খার্গ কেন ইরানের লাইফলাইন, হামলার পর কী হতে পারে

খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলার পর ইরানের তেল রপ্তানি ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপ দিয়েই রপ্তানি হয়।

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে পারস্য উপসাগরের ছোট্ট একটি দ্বীপ খার্গ। আয়তনে ছোট হলেও ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় পুরো ব্যবস্থাই নির্ভর করে এই দ্বীপের ওপর। তাই একে বলা হয় ‘লাইফলাইন’।  দীর্ঘদিন সরাসরি হামলার বাইরে থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে মার্কিন বোমা হামলা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে যে ইরানের এই তেল লাইফলাইনে আঘাত লাগলে যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার কোন দিকে যাবে?

যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালালেও খার্গ দ্বীপকে সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়েছিল। কারণ বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বীপে সরাসরি আঘাত মানে ইরানের অর্থনৈতিক শিরায় আঘাত করা, যা সংঘাতকে আরও বড় আকার দিতে পারে।

আয়তনে ছোট হলেও খার্গ দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে এ স্থানে কোনো হামলা হলে তা বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

তবে শেষ পর্যন্ত সেই দ্বীপেও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড  ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী খার্গ দ্বীপে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী বোমা হামলা’ চালিয়েছে। তার দাবি, ওই হামলায় দ্বীপটির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখে, তাহলে তেল স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে।

ইরানের তেল রপ্তানি কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে

খার্গ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রবালগঠিত এই দ্বীপটির আয়তন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ইরানের প্রধান তেলক্ষেত্র—আহভাজ, মারুন এবং গাচসারান থেকে প্রতিদিন পাইপলাইনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপে পৌঁছায়।

কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণের কারণে ইরানিদের কাছে দ্বীপটি “নিষিদ্ধ দ্বীপ” নামেও পরিচিত।

খার্গ দ্বীপে তেল পরিশোধন হয় সবচেয়ে বেশি

দ্বীপটির দীর্ঘ জেটিগুলো গভীর পানিতে বিস্তৃত, যেখানে সহজেই বিশাল তেলবাহী সুপারট্যাংকার নোঙর করতে পারে। এ কারণেই এটি ইরানের তেল বিতরণ ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি করা হয়।

খার্গ দ্বীপ দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৪ সালের একটি সিআইএ নথিতে বলা হয়েছিল, এই স্থাপনাগুলো “ইরানের তেল ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এবং এগুলোর কার্যক্রম চালু থাকা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।”

ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ সম্প্রতি বলেছেন, এই তেল টার্মিনাল ধ্বংস করা হলে তা “ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে এবং শাসনব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করতে পারে।”

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরান বিশ্বব্যাপী তেলের মোট সরবরাহের প্রায় সাড়ে চার শতাংশ জোগান দেয়। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং অতিরিক্ত ১৩ লাখ ব্যারেল কনডেনসেট ও অন্যান্য তরল জ্বালানি উৎপাদন করে।

কী হয়েছে খার্গে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার ঘোষণা দেন যে, সামরিক বাহিনী খার্গ দ্বীপে “মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী বোমা হামলা” চালিয়েছে। তার দাবি, ওই হামলায় দ্বীপটির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।

ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। তাদের ভৌগোলিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভিডিওটিতে খার্গ দ্বীপের বিমানবন্দর ও রানওয়ের ওপর মার্কিন হামলার দৃশ্য দেখা যায়।

হামলাটি “বৃহৎ পরিসরের”, ছিল দাবি করে একজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, দ্বীপটির তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।
লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ছিল নৌবাহিনীর মাইন সংরক্ষণাগার, ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ বাঙ্কার এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামো।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, দ্বীপটিতে ১৫টিরও বেশি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে এসব হামলায় তেল সংক্রান্ত কোনো স্থাপনার ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করেছে ইরানও।

ট্রাম্প অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখে, তাহলে খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

যুদ্ধেও চলেছে রপ্তানি

যুদ্ধের মধ্যেও খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগের সপ্তাহে দ্বীপটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানির রেকর্ড গড়েছিল ইরান।

সংঘাত শুরু হওয়ার পরও দ্বীপের কার্যক্রম চালু রয়েছে বলে জানা গেছে।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকম এবং জ্বালানি বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলার–এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত খার্গ দ্বীপ থেকে প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে।

এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১১ লাখ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল তেল দ্বীপটি থেকে রপ্তানি হয়েছে বলে ওই তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের মধ্যেও রপ্তানি অব্যাহত রাখা ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তেল বিক্রিই দেশটির অর্থনীতির প্রধান আয়ের উৎস।

খার্গে হামলা হলে কী হবে?

বিশ্লেষকদের মতে, খার্গ দ্বীপে হামলার ঘটনা যুদ্ধের গতিপথ এবং বৈশ্বিক তেলের বাজার-উভয়ের ওপরই বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরান আগেই সতর্ক করে দিয়েছে, তাদের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর যেকোনো হামলার জবাবে তারা এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ তেল কোম্পানিগুলোর স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ইরানের সামরিক কমান্ড সদর দপ্তরের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।

একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা যুদ্ধের ঝুঁকি ও গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

খার্গ আইল্যান্ড

মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মার্ক কিমিটের ভাষ্য, আগে লক্ষ্য ছিল শুধু সামরিক শক্তি বা শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা, কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যেখানে দেশের “অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি”কেও আঘাত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

কিমিট আরও বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যেন খার্গ দ্বীপকে এক ধরনের “জিম্মি” করে রেখেছে। কারণ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পরই অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে।

তার মতে, যদি খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামো সরাসরি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়, তাহলে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাবে। আর এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

জ্বালানি বিশ্লেষকেরাও সতর্ক করছেন, খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলো ধ্বংস হলে ইরানের জন্য তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।  

কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মুইউ শু সিএনএনকে বলেন, এমন হামলার পর ইরানের পুনরুদ্ধারে কয়েক মাস, এমনকি এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।

আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীন। কারণ তারাই ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।

মুইউ শু বলেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান পর্যাপ্ত অর্থ, প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা সহজে সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলে খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা হওয়ায় চীন এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে খার্গ দ্বীপে বড় ধরনের ক্ষতি হলে তা শুধু ইরান নয়, পুরো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেই নতুন অস্থিরতা তৈরি করবে।

পরিণাম কী হতে পারে?

পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামনে সংঘাত আরও তীব্র আকার নিতে পারে। ইরান ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে তাদের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা হলে তারা পুরো অঞ্চলের তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানতে পারে।বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ওমান ও বাহরাইনের তেল সংরক্ষণাগারগুলোতে হামলা চালিয়েছে এবং পারস্য উপসাগরে তেলবাহী ট্যাংকার ও কার্গো জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে।

এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে আঘাত করা হয়, তাহলে তারা পুরো অঞ্চলের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো “আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার” মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।

খার্গ দ্বীপে হামলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে যে তারা প্রায় ২,৫০০ মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। মার্ক কিমিট এমন সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন যে এই বাহিনী খার্গ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে।

তবে এই মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট  ঠিক কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে বা মধ্যপ্রাচ্যের কোন এলাকায় মোতায়েন করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সাধারণত এসব ইউনিট বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান, জরুরি সরিয়ে নেওয়া এবং সমুদ্র থেকে স্থলে অভিযান পরিচালনার মতো কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খার্গ দ্বীপ দখল বা সেখানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে হলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থলসেনা প্রয়োজন হবে। তবে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন সেই মাত্রার স্থলসেনা পাঠানোর ব্যাপারে অনিচ্ছুক বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ফলে খার্গ দ্বীপকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত সামনে আরও জটিল ও বিস্তৃত রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা

(সিএনএন ও স্কাইনিউজ অবলম্বনে)