আট টেক জায়ান্টের শ্রম-সনদ স্থগিত করলো যুক্তরাষ্ট্র , গ্রিন কার্ডে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

স্থায়ী বসবাসের পথ আরও কঠিন হলো যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা বিদেশি ‘টেক ওয়ার্কার’দের জন্য। মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, টিসিএস, ইনফোসিস ও উইপ্রোসহ আট প্রতিষ্ঠানের শ্রম-সনদ আবেদন স্থগিত করেছে মার্কিন সরকার। ফলে এসব কোম্পানির কর্মীদের গ্রিন কার্ড পেতে দেরি হতে পারে। তবে চলমান এইচ-১বি ভিসা আপাতত বহাল থাকছে।

বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্তের কথা জানান দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং সেক্রেটারি অব লেবার কিথ সন্ডারলিং। তাদের দাবি, বিদেশি কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থায় অনিয়ম ঠেকানো এবং মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সুরক্ষিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আট প্রতিষ্ঠানের কোনো নতুন শ্রম-সনদ আবেদন এখন থেকে নেবে না ডিপার্টমেন্ট অব লেবার। আগে জমা দেওয়া যেসব আবেদন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলোর কাজও বন্ধ থাকবে। কত দিন এই নিষেধাজ্ঞা চলবে, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। ভ্যান্স শুধু জানিয়েছেন, প্রয়োজন যত দিন থাকবে, তত দিন এটি বহাল থাকবে।

যে আট প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা

স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো– মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), ইনফোসিস, উইপ্রো, এইচসিএল টেকনোলজিস, কগনিজ্যান্ট, ক্যাপজেমিনি। 

মাইক্রোসফট ও অ্যাডোবির বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। বাকি ছয় প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টিসিএস, উইপ্রো, এইচসিএল ও ক্যাপজেমিনির বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছে শ্রম দপ্তর। তাদের অভিযোগ, এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি কর্মী নিয়োগ ও শ্রম-সনদ ব্যবস্থা ব্যবহারে বাড়াবাড়ি করেছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, সেক্রেটারি অব লেবার কিথ সন্ডারলিং বলেছেন, ২০০৯ সাল থেকে এই আট প্রতিষ্ঠান মিলে প্রায় ৩০ লাখ বিদেশি কর্মীর জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসা এবং ১ লাখের বেশি স্থায়ী শ্রম-সনদ অনুমোদন পেয়েছে।

কেন এই সিদ্ধান্ত 

মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী আনতে গিয়ে শ্রমবাজারের নিয়মকে নিজেদের সুবিধায় কাজে লাগিয়েছে। এতে স্থানীয় কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে, ‘যোগ্য মার্কিন কর্মী পাওয়া যায়নি’ বলে দেখিয়ে কম বেতনে বিদেশিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে চায় প্রশাসন। 

মাইক্রোসফটের নিয়োগ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালে ছয় হাজার মার্কিন কর্মী ছাঁটাই করলেও একই সময়ে বিপুলসংখ্যক এইচ-১বি ভিসা এবং গ্রিন কার্ডের অনুমোদন পেয়েছে।

ভ্যান্সের অভিযোগ, স্থানীয় কর্মীদের জন্য উপযুক্ত চাকরির সুযোগ নিশ্চিত না করেই বিদেশি কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে ব্যবস্থাটির অপব্যবহার করা হয়েছে।

তবে এগুলো মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ। 

তবে এসব অভিযোগ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে মাইক্রোসফট। কোম্পানিটির দাবি, একই কাজে এইচ-১বি ভিসার কর্মী ও অন্য কর্মীরা সমান বেতন পান। 

মাইক্রোসফট আরও জানায়, গত অর্থবছরে করা এইচ-১বি আবেদনের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিলো বর্তমান কর্মীদের জন্য, অর্থাৎ ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা অভিবাসন-অবস্থা বদলানোর জন্য। নতুন কর্মী আনার জন্য নয়।

অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। 

গ্রিন কার্ডের ক্ষেত্রে পার্ম বা শ্রম-সনদ কী?

যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির সূত্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পেতে বিদেশি কর্মীদের অনেক ক্ষেত্রেই ‘পারমানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন’ (পার্ম) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এটি মার্কিন শ্রম দপ্তরের অধীন একটি শ্রম-সনদ প্রক্রিয়া।

পার্ম প্রক্রিয়ায় নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকে দুটি বিষয় প্রমাণ করতে হয়। প্রথমত, ওই পদের জন্য যোগ্য ও আগ্রহী কোনো মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, বিদেশি কর্মী নিলে স্থানীয় কর্মীদের বেতন বা কাজের পরিবেশের ক্ষতি হবে না।

এই শ্রম-সনদ পেলে তবেই নিয়োগদাতা পরের ধাপের অভিবাসন আবেদনে এগোতে পারে। তাই পারমানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন আটকে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের গ্রিন কার্ডের অপেক্ষা আরও লম্বা হতে পারে।

তবে পারমানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন স্থগিত হওয়া মানে ভিসা বা গ্রিন কার্ড বাতিল হওয়া নয়। এই সিদ্ধান্তে কর্মীদের বর্তমান এইচ-১বি ভিসা এমনিতেই বাতিল হচ্ছে না। যারা আগেই গ্রিন কার্ড পেয়েছেন, তাদের কার্ডও বাতিল হচ্ছে না।

ভারতীয়দের ওপর প্রভাব 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে ভারতীয়দের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। টিসিএস, ইনফোসিস, উইপ্রো ও এইচসিএল টেকনোলজিসের মতো ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বহু বছর ধরে মার্কিন বাজারে কর্মী সরবরাহ ও প্রযুক্তিসেবা দিয়ে আসছে। তাই নতুন এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ভারতীয় কর্মীদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে।

ভারতের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছ, যেসব কর্মীরা গ্রিন কার্ডের জন্য পুরোপুরি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল তারাই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। তাদের আবেদন আটকে যেতে পারে, স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনাও ঝুলে যেতে পারে। 

যাদের আবেদন এখনো পারমানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন ধাপে আটকে আছে এবং যারা শিগগির আবেদন করার পরিকল্পনা করছিলেন তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। গ্রিন কার্ডের অপেক্ষা লম্বা হলে এর প্রভাব পড়তে পারে চাকরি বদলানো, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সময় থাকার পরিকল্পনা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত অন্য সিদ্ধান্তেও।

তবে সবার ওপর প্রভাব এক রকম হবে না। কারও আবেদন কোন ধাপে আছে, ভিসার মেয়াদ আর কত দিন বাকি, আর অন্য কোনো অভিবাসনের পথ খোলা আছে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে কে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ভারতের আইটি শিল্প সংগঠন ন্যাসকম বলেছে, মার্কিন বাজারে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা আগের চেয়ে কমেছে। পার্মের মাধ্যমে গ্রিন কার্ডের আবেদন করেন, এমন কর্মীর সংখ্যাও তুলনায় কম। তাই সিদ্ধান্তটির প্রভাব কতটা ছড়াবে, তা বোঝার জন্য এখন দরকার ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীর প্রকৃত সংখ্যা ও তাদের আবেদনের অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি আরও কঠোর হচ্ছে

ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। এবার সেই কড়াকড়ি পৌঁছালো দক্ষ বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের পথে।

রয়টার্স জানিয়েছে, বিদেশ থেকে নতুন কর্মী আনতে এইচ-১বি ভিসার আবেদনে এককালীন এক লাখ ডলার ফি চালুর ঘোষণা আসে। এর পরপরই গত বছরের সেপ্টেম্বরে শ্রম দপ্তর "প্রজেক্ট ফায়ারওয়াল" নামে একটি কার্যক্রম শুরু করে। এর লক্ষ্য, এইচ-১বি ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা।

৮ই অক্টোবরের এই ঘোষণায় শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রিন কার্ড-সংক্রান্ত শ্রম-সনদ আবেদন স্থগিত করা হয়নি; বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগে হার্ভার্ড, ইয়েল ও স্ট্যানফোর্ডসহ নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেও তদন্তের কথা জানানো হয়েছে।

এসব পদক্ষেপের পক্ষে মার্কিন প্রশাসনের যুক্তি, স্থানীয় কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করা। অন্যদিকে, বিদেশি দক্ষ কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর কড়াকড়ি অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও উদ্বেগ আছে।

সব মিলিয়ে, আট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পারমানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন আবেদন স্থগিতের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশি পেশাজীবীদের স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর আসল প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর– স্থগিতাদেশ কত দিন চলে, প্রতিষ্ঠানগুলো আদালতে যায় কি না এবং মার্কিন প্রশাসন পরে কী সিদ্ধান্ত নেয়।

(তথ্যসূত্র: রয়টার্স, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, গালফ নিউজ)