যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ১৪ দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তি: বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মোড়, বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারকে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ এবং ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে লেবানন সংকট, হরমুজ প্রণালি ঘিরে চুক্তিটির বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ১৮ জুন ২০২৬, ০৪:১২ পিএমআপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি: মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক সমীকরণের নতুন অধ্যায়
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার অবসানে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছে। চুক্তিতে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে, বিশেষ করে লেবানন পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও ইসরায়েলের অবস্থানকে কেন্দ্র করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
বুধবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়ে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি এখন থেকেই কার্যকর।
ফ্রান্সে জি সেভেন সম্মেলন চলাকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।
১৪ দফা সম্বলিত এই চুক্তিকে বলা হচ্ছে সমঝোতা স্মারক। সেখানে বলা আছে, ইরান কখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না। একইসঙ্গে তাদের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়া হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই চুক্তিকে ‘পারফর্মেন্স বেসড’ বলা হচ্ছে। অর্থাৎ যদি ইরান এই চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলে তবেই তারা সুবিধা পাবে।
চুক্তি কতটা কার্যকর হবে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলোচনাকে বিপন্ন করতে পারে এমন তিনটি বড় শঙ্কা রয়েছে। লেবানন, হরমুজ প্রণলি ও ইসরায়েলের অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেবানন
দুই পক্ষ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। চুক্তিতে লেবাননকেও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে তার ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করা হয়।
তবে ডনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সে জি-সেভেন সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে "লেবাননের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার" কথা বলার পরও ইসরায়েল লেবাননে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে।
হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি নিয়ে পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেখানে প্রতিদিন মাত্র ১৫ থেকে ২০টি জাহাজ চলাচল করছে, তাও অনেকটা সীমিত ও গোপনভাবে। এখনো কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাদের মতে, বৈশ্বিক শিপিং কোনো রাজনৈতিক ঘোষণার ওপর চলে না। এটা বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, আর সেই বাস্তবতা এখনো অনিশ্চিত।
অক্সিলাম ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রেসিডেন্ট ইয়ান রালবি বলেছেন, “খুবই ধীরে ধীরে জাহাজ চলছে। দিনে হয়তো ১৫ থেকে ২০টি। পরিস্থিতি এখনো পাল্টায়নি। এই সপ্তাহ হয়তো এমনই থাকবে।”
“জাহাজের চলাচল শুধু কথাতেই চলে না। বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নিতে হবে। আর দুঃখের বিষয় হচ্ছে বাস্তবতা অনিশ্চত,” বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
ইসরায়েলের অবস্থান
ইসরায়েল নিয়েও বিশ্লেষকদের মন্তব্য এসেছে। চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ইসরায়েলের ভবিষ্যত ভূমিকা মূলত যুক্তরাষ্ট্রই ঠিক করবে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলে এখন একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে—গত কয়েক বছরে এত সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও দেশটি আসলে কী অর্জন করেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরান নিয়ে আলোচনায় ইসরায়েলকে অনেকটাই পাশ কাটানো হয়েছে, এবং ভবিষ্যত আলোচনায় তাদের ভূমিকা সীমিত হতে পারে।
তার মতে, ইসরায়েলের ভেতরে এখন এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে সামগ্রিকভাবে এই যুদ্ধের ফলাফল তেমন সফল হয়নি। কারণ সরকারের ঘোষিত বড় লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই অর্জিত হয়নি। যেমন, ইরানে শাসন পরিবর্তন, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ওপর প্রভাব কমানো সবকিছু বলা চলে আগের অবস্থানেই আছে ইরান।
চীন-রাশিয়ার প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি বা সাময়িক চুক্তি গঠনের পেছনে শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানই নয়, বরং চীন ও রাশিয়ারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই দুই দেশের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ট্রাম্পের সফরের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই বেইজিং সফর করেন। এই সময়টা অনেক বিশ্লেষকের কাছে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।
চীন আবার পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র, আর পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। গত মাসে চীনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফকে স্বাগত জানানো হয়, যেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতিও আলোচনায় আসে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার অধ্যাপক চেন জিয়ে বলেন, চীন এই শান্তি চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, চীন দ্রুত এই অঞ্চলে শান্তি চায়, কারণ পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল–গ্যাস সরবরাহের ওপর দেশটি অনেকটা নির্ভরশীল। এটি বাস্তবতা, যা সহজে বদলানো যায় না।
অস্ট্রিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভেলিনা টচাকারোভা বলেন, রাশিয়া ও চীন শুধু পাশ থেকে দেখেনি, বরং ইরানের আলোচনার অবস্থান তৈরি করতেও সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং, মস্কো ও তেহরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠক হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘেও তারা সমন্বিতভাবে কাজ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, রাশিয়া ও চীন ইরানকে সমর্থন দিয়ে গেছে, এমনকি চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও।
যা আছে চুক্তিতে
১. যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ
সমঝোতা স্মারকের প্রথম পয়েন্টেই বলা হয়েছে যে সব ধরনের যুদ্ধ বন্ধ হবে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা সব ধরনের যুদ্ধ ও আক্রমণ বন্ধ করবে, এমনকি লেবাননের মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকাতেও তারা আর কোনো আক্রমণ করতে পারবে না।
লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি আগ্রাসন নিয়ে বারবারই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তার শঙ্কা এই অভিযানের কারণে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে যেতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, লেবাননে ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের সামরিক অভিযান সমঝোতার লঙ্ঘন হবে এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সমঝোতায় বলা আছে, “এখন থেকে কোনো পক্ষই কোনো সামরিক অভিযান চালাবে না বা কাউকে হুমকি দেবে না, এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখা হবে। আর চূড়ান্ত চুক্তিতে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা হবে।
তবে ইসরায়েল এই পয়েন্ট নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া জানাবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২. একে অপরের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা:
সমঝোতার দ্বিতীয় দফায় বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে। তারা একে অপরের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
ইরানে যারা সরকারবিরোধী আন্দোলন করছিলেন তাদের জন্য এই শর্ত বড় ধরনের ধাক্কা বলে জানিয়েছে বিবিসি। ২০২৬ সালেই ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কাছে নেতিবাচকভাবে দেখা হতে পারে।
দুই দেশের নেতারা সমঝোতা স্মারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করার পর থেকেই ৬০ দিনের এই সময় গণনা শুরু হয়েছে।
হোয়াইট হাউস বিবিসিকে জানিয়েছে, বুধবার রাতে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে জি৭ সম্মেলন পরবর্তী এক নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরান-সংক্রান্ত এই নথিতে স্বাক্ষর করেন।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এতে স্বাক্ষর করেছেন।
এর আগে ট্রাম্প এবং ইরানি কর্মকর্তারা এ সপ্তাহের শেষ দিকে জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এখন সেটি হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
৪. নৌ-অবরোধ ও সামরিক চাপ কমানো:
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থাকা নৌ-অবরোধ তুলে নেবে এবং ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে। চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করবে। এই দিন গণনাও শুরু হয়েছে।
এই সময় যুক্তরাষ্ট্র কিছু সীমিত জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে। এবংযুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনা ইরানের কাছাকাছি এলাকা থেকে সরিয়ে নেবে।
৫. হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা
চুক্তির পঞ্চম দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্বাক্ষরের পর ইরান চেষ্টা করবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে পারে। এখানে কোনো ফি নেওয়া হবে না।
যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম তীব্রভাবে বেড়ে যায়। তাই প্রণালিটি পুনরায় চালু করা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলো।
নথি অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে “তাৎক্ষণিকভাবে” শুরু হবে জাহাজ চলাচল। মাইনসহ যেকোনো সামরিক প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ফেলতে হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ইরান ও ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো মিলে এই রুট পরিচালনার একটি বড় চুক্তি করবে।
৬. ইরানের জন্য বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা:
ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি উন্নয়ন তহবিল তৈরি করবে।
এই টাকা ইরানের অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে ব্যবহার হবে।
চূড়ান্ত পরিকল্পনা পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে ঠিক করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় অনুমতি দেবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো টাকা দেবে না। ট্রাম্প প্রশাসন জোর দিয়ে বলছে, এটি ২০১৫ সালের চুক্তির মতো নয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ দিতে হয়েছিল।
মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, ‘যুক্তরাষ্ট্র এক পয়সাও দেবে না”।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান যদি সব শর্ত মেনে চলে তবে আমিরাতের পক্ষ থেকে ইরানে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সহায়তা করবে।
৭. সকল ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া:
সমঝোতার সপ্তম দফায় বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থাকা সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। এর মধ্যে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একক নিষেধাজ্ঞাও থাকবে।
তবে ঠিক কখন এই প্রক্রিয়া শুরু হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
ইরান বহুদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র “অপারশেন এপিক ফিউরি” নামে একটি অভিযান চালিয়েছিল, এর লক্ষ্য ছিল ইরানকে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
৮. ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না:
সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা অর্জন না করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি উভয় পক্ষ তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে একমত হয়েছে।
এই পদার্থ ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি এখনো স্পষ্ট নয়। নথিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী আলোচনায় একটি প্রক্রিয়া 'পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে' হবে। তবে ন্যূনতম হিসেবে এটি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ'র তত্ত্বাবধানে ‘ডাউনব্লেন্ড’, অর্থাৎ ইউরেনিয়ামের মান বা তীব্রতা হ্রাস করার ব্যবস্থা করা হবে।
নথিতে বলা হয়েছে, বিষয়টি পরে আলোচনায় নির্ধারণ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বিষটিকে বড় একটি অর্জন হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে আটকানোই তার মূল লক্ষ্য ছিলো।
তিনি বলেন, “অপারেশন এপিক ফিউরির ৯৯ শতাংশই লক্ষ্যই ছিলো পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করা।”
৯ , ১০: স্থিতাবস্থা
আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুই পক্ষ কোনো নতুন বড় পরিবর্তন করবে না। ইরান তার পারমাণবিক কাজ সীমিত রাখবে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা দেবে না।
অর্থাৎ বড় কোনো পরিবর্তন হবে না, যতক্ষণ না ইউরেনিয়াম বিষয়টি সমাধান হয়।
যুক্তরাষ্ট্রও নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না। বরং তেল, পেট্রোলিয়াম এবং সম্পর্কিত পরিষেবার জন্য কিছু ছাড় দেবে, যেমন ব্যাংকিং ও পরিবহন।
১১. ইরানের জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়া:
সমঝোতার ১১তম দফা অনুযায়ী, ইরানের আটকে থাকা টাকা ও সম্পদ ধীরে ধীরে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিদেশে আটকে থাকা অর্থ ফেরত চাইছিল। বিষয়টি আলোচনার একটি বড় সমস্যা ছিল।
সমঝোতা স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র কিছু জব্দ বা সীমিত অর্থ ইরানের জন্য মুক্ত করে দেবে। তবে একবারে নয়, ধাপে ধাপে দেওয়া হবে।
১২,১৩,১৪: ধাপে ধাপে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে যাওয়া:
এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এবং ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর উভয় পক্ষ বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে।
চুক্তি ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য একটি যৌথ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে। শেষে এই চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হবে।
সব মিলিয়ে এই যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হলেও এর ভবিষ্যত এখনো অনিশ্চিত। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বড় বড় অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে এসব শর্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। বিশেষ করে লেবাননের চলমান উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের অবস্থান এই চুক্তির স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ১৪ দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তি: বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মোড়, বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারকে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ এবং ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে লেবানন সংকট, হরমুজ প্রণালি ঘিরে চুক্তিটির বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার অবসানে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছে। চুক্তিতে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে, বিশেষ করে লেবানন পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও ইসরায়েলের অবস্থানকে কেন্দ্র করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
বুধবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়ে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি এখন থেকেই কার্যকর।
ফ্রান্সে জি সেভেন সম্মেলন চলাকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।
১৪ দফা সম্বলিত এই চুক্তিকে বলা হচ্ছে সমঝোতা স্মারক। সেখানে বলা আছে, ইরান কখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না। একইসঙ্গে তাদের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়া হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই চুক্তিকে ‘পারফর্মেন্স বেসড’ বলা হচ্ছে। অর্থাৎ যদি ইরান এই চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলে তবেই তারা সুবিধা পাবে।
চুক্তি কতটা কার্যকর হবে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলোচনাকে বিপন্ন করতে পারে এমন তিনটি বড় শঙ্কা রয়েছে। লেবানন, হরমুজ প্রণলি ও ইসরায়েলের অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেবানন
দুই পক্ষ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। চুক্তিতে লেবাননকেও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে তার ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করা হয়।
তবে ডনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সে জি-সেভেন সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে "লেবাননের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার" কথা বলার পরও ইসরায়েল লেবাননে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে।
হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি নিয়ে পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেখানে প্রতিদিন মাত্র ১৫ থেকে ২০টি জাহাজ চলাচল করছে, তাও অনেকটা সীমিত ও গোপনভাবে। এখনো কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাদের মতে, বৈশ্বিক শিপিং কোনো রাজনৈতিক ঘোষণার ওপর চলে না। এটা বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, আর সেই বাস্তবতা এখনো অনিশ্চিত।
অক্সিলাম ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রেসিডেন্ট ইয়ান রালবি বলেছেন, “খুবই ধীরে ধীরে জাহাজ চলছে। দিনে হয়তো ১৫ থেকে ২০টি। পরিস্থিতি এখনো পাল্টায়নি। এই সপ্তাহ হয়তো এমনই থাকবে।”
“জাহাজের চলাচল শুধু কথাতেই চলে না। বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নিতে হবে। আর দুঃখের বিষয় হচ্ছে বাস্তবতা অনিশ্চত,” বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
ইসরায়েলের অবস্থান
ইসরায়েল নিয়েও বিশ্লেষকদের মন্তব্য এসেছে। চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ইসরায়েলের ভবিষ্যত ভূমিকা মূলত যুক্তরাষ্ট্রই ঠিক করবে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলে এখন একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে—গত কয়েক বছরে এত সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও দেশটি আসলে কী অর্জন করেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরান নিয়ে আলোচনায় ইসরায়েলকে অনেকটাই পাশ কাটানো হয়েছে, এবং ভবিষ্যত আলোচনায় তাদের ভূমিকা সীমিত হতে পারে।
তার মতে, ইসরায়েলের ভেতরে এখন এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে সামগ্রিকভাবে এই যুদ্ধের ফলাফল তেমন সফল হয়নি। কারণ সরকারের ঘোষিত বড় লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই অর্জিত হয়নি। যেমন, ইরানে শাসন পরিবর্তন, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ওপর প্রভাব কমানো সবকিছু বলা চলে আগের অবস্থানেই আছে ইরান।
চীন-রাশিয়ার প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি বা সাময়িক চুক্তি গঠনের পেছনে শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানই নয়, বরং চীন ও রাশিয়ারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই দুই দেশের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ট্রাম্পের সফরের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই বেইজিং সফর করেন। এই সময়টা অনেক বিশ্লেষকের কাছে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।
চীন আবার পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র, আর পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। গত মাসে চীনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফকে স্বাগত জানানো হয়, যেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতিও আলোচনায় আসে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার অধ্যাপক চেন জিয়ে বলেন, চীন এই শান্তি চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, চীন দ্রুত এই অঞ্চলে শান্তি চায়, কারণ পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল–গ্যাস সরবরাহের ওপর দেশটি অনেকটা নির্ভরশীল। এটি বাস্তবতা, যা সহজে বদলানো যায় না।
অস্ট্রিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভেলিনা টচাকারোভা বলেন, রাশিয়া ও চীন শুধু পাশ থেকে দেখেনি, বরং ইরানের আলোচনার অবস্থান তৈরি করতেও সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং, মস্কো ও তেহরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠক হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘেও তারা সমন্বিতভাবে কাজ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, রাশিয়া ও চীন ইরানকে সমর্থন দিয়ে গেছে, এমনকি চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও।
যা আছে চুক্তিতে
১. যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ
সমঝোতা স্মারকের প্রথম পয়েন্টেই বলা হয়েছে যে সব ধরনের যুদ্ধ বন্ধ হবে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা সব ধরনের যুদ্ধ ও আক্রমণ বন্ধ করবে, এমনকি লেবাননের মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকাতেও তারা আর কোনো আক্রমণ করতে পারবে না।
লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি আগ্রাসন নিয়ে বারবারই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তার শঙ্কা এই অভিযানের কারণে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে যেতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, লেবাননে ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের সামরিক অভিযান সমঝোতার লঙ্ঘন হবে এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সমঝোতায় বলা আছে, “এখন থেকে কোনো পক্ষই কোনো সামরিক অভিযান চালাবে না বা কাউকে হুমকি দেবে না, এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখা হবে। আর চূড়ান্ত চুক্তিতে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা হবে।
তবে ইসরায়েল এই পয়েন্ট নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া জানাবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২. একে অপরের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা:
সমঝোতার দ্বিতীয় দফায় বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে। তারা একে অপরের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
ইরানে যারা সরকারবিরোধী আন্দোলন করছিলেন তাদের জন্য এই শর্ত বড় ধরনের ধাক্কা বলে জানিয়েছে বিবিসি। ২০২৬ সালেই ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কাছে নেতিবাচকভাবে দেখা হতে পারে।
ইরানের আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, “সাহায্য আসছে”
৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির চেষ্টা:
ডকুমেন্টের তৃতীয় পয়েন্টে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনা করে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাবে।
তবে প্রয়োজনে দুই পক্ষের সম্মতিতে এই সময় বাড়ানো যাবে।
দুই দেশের নেতারা সমঝোতা স্মারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করার পর থেকেই ৬০ দিনের এই সময় গণনা শুরু হয়েছে।
হোয়াইট হাউস বিবিসিকে জানিয়েছে, বুধবার রাতে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে জি৭ সম্মেলন পরবর্তী এক নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরান-সংক্রান্ত এই নথিতে স্বাক্ষর করেন।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এতে স্বাক্ষর করেছেন।
এর আগে ট্রাম্প এবং ইরানি কর্মকর্তারা এ সপ্তাহের শেষ দিকে জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এখন সেটি হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
৪. নৌ-অবরোধ ও সামরিক চাপ কমানো:
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থাকা নৌ-অবরোধ তুলে নেবে এবং ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে। চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করবে। এই দিন গণনাও শুরু হয়েছে।
এই সময় যুক্তরাষ্ট্র কিছু সীমিত জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে। এবংযুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনা ইরানের কাছাকাছি এলাকা থেকে সরিয়ে নেবে।
৫. হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা
চুক্তির পঞ্চম দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্বাক্ষরের পর ইরান চেষ্টা করবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে পারে। এখানে কোনো ফি নেওয়া হবে না।
যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম তীব্রভাবে বেড়ে যায়। তাই প্রণালিটি পুনরায় চালু করা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলো।
চুক্তি অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ইরান ও ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো মিলে এই রুট পরিচালনার একটি বড় চুক্তি করবে।
৬. ইরানের জন্য বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা:
ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি উন্নয়ন তহবিল তৈরি করবে।
এই টাকা ইরানের অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে ব্যবহার হবে।
চূড়ান্ত পরিকল্পনা পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে ঠিক করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় অনুমতি দেবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো টাকা দেবে না। ট্রাম্প প্রশাসন জোর দিয়ে বলছে, এটি ২০১৫ সালের চুক্তির মতো নয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ দিতে হয়েছিল।
মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, ‘যুক্তরাষ্ট্র এক পয়সাও দেবে না”।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান যদি সব শর্ত মেনে চলে তবে আমিরাতের পক্ষ থেকে ইরানে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সহায়তা করবে।
৭. সকল ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া:
সমঝোতার সপ্তম দফায় বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থাকা সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। এর মধ্যে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একক নিষেধাজ্ঞাও থাকবে।
তবে ঠিক কখন এই প্রক্রিয়া শুরু হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
ইরান বহুদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র “অপারশেন এপিক ফিউরি” নামে একটি অভিযান চালিয়েছিল, এর লক্ষ্য ছিল ইরানকে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
৮. ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না:
সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা অর্জন না করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি উভয় পক্ষ তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে একমত হয়েছে।
এই পদার্থ ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি এখনো স্পষ্ট নয়। নথিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী আলোচনায় একটি প্রক্রিয়া 'পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে' হবে। তবে ন্যূনতম হিসেবে এটি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ'র তত্ত্বাবধানে ‘ডাউনব্লেন্ড’, অর্থাৎ ইউরেনিয়ামের মান বা তীব্রতা হ্রাস করার ব্যবস্থা করা হবে।
নথিতে বলা হয়েছে, বিষয়টি পরে আলোচনায় নির্ধারণ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বিষটিকে বড় একটি অর্জন হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে আটকানোই তার মূল লক্ষ্য ছিলো।
তিনি বলেন, “অপারেশন এপিক ফিউরির ৯৯ শতাংশই লক্ষ্যই ছিলো পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করা।”
৯ , ১০: স্থিতাবস্থা
আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুই পক্ষ কোনো নতুন বড় পরিবর্তন করবে না। ইরান তার পারমাণবিক কাজ সীমিত রাখবে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা দেবে না।
অর্থাৎ বড় কোনো পরিবর্তন হবে না, যতক্ষণ না ইউরেনিয়াম বিষয়টি সমাধান হয়।
যুক্তরাষ্ট্রও নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না। বরং তেল, পেট্রোলিয়াম এবং সম্পর্কিত পরিষেবার জন্য কিছু ছাড় দেবে, যেমন ব্যাংকিং ও পরিবহন।
১১. ইরানের জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়া:
সমঝোতার ১১তম দফা অনুযায়ী, ইরানের আটকে থাকা টাকা ও সম্পদ ধীরে ধীরে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিদেশে আটকে থাকা অর্থ ফেরত চাইছিল। বিষয়টি আলোচনার একটি বড় সমস্যা ছিল।
সমঝোতা স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র কিছু জব্দ বা সীমিত অর্থ ইরানের জন্য মুক্ত করে দেবে। তবে একবারে নয়, ধাপে ধাপে দেওয়া হবে।
১২,১৩,১৪: ধাপে ধাপে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে যাওয়া:
এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এবং ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর উভয় পক্ষ বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে।
চুক্তি ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য একটি যৌথ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে। শেষে এই চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হবে।
সব মিলিয়ে এই যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হলেও এর ভবিষ্যত এখনো অনিশ্চিত। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বড় বড় অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে এসব শর্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। বিশেষ করে লেবাননের চলমান উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের অবস্থান এই চুক্তির স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারে।
(বিবিসি, আলজাজিরা, পিবিএস, এবিসি নিউজ, গার্ডিয়ান ও জেএনএস নিউজ অবলম্বনে )
বিষয়: