মেসি ১-০ রোনালদো

৭৫ শতাংশ বল দখলে রেখেও কঙ্গোর চেয়ে কম গোলের সুযোগ তৈরি করেছে পর্তুগিজরা। রোনালদো পুরো ম্যাচে শটই নিতে পেরেছেন দুটো। ছিলো না কোনো অন টার্গেট শট।

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম

নিউ ইয়র্ক থেকে নিউ জার্সি যাবো। ফ্র্যান্স-সেনেগাল ম্যাচের টিকিট পকেটে নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। ম্যাচ টিকিট থাকাতে কিছুটা স্বস্তি। ৯৫ ডলারের বাস টিকিট পড়েছে মাত্র ২০ ডলার। তবে বাসে চড়ার আগে জ্যামাইকা হিল সাইড (নিউ ইয়র্কে আমার আবাসস্থল) থেকে ট্রেনে করে বাস স্ট্যান্ড যেতে লেগে যাবে প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট। তারপর চড়া যাবে বাসে। ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এক বাঙালির সাথে হলো পরিচয়। পয়ত্রিশের ওপর বয়স হবে, নাম অভিক। ভদ্রলোক কাতার বিশ্বকাপের চৌদ্দটা ম্যাচ দেখেছেন। এবার তার কপালে জুটেছে চারটা ম্যাচের টিকিট।

এই টিকিটের মিলিত দাম শুনে বুঝলাম, আমার যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের পুরো বাজেটের প্রায় কাছাকাছি কিছু একটা হবে। ৪৬৫ ডলার খরচ করে ফ্রান্স-সেনেগাল ম্যাচের টিকিট পেয়েছি। সর্বকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ বলে কথা!

এ কথা সে কথা থেকে অভিক বলে বসলেন পতুর্গালকে দিয়ে এবারও কিছু হবে না। রোনালদোর ওপর বাজি ধরতে তিনি নারাজ। আমার জেদ চেপে গেলো। প্রচণ্ড শব্দে ট্রেন চলছে। সেই শব্দকে ছাপিয়ে শোনা গেলো আমার কণ্ঠ, ‘অভিক, আপনার সেই ন্যুডলস চুলের রোনালদোর কথা মনে আছে? সেই পাগলা সিআরসেভেন থাকলে এবারের পতুর্গালকে থামানোই যেতো না। রাফায়েল লিও, নেতো, কনসেসাও, ব্রুনোদের পর্তুগালকে বড়ো বড়ো পন্ডিতরা বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার বলছেন! আর আপনি পাত্তা দিতেই রাজি নন?’

পর্তুগাল-কঙ্গো ম্যাচ শেষে সেই আমি অভিকের পাঠানো ক্ষুদেবার্তার জবাব খুঁজে পাচ্ছি না। অভিক লিখেছেন, ‘হোয়াটস আপ, বাডি?’ ছোট এই প্রশ্নের ভেতর যেমন উত্তর রয়েছে, তেমনি রয়েছে তীর্যক খোঁচাও। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপ খেলতে আসা কঙ্গোর সাথে পর্তুগালের ড্র যেন আগাম বার্তা দিচ্ছে, গোধূলি লগ্নে থাকা রোনালদো আরও একবার কাঁদতে কাঁদতে রিক্ত হাতে মাঠ ছাড়বেন, বিশ্বকাপকে বিদায় বলবেন।

গোলডটকম রোনালদোকে ম্যাচ রেটিংয়ে ১০ এ মাত্র তিন পয়েন্ট দিয়েছে। আমি হলে দুই পয়েন্ট দিতাম কি-না সন্দেহ! এমবাপ্পের জোড়া গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই হ্যালান্ড দিয়েছেন জোড়া। এরপর মেসি হ্যাটট্রিক করে বুঝিয়ে দিয়েছে, কেন তিনি গ্রেটেস্ট অব অল টাইম। রোনালদোর ম্যাচ শেষে মাঠে নামা ইংল্যান্ড সুপারস্টার হ্যারি কেইন তো প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই ক্রোয়েশিয়ার জালে দিয়েছেন দুই গোল। ব্রাজিলের ভিনিসিয়াসের নামের পাশেও আছে এক গোল। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ শেষে তারকাদের মধ্যে স্কোরশিটে নাম নেই শুধু রোনালদোর।

৭৫ শতাংশ বল দখলে রেখেও কঙ্গোর চেয়ে কম গোলের সুযোগ তৈরি করেছে পর্তুগিজরা। রোনালদো পুরো ম্যাচে শটই নিতে পেরেছেন দুটো। ছিলো না কোনো অন টার্গেট শট।

এই নিয়ে বিশ্বকাপের মোট ছয়টি ম্যাচে অন টার্গেট শট রাখতে ব্যর্থ হলেন ক্রিশ্চিয়ানো। সব মিলিয়ে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ- এ টানা পাঁচ ম্যাচ গোলশূন্য। কিংবদন্তি রোনালদো এই গেমের অংশ হিসেবে সব কিছু অর্জন করেছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই যেন কী হয়ে যায় তার! কোথায় যেন তৈরি হয় শূন্যতা। এক মায়াজালে আটকে পড়েন। এমন এক গর্তে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেন যে নিজেই আর বের হওয়ার পথ খুঁজে পান না। 

অথচ কঙ্গোর সাথে ম্যাচটা তার জন্য এক মাইলফলকের ম্যাচ বটে। মেসির পর মর্ত্যের দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে ছয় নম্বর  বিশ্বকাপ খেলতে নামলেন। এই সব পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়, অমর হয়ে থাকার আংশিক টোকেনও। কি রাজসিক হতে পারতো তার এই কীর্তি! মেসি যেমন রেকর্ড ষষ্ঠ অভিযান অমর করেছেন হ্যাটট্রিক দিয়ে, রোনালদো তেমনটা না হলেও ম্যাচ ডিসাইডিং গোল তো পেতেই পারতেন!

পেতেই পারতেন আর পারেননি, এই দুইয়ের পার্থক্য বিস্তর। ছন্নছাড়া, বড্ড একা লেগেছে রোনালদোকে। গোল ক্ষুধায় মত্ত সিআরসেভেনের ছিটে-ফোঁটাও চোখে পড়েনি। কোচ মার্তিনেজও তার সবচেয়ে বড়ো তারকাকে বেঞ্চ করেননি। খেলিয়েছেন পুরো ৯০ মিনিট। কোনো কৌশলই কাজে দেয়নি। পর্তুগিজ রাজার শেষের শুরুটা হয়েছে খুব ধূসর, খুবই মলিন।

১৯৬৬ আর ২০০৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলার স্মৃতি আর কতদিন বয়ে বেড়াবে পর্তুগিজরা? রোনালদো হেটাররা পর্তুগালের প্রথম ম্যাচের পর বেজায় খুশি। ফেসবুক ভরে গেছে তাদের তীর্যক বানীতে।

মেসি আর রোনালদোর প্রথম ম্যাচ শেষে হিসেব নিকেশে লিও এগিয়ে এক পয়েন্টে। হ্যাটট্রিক করা মেসায়াহকে আপনি আরও একটি বোনাস পয়েন্ট দিতে পারেন। তবে রোনালদোর ট্যালিতে বিশাল আকৃতির শূন্য ছাড়া আর কিছু দেওয়ার সুযোগ নেই।

মেসি ভক্তরা অবশ্য বলে বসতে পারেন, আমাদের আবার কার সাথে প্রতিযোগিতা? সিআরসেভেন তাদের কাছে আর পাঁচ দশটা প্লেয়ারের মতোই।