আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে তিন সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাত এখন এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে।
সোমবার কাবুলের একটি হাসপাতালে পাকিস্তান বিমান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে আফগানিস্তান। তালেবান কর্তৃপক্ষের দাবি, এই হামলায় অন্তত ৪০০ জন নিহত এবং ২৫০ জন আহত হয়েছেন।
তবে হাসপাতালে হামলার কথা অস্বীকার করেছে পাকিস্তান। তারা বলছে, তাদের অভিযান ছিল অত্যন্ত ‘সুনির্দিষ্ট’ এবং লক্ষ্যবস্তু ছিল ‘কেবল সামরিক স্থাপনা।’
আফগান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত এক্স-এ পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন, সোমবার রাতে রাজধানী কাবুলের ২,০০০ শয্যাবিশিষ্ট ওই হাসপাতালটি হামলা চালালে ভবনটির একটি বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মী ওমিদ স্তানিকজাই বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, আকাশে যুদ্ধবিমান টহল দিচ্ছিল। আফগান সামরিক ইউনিটগুলো বিমান লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে বিমান থেকে বোমা ফেলা হয়। তিনি জানান, হতাহতদের সবাই সাধারণ নাগরিক ও চিকিৎসাধীন রোগী।
ইসলামাবাদের দাবি কোন হাসপাতালে নয়, বরং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং আফগান সামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়েছে।
দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এসব স্থাপনা থেকে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছিল। বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক’ বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
কেন এই সংঘাত?
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে এই সংঘাতের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে চরম মতভেদ। আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবান সরকার আসে ২০২১ সালে।
তারপর থেকেই আফগানিস্তানের মাটিতে টিটিপিসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে পাকিস্তান। যাকে ‘টিকিং টাইম বম্ব’ হিসেবে বলছে ইসলামাবাদ।
তবে এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে আসছে কাবুল।
গেল ফেব্রুয়ারির শেষে এই উত্তেজনা সরাসরি যুদ্ধে রূপ নেয়। আফগান ভূখণ্ডের ভেতরে বিমান হামলা শুরু পাকিস্তান। আর এই হামলাকে ‘সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ’ হিসেবে ঘোষণা করে পাল্টা আক্রমণ চালায় তালেবান প্রশাসন।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনায় সারা পৃথিবীর মনোযোগ যখন সেখানে, তখন এই দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশ এক অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, এই যুদ্ধ কেবল দুই দেশের সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
আফগানিস্তানকে তাদের মাটি থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধের কঠোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য আফগানিস্তানে জাতিসংঘের রাজনৈতিক মিশনের মেয়াদ তিন মাস বাড়ানো হয়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান এএফপিকে বলেন, “এই সংকট থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।”
তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে কাতার বা উপসাগরীয় দেশগুলো এখন মধ্যস্থতায় মনোযোগ দিতে পারছে না।
কুগেলম্যানের ধারণা, তালেবান এখন সরাসরি যুদ্ধের বদলে পাকিস্তানের ভেতরে চোরাগোপ্তা হামলা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই যুদ্ধের ফলে ইতোমধ্যে ১ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। এরই মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি পরিবারকে জরুরি খাদ্য সহায়তা দেওয়ার কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি।
যুদ্ধের ফলে আফগানিস্তানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত বন্ধ থাকায় দেশটিতে খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক অচলাবস্থা
চীন গত এক সপ্তাহ ধরে বিশেষ দূতের মাধ্যমে মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তান তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে আফগানিস্তানের ভেতরে হামলা অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে তালেবান সরকার তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পিছু হটতে নারাজ।
আফগান উপ-প্রধানমন্ত্রী আব্দুল সালাম হানাফি পরিষ্কার করে বলেছেন, “এই যুদ্ধ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো আপস করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেছেন, “পাকিস্তান তার সীমানা রক্ষা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে বদ্ধপরিকর।"
এই পারস্পরিক অনড় অবস্থান অঞ্চলটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই ঘোলাটে পরিস্থিতিতে চীন বা রাশিয়ার মত শক্তিশালী কোন মধ্যস্থতাকারী যদি এগিয়ে না আসে, তবে এই সংঘাত কেবল কাবুল বা ইসলামাবাদে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পুরো দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
[সিএনএন, আল-জাজিরা, নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে]



