২০ মিনিটে ৬৩০ কোটি ডলার: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো হ্যাক

মাত্র বিশ মিনিট; দশটি নেটওয়ার্ক; ৬৩০ কোটি ডলার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে ঘটে গেল অনলাইন হ্যাকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডাকাতি।  

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে ৬ দশমিক ৩০ বিলিয়ন বা ৬৩০ কোটি ডলার চুরি হয়েছে। বাংলাদেশি অর্থে যার পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।

একে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অনলাইন হ্যাক বা চুরি বলা হচ্ছে। বিবিসি ও রয়টার্সের খবর বলছে, সাইবার অপরাধীদের চুরি করা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ খুঁজতে মাঠে নেমেছে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।

গত বৃহস্পতিবার মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক থেকে এই রেকর্ড পরিমাণ ডিজিটাল অর্থ হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা।

তবে এরই মধ্যে চুরি যাওয়া অর্থের প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ তিন বিলিয়ন ডলার বা ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ফ্রিজ বা ব্লক করা গেছে। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং ডিজিটাল ওয়ালেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান টেথার, সার্কেল ও রিপলের যৌথ সহায়তায় এটি সম্ভব হয়েছে।

বাকি অর্থ সম্পদ উদ্ধারে মাঠে নেমেছে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের অর্থ ও সাইবার অপরাধ দমন বিভাগ। বাইন্যান্স এবং শীর্ষ স্থানীয় ব্লকচেইন সিকিউরিটি ফার্মগুলোর সাথে যৌথভাবে কাজ করছে তারা।

বাকি প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন ও ইথার আছে, যা বিকেন্দ্রীভূত বা ডিসেন্ট্রালাইজড ব্লকচেইনে থাকায় সরাসরি ব্লক করা কঠিন। এই অর্থের গতিপথ নজরে আনতে মার্কিন গোয়েন্দারা বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।

ডিজিটাল অ্যাসেট নিরাপত্তার ইতিহাসে এর আগেও একাধিক বড় ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে। এতদিন পর্যন্ত একক ক্রিপ্টো চুরির রেকর্ডটি ছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাইবিট এক্সচেঞ্জে ঘটা দেড় বিলিয়ন ডলারের হ্যাকিং।

এছাড়া ২০২২ সালে এক্সি ইনফিনিটির রোনিন নেটওয়ার্ক ব্রিজ থেকে ৬২০ মিলিয়ন পলার, ২০২১ সালে ডিফাই প্ল্যাটফর্ম পলি নেটওয়ার্ক থেকে ৬১২ মিলিয়ন ডলার, ২০১৮ সালে জাপানি এক্সচেঞ্জ কয়েনচেক থেকে ৫৩০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০১৪ সালে মাউন্ট গক্স এক্সচেঞ্জ থেকে ৪৭০ মিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন চুরি হয়েছিল।

তবে সব ছাড়িয়ে গেছে বাইন্যান্সের ঘটনা। পূর্বে সর্বোচ্চ রেকর্ড থাকা বাইবিটের দেড় বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো চুরির তুলনায় বাইন্যান্সের চুরির পরিমাণ চার গুণেরও বেশি।

ব্লকচেইন সিকিউরিটি ফার্ম টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে প্রায় ১৫০টি আলাদা হ্যাকিংয়ের ঘটনায় সারা বিশ্বে চুরির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।

বাইন্যান্সের এই এক ঘটনায় চুরি হওয়া অর্থের পরিমাণ পুরো ২০২৫ সালের মোট চুরির দ্বিগুণেরও বেশি।

ব্লকচেইন অ্যানালিটিক্স ফার্ম টিআরএম ল্যাবস, চেইনঅ্যানালিসিস এবং এলিপটিকের বরাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার সরকারি হ্যাকিং ইউনিট ট্রেডারট্রেটর এবং লাজারাস গ্রুপ যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

টিআরএম ল্যাবসের পলিসি হেড আরিয় রেডবোর্ড আল জাজিরাকে জানান, উত্তর কোরিয়া যখন এই পরিমাণে অর্থ চুরি করে, তখন সেই টাকা সরাসরি তাদের পারমাণবিক ও অন্যান্য অস্ত্র এবং সামরিক কাজে ব্যবহার হয়। এতে বাইন্যান্সের চুরির ঘটনা শুধু ফাইনান্সিয়াল ক্রাইম নয় বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকট হিসাবে দেখা হচ্ছে।

বাইন্যান্সের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, তাদের একজন প্রকৌশলীর হ্যাক হওয়া ল্যাপটপ থেকে সিস্টেমে ঢুকে এই চুরি সম্ভব হয়েছে। সংস্থাটি তাদের ‘প্রাইভেট কি’ (মূল নিরাপত্তা কাঠাসো) ফাঁস হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে।

বাইন্যান্সের সহ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইও রিচার্ড তেং এবং প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাও গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে তাদের মূল তহবিল সম্পূর্ণ নিরাপদ আছে। বাইন্যান্সের নিজস্ব সিকিউর এসেট ফান্ড ফর ইউজার্স তহবিল থেকে চুরির শতভাগ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

এই সাইবার হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে ক্রিপ্টো বাজারে ধস নেমেছে। বিটকয়েনের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে ৭৭ হাজার ডলারের নিচে নেমেছে। ইথেরিয়াম ও বাইন্যান্সের টোকেনের মানও কমেছে।

সিডনির ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিপ্টো বিশেষজ্ঞ শেন ফোলি আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, বাইন্যান্সের মতো মেগা প্ল্যাটফর্মে এমন ফাঁকফোকর ধরা পড়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়েছে।