ইরানে গণবিক্ষোভ, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ
ইরানে সামরিক পদক্ষেপ, সাইবার অস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা এবং ইন্টারনেট সহায়তাসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে ওয়াশিংটনে। একই সঙ্গে ইসরায়েল রয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতায়।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৩৬ পিএমআপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:১৮ পিএম
ইরানে রাজপথ যখন উত্তাল, তখন ওয়াশিংটন থেকে আসছে ‘শক্ত পদক্ষেপ’-এর হুঁশিয়ারি। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে সামরিক হামলা থেকে শুরু করে সাইবার যুদ্ধ পর্যন্ত নানা বিকল্পের।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের চলমান সংকটে ট্রাম্প আসলে কী কী করতে পারেন, আর সেই পদক্ষেপের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে।
নতুন এই প্রেক্ষাপটে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট আর শুধু দেশটির ভেতরের বিষয় থাকছে না। বিক্ষোভ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা মন্তব্য ও সম্ভাব্য পদক্ষেপের ইঙ্গিত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আন্দোলন দমনে ইরানের পদক্ষেপের ব্যাপারে ‘কড়া জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট।
“আমরা বিষয়টি খুবই গুরুত্ব সহকারে দেখছি। সামরিক বাহিনী বিষয়টা দেখছে এবং আমরা শক্তিশালী পদক্ষেপের কথাই ভাবছি,” রবিবার রাতে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন ট্রাম্প।
তার দাবি, সামরিক পদক্ষেপের হুমকি পাওয়ার পর ইরানের নেতারা আলোচনায় বসতে চাইছেন। আমেরিকার পক্ষ থেকেও বৈঠকের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে সেই বৈঠকের আগেই কোনো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলেও ‘ইঙ্গিত দিয়েছেন’ ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১১১টি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে। সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে ৫৩৮ জন। গ্রেফতার হয়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারে সতর্ক করেছে ইরান। দেশটির স্পিকার মোহাম্মাদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, “যদি ইরানে হামলা চালানো হয় তবে দখলদাররা (ইসরায়েল) ও সব মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।”
এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শুক্রবার এক ভাষণে বলেছেন, "কয়েক লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে এবং বিক্ষোভের মুখে আমরা পিছু হটব না।"
যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ইরানে বিক্ষোভ ছড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। বিক্ষোভকারীরা "মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করছে" বলেও মন্তব্য করেছেন আলি খামেনি।
আটাশে ডিসেম্বর ইরানের ‘গ্র্যান্ড বাজার’ থেকে আন্দোলন শুরু হয় ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। এরপর দেশজুড়ে তা ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের ছবি-ভিডিওতে সয়লাব এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তেহরানের উত্তর-পশ্চিমের শহর কাজভিন, শিয়া পবিত্র শহর মাশহাদ, পশ্চিমাঞ্চলীয় আলিগুদারজ শহর, ইরাক সীমান্তের কাছের শহর আবাদানসহ আরও অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীদের দেখা গেছে সরকার পতনের দাবিতে নানা স্লোগান দিতে।
'স্বৈরাচারীর মৃত্যু হোক', ‘কামান, ট্যাংক, আতশবাজি! মোল্লারা বিদায় নাও’, 'জনতার বিদ্রোহ, জিন্দাবাদ’ শুধু এমন স্লোগানের আওয়াজ না, তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে গুলির শব্দও হয়ে উঠেছে এখন নৈমিত্তিক। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর ১০৮ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। বাহাত্তর ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট।
ইরানে যখন এই অস্থিরতা চরমে, তখন দমনমূলক বৈদেশিক নীতি নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে উঠিয়ে এনেছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ড দখলেরও হুমকি দিয়েছেন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বৈরী দেশ ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের আচরণ কী হবে। মঙ্গলবার তার সিনিয়র অ্যাডভাইজারদের সঙ্গে এই নিয়ে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে ট্রাম্পের।
তবে তার আগেই ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান সরকার যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে তাহলে তিনি তাদের ‘উদ্ধার’ করবেন।
“ইরান এখন ‘স্বাধীনতা’ চায়। এর আগে কখনোই এমন হয়নি। আর আমেরিকা সহায়তার জন্য প্রস্তুত আছে,” পোস্টে লিখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে সামরিক হামলা, সাইবার অস্ত্র এবং আরও নতুন নিষেধাজ্ঞার কথা চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া সরকারবিরোধীদের অনলাইনে সহায়তাও দেওয়া হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব
এখন সরাসরি হামলার বিষয়টি আসলেও ইরানের এই পরিস্থিতি তৈরিতে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
“২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হওয়া যাওয়ায় বিপাকে পড়ে তেহরান। তাদের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যায় এবং দুর্নীতি বাড়তে থাকে। এতে করে খুব ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী লাভবান হয়,” আল-জাজিরাকে বলেছেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক প্রভাষক বারবারা স্ল্যাভিন।
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররাও পশ্চিমা আঘাতে ভেঙে পড়তে থাকে এবং গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর ইরানে সব পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সর্বোচ্চ সতর্কতায় ইসরায়েল
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে আমেরিকার মিত্র ইসরায়েল।
দেশটি নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন অন্তত তিনটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থাটি। তবে 'সর্বোচ্চ সতর্কতা' বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে সূত্রগুলো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
এর আগে গত বছরের জুনে এ ধরনের সতর্ক অবস্থান জানানোর পর যুদ্ধ জড়িয়ে পড়েছিল ইসরায়েল ও ইরান। বারো দিনব্যাপী ওই যুদ্ধ চলে, যাতে উভয়পক্ষ হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নেয় এবং দেশটির পরমাণুকেন্দ্রে বিমান হামলা চালায়।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হলেও ইরানে সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত দিতে দেখা যায়নি ইসরায়েলকে।
যদিও ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কারণে দুই চির বৈরী দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
গত সপ্তাহে দ্য ইকনমিস্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছেন, ইরান ইসরায়েলের ওপর হামলা চালালে সেটার 'পরিণতি হবে ভয়াবহ'।
ইরানে যে গণবিক্ষোভ চলছে, সেটির দিকে তাদের নজর রয়েছে বলেও জানিয়েছেন নেতানিয়াহু।
জড়িয়ে পড়েছেন ইলন মাস্ক
রবিবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে ইন্টারনেট ফেরাতে স্টারলিংক প্রতিষ্ঠাতা ও মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করছেন তিনি। তার ভাষ্যে, “এসব ব্যাপারে সে দারুণ এবং তার দুর্দান্ত একটা কোম্পানি আছে।”
তবে ট্রাম্পের আলোচনার আগেই এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী মাস্ক। চৌঠা জানুয়ারি এক্স-এ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনির একটি পোস্টের জবাব দেন তিনি।
খামেনি তার পোস্টে লিখেছিলেন, “আমরা শত্রুর কাছে হার মানবো না।”
জবাবে মাস্ক একটি পোস্টে বলেন, ‘ফলস ইলুশ্যন’। এরপর ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের পুরোনো পতাকার ইমোজি পোস্ট করেন মাস্ক।
শনিবার তার মালিকানাধীন সোশ্যাল মিডিয়া, এক্স ইরানের পতাকার ইমোজিই পরিবর্তন করে ফেলে, দেশটির এখনকার পতাকা ইমোজি অপশনেই আর নেই!
১৯৭৯ সালে পর্যন্ত ইরানের পতাকাতে ছিল সূর্য ও সিংহ। ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এবারকার আন্দোলনে বেশকিছু জায়গায় এই পতাকা দেখা গেছে বিক্ষোভকারীদের হাতে।
আর সেজন্যই ইলন মাস্কের এই পদক্ষেপ ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরানের রাজপথেও এর প্রভাব পড়বে।
এর আগে ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পরের আন্দোলন ও গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইলন মাস্ক স্টারলিংকের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা দিয়েছিলেন। তবে ইরান সেই সিগনাল জ্যামেরও চেষ্টা করেছে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি বলেন, “সরকার ইন্টারনেট বিভ্রাট ও বন্ধের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দেয় এবং সংবাদ যেন সব জায়গায় পৌঁছাতে না পারে সেই চেষ্টা করে।”
আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, “তবে ইন্টারনেট ফিরে আসলে আবার শুরু হয়। কিন্তু আন্দোলনের গতি কমে যায়। এটাই আসলে শাটডাউনের মূল্য লক্ষ্য।”
পতাকা পরিবর্তন কী বার্তা দেয়
ইনস্টিটিউট অব ওয়ার অ্যান্ড পিস রিপোর্টিংয়ের ইরান বিষয়ক বিশ্লেষক রেজা আকবরির মতে, ১৯৭৯ এর পূর্ববর্তী পতাকাটি সবসময়ই প্রভাবশালী ছিল। বিশেষ করে দেশের ভেতরে ও বাইরে বিরোধীমতের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে এই পতাকা।
আল-জাজিরাকে তিনি বলেছেন, “পতাকার অর্থ একেকজনের কাছে একেক রকম হতে পারে। তবে বিরোধীরা বরাবরই একে ১৯৭৯ সালে পতন হওয়া শাহ পরিবারের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে।”
ইরানে গণবিক্ষোভ, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ
ইরানে সামরিক পদক্ষেপ, সাইবার অস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা এবং ইন্টারনেট সহায়তাসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে ওয়াশিংটনে। একই সঙ্গে ইসরায়েল রয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতায়।
ইরানে রাজপথ যখন উত্তাল, তখন ওয়াশিংটন থেকে আসছে ‘শক্ত পদক্ষেপ’-এর হুঁশিয়ারি। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে সামরিক হামলা থেকে শুরু করে সাইবার যুদ্ধ পর্যন্ত নানা বিকল্পের।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের চলমান সংকটে ট্রাম্প আসলে কী কী করতে পারেন, আর সেই পদক্ষেপের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে।
নতুন এই প্রেক্ষাপটে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট আর শুধু দেশটির ভেতরের বিষয় থাকছে না। বিক্ষোভ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা মন্তব্য ও সম্ভাব্য পদক্ষেপের ইঙ্গিত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আন্দোলন দমনে ইরানের পদক্ষেপের ব্যাপারে ‘কড়া জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট।
“আমরা বিষয়টি খুবই গুরুত্ব সহকারে দেখছি। সামরিক বাহিনী বিষয়টা দেখছে এবং আমরা শক্তিশালী পদক্ষেপের কথাই ভাবছি,” রবিবার রাতে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন ট্রাম্প।
তার দাবি, সামরিক পদক্ষেপের হুমকি পাওয়ার পর ইরানের নেতারা আলোচনায় বসতে চাইছেন। আমেরিকার পক্ষ থেকেও বৈঠকের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে সেই বৈঠকের আগেই কোনো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলেও ‘ইঙ্গিত দিয়েছেন’ ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১১১টি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে। সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে ৫৩৮ জন। গ্রেফতার হয়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারে সতর্ক করেছে ইরান। দেশটির স্পিকার মোহাম্মাদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, “যদি ইরানে হামলা চালানো হয় তবে দখলদাররা (ইসরায়েল) ও সব মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।”
এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শুক্রবার এক ভাষণে বলেছেন, "কয়েক লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে এবং বিক্ষোভের মুখে আমরা পিছু হটব না।"
যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ইরানে বিক্ষোভ ছড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। বিক্ষোভকারীরা "মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করছে" বলেও মন্তব্য করেছেন আলি খামেনি।
আটাশে ডিসেম্বর ইরানের ‘গ্র্যান্ড বাজার’ থেকে আন্দোলন শুরু হয় ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। এরপর দেশজুড়ে তা ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের ছবি-ভিডিওতে সয়লাব এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তেহরানের উত্তর-পশ্চিমের শহর কাজভিন, শিয়া পবিত্র শহর মাশহাদ, পশ্চিমাঞ্চলীয় আলিগুদারজ শহর, ইরাক সীমান্তের কাছের শহর আবাদানসহ আরও অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীদের দেখা গেছে সরকার পতনের দাবিতে নানা স্লোগান দিতে।
'স্বৈরাচারীর মৃত্যু হোক', ‘কামান, ট্যাংক, আতশবাজি! মোল্লারা বিদায় নাও’, 'জনতার বিদ্রোহ, জিন্দাবাদ’ শুধু এমন স্লোগানের আওয়াজ না, তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে গুলির শব্দও হয়ে উঠেছে এখন নৈমিত্তিক। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর ১০৮ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। বাহাত্তর ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট।
ইরানে যখন এই অস্থিরতা চরমে, তখন দমনমূলক বৈদেশিক নীতি নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে উঠিয়ে এনেছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ড দখলেরও হুমকি দিয়েছেন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বৈরী দেশ ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের আচরণ কী হবে। মঙ্গলবার তার সিনিয়র অ্যাডভাইজারদের সঙ্গে এই নিয়ে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে ট্রাম্পের।
তবে তার আগেই ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান সরকার যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে তাহলে তিনি তাদের ‘উদ্ধার’ করবেন।
“ইরান এখন ‘স্বাধীনতা’ চায়। এর আগে কখনোই এমন হয়নি। আর আমেরিকা সহায়তার জন্য প্রস্তুত আছে,” পোস্টে লিখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে সামরিক হামলা, সাইবার অস্ত্র এবং আরও নতুন নিষেধাজ্ঞার কথা চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া সরকারবিরোধীদের অনলাইনে সহায়তাও দেওয়া হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব
এখন সরাসরি হামলার বিষয়টি আসলেও ইরানের এই পরিস্থিতি তৈরিতে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
“২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হওয়া যাওয়ায় বিপাকে পড়ে তেহরান। তাদের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যায় এবং দুর্নীতি বাড়তে থাকে। এতে করে খুব ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী লাভবান হয়,” আল-জাজিরাকে বলেছেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক প্রভাষক বারবারা স্ল্যাভিন।
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররাও পশ্চিমা আঘাতে ভেঙে পড়তে থাকে এবং গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর ইরানে সব পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সর্বোচ্চ সতর্কতায় ইসরায়েল
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে আমেরিকার মিত্র ইসরায়েল।
দেশটি নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন অন্তত তিনটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থাটি। তবে 'সর্বোচ্চ সতর্কতা' বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে সূত্রগুলো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
এর আগে গত বছরের জুনে এ ধরনের সতর্ক অবস্থান জানানোর পর যুদ্ধ জড়িয়ে পড়েছিল ইসরায়েল ও ইরান। বারো দিনব্যাপী ওই যুদ্ধ চলে, যাতে উভয়পক্ষ হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নেয় এবং দেশটির পরমাণুকেন্দ্রে বিমান হামলা চালায়।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হলেও ইরানে সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত দিতে দেখা যায়নি ইসরায়েলকে।
যদিও ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কারণে দুই চির বৈরী দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
গত সপ্তাহে দ্য ইকনমিস্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছেন, ইরান ইসরায়েলের ওপর হামলা চালালে সেটার 'পরিণতি হবে ভয়াবহ'।
ইরানে যে গণবিক্ষোভ চলছে, সেটির দিকে তাদের নজর রয়েছে বলেও জানিয়েছেন নেতানিয়াহু।
জড়িয়ে পড়েছেন ইলন মাস্ক
রবিবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে ইন্টারনেট ফেরাতে স্টারলিংক প্রতিষ্ঠাতা ও মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করছেন তিনি। তার ভাষ্যে, “এসব ব্যাপারে সে দারুণ এবং তার দুর্দান্ত একটা কোম্পানি আছে।”
তবে ট্রাম্পের আলোচনার আগেই এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী মাস্ক। চৌঠা জানুয়ারি এক্স-এ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনির একটি পোস্টের জবাব দেন তিনি।
খামেনি তার পোস্টে লিখেছিলেন, “আমরা শত্রুর কাছে হার মানবো না।”
জবাবে মাস্ক একটি পোস্টে বলেন, ‘ফলস ইলুশ্যন’। এরপর ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের পুরোনো পতাকার ইমোজি পোস্ট করেন মাস্ক।
শনিবার তার মালিকানাধীন সোশ্যাল মিডিয়া, এক্স ইরানের পতাকার ইমোজিই পরিবর্তন করে ফেলে, দেশটির এখনকার পতাকা ইমোজি অপশনেই আর নেই!
১৯৭৯ সালে পর্যন্ত ইরানের পতাকাতে ছিল সূর্য ও সিংহ। ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এবারকার আন্দোলনে বেশকিছু জায়গায় এই পতাকা দেখা গেছে বিক্ষোভকারীদের হাতে।
আর সেজন্যই ইলন মাস্কের এই পদক্ষেপ ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরানের রাজপথেও এর প্রভাব পড়বে।
এর আগে ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পরের আন্দোলন ও গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইলন মাস্ক স্টারলিংকের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা দিয়েছিলেন। তবে ইরান সেই সিগনাল জ্যামেরও চেষ্টা করেছে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি বলেন, “সরকার ইন্টারনেট বিভ্রাট ও বন্ধের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দেয় এবং সংবাদ যেন সব জায়গায় পৌঁছাতে না পারে সেই চেষ্টা করে।”
আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, “তবে ইন্টারনেট ফিরে আসলে আবার শুরু হয়। কিন্তু আন্দোলনের গতি কমে যায়। এটাই আসলে শাটডাউনের মূল্য লক্ষ্য।”
পতাকা পরিবর্তন কী বার্তা দেয়
ইনস্টিটিউট অব ওয়ার অ্যান্ড পিস রিপোর্টিংয়ের ইরান বিষয়ক বিশ্লেষক রেজা আকবরির মতে, ১৯৭৯ এর পূর্ববর্তী পতাকাটি সবসময়ই প্রভাবশালী ছিল। বিশেষ করে দেশের ভেতরে ও বাইরে বিরোধীমতের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে এই পতাকা।
আল-জাজিরাকে তিনি বলেছেন, “পতাকার অর্থ একেকজনের কাছে একেক রকম হতে পারে। তবে বিরোধীরা বরাবরই একে ১৯৭৯ সালে পতন হওয়া শাহ পরিবারের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে।”