বিশ্বব্যাংকের চোখে দক্ষিণ এশিয়ায় নেই পাকিস্তান-আফগানিস্তান

বিশ্বব্যাংক পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে নতুন ‘মিনাআপ’ অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে পাকিস্তানকে এখন আর শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে নয়, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

বিশ্বব্যাংকের নতুন আঞ্চলিক মানচিত্রে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে আর দক্ষিণ এশিয়ার অংশ হিসেবে রাখা হয়নি। তাদের নেওয়া হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান বিভাগে। সংক্ষেপে ‘মিনাআপ’ (MENAAP)। এতে প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তান কি তাহলে দক্ষিণ এশিয়া থেকে সরে গেল? 

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভৌগোলিক পরিচয় নয়, আসলে বদলে যাচ্ছে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থানকে দেখার ধরন।

এই পরিবর্তনের অর্থ পাকিস্তান বা আফগানিস্তান ভৌগোলিকভাবে অঞ্চল বদলে ফেলেছে, এমন নয়। বরং বিশ্বব্যাংক বোঝাতে চাইছে, দেশ দুইটির অর্থনৈতিক ও উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ এখন এমন এক বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বহু দেশের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

ভবিষ্যতে তাদের পারফরম্যান্সের তুলনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নীতিগত পরামর্শও নতুন কাঠামো ধরে নির্ধারিত হতে পারে।

মিনাআপ কী?

মিনাআপ হলো বিশ্বব্যাংকের নতুন একটি আঞ্চলিক শ্রেণিবিন্যাস। এর অর্থ মিডল ইস্ট, নর্থ আফ্রিকা, আফগানিস্তান অ্যান্ড পাকিস্তান। এই কাঠামোতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে এনে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে রাখা হয়েছে।

লাহোরের কিনিয়ার্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিশ্লেষক আলিজা আবরার মনে করেন এটি একটি কারিগরি সিদ্ধান্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় বিশ্লেষণের সুবিধার জন্য দেশগুলোকে নতুনভাবে ভাগ করে। মিনাআপও তেমন একটি উদাহরণ।

বৈশ্বিক নীতি নিয়ে কাজ করা থিংক ট্যাংক স্ট্র্যাদিয়ার এক নিবন্ধে তিনি বলেন, এই গ্রপে এমন দেশগুলোকে রাখা হয়েছে, যাদের অর্থনীতিতে কিছু মিল আছে। এ জন্য পাকিস্তানকে এখানে রাখা হয়েছে, যদিও দেশটি ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের অংশ নয়।

তিনি মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের মতো বড় কোনো প্রতিষ্ঠান যখন কোনো দেশকে নতুনভাবে শ্রেণিবিন্যাস করে, তখন নাম বদলায় না। এতে দেশগুলোর মধ্যে কীভাবে তুলনা করা হবে, কীভাবে ঝুঁকি বিচার করা হবে এবং কোন ধরনের নীতি সাজানো হবে এসবেও প্রভাব পড়ে।

পাকিস্তান কেন এই জোটে

ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তান এখনো দক্ষিণ এশিয়ারই অংশ। ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং রাজনীতির দিক থেকেও পাকিস্তানের সঙ্গে তার প্রতিবেশি দেশগুলোর সম্পর্ক আগের মতোই রয়েছে।

তবে এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে কোনো দেশকে শুধু মানচিত্র দেখে বিচার করা হয় না। এখন অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ভিত্তিতে দেশগুলোর অবস্থান ঠিক করা হয়।

দ্য ডিপ্লোমেটিক ইনসাইটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের বদলে যাওয়া অর্থনৈতিক চেহারার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের অর্থনীতিতে এখন এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে, যাতে দক্ষিণ এশিয়ার চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের সাথে বেশি মিলে যায়।

উদাহরণ হিসেবে তারা বলছে, পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করা শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে। অর্থাৎ শুধু বাণিজ্য নয়, ঘরের আয়ের সঙ্গেও মধ্যপ্রাচ্যের গভীর সম্পর্ক আছে।

এ ছাড়াও পাকিস্তান আমদানি করা জ্বালানির ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল, আর সেই জ্বালানির বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের পরিবর্তন পাকিস্তানের বাজেট, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে খুব দ্রুত প্রভাব ফেলে। 

এই বৈশিষ্ট্যগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অনেক দেশের সঙ্গেও মিলে যায়।

পাকিস্তানকে এসব দেশের সঙ্গে রাখলে, তুলনা করা আরও সহজ ও অর্থপূর্ণ হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি সামলানো, এসব সমস্যা তখন এমনভাবে বোঝা যাবে, যাতে মিলগুলো স্পষ্ট হয়।

যদিও বিশ্বব্যাংক বলছে, এই পরিবর্তন শুধু বিশ্লেষণের সুবিধার জন্য করা হয়েছে, তবু এর আরও গভীর প্রভাব আছে।

এতে পাকিস্তানের উন্নয়নসংক্রান্ত সমস্যাগুলো কীভাবে দেখা হবে, দেশটির পারফরম্যান্স কাদের সঙ্গে তুলনা করা হবে এবং ভবিষ্যতে নীতিগত পরামর্শ ও অর্থায়নের অগ্রাধিকার কীভাবে ঠিক হবে, এসব ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে।

আলিজা আবরার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বেড়ে ওঠা কোনো হঠাৎ ঘটনা নয় বরং এটি দেশটির নীতিগত সিদ্ধান্তেরই ফল। বিভিন্ন সরকার বহুদিন ধরেই উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছে, কারণ তারা বিনিয়োগের উৎস, জ্বালানির সরবরাহকারী এবং কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র।

এই অবস্থায় বিশ্বব্যাংকের এই পুনঃশ্রেণিবিন্যাস হয়তো নতুন কোনো পরিবর্তন শুরু করেনি বলে মত দেন এই বিশ্লেষক। 

তিনি মনে করেন আগে থেকেই চলতে থাকা একটি পরিবর্তনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

তবে এই নতুন অবস্থানের কিছু ঝুঁকিও আছে। পাকিস্তানকে যদি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অর্থনীতির সঙ্গে বেশি করে যুক্ত করা হয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চোখে তার অর্থনীতির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, মিনা অঞ্চলের অনেক দেশ দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থা, বেশি বিদেশি ঋণ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সমস্যায় ভুগছে।

মিনাআপ অঞ্চলে বর্তমানে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৮ কোটি। আগামী ২৫ বছরে এই সংখ্যা আরও ৪০ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সেই তুলনায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না।

এই পরিস্থিতিতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো পাকিস্তানকে ভিন্ন একটি শ্রেণিতে রাখা শুরু করবে, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারী, অন্যান্য সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও পাকিস্তানকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করতে পারে। 

তখন পাকিস্তানকে হয়তো আর শুধু দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশিদের সঙ্গে তুলনা করা হবে না। বরং এমন দেশগুলোর সঙ্গে দেখা হবে, যাদের অর্থনৈতিক সমস্যা প্রায় একই রকম।

এই শ্রেণিবিন্যাস নীতিগত পরামর্শের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় আঞ্চলিক গোষ্ঠী ধরে নীতির পরামর্শ দেয়।

মিনাআপের অংশ হওয়ায় পাকিস্তানের জন্য এমন কিছু সংস্কারের কথা বলা হতে পারে, যা ওই গোষ্ঠীর প্রধান সমস্যাগুলো মাথায় রেখে তৈরি।

এতে কিছু সুবিধা থাকলেও, পাকিস্তানের নিজস্ব বাস্তবতা হয়তো পুরোপুরি গুরুত্ব পাবে না।

আলিজা আবরার অবশ্য বলছেন, এসব জটিলতা থাকলেও বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করা ঠিক হবে না। 

“এই পুনঃশ্রেণিবিন্যাস পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক জোট বদলে দেয়নি, তার আনুষ্ঠানিক আঞ্চলিক পরিচয়ও পাল্টায়নি। কূটনৈতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা কাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে পাকিস্তান এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অংশ হিসেবেই রয়েছে”, বলেন এই বিশ্লেষক। 

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিচয় বদলাচ্ছে। তাকে এখন আর শুধু দক্ষিণ এশিয়ার চোখে দেখা হচ্ছে না বরং মধ্যপ্রাচ্যের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা বৃহত্তর এক অর্থনৈতিক অঞ্চলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

আফগানিস্তান কেন এই তালিকায়

বিশ্বব্যাংক বলছে, তাদের আঞ্চলিক গ্রুপিং শুধু মানচিত্র দেখে করা হয় না। এগুলো ‘অপারেশনাল অ্যান্ড অ্যানালিটিকাল প্রায়োরিটিস’ এর ওপর ভিত্তি করে করা হয়। 

বিশ্বব্যাংকের মিনাআপ কাঠামোতে বারবার যেসব বৈশিষ্ট্যকে সামনে আনা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে আছে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও চাকরির চ্যালেঞ্জ। সে কারণে আফগানিস্তানকে এখানে রাখা হতে পারে। 

আফগানিস্তানের অবস্থান আসলে ভৌগোলিক বিবেচনায় নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নগত বিশ্লেষণের সুবিধার জন্য।

বিশ্বব্যাংক মনে করছে, আফগানিস্তানের সমস্যা ও বাস্তবতা এই বৃহত্তর মিনাপ কাঠামোর সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

ভূ-অর্থনীতির উত্থান

স্ট্র্যাটেদিয়ার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মিনাআপের গঠন বৈশ্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতিফলন। যাকে বলা হচ্ছে ভূ-অর্থনীতির উত্থান। 

এর আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)  আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা যত বাড়ছে, ততই পুরোনো আঞ্চলিক সীমানাগুলো কিছুটা ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। এখন দেশগুলোকে ক্রমে বেশি করে বিচার করা হচ্ছে তারা কোথায় অবস্থিত তার চেয়ে, তারা কীভাবে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত তার ভিত্তিতে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানকে মিনাআপে অন্তর্ভুক্ত করা এই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ। এটি দেখায়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও আর্থিক প্রবাহ এখন বৈশ্বিক শ্রেণিবিন্যাসে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের ও আফগানিস্তানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই পরিবর্তনকে কীভাবে সামলাবে। সঠিকভাবে সামলাতে পারলে পাকিস্তানের এই দ্বৈত অবস্থান তার শক্তি হতে পারে।

এতে দেশটি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে পারে এবং নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। আর ভুল করলে বাড়তে পারে কৌশলগত বিভ্রান্তি।

(ডেমোক্রেসি ইনসাইট, বিশ্বব্যাংক, স্ট্র্যাটেদিয়ার অবলম্বনে)