বাংলাদেশে মানব পাচারের তদন্ত-মামলা বাড়লেও সাজা কমছে: ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট

সরকারি হিসাবে, বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়োগ ব্যয় ৮৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৬২ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তবে অনেক শ্রমিককে এর চেয়েও বেশি অর্থ দিতে হয়। এর মধ্যে আছে দালালের কমিশন, বিমানভাড়া, পাসপোর্ট, ভিসা, চিকিৎসা পরীক্ষা ও অন্যান্য খরচ।

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৯ পিএম

বাংলাদেশে মানব পাচার সম্পর্কিত অপরাধের মামলা ও তদন্ত বাড়লেও, সাজা ও ভুক্তভোগী শনাক্তের সংখ‍্যা কমেছে। ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০২৬ সালের মানবপাচার সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ‍্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তথ‍্য পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে ২০২৪ সালে গত বছর ৭৬ জন মানব পাচারকারী আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ২০২৩ সালে এ সংখ‍্যা ছিলো ১০৩ জন। পাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা কমে ১ হাজার ১৩৫ জনে নেমেছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে মানব পাচারের শিকার হওয়া শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা, তাদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনে সরকারি সহায়তাও কমেছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের বাস্তুচ‍্যুত রোহিঙ্গা ও বিদেশফেরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় ঘাটতি রয়ে গেছে।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানব পাচার বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন এ বছরও বাংলাদেশকে আগের বছরের মতো টিয়ার-টু বা দ্বিতীয় ক‍্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মানব পাচার বন্ধ করতে না পারলেও সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে মানব পাচারবিরোধী আইন শক্তিশালী করা, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বাড়ানো এবং ভুক্তভোগী শনাক্ত করা ও সেবায় সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। তবে একইসাথে মানব পাচার প্রতিরোধ, পাচারকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে।

তদন্ত ও মামলা বাড়লেও দণ্ড কমেছে

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানব পাচারের ঘটনায় ৯৬১টি মামলা তদন্ত করেছে সরকার। এসব মামলায় সন্দেহভাজন ছিলেন ৫ হাজার ২৬৩ জন। আগের প্রতিবেদনে তদন্ত করা মামলার সংখ্যা ছিলো ৮১১।

একই সময়ে ১ হাজার ৭৯৫ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছে। আগের বছর এ সংখ্যা ছিলো ৪৫২। নতুন করে শুরু হওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যে যৌন নির্যাতনের উদ্দেশ্যে মানব পাচারের ঘটনায় ৬০৪ জন, জোরপূর্বক শ্রমের ঘটনায় ৬০০ জন এবং অন্যান্য পাচারের ঘটনায় ৫৯১ জন অভিযুক্ত হয়েছেন।

তবে তদন্ত ও বিচার বাড়লেও দোষী সাব্যস্ত বা সাজা দেওয়ার সংখ‍্যা কমেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালত ও ট্রাইব্যুনালে ৭৬ জন মানব পাচারকারী দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিলো ১০৩ এবং ২০২৩ সালে ৪০৭।

দণ্ড পাওয়া ৭৬ জনের মধ্যে ৩৫ জনকে তিন মাস থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের জরিমানার পরিমাণ পাঁচ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা। বাকি ব্যক্তিদের সাজাসংক্রান্ত তথ্য দেয়নি বাংলাদেশ সরকার।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরাধের গুরুত্বের তুলনায় কারাদণ্ডের পরিবর্তে জরিমানা করার প্রবণতা পাচারকারীদের অপরাধ দমনে কার্যকর প্রতিবন্ধকতা তৈরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া তদন্তে দক্ষতার ঘাটতি, পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহে জটিলতা এবং ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। পুলিশ ও আইনজীবীদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবেও মামলা নিষ্পত্তিতে দেরি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শনাক্ত ভুক্তভোগী কমেছে

মানব পাচারের শিকার হিসেবে সরকার ১ হাজার ১৩৫ জনকে শনাক্ত করেছে। আগের প্রতিবেদনের সময়ে এ সংখ্যা ছিলো ১ হাজার ৪৬২। অর্থাৎ শনাক্ত ভুক্তভোগীর সংখ্যা কমেছে ৩২৭ জন।

শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৯৯ জন যৌন পাচার, ৫১০ জন জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ এবং ৪২৬ জন অন্যান্য ধরনের মানব পাচারের শিকার।

অন্যদিকে, বেসরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আরও ৪ হাজার ৭৫৮ জন মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের যথেষ্ট সরকারি সেবা না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। সরকারি সেবার আওতায় স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকার কথা। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরুষ ভুক্তভোগীদের জন্য সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা কম। ঢাকার বাইরেও এই সেবার সুযোগ সীমিত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ঘাটতি আছে। কখনো কখনো পাচারের শিকার হওয়ার সঙ্গে, সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ঝুঁকিতে

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যৌন ও শ্রম পাচারের ঝুঁকিতে আছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কক্সবাজারের ৩৪টি ক‍্যাম্প ও ভাসানচরে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাস করছেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী পাচারকারীরা রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে ভারত, মালয়েশিয়া ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করছে। তাদের চাকরি বা বিয়ের প্রলোভনও দেখানো হচ্ছে।

রোহিঙ্গা শিশুদের দোকানের কর্মী, জেলে, রিকশাচালক ও গৃহকর্মী হিসেবে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করার তথ্যও প্রতিবেদনে আছে। পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের হাতে রোহিঙ্গা শরণার্থী এমনকি শিশুদেরও জোর করে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অবিশ্বাস, ক‍্যাম্পে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, জীবিকার সুযোগ নিয়ন্ত্রিত থাকা এবং বৈধ কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা তাদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের মানব পাচারের ঘটনায় যথেষ্ট তদন্ত ও বিচার হচ্ছে না। রোহিঙ্গা ক‍্যাম্পে পাচারের অভিযোগ জানানোর সুস্পষ্ট আইনি ব্যবস্থা না থাকায় ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার সুযোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অভিবাসন ব্যয় ও ঋণের ফাঁদ

বিদেশে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাচারের শিকার হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উচ্চ অভিবাসন ব্যয়কে চিহ্নিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার ১৮টি প্রধান শ্রমবাজারের জন্য ব্যয় নির্ধারণ করে দিলেও তা অনেক শ্রমিককে ঋণগ্রস্ত করে ফেলতে পারে। এর বাইরে দালাল বা অবৈধ মধ্যস্থতাকারীদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে গিয়ে অনেক শ্রমিক আরও আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েন।

সরকারি হিসাবে, বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়োগ ব্যয় ৮৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৬২ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তবে অনেক শ্রমিককে এর চেয়েও বেশি অর্থ দিতে হয়। এর মধ্যে আছে দালালের কমিশন, বিমানভাড়া, পাসপোর্ট, ভিসা, চিকিৎসা পরীক্ষা ও অন্যান্য খরচ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট ঋণকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজ করাতে পারে। বিদেশে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক ভুয়া চুক্তি, নির্ধারিত মজুরি না পাওয়া, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং বেতন না পাওয়ার মতো অপরাধের শিকার হন।

মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাচার ও শোষণের ঝুঁকি রয়েছে। নারী অভিবাসী শ্রমিকরা, বিশেষ করে ঘরের কাজে যাওয়া নারীরা, উপসাগরীয় দেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ ঝুঁকিতে থাকেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ ও অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তরুণদের বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাইবার স্ক‍্যামে জড়িয়ে ফেলার ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তাদের পরিচয়পত্র ও বেতন আটকে রেখে এবং ঋণের বোঝা চাপিয়ে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

শিশু শ্রম ও যৌন শোষণের ঝুঁকি

বাংলাদেশে শিশুদের জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন শোষণের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এই রিপোর্টের পর্যালোচনাধীন সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে ৫ হাজার ১২২ শিশুকে সরিয়ে এনেছে। আগের প্রতিবেদনের সময়ে এ সংখ্যা ছিলো ৩ হাজার ৬৯৭।

তবে শিশু শ্রমের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় তা শনাক্ত ও প্রতিরোধে সীমাবদ্ধতা আছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে,বাংলাদেশে শিশু শ্রমের আনুমানিক ৯৩ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে ঘটে। এসব খাতে পরিদর্শন ও নজরদারির ক্ষমতাও সীমিত।

কৃষি, ইটভাটা, নির্মাণ, গৃহকর্ম, মাছ ধরা, পোশাক উৎপাদন, চা-বাগান, রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিশুরা জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকিতে আছে। গৃহহীন শিশুদের একটি অংশকে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি বা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় শিশুদের দিয়ে মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা উৎপাদন ও পরিবহনের ঝুঁকির কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

নতুন আইন ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ

মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের কিছু অগ্রগতির কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে। এতে অভিবাসী চোরাচালানের জন্য পৃথক অধ্যায় যুক্ত করা হয়, শোষণের সংজ্ঞায় জোরপূর্বক অপরাধে নিয়োজিত করাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তদন্তপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়। পরে ২০২৬ সালের এপ্রিলে নির্বাচিত সংসদ বিলটি আইনে পরিণত করে।

এ ছাড়া মানব পাচারের ভুক্তভোগী শনাক্ত করার নির্দেশিকাও হালনাগাদ করা হয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে ডিজিটাল রেফারেল ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। সৌদি আরব, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে শ্রমবিষয়ক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে।

শিশু শ্রমের জন্য জরিমানা বাড়ানো এবং জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ করার মতো আইনি পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনের মূল্যায়ন হলো, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর দণ্ড নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের যথাযথভাবে শনাক্ত ও পুনর্বাসন করা, রোহিঙ্গাদের বিচার পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো এবং অভিবাসন ব্যয়জনিত ঋণের ফাঁদ কমানো জরুরি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মানব পাচার প্রতিরোধে আইনি কাঠামো উন্নত হলেও আইন প্রয়োগ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।