কেন্টের পদত্যাগ ও ট্রাম্পের নীতি, গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক
একজন যুদ্ধফেরত সেনা ও ট্রাম্পপন্থি হিসেবে পরিচিত কেন্টের এই অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তার পদত্যাগ ইরান ইস্যুতে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মিত্রদেশের প্রভাব এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব, সবকিছুকেই একসাথে সামনে নিয়ে এসেছে।
আলাপ ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএমআপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম
জো কেন্ট
ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ এক কর্মকর্তার পদত্যাগ ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই মতপার্থক্যকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে এই পদত্যাগ।
যুদ্ধের যৌক্তিকতা, গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ—এই তিন প্রশ্নকে সামনে এনে ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের প্রধান জো কেন্টের পদত্যাগ শুধু প্রশাসনিক ঘটনা নয় বরং ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি নিয়েই নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান ও যুদ্ধ নিয়ে সরাসরি আপত্তি জানিয়ে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।
তার পদত্যাগপত্রে উঠে এসেছে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান, ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল বাস্তবতা।
একজন যুদ্ধফেরত সেনা ও ট্রাম্পপন্থি হিসেবে পরিচিত কেন্টের এই অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে লেখা চিঠিতে জো কেন্ট বলেন, ‘আমার বিবেক ইরানে চলমান যুদ্ধকে সমর্থন করতে সাড়া দেয় না।’
চিঠিটি এক্স–এ পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে কেন্ট লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান কোনো আসন্ন হুমকি তৈরি করেনি। এটি স্পষ্ট যে আমরা ইসরায়েল ও তাদের প্রভাবশালী আমেরিকান লবির চাপে এই যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছি।” যুদ্ধ শুরুর পর এটাই ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বড় কর্মকর্তার পদত্যাগ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টার মূলত সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় ও বিশ্লেষণ করে থাকে।
কে এই জো কেন্ট
ডানপন্থি রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে সংযোগের কারণে এর আগেও সমলোচনার মুখে পড়েছিলেন ৪৫ বছর বয়সী কেন্ট।
তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সাবেক সদস্য। ১১টি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ইরাক যুদ্ধেও ছিলেন তিনি।
তার প্রথম স্ত্রী শ্যানন কেন্ট, মার্কিন নৌবাহিনীর ক্রিপ্টোলজিক টেকনিশিয়ান ছিলেন, ২০১৯ সালে সিরিয়ায় একটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন। তার মৃত্যুতে দুই সন্তান রেখে যান তিনি।
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর কেন্ট গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র প্যারামিলিটারি অফিসার হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন। তিনি দুইবার রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচনে অংশ নেন। তবে ২০২২ ও ২০২৪—দুইবারই তিনি মধ্যপন্থি ডেমোক্র্যাট মেরি গ্লুসেনক্যাম্প পেরেজের কাছে হেরে যান।
এই দুই নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্প কেন্টকে সমর্থন দিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি উগ্র ডানপন্থি সংগঠন ‘প্রাউড বয়েজ’-এর এক সদস্যকে পরামর্শ ফি দিয়েছেন।
কত দিন দায়িত্বে ছিলেন কেন্ট
ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের প্রধান হিসেবে আট মাসেরও কম সময় দায়িত্বে ছিলেন কেন্ট। কেন্টের ঊর্ধ্বতন ছিলেন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড। জুলাই মাসে সিনেট ৫২–৪৪ ভোটে তাকে অনুমোদন দেয়, শুধু রিপাবলিকানরাই তাকে সমর্থন দিয়েছিল।
অনুমোদনের পর তাকে অভিনন্দন জানানোর প্রথমদিকের ব্যক্তিদের একজন ছিলেন গ্যাবার্ড। তিনি কেন্টকে “দেশপ্রেমিক” বলে বর্ণনা করেন এবং একজন যুদ্ধফেরত সেনা হিসেবে তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
তিনি লিখেছিলেন, “বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক কিছু যুদ্ধক্ষেত্রে সামনের সারিতে থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে ইসলামপন্থি সন্ত্রাসবাদের স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল হুমকি সম্পর্কে গভীর ও বাস্তব জ্ঞান দিয়েছে।”
গ্যাবার্ড, কেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ট্রাম্প প্রশাসনের এমন একটি অংশ হিসেবে দেখা হতো, যারা বিদেশে অ্যামেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপ নিয় সংশয় প্রকাশ করতেন।
এই সংশয় ট্রাম্পেরও অজানা ছিল না। তিনি নিজেই বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন।
গত সপ্তাহেও ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানে হামলার বিষয়ে ভ্যান্স “হয়তো কিছুটা কম উৎসাহী” ছিলেন। তবে তিনি যোগ করেন, “এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে খুব ভালো বোঝাপড়া আছে।”
অন্যদিকে, তুলসি গ্যাবার্ড অবশ্য কেন্টের পদত্যাগ ইস্যু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। মঙ্গলবার দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্পের অবস্থানের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা জোর দিয়ে উল্লেখ করেন।
তিনি লেখেন, “ডনাল্ড ট্রাম্পকে বিপুল জনসমর্থনে আমাদের প্রেসিডেন্ট এবং কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।”
তবে সেখানে তিনি কেন্টের নাম উল্লেখ করেননি।
তিনি আরও লেখেন, “কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে কোনটি তাৎক্ষণিক হুমকি আর কোনটি নয়, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তারই।”
কেন পদত্যাগ করলেন কেন্ট
সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক সদস্য হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কেন্ট। পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প তার আগের তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারে যে পররাষ্ট্রনীতি তুলে ধরেছিলেন, তিনি সেটিকে সমর্থন করতেন।
ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন কেন্ট।
কেন্ট লেখেন, “২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত আপনি বুঝতেন যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো একটি ফাঁদ, যা আমাদের দেশপ্রেমিকদের মূল্যবান জীবন কেড়ে নেয় এবং আমাদের দেশের সম্পদ ও সমৃদ্ধি ক্ষয় করে।”
কেন্টের দাবি, ইরানকে ঘিরে হুমকির বিষয়ে ট্রাম্পকে ভুল পথে পরিচালিত করা হয়েছে। তিনি এ জন্য গণমাধ্যম, ইসরায়েলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও লবিস্টদের দায়ী করেন, যারা ট্রাম্পকে তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি থেকে সরে আসতে প্রভাবিত করেছেন।
কেন্ট বলেন, “পরিবেশ তৈরি করে আপনাকে বিশ্বাস করানো হয়েছে যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি এবং এখন হামলা করলে দ্রুত বিজয়ের পথ রয়েছে।” তিনি এটিকে মিথ্যা বলে দাবি করে বলেন, ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াতে ইসরায়েল একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছিল, যার ফলে হাজারো মার্কিন সেনা প্রাণ হারায়। কেন্ট আরও বলেন, “আমরা আবার সেই ভুল করতে পারি না।”
নিজের বক্তব্যে তিনি সিরিয়ায় মার্কিন অভিযানে নিহত স্ত্রী শ্যাননের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এই ধরনের যুদ্ধের মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার উদাহরণ আমার স্ত্রী শ্যাননের মৃত্যু”
ট্রাম্পের ইরান নীতিতে প্রভাব
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যাপক পল কুইর্ক বলেন, কেন্টের পদত্যাগ দেখিয়ে দেয় যে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় সরকারের সামরিক, গোয়েন্দা ও পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।
তবে কুইর্ক মনে করেন, একমাত্র কেন্টের পদত্যাগ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে, এমনটা বলা যায় না।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “সাধারণত উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার পদত্যাগ এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য বিরোধিতা প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। এতে কংগ্রেসে একই দলের সদস্যরাও প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।”
কিন্তু এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ব্যাপক সমালোচনা চলছে। কুইর্কের ভাষায়, “কেন্টের বক্তব্য মূলত সেই সমালোচনার সঙ্গেই নতুন করে যুক্ত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ইরানে হামলার পেছনে ট্রাম্পের যুক্তি ছিল দুর্বল এবং পরিকল্পনাহীনভাবে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, কেন্টের পদত্যাগ হয়তো তাৎক্ষণিক বড় প্রভাব ফেলবে না, এটি সামগ্রিক বিরোধিতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। “এটি এমন হতে পারে—শেষ পর্যন্ত একটি ছোট ঘটনা বড় প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়, অর্থাৎ ‘শেষ খড়কুটো’ হয়ে দাঁড়াতে পারে,” বলেন কুইর্ক। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় প্রভাব পড়বে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্টের পদত্যাগ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তন না আনলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের (মিডটার্ম) আর আট মাসেরও কম সময় বাকি। ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ বাড়লে তা নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আল জাজিরার প্রতিবেদক মাইক হান্না বলেন, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ সমর্থকদের মধ্যেও কেন্টের একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে।
ফলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কেন্টের সমালোচনা তার সমর্থকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়াতে পারে।
হান্না বলেন, “ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে কেন্টের সমালোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি সাধারণ কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন।” কেন্টকে একজন অভিজ্ঞ সেনা আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, তিনি স্পেশাল ফোর্সে একাধিক মিশনে অংশ নিয়েছেন এবং সবসময়ই ট্রাম্প ও মাগা আন্দোলনের জোরালো সমর্থক ছিলেন।
এমন একজন ব্যক্তি যখন ইসরায়েলের প্রভাবে ট্রাম্প ভুল তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ করেন, তা অত্যন্ত গুরুতর এবং ডানপন্থি সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কমাতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
পদত্যাগের প্রতিক্রিয়া কী
কেন্টের পদত্যাগপত্র রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। কেউ এটিকে নীতিগত অবস্থান হিসেবে সমর্থন করেছেন, আবার কেউ তাকে ভুল তথ্যভিত্তিক ও প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুগত নন বলে সমালোচনা করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বলেছেন, “আমি সবসময় ভেবেছি সে ভালো মানুষ, কিন্তু নিরাপত্তা বিষয়ে দুর্বল।”
তিনি আরও বলেন, “সে বলেছে ইরান কোনো হুমকি নয়, তাই তার চলে যাওয়া ভালো হয়েছে।”
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লিভিট কেন্টের বক্তব্যকে “অপমানজনক ও হাস্যকর” বলে উড়িয়ে দেন।
কংগ্রেসেও সমালোচনা হয়। হাউস স্পিকার মাইক জনসন বলেন, ইরান কোনো হুমকি নয় কেন্টের এই মূল্যায়ন “স্পষ্টতই ভুল”।
একই মত দেন সিনেটর টম কটন। তিনি বলেন, “কেন্ট ও তার পরিবার দেশের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তবে তার এই মূল্যায়নের সঙ্গে আমি একমত নই।” তবে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসন কেন্টের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “জো সবচেয়ে সাহসী মানুষদের একজন। তাকে সহজে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।”
কেন্টের পদত্যাগ ও ট্রাম্পের নীতি, গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক
একজন যুদ্ধফেরত সেনা ও ট্রাম্পপন্থি হিসেবে পরিচিত কেন্টের এই অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তার পদত্যাগ ইরান ইস্যুতে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মিত্রদেশের প্রভাব এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব, সবকিছুকেই একসাথে সামনে নিয়ে এসেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ এক কর্মকর্তার পদত্যাগ ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই মতপার্থক্যকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে এই পদত্যাগ।
যুদ্ধের যৌক্তিকতা, গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ—এই তিন প্রশ্নকে সামনে এনে ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের প্রধান জো কেন্টের পদত্যাগ শুধু প্রশাসনিক ঘটনা নয় বরং ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি নিয়েই নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান ও যুদ্ধ নিয়ে সরাসরি আপত্তি জানিয়ে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।
তার পদত্যাগপত্রে উঠে এসেছে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান, ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল বাস্তবতা।
একজন যুদ্ধফেরত সেনা ও ট্রাম্পপন্থি হিসেবে পরিচিত কেন্টের এই অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে লেখা চিঠিতে জো কেন্ট বলেন, ‘আমার বিবেক ইরানে চলমান যুদ্ধকে সমর্থন করতে সাড়া দেয় না।’
চিঠিটি এক্স–এ পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে কেন্ট লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান কোনো আসন্ন হুমকি তৈরি করেনি। এটি স্পষ্ট যে আমরা ইসরায়েল ও তাদের প্রভাবশালী আমেরিকান লবির চাপে এই যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছি।”
যুদ্ধ শুরুর পর এটাই ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বড় কর্মকর্তার পদত্যাগ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টার মূলত সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় ও বিশ্লেষণ করে থাকে।
কে এই জো কেন্ট
ডানপন্থি রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে সংযোগের কারণে এর আগেও সমলোচনার মুখে পড়েছিলেন ৪৫ বছর বয়সী কেন্ট।
তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সাবেক সদস্য। ১১টি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ইরাক যুদ্ধেও ছিলেন তিনি।
তার প্রথম স্ত্রী শ্যানন কেন্ট, মার্কিন নৌবাহিনীর ক্রিপ্টোলজিক টেকনিশিয়ান ছিলেন, ২০১৯ সালে সিরিয়ায় একটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন। তার মৃত্যুতে দুই সন্তান রেখে যান তিনি।
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর কেন্ট গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র প্যারামিলিটারি অফিসার হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন।
তিনি দুইবার রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচনে অংশ নেন। তবে ২০২২ ও ২০২৪—দুইবারই তিনি মধ্যপন্থি ডেমোক্র্যাট মেরি গ্লুসেনক্যাম্প পেরেজের কাছে হেরে যান।
এই দুই নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্প কেন্টকে সমর্থন দিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি উগ্র ডানপন্থি সংগঠন ‘প্রাউড বয়েজ’-এর এক সদস্যকে পরামর্শ ফি দিয়েছেন।
কত দিন দায়িত্বে ছিলেন কেন্ট
ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের প্রধান হিসেবে আট মাসেরও কম সময় দায়িত্বে ছিলেন কেন্ট। কেন্টের ঊর্ধ্বতন ছিলেন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড।
জুলাই মাসে সিনেট ৫২–৪৪ ভোটে তাকে অনুমোদন দেয়, শুধু রিপাবলিকানরাই তাকে সমর্থন দিয়েছিল।
অনুমোদনের পর তাকে অভিনন্দন জানানোর প্রথমদিকের ব্যক্তিদের একজন ছিলেন গ্যাবার্ড। তিনি কেন্টকে “দেশপ্রেমিক” বলে বর্ণনা করেন এবং একজন যুদ্ধফেরত সেনা হিসেবে তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
তিনি লিখেছিলেন, “বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক কিছু যুদ্ধক্ষেত্রে সামনের সারিতে থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে ইসলামপন্থি সন্ত্রাসবাদের স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল হুমকি সম্পর্কে গভীর ও বাস্তব জ্ঞান দিয়েছে।”
গ্যাবার্ড, কেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ট্রাম্প প্রশাসনের এমন একটি অংশ হিসেবে দেখা হতো, যারা বিদেশে অ্যামেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপ নিয় সংশয় প্রকাশ করতেন।
এই সংশয় ট্রাম্পেরও অজানা ছিল না। তিনি নিজেই বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন।
গত সপ্তাহেও ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানে হামলার বিষয়ে ভ্যান্স “হয়তো কিছুটা কম উৎসাহী” ছিলেন। তবে তিনি যোগ করেন, “এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে খুব ভালো বোঝাপড়া আছে।”
অন্যদিকে, তুলসি গ্যাবার্ড অবশ্য কেন্টের পদত্যাগ ইস্যু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। মঙ্গলবার দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্পের অবস্থানের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা জোর দিয়ে উল্লেখ করেন।
তিনি লেখেন, “ডনাল্ড ট্রাম্পকে বিপুল জনসমর্থনে আমাদের প্রেসিডেন্ট এবং কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।”
তবে সেখানে তিনি কেন্টের নাম উল্লেখ করেননি।
তিনি আরও লেখেন, “কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে কোনটি তাৎক্ষণিক হুমকি আর কোনটি নয়, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তারই।”
কেন পদত্যাগ করলেন কেন্ট
সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক সদস্য হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কেন্ট। পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প তার আগের তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারে যে পররাষ্ট্রনীতি তুলে ধরেছিলেন, তিনি সেটিকে সমর্থন করতেন।
ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন কেন্ট।
কেন্ট লেখেন, “২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত আপনি বুঝতেন যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো একটি ফাঁদ, যা আমাদের দেশপ্রেমিকদের মূল্যবান জীবন কেড়ে নেয় এবং আমাদের দেশের সম্পদ ও সমৃদ্ধি ক্ষয় করে।”
কেন্টের দাবি, ইরানকে ঘিরে হুমকির বিষয়ে ট্রাম্পকে ভুল পথে পরিচালিত করা হয়েছে। তিনি এ জন্য গণমাধ্যম, ইসরায়েলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও লবিস্টদের দায়ী করেন, যারা ট্রাম্পকে তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি থেকে সরে আসতে প্রভাবিত করেছেন।
কেন্ট বলেন, “পরিবেশ তৈরি করে আপনাকে বিশ্বাস করানো হয়েছে যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি এবং এখন হামলা করলে দ্রুত বিজয়ের পথ রয়েছে।”
তিনি এটিকে মিথ্যা বলে দাবি করে বলেন, ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াতে ইসরায়েল একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছিল, যার ফলে হাজারো মার্কিন সেনা প্রাণ হারায়।
কেন্ট আরও বলেন, “আমরা আবার সেই ভুল করতে পারি না।”
নিজের বক্তব্যে তিনি সিরিয়ায় মার্কিন অভিযানে নিহত স্ত্রী শ্যাননের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এই ধরনের যুদ্ধের মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার উদাহরণ আমার স্ত্রী শ্যাননের মৃত্যু”
ট্রাম্পের ইরান নীতিতে প্রভাব
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যাপক পল কুইর্ক বলেন, কেন্টের পদত্যাগ দেখিয়ে দেয় যে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় সরকারের সামরিক, গোয়েন্দা ও পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।
তবে কুইর্ক মনে করেন, একমাত্র কেন্টের পদত্যাগ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে, এমনটা বলা যায় না।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “সাধারণত উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার পদত্যাগ এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য বিরোধিতা প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। এতে কংগ্রেসে একই দলের সদস্যরাও প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।”
কিন্তু এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
কুইর্কের ভাষায়, “কেন্টের বক্তব্য মূলত সেই সমালোচনার সঙ্গেই নতুন করে যুক্ত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ইরানে হামলার পেছনে ট্রাম্পের যুক্তি ছিল দুর্বল এবং পরিকল্পনাহীনভাবে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, কেন্টের পদত্যাগ হয়তো তাৎক্ষণিক বড় প্রভাব ফেলবে না, এটি সামগ্রিক বিরোধিতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
“এটি এমন হতে পারে—শেষ পর্যন্ত একটি ছোট ঘটনা বড় প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়, অর্থাৎ ‘শেষ খড়কুটো’ হয়ে দাঁড়াতে পারে,” বলেন কুইর্ক।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় প্রভাব পড়বে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্টের পদত্যাগ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তন না আনলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে।
আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের (মিডটার্ম) আর আট মাসেরও কম সময় বাকি। ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ বাড়লে তা নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক মাইক হান্না বলেন, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ সমর্থকদের মধ্যেও কেন্টের একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে।
ফলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কেন্টের সমালোচনা তার সমর্থকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়াতে পারে।
হান্না বলেন, “ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে কেন্টের সমালোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি সাধারণ কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন।”
কেন্টকে একজন অভিজ্ঞ সেনা আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, তিনি স্পেশাল ফোর্সে একাধিক মিশনে অংশ নিয়েছেন এবং সবসময়ই ট্রাম্প ও মাগা আন্দোলনের জোরালো সমর্থক ছিলেন।
এমন একজন ব্যক্তি যখন ইসরায়েলের প্রভাবে ট্রাম্প ভুল তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ করেন, তা অত্যন্ত গুরুতর এবং ডানপন্থি সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কমাতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
পদত্যাগের প্রতিক্রিয়া কী
কেন্টের পদত্যাগপত্র রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। কেউ এটিকে নীতিগত অবস্থান হিসেবে সমর্থন করেছেন, আবার কেউ তাকে ভুল তথ্যভিত্তিক ও প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুগত নন বলে সমালোচনা করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বলেছেন, “আমি সবসময় ভেবেছি সে ভালো মানুষ, কিন্তু নিরাপত্তা বিষয়ে দুর্বল।”
তিনি আরও বলেন, “সে বলেছে ইরান কোনো হুমকি নয়, তাই তার চলে যাওয়া ভালো হয়েছে।”
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লিভিট কেন্টের বক্তব্যকে “অপমানজনক ও হাস্যকর” বলে উড়িয়ে দেন।
কংগ্রেসেও সমালোচনা হয়। হাউস স্পিকার মাইক জনসন বলেন, ইরান কোনো হুমকি নয় কেন্টের এই মূল্যায়ন “স্পষ্টতই ভুল”।
একই মত দেন সিনেটর টম কটন। তিনি বলেন, “কেন্ট ও তার পরিবার দেশের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তবে তার এই মূল্যায়নের সঙ্গে আমি একমত নই।”
তবে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসন কেন্টের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “জো সবচেয়ে সাহসী মানুষদের একজন। তাকে সহজে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।”
(আল জাজিরা অবলম্বনে)