শান্তিচুক্তির আলোচনায় যেভাবে জড়িত হলো পাকিস্তান

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে হঠাৎ করেই শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভাব পাকিস্তানের। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন দুই পক্ষই ভরসা করলো ইসলামাবাদের ওপর? তবে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর লেবাননে চলমান হামলার মধ্যে-এই বৈঠক কি শান্তি আনবে, নাকি আরও বড় সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর শান্তিচুক্তির বৈঠকে বসতে সম্মত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছায়।

আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরানের ত্রিপক্ষীয় লড়াইয়ের মধ্যে হঠাৎ করেই শান্তির বার্তা নিয়ে রণাঙ্গনে পাকিস্তানের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। 

যুদ্ধে লিপ্ত উভয় পক্ষই কেন পাকিস্তানকে ‘ব্রোকার’ হিসেবে মেনে নিলো, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন বিশ্লেষকরা। 

আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তানে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে রয়েছেন, দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ, এবং ডনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। 

ইরানের প্রতিনিধি দলের মধ্যে আছেন দেশটির সংসদের স্পিকার মোহাম্মেদ বাঘের ঘালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। 

শান্তিচুক্তির বৈঠকের আগে আলাদাভাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সাথে দেখা করেছে দুই দেশের প্রতিনিধিদল। দুই দলকেই স্বাগত জানান পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার ও সামরিক বাহিনীর প্রধান আসিম মুনির।

ইসলামাবাদে ইরানের প্রতিনিধিদল

যেভাবে পাকিস্তান জড়িত হলো

শান্তিচুক্তির বৈঠক উপলক্ষে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শহরটির রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছে ১০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে সারাবিশ্বের জন্য এই যুদ্ধ থামাটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, যুদ্ধ চলতে থাকলে পাকিস্তানের জন্য ঝুঁকি আপেক্ষিক বেশি। কারণ, সৌদি আরবের সাথে ২০২৫ সালে পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (মিউচুয়াল ডিফেন্স ট্রিটি) সই করেছে। এর ফলে সৌদি আরবের সাথে ইরানের সংঘাতে সৌদি আরবের পক্ষে নামতে হতে পারে।

এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের সাথে পাকিস্তানের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা আছে। দেশটির ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লীগের সংসদ সদস্য মুশাহিদ হুসাইন সাইদ বিবিসিকে বলেছেন, ডনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান আসিম মুনিরকে “তার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল” বলে থাকেন। 

যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের কাছে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই তাকে “দু’টি বিজয়” উপহার দেন আসিম মুনির।

প্রথমটি হলো, ২০২১ সালে কাবুল বিমানবন্দরে বোমা হামলার মাস্টারমাইন্ডকে ধরিয়ে দেওয়া। এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৩জন সেনা সদস্য নিহত হয়।

দ্বিতীয়টি ছিলো, ট্রাম্পকে এই ধারণা দেওয়া যে, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ এড়াতে মুখ্য ভূমিকা ছিলো তার। 

পাকিস্তান ডনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা দেশগুলোরও একটি।

এছাড়া, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সই করা ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে খনিজ সম্পদ নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। 

ইরানের সাথেও পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো হওয়ার অনেক কারণ আছে। ধর্মীয় যোগসূত্রের পাশাপাশি নয় শতাধিক কিলোমিটারের সীমান্ত এবং আফগানিস্তান থেকে আমদানি হওয়া শরণার্থী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমস্যা দুই দেশেরই আছে। 

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং সৌদি আরবে ইরানের হামলা নিয়ে একইসঙ্গে নিন্দা জানিয়েছে পাকিস্তান। 
মুশাহিদ হুসাইন সাইদের মতে, পাকিস্তানের ভারসাম্যমূলক অবস্থানের কারণে ইরান ও অন্যান্য গালফ দেশের ভরসা ধরে রাখতে পেরেছে। 

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার দিন, দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ বলেছিলেন যে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে তার অত্যন্ত “উষ্ণ ও ফলপ্রসূ” আলোচনা হয়েছিল। 

শান্তিচুক্তির বৈঠক উপলক্ষে ইসলামাবাদে ১০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

দুই পক্ষ যা ভাবছে

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংসদীয় স্পিকার ইসলামাবাদে পৌঁছানোয় বৈঠক শুরু হতে যাচ্ছে। আর এটা হচ্ছে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। 
জে ডি ভ্যান্স ইরানের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে বলেন, “ইরানিরা যদি সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনায় আসতে আগ্রহী হয়, তাহলে আমরাও হাত বাড়াতে আগ্রহী।” 

তবে ইরানের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে বিশ্বাসের ঘাটতি। ইরানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা রেজা আমিরি মোঘাদাম তার এক্স অ্যাকাউন্টের এক পোস্টে লেখেন, ইসলামাবাদের আলোচনাগুলোর উদ্দেশ্য “ইরানের বিরুদ্ধে একটি বেআইনি যুদ্ধ শেষ করতে সাহায্য করা।”

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্র আমাদের আমন্ত্রণকারী দেশের সমঝোতার প্রচেষ্টাকে সম্মান জানাবে কিনা তা এখনও দেখা বাকি।”

ইরানের এক সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি আল জাজিরাকে জানান, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বৈঠকে গেলেও তার “আঙ্গুল ট্রিগারে থাকবে।” 

ইরান সার্বভৌম অধিকার সমর্পণ করবে না- এমনটা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা আলোচনায় বিশ্বাস করি এবং আমরা যৌক্তিক। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করি না এবং ইরানের প্রতিনিধিদল সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে আলোচনায় অংশ নেবে।” 

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে এই বৈঠক থেকে শান্তি আসবে কিনা, তা নিয়ে সন্দীহান অনেকে। কেননা, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও লেবাননের ওপর লাগাতার বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

বুধবার ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৫৭ জন। শনিবারও ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের তিনটি শহরে ১০জন নিহত হয়েছে।

এদিকে সৌদির সাথে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে ইতিমধ্যেই দেশটিতে যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে পাকিস্তান। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিমান হস্তান্তরের উদ্দেশ্য হলো- দুই দেশের মধ্যে “সামরিক সমন্বয় বাড়ানো”।

তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য আসেনি। 

ইসলামাবাদের বৈঠকের আগে ইরান ও আমেরিকা- দুই পক্ষই ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে গেছে। পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাবও দৃশ্যমান। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনা কাজে না দিলে তিনি যুদ্ধজাহাজ পুনরায় পাঠাবেন এবং এর সমাধান সামরিকভাবেই করবেন। 

ইরানের শর্তগুলোর একটি হলো লেবাননে হামলা থামানো, যা যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েল চালিয়ে গেছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জেডি ভ্যান্সের উপস্থিতি ইতিবাচক। কেননা তাকে বিদেশি সংঘাতের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ হিসেবে দেখা হয় এবং এবার ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি তাতে বিশেষভাবে জড়িত ছিলেন না। 

তবে কি ইসলামাবাদ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংঘাতের অবসানের ক্ষেত্র হবে, নাকি দুই পক্ষের অবিশ্বাসই টিকে থাকবে শেষ পর্যন্ত? 

শান্তি না এসে সামরিক সংঘাত বাড়লে কি পাকিস্তানকে যুক্তি রক্ষার্থে যুক্ত হতে হবে সৌদি আরবের পক্ষে?