বিশ্বকাপ ফুটবলে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের অভিযোগ, প্রশ্নবিদ্ধ ফিফা

ট্রাম্পের ফোনকলের পর ব্যালাগুনের উপর থেকে ফিফার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত এখন এক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ সরাসরি প্রমাণিত না হলেও বিশ্বজুড়ে টুর্নামেন্টের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

ফুটবল বিশ্বকাপই বোধহয় একমাত্র ঘটনা, যার সাথে গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দৃশ্যত কোনো সম্পর্ক ছিলো না। 

কিন্তু এই বিশ্বকাপ থেকেও দূরে থাকতে পারলেন না ডনাল্ড ট্রাম্প। আলোচনায় এসেছেন নিজ দেশের খেলোয়াড় ফলারিন ব্যালাগুনকে নিয়ে। 

লাল কার্ড পেয়ে সোমবারে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে পারার কথা ছিলো না ব্যালাগুনের। কিন্তু ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে সেই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এসেছে। আর এরপরই শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। 

অভিযোগ উঠছে, ব্যালাগুনের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ট্রাম্পের আহ্বানে তাকে খেলার সুযোগ দিচ্ছে ফিফা। এর ফলে ট্রাম্প ও ফিফা প্রধানের সম্পর্ক নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। 

ট্রাম্প কীভাবে আলোচনায়

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যালাগুনের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনোর সাথে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। তার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল খেলোয়াড় ফলারিন ব্যালাগুনের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ফিফা। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার অনুমতি পান তিনি।

বিশ্বকাপ নিয়ে সময়ে সময়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হলেও, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক এই প্রথম।

রবিবার ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। লিখেছেন, “ঠিক কাজ এবং বড় অন্যায় সংশোধন করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ! প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড জে. ট্রাম্প।” 

ট্রাম্পের ফোনকলের পর ব্যালাগুনের উপর থেকে ফিফার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত এখন এক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ সরাসরি প্রমাণিত না হলেও বিশ্বজুড়ে টুর্নামেন্টের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। 

বিশ্বকাপ নিয়ে সময়ে সময়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হলেও, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক এই প্রথম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করছে সিএনএন।  

বেলজিয়ামের রয়্যাল ফুটবল ফেডারেশন অভিযোগ করেছে, ম্যাচের আগে এমন সিদ্ধান্ত ফিফার নিয়ম ভঙ্গ করেছে এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। 

বেলজিয়াম জাতীয় দলের কোচ রুডি গারসিয়া বলেন, তাদের ফেডারেশন শুধু জাতীয় মর্যাদা নয়, ফুটবলের সামগ্রিক সততা ও নৈতিকতা রক্ষার জন্য পদক্ষেপ নেবে।

কেন লাল কার্ড পেয়েছিলেন ব্যালাগুন

বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ফলারিন ব্যালাগুনকে লাল কার্ড দেখিয়ে বের করে দেওয়া হয়। ফলে পরের ম্যাচে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে।   

বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ।

গত সপ্তাহের সেই ম্যাচে বসনিয়ান খেলোয়াড় তারিক মুখারিমোভিচের পায়ের পেছনে আঘাত করেন ব্যালাগুন। ঘটনাটি প্রথমে গুরুতর মনে না হলেও ভিডিও রিভিউতে বিপজ্জনক এই আঘাত স্পষ্ট দেখা যায়। পরে ব্যালাগুনকে লাল কার্ড দেখানো হয়।  

তবে অনেকেই বলছেন, প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়কে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করেনি ব্যালাগুন। তাদের দাবি, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি ব্যবস্থার কারণে ব্যালাগুন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারণ, ধীরগতির ভিডিওতে অনেক সময় ঘটনাগুলো বাস্তবের চেয়ে বেশি ভয়াবহ মনে হয়।

সিদ্ধান্ত পরিবর্তন নিয়ে কী বলছে ফিফা

ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি তাদের বিধির ২৭ নম্বর ধারা ব্যবহার করে ব্যালাগুনের উপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ধারা অনুযায়ী, ডিসিপ্লিনারি কমিটি কোনো খেলোয়াড়ের শাস্তি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে স্থগিত করতে পারে। 

ব্যালাগুনের ক্ষেত্রে লাল কার্ড বহাল আছে এবং ভবিষ্যতে আবারও অপরাধ করলে তখন এই শাস্তিসহ আরও নতুন শাস্তিও হতে পারে।  

বসনিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচের পর ফিফা অবশ্য জানিয়েছিলো, যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল দলের এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপিলের কোনো সুযোগ নেই এবং ব্যালাগুন পরবর্তী ম্যাচে খেলতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্ত দলটির জন্য বড় একটা ধাক্কা ছিলো। কারণ ব্যালাগুনই ছিলো দলের শীর্ষ খেলোয়াড়। 

কিন্তু রবিবার হঠাৎ করেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় ফিফা। নতুন সিদ্ধান্তের কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি ফুটবলের শীর্ষ সংস্থাটি, যা সমালোচনার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।  

অনেকেই মনে করছেন, ফিফার এই সিদ্ধান্তের পেছনে ট্রাম্পের হাত আছে। কারণ, তিনি ফিফা প্রেসিডেন্টকে ফোন করার পরই যুক্তরাষ্ট্রের এই খেলোয়াড়কে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো কেমিস্ট্রি

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। সাথে এসেছে ফিফা প্রধানের সাথে তার সম্পর্ক। সিএনএন এই সম্পর্ককে ‘ব্রোমেন্স’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। 

জিয়ানি ইনফান্তিনোকে প্রায়ই ট্রাম্পের পাশে দেখা যায়। এমনকি তিনি ২০২৫ সালে মিশরে গাজা শান্তি সম্মেলনেও উপস্থিত ছিলেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শপথ অনুষ্ঠানের পর ইনফান্তিনো ইনস্টাগ্রামে লিখেছিলেন, “আমরা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নয়, পুরো বিশ্বকে মহান করে তুলবো।”

জিয়ানি ইনফান্তিনোকে প্রায়ই ট্রাম্পের পাশে দেখা যায়।

ইনফান্তিনো আগেও বিভিন্ন বিতর্কের মুখে পড়েছেন। যার মধ্যে আছে কাতারে বিশ্বকাপ আয়োজনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ সৌদি আরবকে আয়োজন করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। 

ট্রাম্প শান্তিতে নোবেল পুরস্কার না পেলে ফিফা প্রধান তাকে ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ দেন, যা এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে। 

ট্রাম্পের সাথে জিয়ানির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে যখন নানা দিকে নানা সমালোচনা চলছে, তখন জিয়ানি যুক্তি দেন, আয়োজক দেশের নেতার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা ফিফা প্রধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফিফার এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরও বেশি লক্ষণীয়, কারণ ২০১৫ সালে ফিফার সবচেয়ে বড় দুর্নীতি কেলেঙ্কারি উন্মোচন করেছিলো যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

এই ঘটনার পর ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অন্যান্য প্রভাবশালী দেশের নেতারাও কি চাপ সৃষ্টি করে ফিফার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেকেই। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পর বিশ্বকাপের পরের যেকোনো সিদ্ধান্ত বাড়তি নজরদারি ও বিতর্কের মুখে পড়বে।