খোলার একদিন পরই বন্ধ হরমুজ প্রণালি: ফিরে গেলো ‘বাংলার জয়যাত্রা’

একদিকে সমঝোতার চেষ্টা, অন্যদিকে যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি- মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির সমীকরণ রূপ বদলাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। শুক্রবার 'হরমুজ প্রণালি' খুলে দেওয়ার পরদিনই ফিরে যাচ্ছে ‘আগের অবস্থায়’। কী হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত হরমুজ প্রণালিতে?

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০১ পিএম

ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনার মধ্যেই হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলো ইরান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ‘লেবাননে যুদ্ধবিরতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’ বলে ঘোষণা দেন।

তবে হরমুজ খোলার ঘোষণার এক দিন পরেই প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ 'আগের অবস্থায়' ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিলো ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড 'খাতাম আল-আনবিয়া' রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে এই ঘোষণার কথা জানায়।

হরমুজ খোলার খবরে যাত্রা শুরু করলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’কে ফেরত পাঠায় ইরানের বাহিনী। নির্দেশনা পেয়ে আবারও পারস্য উপসাগরে ফিরে যায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’

ইরান হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে ইরানের ক্ষেত্রে মার্কিন নৌ-অবরোধ ‘পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে’ বলে জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। পোস্টে ট্রাম্প লিখেন, যতক্ষণ না ইরানের সঙ্গে লেনদেন ১০০ শতাংশ সম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ এই অবরোধ উঠবে না।

মার্কিন অবরোধকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে 'খাতাম আল-আনবিয়া'। ইরানগামী বা ইরান থেকে ছেড়ে আসা জাহাজগুলোর চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা না দেওয়া পর্যন্ত এই কড়াকড়ি বজায় থাকবে বলে জানায় তারা। নতুন এই ঘোষণায় আবারও অনিশ্চয়তায় পড়লো গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ভবিষ্যৎ।

এর আগে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে কার্যকর হয় ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি। এই যুদ্ধবিরতিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া ‘সাময়িক সমঝোতা’র একটি অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছিল ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। বার্তা সংস্থা এএফপি’কে বাঘাই বলেন, এই সিদ্ধান্ত ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থামানোর একটি বড় পদক্ষেপ’

ট্রাম্পও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনার বিষয়ে কিছুটা ইতিবাচক বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল রয়টার্স। তবে কোনো একটি চুক্তিতে না পৌঁছালে এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়ানো নাও হতে পারে বলে জানিয়েছিলো সংবাদ সংস্থাটি। এপ্রিলের ২২ তারিখ শেষ হবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ।

দ্বিধাগ্রস্ত জাহাজ চলাচল

ইরানের ঘোষণার পর হরমুজ উন্মুক্ত থাকলেও জাহাজ চলাচলে অচলাচস্থার দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। শিপিং ট্র্যাকিং ডেটা বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যায় একদল জাহাজ পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

‘মেরিন ট্রাফিক’ এর তথ্য বলছে, প্রায় ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালির দিকে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু কিছু সময় পরেই তারা গতি থামিয়ে দেয় এবং অনেক জাহাজ ফিরে আসে। গত ২৮এ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যত বন্ধ এই পথ। শুক্রবারে এটিই ছিল জাহাজগুলোর হরমুজ পার হওয়ার প্রথম বড় কোনো প্রচেষ্টা।

সিএনএন এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, শুক্রবার হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেছে। শিপিং কোম্পানিগুলো এই পথ ব্যবহারে এখনও ‘অনিশ্চয়তা’ প্রকাশ করছে।

হরমুজ অতিক্রম করা পাহাড়গুলোর মধ্যে ছিলো একটি যাত্রীবাহী প্রমোদতরিও। মাল্টার পতাকাবাহী ‘সেলেস্টিয়াল ডিসকভারি’ নামের এই জাহাজটি শুক্রবার মাস্কাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে এই নৌপথ পার হয়।

তবে তৃতীয়বারে চেষ্টাতেও পার হতে পারেনি বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। হরমুজ খোলার খবরে যাত্রা শুরু করলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাহাজটিকে ফেরত যাওয়ার নির্দেশনা দেয় ইরানের বাহিনী। নির্দেশনা পেয়ে আবারও পারস্য উপসাগরে ফিরে যায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’।

আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের(আইএমও) প্রধান আর্সেনিও ডমিঙ্গো বিবিসি ওয়ার্ল্ড বিজনেস রিপোর্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘শিপিং শিল্পের জন্য আমাদের আরো স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জাহাজগুলো যে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই চলাচল করতে পারবে, সেই নিশ্চয়তা আমাদের দরকার’।

স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালাইসিস অস্ট্রেলিয়ার পরিচালক মাইকেল শুব্রিজ বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ম বারবার পরিবর্তন করা হচ্ছে। এটি সেখানে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য একটি বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি করছে।

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স একটি বহুজাতিক মিশনের নেতৃত্ব দেবে। শুক্রবার এক সম্মেলনে এই কথা জানান যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। বিবিসি জানিয়েছে, ৪৯টি দেশের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক শেষে স্টারমার বলেন, এই মিশনটি হবে সম্পূর্ণ ‘শান্তিপূর্ণ ও রক্ষণাত্মক’। তবে এই অঞ্চলের লড়াই পুরোপুরি থামলে কেবল তখনই এই মিশনটি বাস্তবায়ন হবে বলে জানান স্টারমার।

হুমকি ও সামরিক বিধিনিষেধ

শুক্রবার প্রণালি খোলার ঘোষণা দিলেও তখনই ভিন্ন সুরও শোনা গিয়েছিলো ইরানের অভ্যন্তরে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্স পোস্টে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি আর খোলা রাখা হবে না। এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি ইরানের অনুমতির ওপর নির্ভর করে বলেও পোস্টে দাবি করেন গালিবাফ। 

ইরানের ‘জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার’ বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছিলো, হরমুজ খোলা থাকলেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে রেভল্যুশনারি গার্ডের(আইআরজিসি) নৌ-শাখার বিশেষ অনুমতি নিতে হবে।

এদিকে শান্তি আলোচনার সমান্তরালে এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে মার্কিন বাহিনী। বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ আবারও মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। সাথে আছে ইউএসএস মাহান এবং ইউএসএস উইনস্টন এস চার্চিল নামের আরো দুইটি ডেস্ট্রয়ার।

রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ আগে থেকেই অবস্থান করছে আরব সাগরে। এছাড়া, ‘ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ’ নামের আরেকটি রণতরিও এই অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।

ইরানের হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে কমে তেলের দাম। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ সচল হওয়ার সম্ভাবনায় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায় শেয়ারবাজারে। তবে পুনরায় হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণায় দেওয়ার পর আবার বাড়তে পারে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা।

হরমুজ নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইঁদুর-বেড়াল খেলা’ চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে। একদিকে চলছে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা, অন্যদিকে বাড়ছে আরব সাগরে রণতরির সংখ্যা। সাথে শেষ হয়ে আসতে থাকা যুদ্ধবিরতির সময়সীমা। সব মিলিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সংকট কোনো টেকসই চুক্তিতে গড়ায়, নাকি নতুন কোনো সংঘাতের দিকে যায়- গোটা বিশ্ব তাকিয়ে সেদিকেই

 

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, এপি, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান ও আল জাজিরা