হোয়াইট হাউসে ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যক্তিগত আয়ের রেকর্ড বৃদ্ধি ঘিরে বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, এক বছরে তিনি ২.২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছেন, যার বড় অংশই এসেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে, যার সমালোচনা আগে তিনি নিজেই করেছিলেন।
তানজিলা রহমান
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএমআপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই নজিরবিহীন ‘প্রেসিডেন্সিয়াল প্রফিট’ অর্জনের খতিয়ান এটিই প্রমাণ করে যে, আমেরিকার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কার্যালয়কে তিনি একটি ব্যক্তিগত পারিবারিক ব্যবসায়িক সংস্থায় রূপান্তর করেছেন। ছবি: এআই
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে আলোচনায় আসলেন তার সম্পদ নিয়ে।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ৯২৭ পৃষ্ঠার ব্যক্তিগত আর্থিক বিবরণী থেকে জানা গেছে, ট্রাম্প গত এক বছরে ২২০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি আয় করেছেন। অথচ প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি পছন্দ করেন না। অথচ ক্রিপ্টোতেই গড়েছেন সম্পদ।
২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছিলেন, "আমি বিটকয়েন বা অন্য কোনো ক্রিপ্টোকারেন্সির ভক্ত নই। এগুলো কোনো আসল টাকা নয়, এর কোনো ভিত্তি নেই।"
২০২১ সালেও ফক্স বিজনেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সিকে একটি স্ক্যাম বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সে সময় তার অ্যাকাউন্টে ছিলো মাত্র ১০ থেকে ৫০ লাখ ডলার মূল্যের সামান্য কিছু ইথেরিয়াম টোকেন।
অথচ ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণা থেকে শুরু করে ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর ট্রাম্পের এই অবস্থানে পরিবর্তন আসে।
হঠাৎ করেই তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে কথা বলা শুরু করেন। গত বছর জুনে মার-এ-লাগোতে ক্রিপ্টো বিশেষজ্ঞদের সাথে বৈঠকের পর তিনি বাইডেন প্রশাসনের ক্রিপ্টো-নীতির সমালোচনা করেন। একে চীন ও রাশিয়ার জন্য সুবিধাজনক বলে উল্লেখ করেন।
এমনকি ন্যাশভিলের এক বিটকয়েন সম্মেলনে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি আমেরিকাকে ক্রিপ্টোর রাজধানী এবং বিশ্বের বিটকয়েন পরাশক্তি বানাবেন। এর পরপরই শুরু হয় তার নির্বাচনি প্রচারে অফিশিয়ালি ক্রিপ্টো অনুদান নেওয়া।
যেভাবে ক্রিপ্টো সাম্রাজ্যের শুরু
এই ক্রিপ্টো সাম্রাজ্যের শুরু হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে। ট্রাম্প ও তার পরিবারের মালিকানাধীন কোম্পানি ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’-এ চীনা বংশোদ্ভূত ক্রিপ্টো ধনকুবের জাস্টিন সান প্রথমে ৩ কোটি ডলার এবং পরবর্তীতে আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারসহ মোট সাড়ে সাত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেন।
সে সময় সানের এই বিনিয়োগকে অনেকেই ‘ঘুষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। কারণ, ৩৪ বছর বয়সী জাস্টিন সান তখন মার্কিন ফেডারেল আদালতের অধীনে জালিয়াতি, বাজার কারসাজি এবং অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিক্রির মতো গুরুতর ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। এমনকি অভিনেত্রী ও গায়ক লিন্ডসে লোহান বা পর্ন তারকা কেন্দ্রা লাস্টের মতো তারকাদের গোপনে অর্থ দিয়ে অবৈধ ক্রিপ্টো প্রচারণার অভিযোগও ছিলো তার বিরুদ্ধে।
তবে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মার্কিন শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সানের সাথে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। সানের বিরুদ্ধে ৩১ মিলিয়ন ডলারের জালিয়াতির অভিযোগ থাকার পরও গত মার্চ মাসে মাত্র ১০ মিলিয়ন ডলারের সামান্য জরিমানার বিনিময়ে তার সমস্ত ফৌজদারি চার্জ ড্রপ করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনাটি ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সানের কোনো গোপন সুবিধা বিনিময়ের চুক্তির দিকেই আঙুল তোলে।
তবে ট্রাম্প ও সানের এই কোটি কোটি ডলারের অংশীদারিত্বের ব্যবসাটি বেশিদিন টিকেনি। গত এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের কোম্পানি ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি’-র বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা করেন জাস্টিন সান।
সানের অভিযোগ, ট্রাম্পের ছেলেরা তাকে জোরপূর্বক আরও ২০ কোটি ডলারের স্ট্যাবলকয়েন কিনতে বাধ্য করেছিলেন। পরবর্তীতে অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের টোকেন লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হলেও, সানের টোকেনগুলো ফ্রিজ করে রাখা হয়। ক্ষুব্ধ সান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে ‘ওয়ার্ল্ড টিরানি’ বা ‘বিশ্ব স্বৈরাচার’ বলে আখ্যা দেন। পাল্টা জবাবে ওয়ার্ল্ড লিবার্টিও সানের বিরুদ্ধে মানহানি ও টোকেনের দাম কৃত্রিমভাবে কমানোর ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে।
সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের আয়ের ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারই এসেছে ক্রিপ্টো টোকেন থেকে। এর মধ্যে শুধু ‘$TRUMP’ নামের একটি ‘মিমকয়েন’ বিক্রি করেই ট্রাম্প প্রায় ৬০ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। বাস্তবে এই মিমকয়েনের কোনো অস্তিত্ব নেই।
দ্য নিউ ইয়র্কারের একটি প্রতিবেদন বলছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগের রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসক পরিবারের কাছে গোপনে ওয়ার্ল্ড লিবার্টির অর্ধেক মালিকানা প্রায় ২৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে বিক্রি করে দেন ট্রাম্প ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত আমেরিকার থেকে যেসব বড় বড় সুবিধা পেয়েছে তার অন্যতম কারণ হতে পারে এই গোপন লেনদেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ‘বাইনান্স’-এর মালিক চ্যাংপেং ঝাওয়ের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে ট্রাম্পের। চ্যাংপেং দীর্ঘদিন ধরে অর্থ পাচারের দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন।
দ্য নিউ ইয়র্কারের প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্প বিশেষ ক্ষমতাবলে চ্যাংপেং-এর সাজা মওকুফ করে দেন। এরপরই বাইনান্সের সাথে ট্রাম্পের কোম্পানির একটি পার্টনারশিপ গড়ে ওঠে।
পাশাপাশি, দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বড় বড় মিডিয়া কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। বিনিময়ে ট্রাম্প গত বছর ৮ কোটি ডলারের বেশি কামিয়েছেন। এমনকি কাতারের আমিরের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া ৪০ কোটি ডলারের একটি বিলাসবহুল বোয়িং ৭৪৭ বিমানকে ট্রাম্প তার নতুন ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় বিমান হিসেবে ব্যবহার করছেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণার সময় ট্রাম্প এবং তার দুই ছেলে, ডন জুনিয়র ও এরিক, সাধারণ ও মধ্যবিত্ত আমেরিকান বিনিয়োগকারীদের বারবার অনুরোধ করেছিলেন ক্রিপ্টোতে বিনিয়োগ করতে।
ডন জুনিয়র এক ভাষণে বলেছিলেন, “প্রত্যেক সাধারণ আমেরিকান যেন যত বেশি সম্ভব ক্রিপ্টো কিনে রাখেন।“
বিটকয়েনের দাম ১০ লাখ ডলারে পৌঁছাবে বলে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেছিলেন তারা।
অথচ বাস্তব চিত্র এখন সম্পূর্ণ উল্টো। ট্রাম্প যতই বিলিয়ন ডলারের মালিক হচ্ছেন, তার ওপর ভরসা করা সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং তার রাজনৈতিক সমর্থকরা এখন পথের ভিখারি হওয়ার উপক্রম হয়েছেন।
ট্রাম্পের ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি’ টোকেনের দাম ৮০ শতাংশের বেশি কমে এখন ৬ সেন্টের নিচে নেমে গেছে।
দ্য নিউ ইয়র্কারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প মিমকয়েনের দাম ৭৫ ডলার থেকে ধসে মাত্র ১ ডলার ৭০ সেন্টে ঠেকেছে।
বিটকয়েনের দাম কমেছে ৬০ শতাংশের বেশি।
ট্রাম্পের ছেলেদের নিজস্ব কোম্পানি ‘আমেরিকান বিটকয়েন’ এবং ট্রুথ সোশ্যাল পরিচালনাকারী ‘ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলোজি গ্রুপ’-এর শেয়ারের দাম পড়েছে ৯০ শতাংশেরও বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই নজিরবিহীন ‘প্রেসিডেন্সিয়াল প্রফিট’ অর্জনের খতিয়ান এটিই প্রমাণ করে যে, আমেরিকার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কার্যালয়কে তিনি একটি ব্যক্তিগত পারিবারিক ব্যবসায়িক সংস্থায় রূপান্তর করেছেন।
‘পছন্দ নয়’ তারপরও বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো সাম্রাজ্য ট্রাম্পের
হোয়াইট হাউসে ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যক্তিগত আয়ের রেকর্ড বৃদ্ধি ঘিরে বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, এক বছরে তিনি ২.২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছেন, যার বড় অংশই এসেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে, যার সমালোচনা আগে তিনি নিজেই করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে আলোচনায় আসলেন তার সম্পদ নিয়ে।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ৯২৭ পৃষ্ঠার ব্যক্তিগত আর্থিক বিবরণী থেকে জানা গেছে, ট্রাম্প গত এক বছরে ২২০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি আয় করেছেন। অথচ প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি পছন্দ করেন না। অথচ ক্রিপ্টোতেই গড়েছেন সম্পদ।
২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছিলেন, "আমি বিটকয়েন বা অন্য কোনো ক্রিপ্টোকারেন্সির ভক্ত নই। এগুলো কোনো আসল টাকা নয়, এর কোনো ভিত্তি নেই।"
২০২১ সালেও ফক্স বিজনেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সিকে একটি স্ক্যাম বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সে সময় তার অ্যাকাউন্টে ছিলো মাত্র ১০ থেকে ৫০ লাখ ডলার মূল্যের সামান্য কিছু ইথেরিয়াম টোকেন।
অথচ ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণা থেকে শুরু করে ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর ট্রাম্পের এই অবস্থানে পরিবর্তন আসে।
হঠাৎ করেই তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে কথা বলা শুরু করেন। গত বছর জুনে মার-এ-লাগোতে ক্রিপ্টো বিশেষজ্ঞদের সাথে বৈঠকের পর তিনি বাইডেন প্রশাসনের ক্রিপ্টো-নীতির সমালোচনা করেন। একে চীন ও রাশিয়ার জন্য সুবিধাজনক বলে উল্লেখ করেন।
এমনকি ন্যাশভিলের এক বিটকয়েন সম্মেলনে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি আমেরিকাকে ক্রিপ্টোর রাজধানী এবং বিশ্বের বিটকয়েন পরাশক্তি বানাবেন। এর পরপরই শুরু হয় তার নির্বাচনি প্রচারে অফিশিয়ালি ক্রিপ্টো অনুদান নেওয়া।
যেভাবে ক্রিপ্টো সাম্রাজ্যের শুরু
এই ক্রিপ্টো সাম্রাজ্যের শুরু হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে। ট্রাম্প ও তার পরিবারের মালিকানাধীন কোম্পানি ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’-এ চীনা বংশোদ্ভূত ক্রিপ্টো ধনকুবের জাস্টিন সান প্রথমে ৩ কোটি ডলার এবং পরবর্তীতে আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারসহ মোট সাড়ে সাত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেন।
সে সময় সানের এই বিনিয়োগকে অনেকেই ‘ঘুষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। কারণ, ৩৪ বছর বয়সী জাস্টিন সান তখন মার্কিন ফেডারেল আদালতের অধীনে জালিয়াতি, বাজার কারসাজি এবং অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিক্রির মতো গুরুতর ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। এমনকি অভিনেত্রী ও গায়ক লিন্ডসে লোহান বা পর্ন তারকা কেন্দ্রা লাস্টের মতো তারকাদের গোপনে অর্থ দিয়ে অবৈধ ক্রিপ্টো প্রচারণার অভিযোগও ছিলো তার বিরুদ্ধে।
তবে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মার্কিন শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সানের সাথে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। সানের বিরুদ্ধে ৩১ মিলিয়ন ডলারের জালিয়াতির অভিযোগ থাকার পরও গত মার্চ মাসে মাত্র ১০ মিলিয়ন ডলারের সামান্য জরিমানার বিনিময়ে তার সমস্ত ফৌজদারি চার্জ ড্রপ করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনাটি ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সানের কোনো গোপন সুবিধা বিনিময়ের চুক্তির দিকেই আঙুল তোলে।
তবে ট্রাম্প ও সানের এই কোটি কোটি ডলারের অংশীদারিত্বের ব্যবসাটি বেশিদিন টিকেনি। গত এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের কোম্পানি ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি’-র বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা করেন জাস্টিন সান।
সানের অভিযোগ, ট্রাম্পের ছেলেরা তাকে জোরপূর্বক আরও ২০ কোটি ডলারের স্ট্যাবলকয়েন কিনতে বাধ্য করেছিলেন। পরবর্তীতে অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের টোকেন লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হলেও, সানের টোকেনগুলো ফ্রিজ করে রাখা হয়। ক্ষুব্ধ সান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে ‘ওয়ার্ল্ড টিরানি’ বা ‘বিশ্ব স্বৈরাচার’ বলে আখ্যা দেন। পাল্টা জবাবে ওয়ার্ল্ড লিবার্টিও সানের বিরুদ্ধে মানহানি ও টোকেনের দাম কৃত্রিমভাবে কমানোর ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে।
সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের আয়ের ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারই এসেছে ক্রিপ্টো টোকেন থেকে। এর মধ্যে শুধু ‘$TRUMP’ নামের একটি ‘মিমকয়েন’ বিক্রি করেই ট্রাম্প প্রায় ৬০ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। বাস্তবে এই মিমকয়েনের কোনো অস্তিত্ব নেই।
দ্য নিউ ইয়র্কারের একটি প্রতিবেদন বলছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগের রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসক পরিবারের কাছে গোপনে ওয়ার্ল্ড লিবার্টির অর্ধেক মালিকানা প্রায় ২৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে বিক্রি করে দেন ট্রাম্প ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত আমেরিকার থেকে যেসব বড় বড় সুবিধা পেয়েছে তার অন্যতম কারণ হতে পারে এই গোপন লেনদেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ‘বাইনান্স’-এর মালিক চ্যাংপেং ঝাওয়ের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে ট্রাম্পের। চ্যাংপেং দীর্ঘদিন ধরে অর্থ পাচারের দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন।
দ্য নিউ ইয়র্কারের প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্প বিশেষ ক্ষমতাবলে চ্যাংপেং-এর সাজা মওকুফ করে দেন। এরপরই বাইনান্সের সাথে ট্রাম্পের কোম্পানির একটি পার্টনারশিপ গড়ে ওঠে।
পাশাপাশি, দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বড় বড় মিডিয়া কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। বিনিময়ে ট্রাম্প গত বছর ৮ কোটি ডলারের বেশি কামিয়েছেন। এমনকি কাতারের আমিরের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া ৪০ কোটি ডলারের একটি বিলাসবহুল বোয়িং ৭৪৭ বিমানকে ট্রাম্প তার নতুন ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় বিমান হিসেবে ব্যবহার করছেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণার সময় ট্রাম্প এবং তার দুই ছেলে, ডন জুনিয়র ও এরিক, সাধারণ ও মধ্যবিত্ত আমেরিকান বিনিয়োগকারীদের বারবার অনুরোধ করেছিলেন ক্রিপ্টোতে বিনিয়োগ করতে।
ডন জুনিয়র এক ভাষণে বলেছিলেন, “প্রত্যেক সাধারণ আমেরিকান যেন যত বেশি সম্ভব ক্রিপ্টো কিনে রাখেন।“
বিটকয়েনের দাম ১০ লাখ ডলারে পৌঁছাবে বলে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেছিলেন তারা।
অথচ বাস্তব চিত্র এখন সম্পূর্ণ উল্টো। ট্রাম্প যতই বিলিয়ন ডলারের মালিক হচ্ছেন, তার ওপর ভরসা করা সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং তার রাজনৈতিক সমর্থকরা এখন পথের ভিখারি হওয়ার উপক্রম হয়েছেন।
ট্রাম্পের ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি’ টোকেনের দাম ৮০ শতাংশের বেশি কমে এখন ৬ সেন্টের নিচে নেমে গেছে।
দ্য নিউ ইয়র্কারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প মিমকয়েনের দাম ৭৫ ডলার থেকে ধসে মাত্র ১ ডলার ৭০ সেন্টে ঠেকেছে।
বিটকয়েনের দাম কমেছে ৬০ শতাংশের বেশি।
ট্রাম্পের ছেলেদের নিজস্ব কোম্পানি ‘আমেরিকান বিটকয়েন’ এবং ট্রুথ সোশ্যাল পরিচালনাকারী ‘ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলোজি গ্রুপ’-এর শেয়ারের দাম পড়েছে ৯০ শতাংশেরও বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই নজিরবিহীন ‘প্রেসিডেন্সিয়াল প্রফিট’ অর্জনের খতিয়ান এটিই প্রমাণ করে যে, আমেরিকার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কার্যালয়কে তিনি একটি ব্যক্তিগত পারিবারিক ব্যবসায়িক সংস্থায় রূপান্তর করেছেন।
বিষয়: