বাংলাদেশের পক্ষে পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে যাওয়া হয়তো সম্ভব নয়: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রুশো

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত)মোস্তফা কামাল রুশো। মিরপুরের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের একজন স্নাতক। তিনি সিঙ্গাপুরের ডিফেন্স কলেজে পড়াশোনা করেছেন এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ বাংলাদেশের একজন গ্র্যাজুয়েট। পেশাগত জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় তিনি কমান্ড পজিশনে নিয়োজিত ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রুশো মালিতে জাতিসংঘের ‘মাল্টিডাইমেনশনাল ইন্টিগ্রেটেড স্ট্যাবিলাইজেশন মিশন’-এ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি লাইবেরিয়া এবং সিয়েরা লিওনেও কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারি সেন্টার অ্যান্ড স্কুলের কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ‘ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর রিসার্চ ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বা মিয়ানমার ইস্যুসহ আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং এর গতিপ্রকৃতি নিয়েও গবেষণা করছেন। এসব বিষয় নিয়েই আলাপ-এর পডকাস্টে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সাহাব এনাম খানের সঙ্গে  আলোচনা করেছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল রুশো। ১৬ই মার্চ ২০২৬ সালে হওয়া আলোচনাটির ঈষৎ সম্পাদিত অংশ প্রকাশিত হলো। ইংরেজিতে হওয়া কথোপকথনটির অনুবাদ করেছেন ফাতিন নূর অবনি

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

সাহাব এনাম খান: মধ্যপ্রাচ্য যেভাবে ক্রমশ পতনের দিকে যাচ্ছে, তা দেখার সামর্থ্য কি বাংলাদেশের আছে? বাংলাদেশ কি এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোস্তফা কামাল রুশো: এখন পুরো বিশ্বের নজর এই সংঘাতের দিকে। আমরা এখন (১৬ই মার্চ ২০২৬) যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসেছি। শুরুতে আমরা দেখেছি যে সংঘাতটি মূলত ত্রিমুখী ছিল, আমেরিকা ও ইসরায়েল মিলে ইরানের ওপর আক্রমণ করছে। কিন্তু এখন আশেপাশের বেশ কিছু দেশ, বিশেষ করে উপসাগরীয়  দেশগুলোও কোনো না কোনোভাবে এতে জড়িয়ে পড়েছে। ইরানের জন্য এটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই বা অস্তিত্বের সংকট। অন্যদিকে, ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো ইরানের সক্ষমতা ধ্বংস করে নিজেদের চারপাশের হুমকিগুলো দূর করা। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি হচ্ছে তাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়া। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে একটি শক্তিশালী ইরান থাকা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল, কারো জন্যই ভালো খবর না।

শুরুতে আমরা দেখেছি যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন, আর তা হলো ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল করা। কিন্তু তারপর সেই লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথমে বলা হলো ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করা হবে, তারপর পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের কথা এলো এবং সবশেষে তাদের নৌ-সম্পদ ধ্বংস করার কথা সামনে এলো।

মিডিয়া যখন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছে, তখন তার কথায় যুদ্ধের এই উদ্দেশ্যগুলো বারবার বদলাচ্ছে; ফলে যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য আসলে কী, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ কিছুটা বিভ্রান্ত।

তবে সহজ কথায় বলতে গেলে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে ইরানের সামর্থ্য পুরোপুরি মিটিয়ে দেওয়া। ইরানের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, একটি জাতি হিসেবে টিকে থাকার জন্য তারা জানপ্রাণ দিয়ে লড়ছে। তাদের সুপ্রিম লিডার এবং শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের হত্যাকাণ্ড ও ক্রমাগত হামলার পরেও আমরা দেখছি যে দেশটির জনগণ এখনও ঐক্যবদ্ধ এবং বর্তমান নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

এছাড়া এত শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরান ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধের কৌশল বেছে নিয়েছে। আমরা দেখছি তারা প্রচুর পরিমাণে ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে একটি ড্রোনের দাম প্রায় ৫ থেকে ২০ হাজার মার্কিন ডলার, কিন্তু সেটি প্রতিহত করতে মিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তি ও ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হচ্ছে। ইরানের আরেকটি কৌশল হলো ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া।

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ অর্থাৎ পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে সরবরাহ হয়। এটি বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বেড়ে যাবে এবং যা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? আমরা একটি ছোট রাষ্ট্র। এখানে আমাদের দুটি বড় স্বার্থ জড়িয়ে আছে। প্রথমটি হলো রেমিট্যান্স। উপসাগরীয় দেশগুলোতে আমাদের প্রায় ৪৫ লাখ প্রবাসী কাজ করছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং তাদের পাঠানো অর্থ, দুটোই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমরা এর জন্য কতটা প্রস্তুত? এই মুহূর্তে সরাসরি আমাদের ওপর কোনও সামরিক হুমকি নেই। কিন্তু আমরা যদি একে একটি ‘ডমিনো ইফেক্ট’ হিসেবে দেখি, যেমন আগে ইসরায়েল অন্য দেশে আক্রমণ করেছে, এখন ইরানে করছে, তবে আমাদের চিন্তার বিষয় হলো, ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য বা পরবর্তী ‘ডমিনো’ কোনটি হবে? এটি আমাদের সবার জন্য একটা সতর্কবার্তা।  

সাহাব: বিশ্বজুড়ে যা ঘটছে, তার ফলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। একটা সময় ছিল যখন আমরা ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’, এই পররাষ্ট্রনীতি মেনে চলতাম। কোনো জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কি খুব সতর্ক হওয়া উচিত? অর্থাৎ জোটের রাজনীতি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মাঝে ঢাকার প্রতিরক্ষা অবস্থান কেমন হওয়া উচিত?

রুশো: আপনি যে ‘সবার সাথে সম্পৃক্ততা এবং ভারসাম্যের ভিত্তিতে অবস্থানের’ কথা বললেন, বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য এটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি কাঠামো। আমরা কোনও পরাশক্তি নই। তাই কূটনৈতিক অঙ্গনে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ খুব সাবধানে এবং বুঝেশুনে নিতে হবে। ‘কৌশলগত নমনীয়তায়’ আমাদের শক্তি।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট যে বাস্তবতায় গঠিত হয়েছে, তাতে আমরা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানত তিনটি বড় পক্ষ বা অ্যাক্টরকে দেখতে পাই। প্রথমত যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয়ত চীন এবং তৃতীয়ত ভারত। 

ব্যাখ্যা করে বলতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অংশীদার; তারা আমাদের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, আমাদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে এবং তারা আমাদের সাথে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর আওতায় কাজ করছে।

চীন আমাদের দেশের অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। আর ভারত আমাদের নিকটতম এবং বৃহত্তম প্রতিবেশী, তাদের সাথে আমাদের উভমুখী ভৌগোলিক আন্তঃনির্ভরশীলতা আছে, যা এড়ানোর কোনও উপায় নেই। 

এখন এই তিন দেশের যেকোনও একটির খুব কাছাকাছি চলে যাওয়া মানেই অন্য দেশগুলোর সাথে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক সংকুচিত হয়ে পড়া। 

আরেকটি বিষয় হলো, আমরা হয়তো পুরোপুরি নিরপেক্ষ থাকতে পারবো না, আবার কোনও নির্দিষ্ট জোটেও যোগ দিতে পারবো না; তবে আমরা একটি ‘সক্রিয় অবস্থানের’ মাধ্যমে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি।

আর তার জন্য দুটি কাজ করা প্রয়োজন। একটি হলো, বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় সক্ষমতা, যা আমাদের অর্থনৈতিক শক্তি, প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংহতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। আর অন্যটি হলো, একটি অনুমানযোগ্য এবং সুসংগত নীতিগত আচরণ। 

আমি নিশ্চিত যে, আমাদের অংশীদার বা পরাশক্তিগুলো আমাদের এই ভারসাম্য রক্ষার নীতিকে মেনে নেবে, কিন্তু আমাদের কূটনৈতিক আচরণে যদি কোনও অস্পষ্টতা থাকে, যা তাদের কাছে সুবিধাবাদী বা অবিশ্বাস্য মনে হয়, তবে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে না। তাই আমাদের অবশ্যই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, তবে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমাদের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ও বজায় রাখতে হবে। আর তা করার জন্য সম্ভবত এখন থেকেই আমাদের একটি ‘কৌশলগত শৃঙ্খলা’ মেনে চলতে হবে।

সাহাব: বাংলাদেশ এখন ভারত, পাকিস্তান এবং চীনএই তিনটি পারমাণবিক শক্তির মাঝে অবস্থান করছে। আর মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ তো আমরা এখনো জানি না। একজন স্ট্র্যাটেজিক থিংকার হিসেবে জানতে চাই, কোন বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি চিন্তিত হওয়া উচিত?

রুশো: বাংলাদেশ ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থানে রয়েছে। আমরা পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো দ্বারা বেষ্টিত। কিন্তু বর্তমান ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং আরও অনেক কারণে বাংলাদেশের পক্ষে এই মুহূর্তে পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে যাওয়া হয়তো সম্ভব নয়।

আরেকটা ব্যাপার হলো, আমাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। 

 একটি হলো, মিয়ানমার পরিস্থিতি। আমাদের দক্ষিণ-পূর্বের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে এখন এক ধরনের গৃহযুদ্ধ চলছে। আরাকান আর্মি, যা একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী, এখন ওই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা এই অস্থিরতার একদম কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি। ওই অঞ্চলে যেকোনও ধরনের অস্থিতিশীলতা আমাদের দেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এটি প্রথম উদ্বেগের বিষয়।

দ্বিতীয়টি হলো, ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কার কারণে অর্থনৈতিক ঝুঁকি। বিশেষ করে আমরা এতক্ষণ যা নিয়ে আলোচনা করলাম, উপসাগরীয় অঞ্চল বা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান বনাম আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধ। এর ফলে আমাদের রেমিট্যান্স এবং জ্বালানি খাতের ওপর যে প্রভাব পড়বে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয়।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় ঢাল বা নিরাপত্তার জায়গা ছিল বিভিন্ন বহুপাক্ষিক সংস্থা। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় আমরা দেখছি যে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি প্রাধান্য পাচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন এবং বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই অস্থিতিশীল বিশ্বে বড় শক্তিগুলো যখন শুধু নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় মত্ত থাকে, তখন আমাদের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ উপেক্ষিত হয়। এটি আমার জন্য একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ। 

সাহাব: আপনার মতে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো দেখতে কেমন হওয়া উচিত? আমাদের কি একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল বা জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল থাকা উচিত?

রুশো: বাংলাদেশের কোনও সুসংগত স্বীকৃত ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল’ নেই। তবে এর মানে এই নয় যে দেশ কোনও নিরাপত্তা কৌশল ছাড়াই চলছে। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের বিভিন্ন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা কাঠামো এবং পররাষ্ট্রনীতির সমন্বয়ে তৈরি একগুচ্ছ নীতি রয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা অবস্থান নির্ধারণ করে। তবে একটি সুসংগঠিত কৌশলগত কাঠামো ছাড়া কিছু সমস্যা তৈরি হয়।

প্রথমত, দেশের জন্য কোন বিপদ বা হুমকিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি যথাযথ জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল না থাকলে একেকটি প্রতিষ্ঠান একেকভাবে আসন্ন বিপদ বা হুমকিকে দেখে বা উপলব্ধি করে। দ্বিতীয়ত, সম্পদ বরাদ্দ। এটি কৌশলগত বা পূর্ব-পরিকল্পিত না হয়ে কোনও নির্দিষ্ট পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ‘রিঅ্যাক্টিভ’ বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ামূলক হয়ে যায়। তৃতীয়ত, বেসামরিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের সমন্বয় সাধন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

একটি প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের প্রধানত চারটি স্তম্ভ থাকা উচিত। 

প্রথমটি হলো, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য কৌশলগত পরিবেশ মূল্যায়ন।

দ্বিতীয়টি হলো, হুমকি বা ঝুঁকির ক্রমধারা বা হায়ারার্কি নির্ধারণ; অর্থাৎ দেশের জন্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উদীয়মান ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা। 

তৃতীয়টি হলো, সক্ষমতা বৃদ্ধি অর্থাৎ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সংস্থা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয় করা।

সর্বশেষে প্রতিষ্ঠানিক সমন্বয়; অর্থাৎ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কীভাবে একসাথে কাজ করবে তার রূপরেখা ঠিক করা। 

এই কৌশল প্রণয়ন করার পর এটি বেসামরিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়া উচিত। তবে অবশ্যই সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, অর্থনীতিবিদ এবং কূটনৈতিক সমাজ বা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে গভীর ও নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে। এভাবেই বেসামরিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। 

বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে সুসংগত কোনও গবেষণা বা পড়াশোনা নেই, আর আমরা যে, ২০২৬ সালে এসেও একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে আলোচনা করছি, এর মানে এই নয় যে কোনও কাজ হচ্ছে না। অবশ্যই অনেক কাজ হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে এটি একটি আনুষ্ঠানিক বা কাঠামোগত রূপ লাভ করবে। যেটা জরুরি তা হলো, এর গুরুত্ব বুঝতে পারা এবং এখন আমরা যে জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তার সাথে তাল মিলিয়ে এই কৌশল বা নীতি প্রণয়ন করা।  

সাহাব: আপনি বলেছেন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বেসামরিক নেতৃত্বই সম্ভবত সেরা বিকল্প। কিন্তু কোনও বেসামরিক নেতৃত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্ডা বা জাতীয় নিরাপত্তা সংস্কৃতি পরিচালনা করছে।‌ এটা দেখার জন্য আমরা সাংস্কৃতিকভাবে কতটা প্রস্তুত?

রুশো: আসলে আমরা যদি আধুনিক বা দীর্ঘদিনের পুরনো গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকাই, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথাই ধরি, সেখানে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল বা এজেন্ডাগুলো সামরিক বাহিনী, কূটনৈতিক মহল, অর্থনীতিবিদ এবং গোয়েন্দা সংস্থার মতো বিভিন্ন পক্ষের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। যা আমি আগেই বলেছি।

কিন্তু এর মূল দিকনির্দেশনা আসে বেসামরিক নেতৃত্বের কাছ থেকে। শুধু ভারত নয়, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতেও একই উদাহরণ দেখা যায়। তাই মূল কথা হলো, জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল অনেকগুলো অংশীদার বা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে কাজ করবে, তবে এর চূড়ান্ত নির্দেশনা রাজনৈতিক বা বেসামরিক নেতৃত্বের কাছ থেকে আসতে হবে। 

সাহাব: আমাদের চারপাশে যদি যুদ্ধ শুরু হয় বা এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তা মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশের বর্তমান প্রতিরক্ষা কাঠামো কি যথেষ্ট শক্তিশালী? আমাদের ঠিক কোন জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন?

রুশো: প্রথমত, আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই যে আমাদের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য, পেশাদার এবং সক্ষম। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিরক্ষা বাহিনীর সক্ষমতা বা পেশাদারিত্ব নয়, বরং প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট। যেখানে তাদের কাজ করতে হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিনটি ধারা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রথমত, বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা দেখছি সেখানে বিদেশি শক্তির নৌ-উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে। আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল, সমুদ্রপথ এবং সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষার জন্য সমুদ্রসীমায় নজরদারির সক্ষমতা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠবে।

দ্বিতীয়ত, হাইব্রিড এবং প্রযুক্তিগত হুমকি বাড়ছে। আমাদের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য যুদ্ধে জেতার ক্ষেত্রে সাইবার অপারেশন, তথ্য যুদ্ধ এবং চালকবিহীন ড্রোন সিস্টেম এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং অতি সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের উদাহরণ দিলে দেখবেন, সেখানে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ড্রোন এবং ‘অ্যাসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে।

তৃতীয়ত, মিয়ানমার সীমান্ত, যা এক সময় তুলনামূলক শান্ত ছিল, কিন্তু এখন একটি সক্রিয় গৃহযুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই তিনটি নাটকীয় পরিবর্তনই এখন সামনে আসছে।

এর মানে এই নয় যে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে রাতারাতি বিশাল সামরিকীকরণের দিকে নিয়ে যেতে হবে। তবে আমাদের সামরিক বাহিনী সুসজ্জিত, এ কথা ভেবে সন্তুষ্ট থাকারও কোনও সুযোগ নেই।

আমার কথা হলো, এই পরিবর্তনশীল বিশ্বে আপনাকে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং সেই সক্ষমতার ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে। একটি উদাহরণ দিই, সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, সেখানে বিমান বাহিনী, কামান বা ট্যাঙ্ক থাকা সত্ত্বেও দেশগুলো আত্মরক্ষার জন্য ড্রোন বা চালকবিহীন যানের ওপর বেশি নির্ভর করছে।

স্থল বাহিনী প্রয়োজনীয় হলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের সংঘাতের অনেক পরে মাঠে নামিয়েছে দেশগুলো। এছাড়া সাইবার যুদ্ধ, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার, অপপ্রচার এবং ভুল তথ্য, এগুলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি করে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

তাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বা আন্তঃবাহিনী সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। সম্ভবত আমাদের সাইবার এবং তথ্য যুদ্ধের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।

সমুদ্রসীমায় আরও ভালো টহল এবং নজরদারির জন্য আমাদের সামুদ্রিক নজরদারি এবং সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মূল কথা হলো, শুধু সক্ষমতা অর্জন করলেই হবে না, বরং ভবিষ্যতের যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে সেগুলোকে সমন্বিত করতে হবে। এটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সাহাব: জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলো যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান, সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্বের উন্নয়ন এবং সর্বোপরি আমাদের কূটনীতির কী হবে, তা নিয়ে কি আমরা ভেবে দেখেছি? নাকি আমরা এই কাঠামোগত পরিবর্তনকে কেবল একটি ‘সাময়িক অসুবিধা’ হিসেবে দেখছি এবং আত্মতুষ্টিতে ভুগছি? 

রুশো: প্রথমে বলতে চাই, আমরা মোটেও আত্মতুষ্টিতে ভুগছি না। আসলে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো প্রশ্ন বা সুযোগই নেই। এখনই সন্তুষ্ট হয়ে গেলে আমরা সামনে এগোতে পারতাম না, আধুনিকায়ন করতে পারতাম না কিংবা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের বদলে নিতে পারতাম না।

জাতিসংঘ মিশনের কথা যদি বলি, আমি আমার সামরিক জীবনে তিনটি ভিন্ন মিশনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। প্রথমটি ছিল ২০০২ সালে, যখন আমি সিয়েরা লিওনে একটি কন্টিনজেন্টের অপারেশন অফিসার ছিলাম। দ্বিতীয়টি ছিল লাইবেরিয়ায়, সেখানে আমি কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। এবং তৃতীয়টি ছিল জাতিসংঘের ইতিহাসের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং এবং মারাত্মক মিশন যেখানে হতাহতের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি, সেটি ছিল মালিতে, যা ২০১৫ এবং ১৬ সালের দিকে ছিল। আমি মালির গাও নামক স্থানে একটি বহুজাতিক সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলাম। 

আমি নিজে দেখেছি কীভাবে একটি মিশন থেকে অন্য মিশনে জাতিসংঘের কাজের ধরন, অবস্থান এবং ম্যান্ডেট বা কর্মপরিধি বদলে গেছে; এমনকি মাঠপর্যায়ে হুমকির ধরনও বদলেছে। সিয়েরা লিওনে আমি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের অংশ হিসেবে সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার সাথে যুক্ত ছিলাম, আমার আজও মনে আছে, সম্ভবত দিনটি ছিল ২০০২ সালের ১৪ মে। তারপর সিয়েরা লিওনে, তারপর আবার ২০০৮ সালে লাইবেরিয়ায় অস্ত্রসমর্পণ ও পুনর্বাসনের পরের সময়টা, তাই সেখানে ঝুঁকি অনেক কম ছিল।

কিন্তু আমি যখন মালিতে বহুজাতিক বাহিনীর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে গেলাম, সেখানকার ম্যান্ডেট ছিল অত্যন্ত কঠোর। একদিকে ছিল জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ও মালির সেনাবাহিনী, অন্যদিকে ছিল সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী, আর তৃতীয় শক্তি হিসেবে ছিল ‘বারখানে’ নামক ফরাসি বাহিনী। সেই জটিল পরিস্থিতিতে একটি নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে শান্তিরক্ষা প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা ছিল বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। সেখানে হুমকি ছিল চরম আর প্রাণহানির সংখ্যাও ছিল অনেক। আমি নিজে দেখেছি বিভিন্ন দেশে যেখানে জাতিসংঘ মিশন মোতায়েন করা হয়েছে, সেখানে কীভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বা সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বদলে গেছে।

এখন আমরা দেখছি যে, জাতিসংঘের মিশনগুলোর জন্য তহবিল কমে গেছে। মাঠপর্যায়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের কার্যকারিতা বা প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তৃতীয়ত, মিশনের ম্যান্ডেটগুলো বদলে গেছে এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জড়িত দেশগুলোর মধ্যকার স্বার্থের সংঘাত। এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও দুর্বল করে তুলেছে। আমি বলবো, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে না, তবে এর প্রকৃতি বদলে যাবে। একে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে এবং সম্ভবত এগুলো আরও ছোট ও বিশেষায়িত মিশনে পরিণত হবে।

বাংলাদেশকে এই ধরনের মিশনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে, যেখানে মাঠপর্যায়ে পাঠানোর আগেই আমাদের বাহিনীকে আরও বেশি অভিযোজনক্ষম, প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ এবং কৌশলগতভাবে সচেতন হতে হবে। 

সাহাব: আমরা কোন বিষয়টাকে বেশি প্রাধান্য দিব? পার্বত্য চট্টগ্রাম নাকি মিয়ানমার? নাকি দুটোই একসাথে? আমলাতন্ত্র, রাজনীতি, সশস্ত্র বাহিনী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং মিডিয়ার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই দুটি বা যেকোনো একটির মোকাবিলা করার মতো যুদ্ধকৌশল, সক্ষমতা এবং কার্যকর প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

রুশো: আপনার প্রশ্নের শেষ অংশটি দিয়ে শুরু করি। আমার মনে হয় বাংলাদেশের জন্য এই দুটি সমস্যাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমি কোনও একটিকে অন্যটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা বেশি সংকটময় হিসেবে চিহ্নিত করতে চাই না। তবে এই দুটি সমস্যার ধরন ভিন্ন।

প্রথমে যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু নিয়ে বলি, এটি ৭০-এর দশকে আমাদের স্বাধীনতার পরপরই শুরু হয়েছিল। এর একটি বড় মাইলফলক ছিল ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের ‘শান্তি চুক্তি’। এই চুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের চিত্র অনেকাংশেই বদলে দিয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়টি মূলত আমাদের জন্য একই সাথে একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যু এবং একটি নিরাপত্তা ইস্যু। এই সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ জড়িয়ে আছে।

মূলত সশস্ত্র বাহিনী অর্থাৎ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য নিয়োজিত রয়েছে। তবে সেখানে আমলাতন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে আরও জোরালো সমন্বয় প্রয়োজন। যদিও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সমন্বয় এখন আছে, তবে মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা বাড়াতে এই সমন্বয়কে আরও উন্নত করতে হবে। অবশ্যই শান্তি চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন, সেই সাথে ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

তবে এখানে একটি বিষয়ে সতর্ক করতে চাই, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। কারণ স্থানীয় কিছু নেতা বা পক্ষ অনেক সময় নিজেদের স্বার্থেই চায় না যে এই বিশ্বাস বা আস্থা তৈরি হোক। সেখানে প্রচুর অবৈধ অর্থনীতি এবং চাঁদাবাজি চলে। তাই স্থানীয় নেতারাই অনেক সময় এই আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান। এটিই হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু।

এবার মিয়ানমার ইস্যু নিয়ে বলি। আমি আগেও বলেছি যে, আমাদের দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। কারণ সেখানে একটি ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’ বা সশস্ত্র গোষ্ঠী (আরাকান আর্মি) বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে এবং তারা রাখাইন রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা দেখেছি যে, এ সমস্যার কারণে আমাদের দেশে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব এবং তাদের নিজেদের সমস্যার কারণে ১৯৭৮ সাল থেকে দফায় দফায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। আমার জানামতে এখন প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা আমাদের দেশে অবস্থান করছে। আমরা এখন মিয়ানমারের এই সংকটের একটা অংশীদার হয়ে পড়েছি। 

 

এটি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়? গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুক্ত করে, মানবিক কূটনীতি এবং দেশি-বিদেশি পক্ষগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে সরকার যেভাবে এটাকে মোকাবিলার চেষ্টা করছে, সেভাবেই হয়তো এর সমাধান মিলবে। তবে আমি মনে করি না এই সমস্যা খুব দ্রুত বা এখনই কোনও সমাধান হবে। এটি পুরোপুরি সমাধান করতে আরও অনেক বছর সময় লাগতে পারে।

সাহাব: আমার শেষ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ঐতিহাসিকভাবেই পররাষ্ট্রনীতি বা অন্য যেকোনও নীতি নির্ধারণে খুব সীমিত ভূমিকা পালন করে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে ‘কৌশলগত সংস্কৃতি’ নিয়ে একটি বড় আলোচনা শুরু হয়েছে। কৌশলগত সংস্কৃতির আদলে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘সুস্থ সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক’ দেখতে আসলে কেমন হওয়া উচিত?

রুশো: একটি সুস্থ বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ক সবসময়ই দেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষা করে। আর এই সুসম্পর্ক শুধু সামরিক বাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে না, যদিও রাজনীতি থেকে সামরিক বাহিনীকে দূরে রাখাটা অপরিহার্য।

আসলে এমন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম তৈরি করতে হবে, যার মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর কৌশলগত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু শনাক্ত করা যায় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের নীতিনির্ধারণী সংস্থা, এই অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান থেকে সাহায্য পেতে পারে।

বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে সামরিক এবং বেসামরিক পক্ষগুলো সবসময় একযোগে বা ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেয়নি। অনেক সময় দেখা গেছে, সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে, যা জাতীয় স্বার্থের জন্য কখনই ভালো ফল বয়ে আনে না। আমাদের দেশে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা এবং শিক্ষাবিদরা অনেক সময় যার যার জায়গা থেকে কাজ করেন ঠিকই, কিন্তু তারা সমন্বিতভাবে কাজ করেন না।

জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে যদি নিয়মিত আলোচনা ও পরামর্শের সংস্কৃতি চালু থাকে, তবেই দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য কল্যাণকর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। আর এটি কীভাবে কাজ করবে? আমার মনে হয় এর একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হতে পারে এমন যে, একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে। এই কাউন্সিল নিয়মিতভাবে বসবে, বিভিন্ন নিরাপত্তা ইস্যু বিশ্লেষণ করবে এবং দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সঠিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের স্বার্থই রক্ষা করবে।

এছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিক্ষাবিদ, গোয়েন্দা সংস্থা, থিঙ্ক ট্যাংক এবং প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী বন্ধন বা যোগাযোগ তৈরি করা। আপনি যে ‘কৌশলগত সংস্কৃতি’র কথা বলছেন, সেটি গড়ে তুলতে এই সমন্বয় খুব দরকার।

বর্তমানে আমাদের সামরিক বাহিনীর জন্য উচ্চতর পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের পেশাদারিত্ব আগে থেকেই আছে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। তাই আমাদের সামরিক বাহিনীর প্রতিটি স্তরে এই পেশাদারিত্বের চর্চা বাড়াতে হবে এবং ‘মেরিটোক্রেসি’ বা মেধাভিত্তিক মূল্যায়নকে উৎসাহিত করতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো, কৌশলগত সংস্কৃতি তখনই বিকশিত হবে যখন বেসামরিক এবং সামরিক বিশেষজ্ঞরা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবেন, বিচ্ছিন্নভাবে নয়। তাই আমি মনে করি, বাংলাদেশ যদি এখন এই কৌশলগত সংস্কৃতির জন্য একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে, তবে আমাদের দেশ সঠিক পথেই এগোবে। আর সম্ভবত সাধারণ মানুষ এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও অত্যন্ত আশাবাদী যে, নতুন সরকার আসায় অনেক ভালো কাজ হবে, যার জন্য তারা অপেক্ষায় আছেন।