এক সময়ের ‘কৌশলগত মিত্র’ আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণার নেপথ্যে কী

পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্পর্ক যেন তলানিতে এসে ঠেকল। এটি কি কেবল সন্ত্রাসবাদ দমনের লড়াই, নাকি এর শেকড় লুকিয়ে আছে শতাব্দী পুরোনো কোনো অমীমাংসিত ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে?

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম

কাবুলের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন আর সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আর্টিলারি ফায়ার দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। এক সময়ের 'কৌশলগত মিত্র' পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান এখন সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত।

কীভাবে তাদের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকল? কেবল সন্ত্রাসবাদ দমনের লড়াই, নাকি এর শেকড় লুকিয়ে আছে শতাব্দী পুরোনো কোনো অমীমাংসিত ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে?

কাবুলে বোমা এবং 'অপারেশন গজব লিল হক'

পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চলছিলো বেশ কিছুদিন ধরেই। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে এই উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।

২১এ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের নানগারহার এবং পাকতিকা প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী। পাকিস্তানের দাবি, তারা টিটিপি এবং আইএসকে’র আস্তানা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

এই হামলায়  প্রায় ৭০ জন ‘জঙ্গি’ নিহতের দাবি করেছে পাকিস্তান। তবে কাবুলের দাবি, হামলায় নারী ও শিশুসহ বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।

পাকিস্তানের বিমান হামলার প্রতিশোধ নিতে 'ডুরান্ড লাইন' বরাবর বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু করে আফগানিস্তানের তালেবান বাহিনী ।

২৬এ ফেব্রুয়ারি রাতে পাকিস্তানি সীমান্ত চৌকিগুলোতে একযোগে হামলা চালায় তারা। এই হামলায় অন্তত ৫৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত এবং ১৯টি সামরিক চৌকি দখলের দাবি করে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

শুক্রবার তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে পাকিস্তান। এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে 'অপারেশন গজব লিল হক'। অভিযানের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানগুলো ফের কাবুল, কান্দাহার এবং পতিয়া অঞ্চলে বোমাবর্ষণ করে।

অপারেশনের প্রথম পর্যায়ে অন্তত ১৩৩ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি আহতের দাবি করেছে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার। একইসাথে ২৭টি তালেবান পোস্ট ধ্বংস করারও দাবি করেন তিনি।

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একে 'সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত' বলে আখ্যা দিয়েছে।

এই সংঘাত এখন আর সীমান্তেই আটকে নেই বরং দুই দেশের বৃহত্তর সামরিক এবং কূটনৈতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে।

সম্পর্ক বদলে গেলো যেভাবে

দুই দশকের মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতির ইতি ঘটলে ২০২১ সালের অগাস্টে পুনরায় কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। সে সময় পশ্চিমা বিশ্লেষকরাও মনে করেছিলেন, আফগানিস্তান সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের প্রভাব বলয়ে চলে গেল।

তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়াকে ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন পাকিস্তানের সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।

অবশ্য বাস্তবতা মোড় নিয়েছে ভিন্ন পথে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'উইলসন সেন্টার'-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তানের সামরিক কর্তারা ভেবেছিল তালেবান তাদের প্রক্সি হিসেবে কাজ করবে এবং ভারতের প্রভাব শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে। কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আফগান জাতীয়তাবাদকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছে এবং নিজেদের স্বাধীন সত্তার প্রমাণ দিতে চেয়েছে।

পাকিস্তান এখন তালেবান প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সমালোচক। কারণ, তাদের প্রত্যাশা ছিল তালেবান টিটিপিকে দমন করবে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।

টিটিপি ফ্যাক্টর: নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ

পাকিস্তান-আফগানিস্তানের বর্তমান সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি। এটি পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত ও উপজাতীয় এলাকায় সক্রিয় ১৩টি ছোট-বড় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বয়ে তৈরি একটি ‘আমব্রেলা’ সংগঠন।

টিটিপির মূল লক্ষ্য পাকিস্তানে কঠোর শরিয়া আইন জারি করা এবং পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা ও সামরিক বাহিনীকে উচ্ছেদ করা। আল-কায়েদার ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং আফগান তালেবানের আদর্শগত অনুসারী হিসেবে পরিচিত এই সংগঠনটি।

তালেবান সরকার টিটিপিকে আফগানিস্তানে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে বলে বারবার অভিযোগ করে আসছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সামরিক বাহিনী।

পাকিস্তানের দাবি, টিটিপি আফগান মাটি ব্যবহার করে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তানে ভয়াবহ আন্তঃসীমান্ত হামলা চালাচ্ছে।

এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, "আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশে হামলা চালানোর অনুমতি কাউকে দেওয়া হচ্ছে না। পাকিস্তান তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতা ঢাকতে আমাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।”

ইউএস ইনস্টিটিউট অফ পিস-এর সিনিয়র বিশ্লেষক আসফানদিয়ার মীরের মতে, আফগান তালেবান এবং টিটিপির মধ্যে আদর্শিক, ঐতিহাসিক এবং যুদ্ধের ময়দানে একসঙ্গে লড়াই করার বন্ধন আছে। তিনি বলেন, “এই বন্ধন এতটাই গভীর যে, পাকিস্তানের চাপে তালেবান কখনোই টিটিপির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযানে যাবে না।”

ভূ-রাজনীতি: চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র

এই সংঘাতের ঢেউ কেবল কাবুল বা ইসলামাবাদে নয় বরং বেইজিং, নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনেও আছড়ে পড়ছে।

পাক-আফগান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে চীন। পাকিস্তানে আছে চীনের বিলিয়ন ডলারের 'চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর'  প্রকল্প।

পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের পরিচালক মুহাম্মদ আমির রানা মনে করেন, “এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা চীনের বিনিয়োগকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে। এছাড়া, আফগানিস্তানে অস্থিতিশীলতা বাড়লে তা জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উৎসাহিত করতে পারে বলে চীন আশঙ্কা করে।”

ভারত ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে। ভারতের থিংক ট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান তার পশ্চিম সীমান্তে ব্যস্ত থাকলে পূর্ব সীমান্তে অর্থাৎ কাশ্মীরে তাদের মনোযোগ কমতে পারে, যা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে স্বস্তিদায়ক।”

যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। বৈশ্বিক থিংক ট্যাংকগুলো সতর্ক করছে যে, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপের সংকটের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার এই নতুন যুদ্ধ বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

যেকোন যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য পরিশোধ করতে হয় সাধারণ মানুষকে। ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে পাকিস্তান নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ দেখিয়ে লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো শুরু করে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর সতর্ক করেছে যে, হালের সরাসরি যুদ্ধের কারণে এই মানবিক সংকট বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।

তোর্খাম এবং স্পিন বোলডাকের মতো প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টগুলো বন্ধ থাকায় দুই দেশের অর্থনীতিই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পাক-আফগান জয়েন্ট চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মতে, প্রতিদিন দুই দেশের ব্যবসায়ীরা কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে।

খাইবার পাখতুনখোয়া এবং আফগানিস্তানের নানগারহার ও কান্দাহারের সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। স্কুল-কলেজ বন্ধ, সাধারণ মানুষ বাঙ্কারে বা নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে।

ডুরান্ড লাইন: ইতিহাসের এক অমীমাংসিত ক্ষত 

বর্তমান এই সংঘাতের গভীরতা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ১৮৯৩ সালে। ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগান আমির আবদুর রহমান খানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে এই ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রেখা টানা হয়, যা 'ডুরান্ড লাইন' নামে পরিচিত।

প্রখ্যাত আফগান ইতিহাসবিদ এবং নৃবিজ্ঞানী টমাস বারফিল্ড তার ' আফগানিস্তান: অ্যা কালচারাল অ্যান্ড পলিটিকাল হিস্ট্রি’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ডুরান্ড লাইন পশতুন সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে বিভক্ত করেছে। আফগানরা কখনোই এই বিভাজনকে মন থেকে মেনে নেয়নি।

আফগানিস্তানের কোনো সরকারই ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। ইতিহাসবিদ বার্নেট আর রুবিন তার বই ‘দ্য ফ্র্যাগমেন্টেশন অব আফগানিস্তান’-এ দেখিয়েছেন, পশতুন জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে আফগান রাষ্ট্র সবসময় আপসহীন।

পাকিস্তান যখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই সীমান্ত বরাবর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে, তখন থেকেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে। আফগান তালেবানের মতে, এটি কেবল ভৌগোলিক বিভাজন নয়, বরং দুই পাড়ের পশতুনদের সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করার একটি পাকিস্তানি চক্রান্ত।

সমাধানের পথ কী?

বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

পাকিস্তান তাদের 'অপারেশন গজব লিল হক'-এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাইছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে গিয়ে হামলা চালাতেও দ্বিধা করবে না। অন্যদিকে, কয়েক দশকের যুদ্ধ-অভিজ্ঞ তালেবান বাহিনীও তাদের ভূখণ্ড রক্ষায় মরণপণ লড়াই করতে প্রস্তুত।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেন পলিসি ফেলো মাদিহা আফজাল তার বিশ্লেষণে উপসংহার টেনেছেন এই বলে, “এই সংঘাতের কোনো দ্রুত সামরিক বা কূটনৈতিক সমাধান নেই। ডুরান্ড লাইনের ঐতিহাসিক অমীমাংসিত বিতর্ক এবং টিটিপি-র মতো নন-স্টেট অ্যাক্টরদের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।”

তার মতে, দুই দেশ যদি তৃতীয় কোনো শক্তিশালী পক্ষের মধ্যস্থতায় আলোচনায় না বসে, তবে দক্ষিণ এশিয়া একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী প্রক্সি যুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে।

 

বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে