ঢাকায় বাড়ছে অজ্ঞাত মরদেহ

২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে ঢাকায় বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন হয়েছে ২,৬০৭টি। পুলিশ বলছে, বিকৃত মরদেহের পরিচয় মেলানো কঠিন। আর সেই সুযোগে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা, বলছেন একজন বিশেষজ্ঞ।

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম

এই বছরের ১২ই সেপ্টেম্বর ঢাকায় একদিনে তিনজনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। তিনজনেরই পরিচয় অজানা।

আদাবরের হাক্কারপাড় খালে একটি স্কুল ব্যাগ ভাসতে পাওয়া যায়। ভেতরে এক কিশোরীর মরদেহের চার টুকরো। পুলিশের ধারণা বয়স আনুমানিক ১৬। এনআইডি ছিল না তাই ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়েও পরিচয় বের করা যায়নি।

একইদিনে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান এবং হাইকোর্ট মাজারের পাশে ফুটপাতে দুইটি মরদেহ পাওয়া যায়। একজনের আনুমানিক বয়স ৬৫, আরেকজনের ৪৫। এদের মধ্যে একজনের পরিচয় পরে পাওয়া গিয়েছে। 

এর কিছুদিন আগেই, জুরাইনের একটি পরিত্যক্ত টয়লেটে পাওয়া যায় এক কিশোরের গলিত মরদেহ। বয়স আনুমানিক ১৬, কপালে গভীর ক্ষত। এতটাই পচে গিয়েছিলো যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়াও সম্ভব হয়নি।

“পরিচয় না মেলায় নিয়ম মেনে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে তাকে দাফন করা হয়েছে। হত্যা মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে,” শ্যামপুর থানার ওসি নজরুল ইসলাম আলাপ-কে বলেন।

দাফন হয়ে গিয়েছিলো, পরিচয় মিললো পরে

গত বছরের ১৩ই জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের বাসা থেকে তার অটোরিকশা নিয়ে বের হন ৪৫ বছর বয়সী জব্বার হাওলাদার। আর ফেরেননি। 

তিন দিন পর তার ছেলে মাহবুবুর রহমান থানায় জিডি করেন। ওইদিনই, সোনারগাঁওয়ে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিচয় জানা যায়নি। সুরতহাল আর ময়নাতদন্ত শেষে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশ দাফন হয়ে যায়।

কিছুদিন পর খবর পেয়ে কাঁচপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে যান মাহবুব। মৃতদেহের ছবির আর মোজা দেখে বাবাকে চিনতে পারেন। পরে তদন্তে বের হয়ে আসে অটোরিকশার জন্যই খুন হয়েছেন জব্বার। সাতজন গ্রেপ্তার হয়, যাদের মধ্যে চারজন স্বীকারোক্তি দেয় ১৬৪ ধারায়। অটোরিকশা এবং জব্বারের মোবাইল ফোনও পাওয়া যায় তাদের কাছ থেকে।

মাহবুব তবু বাবার খোঁজ পেয়েছিলেন। সবার ভাগ্যে সেটা যে জোটে না তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট হয়।

নয় মাসে ৪৬০ জন

দাতব্য সংস্থা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম জানাচ্ছে, এই বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু ঢাকাতেই তারা ৪৬০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে।

সবচেয়ে বেশি জুনে, ৬৭টি আর সবচেয়ে কম জানুয়ারিতে, ৩০টি। সেপ্টেম্বর মাসে ৬০টি। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫১টি। এদের মধ্যে ৩১৪ জন পুরুষ, ১১৬ জন নারী এবং ৩০ জন শিশু।

গেলো কয়েক বছর ধরে এই সংখ্যাটি বাড়ছে। ২০২৪ সালে ছিলো ৫৭০টি। ২০২৫ সালে ৬৬৪টি, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

আঞ্জুমানের তথ্য কর্মকর্তা মো. কামরুল আহমেদ বলেন, লাশ যত পচা বা বিকৃতই হোক, তারা মৃত ব্যক্তির ছবি তুলে রাখেন। অনেক সময় স্বজনরা এই ছবি দেখেই চিনতে পারেন। “আবার অনেকে হতাশ হয়েই ফিরে যান।”

একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো দাবিদার না এলে, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ আঞ্জুমান মফিদুলের কাছে চলে যায়।

সব মৃতদেহ খুনের না

ঢাকার শাহবাগ থানা এলাকায় অগাস্ট পর্যন্ত ১১টি অজ্ঞাত মরদেহ পাওয়া গিয়েছে। পরে অনেকেরই পরিচয় পাওয়া গিয়েছে জানিয়ে ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেছেন, “তাদের বেশিরভাগই ফুটপাতে থাকতো। অসুস্থতার কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে।”

সাভার, আশুলিয়া, কেরাণীগঞ্জ আর দোহার এলাকার রাস্তায় ও নদীতে পাওয়া মৃতদেহের কোনোটা সড়ক দুর্ঘটনার, কোনোটা খুনের। আবার মাদকাসক্ত ভবঘুরেদের মৃত্যুও রয়েছে।

তবে মিটফোর্ড ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুইজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক নাম না প্রকাশ করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, পুলিশের মাধ্যমে অজ্ঞাত মৃতদেহ তাদের কাছে প্রায়ই আসে। আর এদের একটা বড় অংশ হত্যাকাণ্ডের শিকার।

নদীতে পাওয়া মৃতদেহ সবচেয়ে বেশি ঢাকায়

নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অগাস্ট, এই আট মাসে নদী থেকে ৩৭৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যার মধ্যে ১০১টির পরিচয় পাওয়া যায়নি।

সবচেয়ে বেশি ঢাকার নদীগুলো থেকে, ৬৯টি। এরপর বরিশাল ৫২, ফরিদপুর ও রাজশাহী থেকে ৪৯টি করে এবং নারায়ণগঞ্জে ৪৭টি।

নৌ পুলিশের সদর দপ্তরের মিডিয়া বিভাগের এসপি মাসুমা আক্তার আলাপ-কে বলেন, “বাংলাদেশের নৌ অধিক্ষেত্রের মধ্যে মরদেহ উদ্ধার আমাদের কাজের অংশ। দীর্ঘদিন পানিতে থাকার কারণে এসব লাশগুলো পচে-গলে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। 

“সেসব লাশও আমরা অনেক সময় নদীপথের দুর্গম এলাকা থেকে উদ্ধার করে জেলা বা সংশ্লিষ্ট মর্গে পাঠাই। হারিয়ে যাওয়া জিডির বর্ণনার সঙ্গে ছবিও মিলিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি সারাদেশে বার্তা পাঠানো হয়। সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারিশ লাশগুলো পৌরসভা মেয়রের মাধ্যমে আঞ্জুমান মফিদুলের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।”

তিনি জানান মৃত্যুর কারণ হিসেবে খুন, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা সবই পাওয়া গিয়েছে। তবে চূড়ান্ত কারণ ময়নাতদন্ত ছাড়া বলা যায় না।

ময়নাতদন্তের পর কোন দাবিদার না এলে যা হয়

ঢাকা উত্তর সিটির এবং সাভার-আশুলিয়া থানার উদ্ধার করা সন্দেহজনক মৃত্যুর মরদেহ যায় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে। আর দক্ষিণ সিটি, কেরাণীগঞ্জ আর দোহার থেকে পাওয়া মরদেহ নেওয়া হয় মিটফোর্ড অথবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খোঁজ নিয়ে জানা যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের হিমঘরে ১৩-১৪টি অজ্ঞাত মরদেহ রয়েছে। যার মধ্যে পাঁচটি নারীর। 

“সবগুলো লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়ে গেছে, কেউ দাবি করতে আসেনি। শিগগিরই আঞ্জুমানের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে,” মর্গের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন।

একই সময় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে ছিল তিনটা অজ্ঞাত মরদেহ।

একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো দাবিদার না এলে, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ আঞ্জুমান মফিদুলের কাছে চলে যায়। ঢাকায় বেওয়ারিশ লাশ দাফন হয় জুরাইন এবং রায়েরবাজারের কবরস্থানে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া না গেলে পুলিশ ডিএনএ’র নমুনা রেখে দেয়।

ঢাকা জেলা পুলিশের এসপি শামীমা পারভীন বলেন একটা মরদেহের পেছনে যে খরচ হয়, সরকারি বরাদ্দ ততোটা না।

“দেখা যায় বেশিরভার সময় মানবিক কারনে পুলিশ সদস্যরা নিজের পকেটের টাকা দিয়ে কাজটি শেষ করেন,” আলাপ-কে বলেন এসপি শামীমা, যিনি বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

সাভার, আশুলিয়া, কেরাণীগঞ্জ আর দোহার এলাকার রাস্তায় ও নদীতে পাওয়া মৃতদেহের কোনোটা সড়ক দুর্ঘটনার, কোনোটা খুনের। আবার মাদকাসক্ত ভবঘুরেদের মৃত্যুও রয়েছে।

এতো মরদেহের পরিচয় কেন মেলে না

পুলিশ বলছে, মরদেহ বিকৃত হয়ে গেলে পরিচয় বের করা কঠিন হয়ে যায় আর তখন তদন্তও জটিল হয়ে যায়।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, বেওয়ারিশ মৃতদেহের সাথে অনেক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অজানা তথ্য জড়িয়ে থাকে। 

“ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক কারণে কিংবা টার্গেটেড কিলিংয়ের পর অপরাধীরা মৃতদেহ গুম করে ফেলতে চায়। তারা মৃতদেহ ফেলে দেয় নদী আর অন্যান্য জলাশয়ে, মহাসড়কে বা নির্জন কোনো জায়গায়, কখনো মাটিতে পুঁতে ফেলে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

মৃতদেহের পরিচয় না মেলায় বেশিরভাগ সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায় মন্তব্য করে তিনি যেসব জায়গায় বারবার মরদেহ মিলছে সেখানে সিসিটিভিসহ অন্যান্য সবধরনের নজরদারি বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছেন।