শুরুতে যে হাম নিয়ন্ত্রণের উপায় ছিল, এখন তা অপ্রতিরোধ্য

বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামের মহামারি হলো দেশের ভেঙে পড়া টিকাদান ব্যবস্থার একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ বা সতর্কসংকেত। সরকার যদি এখনই জরুরি এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে হামের পর শিশুদের মাঝে ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি এবং পোলিওর মতো রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম

হামের প্রকোপ যখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া শুরু করেছিল, সেই সময় গত ২৯এ মার্চ আলাপ-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, শিরোনাম ছিল- ‘টিকা ক্যাম্পেইন’ বন্ধ থাকায় ছড়িয়ে পড়ছে হাম, ‘মহামারি’ ঠেকাতে যেসব পদক্ষেপের পরামর্শ। 

মহামারি ঠেকাতে তখন মোটাদাগে চারটি পরামর্শ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সংক্রামক রোগব্যাধি বিষয়ক সুপরিচিত বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন।

শুরুতেই যে মহামারি নিয়ন্ত্রণের উপায় ছিল, তা এখন হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য। বর্তমানে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব রয়েছে ভয়াবহ ও নজিরবিহীন পর্যায়ে। রূপ নিয়েছে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক আকারের। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই প্রাদুর্ভাবটি তীব্রতার দিক থেকে চিহ্নিত হয়েছে অন্যতম ভয়াবহ একটি মহামারি হিসাবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩১এ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশব্যাপী নিশ্চিত হাম এবং হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখ ৫২ হাজার ৫২৭ জন মানুষ, যাদের অধিকাংশই শিশু। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৫২ জনের। এর মধ্যে হামে নিশ্চিত মৃত্যু ১০৫ জনের এবং সন্দেহজনক মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ১৪৭ জনের। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি ১,০০০ জন হাম আক্রান্তের মধ্যে মৃত্যু হতে পারে ২ থেকে ৩ জনের। তবে অপুষ্টি, ভিটামিন-এ এবং যথাযথ চিকিৎসার অভাবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই মৃত্যুর হার হতে পারে আরও বেশি। 

যেমনটি এখন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। সরকারি হিসাবে হাম সংক্রমণে প্রতি হাজারে এখন মৃত্যু হচ্ছে ৫ জনের, যা রীতিমতো ভয়ংকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।   

মহামারি আকারে হাম ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিস্থিতি ছিল একসময় এবং সেই পরামর্শও দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন। 

তাহলে কেন হাম ছড়িয়ে পড়লো? সেই পরামর্শগুলো কি আমলে নেওয়া হয়নি? 

“না, হয়নি। পরামর্শগুলো আমলে নেওয়া হয়নি বলেই হাম এখন তীব্র মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে,” আলাপ-কে বলেন ড. মুশতাক। 

তবে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পরও সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে- এমনটা মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। তাদের ধারণা, এখনো নিয়ন্ত্রণ করার কার্যকর উপায় রয়েছে সামনে। 

সরকার সেই পথে অনুসরণ করছে না বলেও মনে করছেন একজন মহামারি বিশেষজ্ঞ। কিন্তু অবহেলা করলে হামের পাশাপাশি পুরোনো কিছু রোগ ভয়ংকর রূপে ফিরে আসতে পারেও সতর্ক করছেন তারা।  

প্রশ্ন উঠছে টিকাদান কর্মসূচি নিয়েও। এখন যে কর্মসূচি চলছে, তা যথেষ্ট কিনা এবং পরিসর আরও বাড়ানো দরকার কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।  

“সরকার যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে হামের মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বরং এটা আরও বেড়ে যেতে পারে,” আলাপ-কে বলেন মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান, যিনি বাংলাদেশের হাম ও রুবেলা নির্মূল সংক্রান্ত জাতীয় যাচাইকরণ কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল হামের মহামারি

বাংলাদেশ সরকার আগে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহ করত ইউনিসেফ ও টিকা অ্যালায়েন্স গ্যাভির মাধ্যমে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা পরিবর্তন করে উন্মুক্ত দরপত্র বা নতুন নিয়মে আমলাতান্ত্রিক দর-কষাকষির চেষ্টা করা হয়।

টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সফলতার হার নিয়ে একসময় উদাহরণ দেওয়া হতো। কিন্তু সেই গর্ব খর্ব হয়ে যায় ২০২৪ সালের শেষের দিকে, যখন হামের মতো জরুরি টিকা দিতে ব্যর্থ হয় তখনকার অন্তর্বর্তী সরকার। 

হাম ও রুবেলা প্রতিরোধের জন্য দেওয়া হয় এমআর টিকা। বাংলাদেশের শিশুদের সাধারণত ৯ মাস পূর্ণ হলে দেওয়া হয় এমআরের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ।  

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এমআরের প্রথম ডোজ পেয়ে থাকে ৯২ শতাংশ শিশু এবং দ্বিতীয় ডোজ পায় ৯০ শতাংশ। 

দশ শতাংশ বাকি থেকে যায় এবং কয়েক বছর পরপরই দেখা দেয় হামের প্রাদুর্ভাব। আর এটা প্রতিরোধ করতে চালানো হয় ‘জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন’। এ সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি সব শিশুকেই দেওয়া হয় হামের টিকা। 

২০১৪ সালে চালানো হয় মেগা ক্যাম্পেইন। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ওই ক্যাম্পেইনে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সি প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ শিশুকে দেওয়া হয়েছিল হামের টিকা। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সর্বশেষ হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালে জানুয়ারি পর্যন্ত।

পরবর্তী টিকাদান ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের শেষের দিকে। কিন্তু সেটা করতে পারেনি তখনকার সরকার। 

“২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটা ক্যাম্পেইন করার কথা ছিল। কিন্তু কোভিড পিরিয়ড এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা- সবকিছু মিলিয়ে করা সম্ভব হয়নি,” আলাপ-কে গত মার্চে বলেছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা। 

বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যাচ্ছে, পূর্বনির্ধারিত জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনটি না হওয়ার পেছনে আরও দায়ী হলো তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পুনর্বিন্যাস বা বাতিল করা হয় স্বাস্থ্যখাতের বেশকিছু অপারেশনাল প্ল্যান ও কর্মসূচি। এতে মারাত্মকভাবে ব্যহত হয় অর্থ সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতি।

বাংলাদেশ সরকার আগে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহ করত ইউনিসেফ ও টিকা অ্যালায়েন্স গ্যাভির মাধ্যমে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা পরিবর্তন করে উন্মুক্ত দরপত্র বা নতুন নিয়মে আমলাতান্ত্রিক দর-কষাকষির চেষ্টা করা হয়। 

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা সত্ত্বেও নীতিগত এই পরিবর্তনের কারণে টিকার সরবরাহ লাইনে তৈরি হয় দীর্ঘসূত্রিতা। এক পর্যায়ে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে মজুত। 

এই ঘটনা পরে টিকাদান কর্মসূচিতে সৃষ্টি করে এক ধরনের স্থবিরতা এবং আবির্ভূত হয় দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অন্যতম সংকট হিসাবে। 

টিকা না দেওয়ার প্রভাব ফুটে ওঠে দ্রুতই। সার্বিক সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের বিলম্বের কারণে ভেঙে পড়ে শিশুদের ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দেয়াল। 

ডব্লিউএইচও-এর মতে, অতি সংক্রামক একটি ভাইরাসের ক্ষেত্রে এভাবে টিকাদান স্থবির হয়ে পড়াটা ছিল আত্মঘাতী। এর ফলে ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজ ৯৫ শতাংশ থেকে এক লাফে নেমে আসে মাত্র ৫৯ শতাংশে। এটা ছিল নজিরবিহীন ঘটনা এবং এই হার দেশের ইতিহাসে চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।  

এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে খুব দ্রুত। দেশজুড়ে বৃদ্ধি পায় হামের প্রাদুর্ভাব। দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে হামের সংক্রমণ। ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে থাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এবং সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে জ্যামিতিক হারে। 

১৫ই মার্চ থেকে ১৪ই এপ্রিলের মধ্যে দেশব্যাপী হামে আক্রান্ত হয় ১৯ হাজারের বেশি শিশু। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়ে হামের ভাইরাস। 

ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর টিকার ঘাটতি ও হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় পরিবর্তন আনা হয় নীতিতে। বাতিল করা হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের উন্মুক্ত দরপত্র নীতি। পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা ক্রয়ের ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার।  

সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করায় ৫ই এপ্রিল থেকে জরুরি গণটিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে সরকার। এরই মধ্যে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে হামের প্রাদুর্ভাব প্রথমবারের পৌঁছায় সর্বোচ্চ চূড়ায়। সেপ্টেম্বর মাসেও প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার নতুন রোগী শনাক্তের মাধ্যমে দ্বিতীয় দফায় এটি ধারণ করে চরম ভয়াবহ রূপ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহায়তায় জরুরি ক্রাশ প্রোগ্রাম ও বিশেষ মপ-আপ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে সরকার।

সবমিলিয়ে কোভিড মহামারির ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই বাংলাদেশকে এখন মোকাবিলা করতে হচ্ছে আরেকটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট এবং মহামারি।

গত মার্চ মাসে হামের মহামারি যখন দরজায় কড়া নাড়ছিল, তখন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেনের মোট দাগে চার পরামর্শ ছিল:  

  • এটা মহামারিতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা আছে। যেখানে যেখানে আউটব্রেক হয়েছে সেখানে বাচ্চাদের দ্রুত টিকা দিতে হবে, আগে নিক বা না নিক।
  • সারাদেশেই দ্রুত টিকা দিতে হবে। 
  • চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। প্রায় সবাই ঢাকা শহরে আসছে। আসার পথে নিউমোনিয়া বাড়ছে। এখানে তো এত এনআইসিইউ নাই। জেলা শহরে জনবল ও যন্ত্রপাতি বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।
  • যেখানে আউটব্রেক হয়েছে, সেখানে স্বাস্থ্য কর্মী পাঠিয়ে আক্রান্তদের আইসোলেট করে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে ছড়িয়ে পড়া কমে যাবে। 

কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি বলেই হামের এই বিস্তার বলে মনে করছেন ড. মুশতাক। 

“এই সরকারের প্রধান গাফিলতি হচ্ছে, তারা জনস্বার্থের নীতি অনুসরণ করছে না। অন্যান্য আর দশটা রোগ যেভাবে মোকাবিলা করা হয়, ওই অ্যাপ্রোচে তারা করছে। কিন্তু ওই অ্যাপ্রোচে তারা জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি, যেখানে শত শত লোক আক্রান্ত হয়, সেখানে ওই অ্যাপ্রোচ চলে না। ওইটা একটা অংশমাত্র।” 

‘সিংগেল’ রোগীকে চিকিৎসা করার যে পদ্ধতি, সরকার সেই ‘পদ্ধতি অনুসরণ করছে’ বলেও মন্তব্য করেন কোভিড-১৯ মহামারির সময় আইইডিসিআর-এর অন্যতম উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন। 

তবে সরকার যে কাজ করছে না, তা অবশ্য মনে করেন না আইইডিসিআরের সাবেক এই মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।

“কিছু কাজ হচ্ছে। কিন্তু একটা ঘোড়াকে বেধে রেখে যদি চাবুক মারেন, তাহলে সে একপাও এগোবে না। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রচণ্ড পরিশ্রম করছে। কিন্তু কোনো সাফল্য আসছে না– পরিশ্রম করার পরেও, টাকা খরচ করার পরেও,” মন্তব্য করেন ড. মুশতাক।   

তিনি বলেন, “এই সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার করার সময় দলবলের বাইরে অনেককেই তারা সম্পৃক্ত করে নির্বাচনি ইশহেতার তৈরি করেছিল।” 

“কিন্তু কোনোকিছুই এখন পযন্ত আলোর মুখ দেখেছে, এমনটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না,” মন্তব্য করেন মুশতাক হোসেন।    

এখন যেভাবে হাম মোকাবিলা করছে সরকার 

হাম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ও ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইনে কত শিশু টিকা পেয়েছে, তা নিয়ে পার্থক্য আছে সরকারি তথ্য এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্রের মধ্যে।

হামের মহামারিতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। মোট মৃত্যুর ৯৪ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের। 

হাম আর এখন আর সীমাবদ্ধ নেই নির্দিষ্ট কোনো এলাকার মধ্যে। দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ প্রাদুর্ভাব বা মহামারি রূপ নিয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলাই বর্তমানে হামে আক্রান্ত।

সবচেয়ে বেশি রোগী ও চাপ দেখা যাচ্ছে ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলগুলোতে, যার মধ্যে ঢাকা বিভাগেই ঘটছে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৪০ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগ। 

আক্রান্তের দিক থেকে বিশ্বের মধ্যেও শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় বিশেষজ্ঞদের অক্টোবরের যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন অনুযায়ী, হামের এই প্রাদুর্ভাবটি দেশের টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা।

বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এখনই টিকাদানের এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করা না গেলে সামনে ছড়িয়ে পড়তে পারে ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি এবং পোলিওর মতো অন্যান্য মারাত্মক রোগও। 

পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ হওয়ায় নিয়মিত টিকাদানের বয়সসীমা শিথিল করেছে সরকার। ৬ মাস থেকে ৯ বছর বয়সি শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে টিকা। 

বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করতে ৩১ই অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী জোরদার করা হয় বিশেষ ক্যাচ-আপ টিকাদান ক্যাম্পেইন। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় দ্রুত টিকার সংস্থান করে সরকার দেশব্যাপী বাস্তবায়ন করছে প্রায় ২ কোটি শিশুকে জরুরি অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার মেগা-পরিকল্পনা। 

প্রথম ধাপে গত ৫ই এপ্রিল থেকে ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় শুরু হয় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি। পরে ২০এ এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফায় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষায় দেশব্যাপী পরিচালনা করা হচ্ছে বিশেষ ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন। 

গত ২৬এ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ঢাকার কড়াইল বস্তিসহ পরিদর্শন করেন হামের প্রাদুর্ভাবের কয়েকটি প্রধান ‘হটস্পট’। সেখানে উপস্থিত অভিভাবক ও সাংবাদিকদের তিনি জানান যে, বর্তমান সরকারের তদারকিতে ইতিমধ্যে ২ কোটিরও বেশি শিশুকে সফলভাবে টিকা দেওয়া হয়েছে।

শতভাগ শিশু যাতে এই ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইনের আওতায় আসে এবং একটি শক্তিশালী ‘সুরক্ষা প্রাচীর’ গঠিত হয়, তা নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।

তবে হাম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ও ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইনে কত শিশু টিকা পেয়েছে, তা নিয়ে পার্থক্য আছে সরকারি তথ্য এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্রের মধ্যে। 

প্রাথমিক ধাপে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকার। প্রশাসনিক হিসাব অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের হটস্পট ও সিটি কর্পোরেশনগুলোতে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বেশি প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টিকা দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এই সফলতা দাবির পরও দেখা যাচ্ছে, টিকাদান থেকে প্রায় বাদ পড়েছিল ৪৩ লাখ শিশু। 

এর মধ্যে পরবর্তী মপ-আপ রাউন্ডে ১৯ লাখ শিশুকে কভার করা হয়েছে এবং বর্তমানে অবশিষ্ট ৩৪ লাখ বাদ পড়া ও নতুন শিশুকে লক্ষ্য করে হাতে নেওয়া হয় ২৬এ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১এ অক্টোবরের বিশেষ ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন। 

সম্প্রতি রয়টার্সের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে টিকার বাস্তব হার নিয়ে ভেতরের তথ্য এসেছে প্রকাশ্যে। 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, "অগাস্ট মাসের সভার মধ্যেই টিকাদান কর্মসূচির বাস্তবায়নে বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছিল। সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয় যে, নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যারা টিকা পায়নি তাদের অনুপাত বা হার, ক্যাম্পেইনের আগের (৮২%) এবং ক্যাম্পেইনের পরের (৮৫%) পরিস্থিতির মধ্যে 'কার্যত অপরিবর্তিতই' রয়ে গেছে... যা টিকাদানের কভারেজের ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী ও ক্রমাগত ব্যবধান বা ঘাটতিকেই স্পষ্ট করে তোলে।" 

হামের মতো অতি ছোঁয়াচে রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ন্যূনতম টিকার পূর্ণ ডোজ থাকা বাধ্যতামূলক ৯৫ শতাংশ শিশুর। 

সরকারিভাবে কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি (১০২ থেকে ১১৫ শতাংশ) টিকার কভারেজ দেখানো হলেও, স্বাধীন কমিটির পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, পূর্ণাঙ্গভাবে টিকার আওতাভুক্ত হয়েছে দেশের মাত্র ৮২ শিশু। 

হামের মহামারি মোকাবিলায় যা করতে হবে

শুধু টিকা দিয়ে হামের তীব্র সংক্রমণ মোকাবিলা করা যাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সংক্রমণ ব্যাধির মহামারি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আরও বেশি কিছু দরকার বলে মনে করেন তারা।

হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি নিয়ে গঠিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম সংকটের চিত্র এবং একাধিক মারাত্মক সতর্কবার্তা।

বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামের মহামারি হলো দেশের ভেঙে পড়া টিকাদান ব্যবস্থার একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ বা সতর্কসংকেত। সরকার যদি এখনই জরুরি এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে হামের পর শিশুদের মাঝে ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি এবং পোলিওর মতো রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

গত ১৫ই অক্টোবর ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে আন্তর্জাতিক ও দেশি বিশেষজ্ঞদের যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। 

প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে তাকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে, “শিশুদের যে টিকা দেওয়া হচ্ছে, সেই টিকার মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া দরকার। কোথায় টিকা তৈরি হচ্ছে, সেখান থেকে টিকা কোন গুদামে যাচ্ছে, গুদাম থেকে কোন ফ্লাইটে করে কেমন বিমানবন্দরে আনা হচ্ছে, বন্দর থেকে কীভাবে টিকা জেলা পর্যায়ে যাচ্ছে, টিকাকেন্দ্রগুলোতে তা কীভাবে পৌঁছাচ্ছে—এই পুরো ব্যাপারটিতে ‘কোল্ড চেইন’ ঠিক থাকছে কি না, তা জানা দরকার।”  

গত অগাস্টে আইসিডিডিআর-বি ও শিশু হাসপাতালের একটি যৌথ সভায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, "কেবল ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ বেড বাড়িয়ে হাম নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। এর একমাত্র চাবিকাঠি হলো প্রতিরোধ ও টিকাদান।"

“স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে কমপক্ষে ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগবে।”  

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর দুই মাস পার হয়েছে। কিন্তু এখনও উচ্চ সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। অক্টোবর মাসে হাম ও হামের উপসর্গে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ২৮,০০০-এর বেশি মানুষ।

হামের মহামারি মোকাবিলায় এখনও সরকারের যত কার্যক্রম, তার সিংহভাগই আটকে আছে টিকার মধ্যে। শুধু টিকা দিয়ে হামের তীব্র সংক্রমণ মোকাবিলা করা যাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সংক্রমণ ব্যাধির মহামারি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আরও বেশি কিছু দরকার বলে মনে করেন তারা। 

মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর টিকা দেওয়া ছাড়াও গুরুত্ব দিচ্ছেন সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা, রোগীকে আইসোলেশনে রাখার মতো বিষয়গুলোকে। এগুলো করা হচ্ছে না বলেও মনে করেন তিনি। 

“হাত ধোয়ার ব্যাপার আছে, সামাজিক দূরত্বের ব্যাপার আছে, সোশ্যাল মেজার্স নেওয়ার দরকার আছে।” 

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “হাম নিয়ন্ত্রণের উপায় আছে। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে। এখন যেভাবে হচ্ছে, সেটাতে হবে না।” 

তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের আনতে হবে টিকার আওতায়।  

“শুধু পাঁচ বছর পর্যন্ত ভ্যাকসিন দিলে হবে না। এটা বাড়াতেই হবে। কমপক্ষে ১৫ করতে হবে। এরপরেও দেওয়ার সুযোগ থাকলে নিবে, যদি সুযোগ থাকে।” 

ছয় মাসের নিচের বাচ্চাদের জন্য ব্যাপকহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করার প্রয়োজন বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। 

“না হলে এখন যে পর্যায়ে আছে, যেভাবে যাচ্ছে, তাতে হাম নিয়ন্ত্রণ হয় না। এটা এরকমই থাকবে, বাড়বে আরও।”

পাশাপাশি অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবও বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন মহামারি বিশেষজ্ঞ মাহমুদুর রহমান।   

“অলরেডি ডিপথেরিয়ার আউটব্রেক হয়েছে কয়েকটা। পোলিওর অবস্থা জানি না কী হবে। ভাইরাস চলে আসাটা কোনো বিষয় না, চলে আসতে পারে যেকোনো সময়।”  

টিকাদানের হার নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমন প্রশ্ন উঠছে টিকাদানের পদ্ধতি নিয়েও। তদারকি কতটা হচ্ছে তাও পড়েছে প্রশ্নের মুখে। 

ড. মুশতাক হোসেন বলেন, “বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে যেভাবে টিকা দেয় আমাদের ইপিআই, সেই পদ্ধতি এড়িয়ে গিয়ে এলোপাথাড়িভাবে টিকা দেওয়া হচ্ছে। এটা (হাম) খুবই ছোঁয়াচে রোগ, বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। ১০০ শতাংশ টিকার টার্গেট করে যদি ৯৫ শতাংশ পূরণ না করেন তাহলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।”

“প্রথমদিকে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য এলোপাথাড়ি শুরু করা হয়েছে ঠিক আছে। সঙ্গে সঙ্গে মাইক্রোপ্ল্যানিং করে আমাদের ইপিআইয়ের টিকা দেওয়ার যে নিয়ম, সেটা ফলো করা উচিত ছিল। এখন পর্যন্ত সেটা ফলো করা হচ্ছে না।”  

তাই বর্তমানে যে বয়সিদের টিকা দেওয়া হচ্ছে, তা বাড়িয়ে আরও বেশি বয়সিদের দেওয়া দরকার বলে মনে করেন মুশতাক হোসেন। 

“যেহেতু প্রথম পর্যায়ে মাইক্রোপ্ল্যানিং করে ঠিকভাবে দেওয়া যায়নি। এটা কার্যকর করার জন্য এখন ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত দিতে হবে প্রত্যেকটা মানুষকে। তাহলেই আমরা আশা করতে পারি যে, এটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।” 

মুশতাক হোসেন মনে করেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ে তিনটা কাজ করা হয়। এগুলো হলো:

  • প্রথমত: অ্যালিজেবল যারা, যারা টিকা পাওয়ার যোগ্য তাদের সবাইকে তালিকাভুক্ত করা। সরকার যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাঁচ বছর, তাহলে পাঁচ বছর। আর আমরা যদি বাড়িয়ে ১৫ বছর করতে পারি, হলে ১৫ বছর। 
  • দ্বিতীয়ত: টিকা দেওয়া কেন দরকার এবং উপকারিতা কী, সেটা নিয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। 
  • তৃতীয়ত: টিকা কর্মীরা যেন বলে তাদের বাড়ির পাশেই কবে, কোথায়, কীভাবে টিকা দেওয়া হবে। বাড়ির আশেপাশেই করা হয় যেন দূরে যেতে না হয়। কারণ যারা প্রান্তিক মানুষ, দিন আনে দিন খায়, তাদের এত খবর রাখা সম্ভব নয়।

আবার কিছু কিছু গোষ্ঠী ও জোন টিকার আওতা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে বলেও মনে করেন ড. মুশতাক হোসেন। যারা বাদ যাচ্ছেন সেখানে ছয়মাসের নিজের বাচ্চা এবং পাঁচ বছরের উপরের শিশুও আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি। 

“এইজন্য টিকার বয়সটা বাড়ানোর জন্য আমাদের দাবি। আপনি এখনই যদি ১৫ বছরের মধ্যে না যান, তাহলে দেখা যাবে যে অ্যাডাল্টদেরও দিতে হচ্ছে।” 

চলমান মহামারির মধ্যে সামনে এসেছে স্বাস্থ্যখাতের কর্মী সংকট। দেশের টিকাদান কর্মসূচির সফলতার মূল চালিকাশক্তি যারা, সেই ভ্যাকসিনেটর বা টিকাদানকারীদের প্রায় ৪০ শতাংশ পদই বর্তমানে শূন্য বা খালি পড়ে আছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

তাই কর্মী সংকটের কারণে নিয়মিত টিকাদান এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “ফিল্ড লেভেলে মনিটরিং না থাকার কারণে, যাদের ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা, তারা না দিয়েই হয়ত বলছে, ভ্যাকসিন দিয়েছি।” 

আর ভ্যাকসিনের অভাবে হামের তীব্রতা দমন করা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, আক্রান্তদের বড় অংশই টিকাহীন।

ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের মহামারি সংক্রান্ত তথ্যে দেখা গেছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত শিশুদের ৭২ শতাংশই ‘জিরো-ডোজ’, অর্থাৎ তারা জীবনে কখনো হামের একটি ডোজও পায়নি। 

জনবল সংকটের কথা সরকার উল্লেখ করছে না বলে মন্তব্য করেন ড. মুশতাক হোসেন। বলেন, “তাও (জনবল) তো বলছে না যে, জনবলের সংকট আছে আছে কিনা।” 

এটা মোকাবিলা করতে জনবল ভাড়া ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।    

“জনবলের সংকট আছে। এটা মোকাবিলা করতে পারে প্রচুর পরিমাণের ভলানটিয়ারদের কাজে লাগিয়ে। এনজিওদের দায়িত্ব দিতে পারে। নাকি সেই টাকাও নাই,” প্রশ্ন তোলেন এই বিশেষজ্ঞ।