যুদ্ধের ডামাডোলে আগাম খাদ্য মজুতের প্রস্তুতি যুক্তরাজ্যের
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্য সরবরাহে। যুক্তরাজ্যের ফাঁস হওয়া গোপন সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি গ্রীষ্মেই খাদ্য ও নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে, যা ‘প্যানিক বায়িং’ ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তানজিলা রহমান
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৬ এএমআপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫১ পিএম
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে। গ্যাস ও জ্বালানির সরবরাহ বন্ধ থাকায় বেড়ে গেছে সারের দাম, বিভ্রাট দেখা দিয়েছে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব যেসব জায়গায় সবচেয়ে বেশি পড়বে, তার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশও। ফাঁস হওয়া একটি সরকারি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গ্রীষ্মেই যুক্তরাজ্যে মুরগি, মাংসসহ সুপারমার্কেটের বিভিন্ন পণ্যের তীব্র সংকট হবে।
তবে সরকারের দাবি, দেশে কোনো সংকট নেই। বিশ্লেষকরা অবশ্য খাদ্য মজুতেরই পরামর্শ দিচ্ছেন। আর এতেই শুরু হয়েছে ‘প্যানিক বায়িং’ আর অস্থিরতা।
টাইমসের এক প্রতিবেদনে ওই গোপন প্রতিবেদনের কথা প্রথম উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে মুরগি, মাংসসহ সুপারমার্কেটের বিভিন্ন পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
আর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে প্রতি সাতটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার খাদ্য সংকটে রয়েছে। এমন অবস্থায় অনেকের পক্ষেই বাড়তি খাবার মজুত করা সম্ভব নয়। আর খাদ্য সংকট দেখা দিলে জনগণের মধ্যে বাড়ে 'প্যানিক বায়িং'। জনরোষ বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
একটি সরকারি সূত্রকে উদ্ধৃত করে বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটিশ সরকার এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকতে পারে। এর ফলে পশু জবাই এবং খাদ্য সংরক্ষণের মুল উপাদান কার্বন ডাই অক্সাইড সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
মূলত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় খাদ্যশিল্পের জন্য অপরিহার্য কার্বন ডাই-অক্সাইডের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রশাসন।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি কর্মকর্তারা সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করছেন।
সংকট কড়া নাড়ছে ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও। জার্মানি, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার মতো দেশগুলো নিজেদের নাগরিকদের বিশেষ নির্দেশনা দিচ্ছে যে, কীভাবে খাদ্য ছাড়া ৭২ ঘণ্টা টিকে থাকা যায়।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যমন্ত্রী পিটার কাইল জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় সরকার আগেভাগেই জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য বর্তমানে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
পিটার কাইল তথ্য ফাঁসের বিষয়টিকে "অপ্রয়োজনীয়" বলে অভিহিত করেন।
"জনসাধারণের এটা জেনে আশ্বস্ত হওয়া প্রয়োজন যে, আমরা এই ধরনের পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতির আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করছি," টাইমস রেডিওকে বলেছেন তিনি।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য সবথেকে বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যবহার করে। ইরান যুদ্ধের কারণে গ্যাস সংকটের আশঙ্কায় বন্ধ হয়ে থাকা 'এনসাস বায়োইথানল প্ল্যান্ট' পুনরায় চালু করতে সরকার ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে বলে গেল মার্চ মাসে জানিয়েছেন কাইল।
যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় তারা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে একযোগে কাজ করে যাবেন।
তিনি আরও বলেন, "চরম সংকটকালীন এই পরিকল্পনাগুলো মূলত বিশেষজ্ঞদের একটি প্রস্তুতির কৌশল, এটি ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।"
যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম বহুজাতিক খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান টেসকো এর প্রধান নির্বাহী কেন মারফি বলেন, সরবরাহকারীরা এখন পর্যন্ত কোনো ঝুঁকির কথা জানায়নি।
তিনি বলেন, "আমরা বেশ ভালো অবস্থানে আছি”।
তবে খাদ্যপণ্যের দামের কী হতে পারে সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, "আমরা জানি না পরিস্থিতি কেমন হবে, কারণ স্পষ্টতই এটি একটি অস্থির পরিস্থিতি এবং আগে থেকেই আমরা এই ব্যাপারে কিছু অনুমান করতে পারি না।"
খুচরা বিক্রেতা ও খাদ্য খাতের প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়াম জানিয়েছে যে, তারা সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণের আশা করছে। তারা আরও বলছে যে, সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় খুচরা বিক্রেতারা যথেষ্ট অভিজ্ঞ।
একই রকম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এই খাতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তবে তারা পণ্য ঘাটতির চেয়ে দাম বৃদ্ধি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।
ফুড অ্যান্ড ড্রিঙ্ক ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী কারেন বেটস আশ্বস্ত করে বলেন যে, ভোক্তাদের পণ্য সংকট নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। উৎপাদকরা যথাসম্ভব চেষ্টা করছেন যাতে বাড়তি দামের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে।
তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৬ সালের শেষে দাম বাড়ার একটা আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কারেন বেটস আরও বলেন, "যুক্তরাজ্যের খাদ্য ও পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট দক্ষ ও সক্ষম। কিন্তু বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে জ্বালানি, নৌ ও সড়কপথে পণ্য পরিবহন, প্যাকেজিং এবং বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়তে শুরু করেছে।"
ইউনিভার্সিটি অফ ইয়র্কের অধ্যাপক সারাহ ব্রিডল বলেন, "অবশ্যই জরুরি খাদ্য মজুত রাখা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো কারণেই হোক, একটি বড় ধরণের খাদ্যসংকট তৈরি হওয়ার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।"
অন্যদিকে, ফুড অ্যান্ড ড্রিংক ফেডারেশন পূর্বাভাস দিয়েছে যে ডিসেম্বরের মধ্যে খাদ্য পণ্যের মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশতে পৌঁছাতে পারে। এগ্রিকালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ কনফেডারেশন জানিয়েছে, সারের দাম বাড়লে তা আগামী শরতের চাষাবাদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা পরবর্তীকালে বড় খাদ্য সংকট তৈরি করতে পারে।
অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বৈশ্বিক প্রভাব
গ্যাসের যেকোনো ধরণের ঘাটতি পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (ব্রুয়ারি) জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ ১১ই জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তাদের এখন তুমুল ব্যস্ত সময় পার করার কথা।
তবে এই গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা শুধু খাদ্য বা পানীয় খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অস্ত্রোপচার, এমআরআই স্ক্যান এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র শীতল রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও দরকার গ্যাস।
গত মাসে ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়ন সতর্ক করেছে যে, শসা ও টমেটোর দাম আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে বাড়তে পারে এবং দুধ ও অন্যান্য ফসলের দাম তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে বৃদ্ধি পেতে পারে।
ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার গত মাসে এনসুস বায়োইথানল প্ল্যান্টটি সাময়িকভাবে পুনরায় চালু করেছে, যা সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে বন্ধ ছিল। এই প্ল্যান্টটি কার্বন ডাই অক্সাইড, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পশুখাদ্য উৎপাদন করে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করেছে যে, এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরান যুদ্ধ বন্ধে চলতি সপ্তাহে পুনরায় আলোচনা শুরু হতে পারে। গত সপ্তাহে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে।
(বিবিসি , দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইমস ও দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট অবলম্বনে)
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত
যুদ্ধের ডামাডোলে আগাম খাদ্য মজুতের প্রস্তুতি যুক্তরাজ্যের
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্য সরবরাহে। যুক্তরাজ্যের ফাঁস হওয়া গোপন সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি গ্রীষ্মেই খাদ্য ও নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে, যা ‘প্যানিক বায়িং’ ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে। গ্যাস ও জ্বালানির সরবরাহ বন্ধ থাকায় বেড়ে গেছে সারের দাম, বিভ্রাট দেখা দিয়েছে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব যেসব জায়গায় সবচেয়ে বেশি পড়বে, তার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশও। ফাঁস হওয়া একটি সরকারি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গ্রীষ্মেই যুক্তরাজ্যে মুরগি, মাংসসহ সুপারমার্কেটের বিভিন্ন পণ্যের তীব্র সংকট হবে।
তবে সরকারের দাবি, দেশে কোনো সংকট নেই। বিশ্লেষকরা অবশ্য খাদ্য মজুতেরই পরামর্শ দিচ্ছেন। আর এতেই শুরু হয়েছে ‘প্যানিক বায়িং’ আর অস্থিরতা।
টাইমসের এক প্রতিবেদনে ওই গোপন প্রতিবেদনের কথা প্রথম উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে মুরগি, মাংসসহ সুপারমার্কেটের বিভিন্ন পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
আর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে প্রতি সাতটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার খাদ্য সংকটে রয়েছে। এমন অবস্থায় অনেকের পক্ষেই বাড়তি খাবার মজুত করা সম্ভব নয়। আর খাদ্য সংকট দেখা দিলে জনগণের মধ্যে বাড়ে 'প্যানিক বায়িং'। জনরোষ বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
একটি সরকারি সূত্রকে উদ্ধৃত করে বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটিশ সরকার এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকতে পারে। এর ফলে পশু জবাই এবং খাদ্য সংরক্ষণের মুল উপাদান কার্বন ডাই অক্সাইড সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
মূলত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় খাদ্যশিল্পের জন্য অপরিহার্য কার্বন ডাই-অক্সাইডের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রশাসন।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি কর্মকর্তারা সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করছেন।
সংকট কড়া নাড়ছে ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও। জার্মানি, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার মতো দেশগুলো নিজেদের নাগরিকদের বিশেষ নির্দেশনা দিচ্ছে যে, কীভাবে খাদ্য ছাড়া ৭২ ঘণ্টা টিকে থাকা যায়।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যমন্ত্রী পিটার কাইল জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় সরকার আগেভাগেই জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য বর্তমানে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
পিটার কাইল তথ্য ফাঁসের বিষয়টিকে "অপ্রয়োজনীয়" বলে অভিহিত করেন।
"জনসাধারণের এটা জেনে আশ্বস্ত হওয়া প্রয়োজন যে, আমরা এই ধরনের পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতির আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করছি," টাইমস রেডিওকে বলেছেন তিনি।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য সবথেকে বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যবহার করে। ইরান যুদ্ধের কারণে গ্যাস সংকটের আশঙ্কায় বন্ধ হয়ে থাকা 'এনসাস বায়োইথানল প্ল্যান্ট' পুনরায় চালু করতে সরকার ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে বলে গেল মার্চ মাসে জানিয়েছেন কাইল।
যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় তারা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে একযোগে কাজ করে যাবেন।
তিনি আরও বলেন, "চরম সংকটকালীন এই পরিকল্পনাগুলো মূলত বিশেষজ্ঞদের একটি প্রস্তুতির কৌশল, এটি ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।"
যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম বহুজাতিক খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান টেসকো এর প্রধান নির্বাহী কেন মারফি বলেন, সরবরাহকারীরা এখন পর্যন্ত কোনো ঝুঁকির কথা জানায়নি।
তিনি বলেন, "আমরা বেশ ভালো অবস্থানে আছি”।
তবে খাদ্যপণ্যের দামের কী হতে পারে সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, "আমরা জানি না পরিস্থিতি কেমন হবে, কারণ স্পষ্টতই এটি একটি অস্থির পরিস্থিতি এবং আগে থেকেই আমরা এই ব্যাপারে কিছু অনুমান করতে পারি না।"
খুচরা বিক্রেতা ও খাদ্য খাতের প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়াম জানিয়েছে যে, তারা সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণের আশা করছে। তারা আরও বলছে যে, সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় খুচরা বিক্রেতারা যথেষ্ট অভিজ্ঞ।
একই রকম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এই খাতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তবে তারা পণ্য ঘাটতির চেয়ে দাম বৃদ্ধি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।
ফুড অ্যান্ড ড্রিঙ্ক ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী কারেন বেটস আশ্বস্ত করে বলেন যে, ভোক্তাদের পণ্য সংকট নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। উৎপাদকরা যথাসম্ভব চেষ্টা করছেন যাতে বাড়তি দামের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে।
তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৬ সালের শেষে দাম বাড়ার একটা আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কারেন বেটস আরও বলেন, "যুক্তরাজ্যের খাদ্য ও পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট দক্ষ ও সক্ষম। কিন্তু বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে জ্বালানি, নৌ ও সড়কপথে পণ্য পরিবহন, প্যাকেজিং এবং বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়তে শুরু করেছে।"
ইউনিভার্সিটি অফ ইয়র্কের অধ্যাপক সারাহ ব্রিডল বলেন, "অবশ্যই জরুরি খাদ্য মজুত রাখা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো কারণেই হোক, একটি বড় ধরণের খাদ্যসংকট তৈরি হওয়ার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।"
অন্যদিকে, ফুড অ্যান্ড ড্রিংক ফেডারেশন পূর্বাভাস দিয়েছে যে ডিসেম্বরের মধ্যে খাদ্য পণ্যের মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশতে পৌঁছাতে পারে। এগ্রিকালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ কনফেডারেশন জানিয়েছে, সারের দাম বাড়লে তা আগামী শরতের চাষাবাদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা পরবর্তীকালে বড় খাদ্য সংকট তৈরি করতে পারে।
অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বৈশ্বিক প্রভাব
গ্যাসের যেকোনো ধরণের ঘাটতি পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (ব্রুয়ারি) জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ ১১ই জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তাদের এখন তুমুল ব্যস্ত সময় পার করার কথা।
তবে এই গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা শুধু খাদ্য বা পানীয় খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অস্ত্রোপচার, এমআরআই স্ক্যান এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র শীতল রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও দরকার গ্যাস।
গত মাসে ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়ন সতর্ক করেছে যে, শসা ও টমেটোর দাম আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে বাড়তে পারে এবং দুধ ও অন্যান্য ফসলের দাম তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে বৃদ্ধি পেতে পারে।
ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার গত মাসে এনসুস বায়োইথানল প্ল্যান্টটি সাময়িকভাবে পুনরায় চালু করেছে, যা সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে বন্ধ ছিল। এই প্ল্যান্টটি কার্বন ডাই অক্সাইড, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পশুখাদ্য উৎপাদন করে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করেছে যে, এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরান যুদ্ধ বন্ধে চলতি সপ্তাহে পুনরায় আলোচনা শুরু হতে পারে। গত সপ্তাহে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে।
(বিবিসি , দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইমস ও দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট অবলম্বনে)
বিষয়: