ইরানের নিরাপত্তা পর্ষদ প্রধানের মৃত্যু, কী প্রভাব ফেলবে যুদ্ধে?

এই হত্যাকাণ্ড কি শুধু একটি টার্গেটেড স্ট্রাইক, নাকি এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরও বড় যুদ্ধের সূচনা? আর ইরান কি পারবে লারিজানির শূন্যতা কাটিয়ে তাদের সমন্বয় ধরে রাখতে?

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম

সেদিন তিনি কোনো সামরিক বৈঠকে ছিলেন না। ছিলেন না কোনো বাংকারেও। একজন বাবা বাড়িতে গিয়েছিলেন মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে।

ইরানের রাজধানী তেহরানের পারদিস এলাকার সেই বাড়িটিই ছিল এয়ারস্ট্রাইকের নির্ভুল টার্গেট।

প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানিই ছিলেন হামলার লক্ষ্য।

মঙ্গলবার তার মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করে ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা ফারস ও লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।

এ সময় ইরানের এই লারিজানির সঙ্গেই ছিলেন ছেলে মোরতেজা লারিজানি ও সহকারি আলি রেজা বায়াত। হামলায় মৃত্যু হয়েছে তাদেরও।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সংবাদ বলছে, আলি লারিজানির মতো শীর্ষ নেতার মৃত্যুর হলেও, এখনই ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে পড়ার শঙ্কা কম। কারণ ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, প্রক্সি নেটওয়ার্ক বা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে চাপ তৈরির সক্ষমতা এখনও আছে ইরানের।

তবে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে এই শক্তিগুলো এখন কতটা সমন্বিতভাবে ব্যবহার করতে পারবে ইরান।

ইরানের রাজধানী তেহরানের পারদিস এলাকায় নিহত হন লারিজানি

কে এই লারিজানি?

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের সচিব এবং শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সমন্বয়কারীদের একজন ছিলেন লারিজানি। যার প্রধান দায়িত্বই ছিল ইরানের বিভিন্ন শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা।

খামেইনির মৃত্যুর পর লারিজানি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। ইরানের সুপ্রিম লিডারের মৃত্যুর পর প্রতিশোধের কঠোর হুংকার দিয়েছিলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লারিজানি লিখেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী (ইসরায়েল) ইরানি জাতির হৃদয়ে আগুনে জ্বালিয়েছে। আমরা তাদের হৃদয় পুড়িয়ে দেব।”

ইরানের রাজনীতিতে লারিজানির আবির্ভাব বিস্ময়কর কোনো ঘটনা ছিল না। তার পরিবারকে ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন অভিহিত করেছিল ‘ইরানের কেনেডি পরিবার’ হিসেবে।

ইরাকের নাজাফে ১৯৫৮ সালের ৩ জুন জন্ম নেওয়া লারিজানি, বাইশ বছর বয়সে তার কর্মজীবন শুরু করেন দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি’তে যোগ দিয়ে।

এর আগে ২০ বছরে বয়সে তিনি বিয়ে করেন ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনির অন্যতম ঘনিষ্ঠ মোরতেজা মোতাহারির মেয়ে ফারিদেহ মোতাহারিকে।

তারপর সরকারি পদে স্থানান্তরিত হন। এরপর মন্ত্রী হয়েছেন। টানা ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির প্রধান হিসেবে।

ইরানের পার্লামেন্টের (মজলিস) স্পিকার হিসেবে টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত।

এই দায়িত্বের আগে লারিজানি ২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একজন রক্ষণশীল প্রার্থী হিসাবে অংশ নিলেও ব্যর্থ হন দ্বিতীয় ধাপে উঠতে।

এরপর ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করলেও তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

তবে ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান লারিজানিকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর থেকেই এই পদে আসীন ছিলেন তিনি।

এ সময় লারিজানি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ’র সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করেছেন। তিনি ঘোষণা দেন, সংস্থাটির প্রতিবেদনগুলো ‘আর কার্যকর নয়’।

তার নেতৃত্বগুণে অনেকটাই গুছিয়ে উঠেছিল ইরান।

তার মৃত্যুর পর কী?

লারিজানির নিহত হওয়া শুধু আরেকটি টার্গেট কিলিং নয়, এটি ইরানের সমন্বয় ক্ষমতার ওপর বড় ধাক্কা বলে অভিহিত করেছে ইরান ইন্টারন্যাশনাল।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও আইন বিশ্লেষক শাহরাম খোলদি তার কলামে লারিজানির মৃত্যুকে তুলনা করেছেন ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার ও দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী সামরিক নেতা কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুর সঙ্গে।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোন হামলায় কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুর পর ইরানের কৌশলগত ভারসাম্যও ভেঙে পড়েছিল। সেটি ২০২০ সালের ঘটনা। আর সেই অবস্থা সামাল দিয়ে গুছিয়ে এনেছিলেন লারিজানি।

সেই একই আশঙ্কা এখন লারিজানির মৃত্যুর পর। কারণ তিনিও ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি ইরানের সামরিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখতেন।

লারিজানি মূলত ইরানের ভেতর-বাহির দুটোই সামলাতেন।

ইরান ইন্টারন্যাশনাল বলছে, তার ভূমিকা ছিল দ্বিমুখী। ভেতরে নিজেদের মনোবল ধরে রাখা ও শৃঙ্খলা জোরদার করা। আর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া। একই সঙ্গে আইআরজিসির সামরিক কার্যক্রমেও তার প্রভাব ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সমন্বয়ের ভাঙন। কারণ দেশটি এখন অনেকটাই বিচ্ছিন্ন কাঠামোতে কাজ করছে। যেখানে প্রাদেশিক নেটওয়ার্ক, আইআরজিসি কমান্ডার এবং আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া বাহিনী বাজিস কাজ করছে আলাদা আলাদাভাবে।

লারিজানি ছিলেন সেই অল্প কয়েকজনের একজন, যিনি এই বিচ্ছিন্ন অংশগুলোকে কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত রাখতে পারতেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লারিজানি কোনো সামরিক কমান্ডার ছিলেন না, কিন্তু ইরানের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নির্ধারণে তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যক্তি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত্যুকালে লারিজানি তিনটি প্রধান সংকট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন। প্রথমটি ছিল চলমান যুদ্ধ। দ্বিতীয়, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আর তৃতীয়টি ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।

এখন প্রশ্ন, ইরান কি পারবে লারিজানির শূন্যতা কাটিয়ে তাদের সমন্বয় ধরে রাখতে?

লারিজানি ও তার সঙ্গীদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা ইরানের

অব্যাহত প্রতিশোধের যুদ্ধ?

বিসিব ‘র খবর অনুযায়ী আলী লারিজানি নিহত হওয়ার ঘটনায় ‘চূড়ান্ত ও অনুশোচনাযোগ্য’ প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি।

এক বিবৃতিতে আমির হাতামি বলেন, “সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদ) সেক্রেটারিকে হত্যার ঘটনায় ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে চূড়ান্ত ও অনুশোচনাযোগ্য।”

অন্যদিকে বুধবার আইআরজিসি বিবৃতিতে বলেছে, শহীদ আলি লারিজানি ও তার সঙ্গীদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে মধ্য ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তারা।

সব মিলিয়ে তাই প্রশ্নটা রয়েই গেছে, এই হত্যাকাণ্ড কি শুধু একটি টার্গেটেড স্ট্রাইক, নাকি এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরও বড় যুদ্ধের সূচনা? অব্যাহত থাকবে প্রতিশোধের যুদ্ধ?

ইরান কি পারবে তাদের সমন্বয় ধরে রাখতে? নাকি ইরান এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্র টিকে থাকবে তবে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে আর কাজ করতে পারবে না?

লারিজানির মৃত্যু ইরানকে সেই কঠিন পরীক্ষাকেই সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

প্রসঙ্গত, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার টার্গেট করা হয়েছে। রবিবার এই হুমকি দিয়েছিল ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি।

বিপরীতে নেতানিয়াহুর ঘোষণা ছিল ইরানের শীর্ষ নেতাদের খুঁজে খুঁজে হত্যার। এর মধ্যেই মঙ্গলবার ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র এয়ার স্ট্রাইকে মৃত্যু হলো ইরানের অন্যতম শীর্ষ নেতা আলি লারিজানির।