পাওয়া যায় জানালার সঙ্গে বাঁধা অবস্থায়। তার পরনে ছিল উৎসবের শাড়ি ও গয়না।
অথচ সেদিন বিকালেও পুরো পরিবার ঘুরতে বেরিয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ঘরে রান্না হয়েছিল পোলাও ও গরুর মাংস। দোকান মালিক সুরমা জানান, ফোরকান নিজেই পাশের দোকান থেকে পোলাওয়ের চাল ও কিসমিস কিনেছিলেন।
তাই প্রশ্ন উঠছে, কী এমন ঘটেছিল সেই রাতে? কয়েক ঘণ্টা আগেও যে বাড়িতে উৎসবের প্রস্তুতি ছিল, সেখানে কীভাবে নেমে এলো এমন বিভীষিকা? সবকিছু স্বাভাবিক থাকার পরও কেন স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করা হলো? আর হত্যার পর ফোরকান কোথায় গেলেন?
এক প্রতিবেশী জানিয়েছেন, ফোরকান নিজেই শ্যালককে ফোন করে আসতে বলেছিলেন। টাকা ছিল না জানালে, ফোরকান তাকে আসা-যাওয়ার ভাড়াও দিয়ে দেন। আর সেদিন রাতেই ঘটে সেই নৃশংস ঘটনা।
ফোরকানের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাদের স্থায়ী ঠিকানা গোপালগঞ্জের গোপিনাথপুর। সেখান থেকে প্রায় ২১৭ কিলোমিটার দূরে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাসা ভাড়া নেন তিনি।
বাড়ির মালিকের পরিবার জানায়, স্থানীয় একজনের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে বাসাটি ভাড়া নেন ফোরকান। তবে কেন এত দূরে এসে তিনি বাসা নিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তার কর্মস্থলও এই এলাকায় ছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কেউ।
আসিফ নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, “শুনেছি তিনি গাড়ি চালাতেন। সাত থেকে দশ দিন পরপর বাড়িতে আসতেন।”
তবে প্রতিবেশীদের অনেকেই জানিয়েছেন, ফোরকানের স্ত্রীকে তারা খুব একটা দেখেননি। পরিবারের বড় মেয়ে মিম খানম পড়ত রাউৎকোনা মাদ্রাসায়। ঘটনার আগের দিন বৃহস্পতিবারও নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ক্লাস করেছে।
মিমের শ্রেণিশিক্ষক তকবীর হোসেন জানান, মিম ছিল অত্যন্ত শান্ত ও মনোযোগী শিক্ষার্থী। সহপাঠীরাও বলছে, মিম ছিল হাসিখুশি স্বভাবের।
মিমের বান্ধবী রুকাইয়া বলে, “আমরা বৃহস্পতিবারও একসাথে ক্লাস করেছি। সেদিনও অনেক মজা করতে করতে আমরা বাসায় গেলাম। আমার বিশ্বাসই হয় না যে মিম নাই।”
তবে মিম কখনো বাড়িতে বড় কোনো সমস্যার কথা বলেনি বলে জানায় তার সহপাঠীরা। শুধু জানিয়েছিল, ঈদের আগেই তাদের গোপালগঞ্জে ফিরে যেতে হবে। আর সেখানে গেলে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পরিবার তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে পারে, এমন আশঙ্কাও জানিয়েছিল মিম।
গোপালগঞ্জ থেকে ২১৭ কিলোমিটার দূরে এসে বাসা নেওয়া, চার মাস পর আবার ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা, মিমের পড়াশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে ঘটনাটির পেছনে আরও অনেক অজানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
কেন ফোরকান পরিবার নিয়ে রাউৎকোনায় এসেছিলেন? কেন আবার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল? আর সেই ফেরার আগেই কেন শেষ হয়ে গেল পুরো পরিবার?
কাপাসিয়া থানার ওসি মো. শাহিনুল আলম জানিয়েছেন, ফোরকানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কেন তিনি এই এলাকায় থাকতেন, সে বিষয়েও এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আলাপকে ওসি বলেন, “আমরা তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। আশা করি শিগগিরই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। তখন রহস্যের জট খুলতে শুরু করবে।”
রাউৎকোনার সেই বাড়িটি এখন তালাবদ্ধ। উঠানে আর শিশুদের খেলাধুলা নেই। উচ্চস্বরে টিভির শব্দ নেই। নেই দোকান থেকে চিপস কিনে ফেরার দৃশ্যও।
আছে শুধু মানুষের ভিড়, ফিসফাস আর একটাই প্রশ্ন। যে মানুষকে সবাই শান্ত বলছে, সে কীভাবে নিজের ঘরকেই এমন মৃত্যুর ঘরে পরিণত করল? নাকি এই ঘটনার পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো সত্য?