ইউরোপজুড়ে চলমান ভয়াবহ তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। পশ্চিম ইউরোপের তাপপ্রবাহ এখন ছড়িয়ে পড়েছে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপেও।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে, ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। একের পর এক দেশে ভাঙছে তাপমাত্রার রেকর্ড, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, আর সেই সঙ্গে চাপের মুখে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থা।
অন্যদিকে বিবিসি জানাচ্ছে, ইউরোপজুড়ে জুনের শেষ সপ্তাহে শুধু ফ্রান্সেই ২ হাজার ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির জনস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ২২ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা আগের সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ।
ফরাসি স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট বিবিসিকে বলেছেন, ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। একই সময়ে বেলজিয়ামেও ১ হাজার ২২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, তাপপ্রবাহের সময় এতো বেশি মৃত্যু এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
গণমাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, বর্তমানে ইউরোপে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করছেন।
সংস্থাটির মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অধিকাংশ স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও পড়েছে চাপের মুখে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে একসময় যে তাপপ্রবাহকে ‘প্রজন্মে একবার’ ঘটার ঘটনা বলা হতো, এখন সেটি প্রায় প্রতি বছরই ঘটছে। ইউরোপের ঘরবাড়ি, কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমন তাপমাত্রা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

ফ্রান্সে মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ২৫
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী তীব্র গরমে ফ্রান্সে মৃত্যুর সংখ্যা ২ হাজার ২৫ ছাড়িয়েছে।
ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা বলছে, দেশের অধিকাংশ এলাকায় কিছুটা কমেছে তীব্র গরম।
ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট বিবিসিকে বলেছেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত প্রভাব আরও প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতি এখনো শেষ হয়নি।“
জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র ও অস্ট্রিয়ায় তাপমাত্রার রেকর্ড
গরমের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে আবহাওয়াবিদরা একে “অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ” হিসেবে রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে আরও জানায়, জার্মানিতে টানা কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠেছে। পোল্যান্ডে তাপমাত্রা পৌঁছে গেছে ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা দেশটির আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
একইভাবে চেক প্রজাতন্ত্রে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ছাড়িয়ে গেছে ২০২১ সালের আগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাকেও। অস্ট্রিয়াতেও তাপমাত্রা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে।
রয়টার্সকে বিশেষজ্ঞরা জানায়, এই পরিস্থিতি সতর্ক করছে যে ইউরোপ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে দ্রুত প্রভাবিত অঞ্চলের একটি। শুধু সাময়িক সতর্কতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছাড়া এই ধরনের তাপপ্রবাহ সামাল দেওয়া ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্রেও তীব্র তাপপ্রবাহের সতর্কতা
ইউরোপের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলেও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। দেশটির পূর্ব উপকূলজুড়ে কয়েক কোটি মানুষ চরম গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা (এনডব্লিউএস) সতর্ক করেছে, আগামী কয়েকদিন ওয়াশিংটন ডিসি, ফিলাডেলফিয়া ও নিউ ইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আর্দ্রতার কারণে অনুভূত তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১১৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত হতে পারে।
এই তাপপ্রবাহ এমন সময়ে আঘাত হেনেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ৪ই জুলাই স্বাধীনতা দিবস পালন হবে। একইসঙ্গে চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ।
নদী, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কৃষিতেও প্রভাব
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়েছে ইউরোপের নদীগুলোতেও। নদীর পানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি পানির তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষি খাত সমস্যার মুখে পড়েছে।
ইতালির সবচেয়ে বড় নদী পো-এর পানির প্রবাহ এতটাই কমে গেছে যে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রায় ১৮ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এতে কৃষি ও সংরক্ষিত জলাভূমি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ইতালির ২২টি শহরে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ 'রেড হিট অ্যালার্ট'।
ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং আলবেনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দাবানলের ঘটনাও ঘটেছে। বলকান অঞ্চলের অনেক দেশ এখনও তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে রয়েছে।
পশ্চিম ইউরোপে সাময়িক স্বস্তি, সামনে নতুন তাপপ্রবাহ
ফ্রান্স, জার্মানি ও চেকিয়ার কিছু এলাকায় বজ্রঝড়ের কারণে তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা। তবে ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এখনও তাপপ্রবাহের সতর্কতা বহাল রয়েছে।
ফরাসি স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট বলেছেন, তাপমাত্রা কমে গেলেও এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব অন্তত ১০ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।
তবে এই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হবে না। ইতালির বিমানবাহিনীর আবহাওয়াবিদ দানিয়েলে মোচিও জানিয়েছেন, ৫ জুলাই থেকে ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইতালি, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের কিছু অংশে আবারও নতুন করে তীব্র গরমের ঢেউ আঘাত হানতে পারে।
(রয়টার্স ,বিবিসি ও আল-জাজিরার অবলম্বনে)



