ভারত চাইলেই এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না: জিশান সালাহউদ্দিন
জিশান সালাহউদ্দিন ইসলামাবাদের অন্যতম গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘তাবাদল্যাব’ (Tabadlab)-এর একজন অংশীদার। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংযোগ কেন্দ্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একইসঙ্গে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক চরমপন্থা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ নিয়েও কাজ করেন। জিশান নিয়মিত লিখছেন ডন, ফরেন পলিসি, দ্য ডিপ্লোম্যাট এবং দ্য ফ্রাইডে টাইমসে। অতীতে তিনি সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এ স্ট্র্যাটেজি প্রোগ্রামের পরিচালক ছিলেন।
আলাপের পডকাস্টে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সাহাব এনাম খানের সঙ্গে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন জিশান। সেই আলোচনার ঈষৎ সম্পাদিত অংশ প্রকাশিত হলো। ইংরেজিতে হওয়া কথোপকথনটির অনুবাদ করেছেন ফাতিন নূর অবনি।
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০০ পিএমআপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
জিশান সালাহউদ্দিন ইসলামাবাদের অন্যতম গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘তাবাদল্যাব’ (Tabadlab)-এর একজন অংশীদার।
সাহাব এনাম খান: বাংলাদেশে ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ’ সম্পর্কের পুরো বিষয়টি সার্বভৌমত্ব এবং ঐতিহাসিক জবাবদিহিতার জায়গা থেকে দেখা হয়। পাঁচ দশক ধরে প্রায় থমকে থাকা সম্পর্ক, পাকিস্তানের দিক থেকে ১৯৭১-এর অমীমাংসিত অধ্যায়, এবং এমন দুটি দেশ যারা একে অপরের সাথে কোনো কঠিন বা খোলামেলা আলোচনা বরাবরই এড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দীর্ঘ দূরত্বের কারণ কী? আর এই দূরত্বের জন্য আসলে কার দায় বেশি?
জিশান সালাহউদ্দিন: এই বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বলা দরকার। কারণ এই বিষয়ে কথা উঠলে মানুষ এটা প্রায়ই এড়িয়ে যায়। আমি নিজে যেহেতু আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা নিয়ে কাজ করি, তাই আমার কাছে ইতিহাসের গুরুত্ব স্বীকার করাটা জরুরি; তবে ইতিহাসের ভারে স্থবির হয়ে থাকাটা সমাধান নয়।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান, উভয়ই শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং মধ্যম শক্তির দেশ। দুই দেশেরই নিজস্ব শক্তি ও সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু আমাদের একে-অপরের পরিপূরক হওয়ার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। আমি সরকারের কোনো প্রতিনিধি নই। আমি একজন পাকিস্তানি সাধারণ নাগরিক এবং ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে বলছি- আমার মনে হয়, পাকিস্তান ১৯৭১ সালের ক্ষত এবং ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট কিছু করেনি। তবে একই সাথে আমাদের বাস্তবসম্মত উপায়ে সামনে এগোনোর পথ খুঁজতে হবে, আর ‘লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক’ বা ট্রানজেকশনালিজমই হতে পারে সেই পথ।
এখন আমরা একটি বহুমুখী পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে ছোট ছোট আঞ্চলিক বা উপ-আঞ্চলিক জোট তৈরি হচ্ছে। যখনই এমনটা হয়, আমাদের মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, আমি জানি সামনে আমরা এটা নিয়ে আরও কথা বলবো, আর তা হলো, এই লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের আওতায় বাণিজ্য, অর্থনীতি, সংযোগ, নিরাপত্তা এবং টেক্সটাইল বা ওষুধ শিল্পের মতো বাণিজ্যিক খাতে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, সবকিছুই আসতে পারে। দুটি দেশ একে-অপরের কাছে কী শিখতে পারে, সেটিও দেখার বিষয়।
ভূ-রাজনৈতিকভাবে দুই দেশের জন্যই তাদের বন্ধুত্বের পরিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সমন্বয় বাড়ানো এবং স্বার্থের বৈচিত্র্য আনা এখন খুব জরুরি। কারণ বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়, ইরান যুদ্ধের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। ইরান যুদ্ধ চলছে। এমন এক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বহুপাক্ষিকতা ও বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ততা বজায় রাখতে হবে। বর্তমানে প্রভাবশালী দেশগুলোর একতরফা সিদ্ধান্তের সামনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও প্রায় অকেজো হয়ে পড়ছে।
আমাদের ইতিহাসের ভারে কোণঠাসা হয়ে থাকা উচিত নয়। আমাদের ইতিহাসকে স্বীকার করতে হবে, গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু সামনে এগোনোর পথও খুঁজে বের করতে হবে। এতদিন আমরা এই সম্পর্ক ঠিক করতে পারিনি, কারণ যখনই কোনো পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ছিল মূলত ব্যক্তি-কেন্দ্রিক বা কোনো বিশেষ নেতার ব্যক্তিগত ইচ্ছা। এর পেছনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না।
যেমন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীতে যোগাযোগ করেছিলেন। তখন অনেক আশা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি না থাকায় সেগুলো টেকসই হয়নি।
শুধুমাত্র দুজন নেতা বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্পর্ক এগোবে না। এর জন্য ব্যবসায়ী, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের সংযোগ প্রয়োজন। সামনে আমাদের জন্য নতুন সুযোগ আসতে পারে। আমাদের উচিত সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। আবার তিনিও পাকিস্তান ডে অথবা স্বাধীনতা দিবসে, আমার ঠিক মনে নেই, ফিরতি শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন। তখন থিঙ্ক ট্যাংক বা গবেষক মহলে অনেক উৎসাহ দেখা দিয়েছিল। তারা ভাবছিলেন হয়তো সম্পর্কের বরফ গলছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা টেকেনি। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হলো, সম্পর্ক শিথিল হতে থাকলে কখনো কখনো ইতিহাসের বোঝা ভারি হয়ে যায়। দ্বিতীয় কারণ হলো, শুধু দুইজন ব্যক্তি বা নেতার ইচ্ছায় সম্পর্ক এগোয় না। যদি না এর পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন থাকে।
ঠিক একইভাবে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা পাকিস্তানের বর্তমান বেসামরিক নেতৃত্বের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। আমাদের ব্যবসায়ী সমাজ, থিঙ্ক ট্যাংক, পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। আমার সাথে আপনার এই আলোচনাও একটা ভালো উদ্যোগ।
এই যোগাযোগগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খুব অল্প সময়ের জন্য এই ধরনের আলোচনার সুযোগ থাকে। আমরা প্রায়ই যা করা দরকার তার মাত্র ১০ শতাংশ কাজ করি। পরে আক্ষেপ করে বলি, কিছুই হলো না। আমার মনে হয়, এখন সেই আক্ষেপ কাটিয়ে কাজে নামার সময় এসেছে।
সাহাব: আপনি বললেন ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন পাকিস্তানে অনেক উৎসাহ ছিল। বর্তমানে ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি যে সরকার গঠন করেছে এবং ঠিক আগের অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাপারেও কি ইসলামাবাদে একই ধরনের উৎসাহ কাজ করছে? নাকি এটি শুধু নির্দিষ্ট কোনো সরকারের ওপর নির্ভর করে? ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকার আসতে পারে। এই সম্পর্ক যাতে শুধু সরকার-কেন্দ্রিক না হয় এজন্য পাকিস্তান কি এমন কোনো ব্যবস্থা বা মেকানিজম তৈরি করেছে?
জিশান: এখানে দুটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথমত, অন্যান্য যেকোনো দেশের মতো পাকিস্তানও রাজনৈতিক ও সামাজিক রদবদলের মধ্য দিয়ে যায়। তবে আমাদের কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, ব্যবস্থা বা ধারণা টিকে থাকে। এখন বিভিন্ন সেমিনারে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়, তার মধ্যে একটা বড় বিষয় উঠে আসে। তা হলো, আমরা এর আগে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি; এই উত্তেজনা আগেও ছিল, এই আগ্রহও ছিল, অন্তত রাজনৈতিক স্তরে। কিন্তু কীভাবে আগালে দীর্ঘস্থায়ী, নমনীয়, স্থিতিস্থাপক ও টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা যায়। আমরা এমন এক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা তৈরি পারি যেন উভয় দেশে যে সরকারই আসুক না কেন, সম্পর্ক তখনও টিকে থাকবে।
আমি মনে করি, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। সত্যি বলতে আমাদের সম্পর্ক এখন নেই বললেই চলে, শূন্যেরও নিচে।
ভারত ও চীনের বাণিজ্যের ১২০ বিলিয়ন ডলারের হিসাবের কথা আনা যায়। লাদাখ সীমান্ত নিয়ে চরম উত্তেজনা আর ঐতিহাসিক তিক্ততা থাকার পরও তারা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা বুঝেছে যে মানুষের প্রয়োজনে ‘লেনদেন’ বা বাণিজ্যকে সব কিছুর উপরে রাখতে হবে।
অন্যদিকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বাণিজ্যের দিকে তাকান, আমার জানা মতে এটি বিলিয়ন ডলারেরও কম। বছরে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার। যা আমার মতে খুবই হতাশাজনক।
যদি দুই দেশ বুদ্ধিমানের মতো সঠিক নীতি গ্রহণ করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন দেয়, তবে আগামী পাঁচ বছরেই এই বাণিজ্য ৪ থেকে ৫ গুণ বাড়িয়ে ৩ বা ৪ বিলিয়ন ডলারে নেওয়া সম্ভব।
এবার দ্বিতীয় বিষয়টি বলি, পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোতে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। ভারতের সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা আছে, তবে আমি এ নিয়ে বেশি কিছু বলবো না। কারণ অনেক কিছুই ভারত-কেন্দ্রীক হয়ে যায়।
সত্যি বলতে গেলে, এই মুহূর্তে ভারতকে নিয়ে পাকিস্তান খুব একটা ভাবছে না। কারণ আমাদের নিজেদেরই অনেক কিছু সামাল দিতে হয়। বর্তমানে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা’।
আমরা কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাড়াতে চাই। কর ব্যবস্থার সংস্কার করতে চাই। যাতে আইএমএফ বা বিদেশি ঋণের ওপর আমাদের সবসময় নির্ভরশীল থাকতে না হয়।
আপনি হয়তো জানেন, গত কয়েক মাস ধরে আফগানিস্তানের সাথে আমাদের সরাসরি সংঘর্ষ চলছে। এর কারণও খুব স্পষ্ট। আফগানিস্তানের বর্তমান সরকার, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সব ধরনের ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, তাদের অবস্থান কট্টর।পাকিস্তান গত চার বছরে শত শত কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ এবং ধর্মীয় নেতাদের আফগানিস্তানে পাঠিয়েছে; যেন তালেবানদের আলোচনার টেবিলে আনা যায়।
পাকিস্তানের জন্য আরেকটি চিন্তার বিষয় হলো ইরান পরিস্থিতি। আমরা এর আগে দেখেছি- আফগানিস্তানে যখন শেষবার যুদ্ধ হয়েছিল। তখন পাকিস্তানকে কত বড় মূল্য দিতে হয়েছে। ওই ২০ বছরে প্রায় ৯০ হাজার পাকিস্তানি বিভিন্ন ঘটনায় ও সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল এবং দেশটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এখনও হচ্ছে।
ন্যাটো, আইএসএএফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ২০২১ সালের ৩০ অগাস্ট আফগানিস্তান ছেড়ে যায়। এর প্রায় চার বছর বা তারও বেশি সময় কেটে গেছে। অথচ এখন টিটিপি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পাকিস্তান তাদের ওপর কঠোর অভিযান চালালেও বাস্তবতা হলো, এটি এক ধরনের অসম যুদ্ধ। এখন ইরানের সাথেও একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আমি নিশ্চিত যে এই সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলবে। ইরানিরা এক দীর্ঘ, টানটান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং সংঘাত আরো বাড়তে থাকবে।
এ ধরনের পরিস্থিতি যখন পাকিস্তানের আশপাশে ঘটে, তখন আমাদের কিছু করার থাকে না। আমরা তো আর সীমান্ত বেছে নিতে পারি না। সুইজারল্যান্ডের মতো নিরপেক্ষ সীমান্ত থাকলে ভালো হতো। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চীন ছাড়া এখন আমাদের সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী সম্ভবত আরব সাগর।
তাই আমরা চেষ্টা করছি যেন এই সংঘাতের প্রভাব পাকিস্তানে না পড়ে। আমরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, তা যেন ব্যাহত না হয়। মূল বিষয়টি এখানেই।
আমার মনে হয়, এই কারণেই পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীল ও নমনীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। পাশাপাশি আমাদের দেশের ভেতরেও অনেক পুনর্বিন্যাস চলছে এবং অর্থনীতির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
এই লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র উপায় হলো আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানো, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করা এবং সার্বভৌম পর্যায়ে কাজ করে দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা।
সাহাব: আপনি যদি ঢাকার নীতিনির্ধারক বা রাজনৈতিক মহলকে দেখেন, তারা সবসময় পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এখন যে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলো নিয়ে তারা বেশ চিন্তিত।
একইসঙ্গে সৌদি আরব–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি, সেখানে ইরানের উপস্থিতি। আবার ওয়াশিংটন ও রাওয়ালপিন্ডির সম্পর্ক। আমি ইসলামাবাদের কথা বলছি না, আমি ‘পিন্ডি’-র কথা বলছি। এই সম্পর্কটি বেশ শক্তিশালী। আপনি কি মনে করেন, সৌদি–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি, ইসলামাবাদ বা রাওয়ালপিন্ডি–ওয়াশিংটন সম্পর্ক এবং পাকিস্তানের চরমপন্থী ইকোসিস্টেমের প্রেক্ষাপটে, ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিয়ে ঢাকার যে দুশ্চিন্তা, তা কি যুক্তিসঙ্গত?
জিশান: আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি, নিরাপত্তা নিয়ে ঢাকার মনে যে সংশয় তার থেকেও বেশি চিন্তিত পাকিস্তান। কারণ আমরা প্রতিদিন এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাই না? এখানে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার।
প্রথমত, পাকিস্তান একটি ‘কঠিন অবস্থানে’ আছে। আমি এটাকে একটু ভিন্নভাবে বলব, এটি আসলে একটি ‘সুক্ষ্ম ভারসাম্য’।
সম্প্রতি আমরা সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। এই চুক্তি অনেক দিন ধরেই আলোচনায় ছিল এবং ইসরায়েল যখন গাজায় হামলা শুরু করে, তারও অনেক আগে থেকে এই চুক্তির পরিকল্পনা ছিল। কাতারের দোহায় আলোচনা করতে যাওয়া এক দলের উপর বোমা হামলা চালায় ইসরায়েল, সেই ঘটনাও প্রক্রিয়াটিকে কিছুটা ত্বরান্বিত করেছে। যদিও এটি সরাসরি কারণ নয়, তবে এটি একটি ট্রিগার হিসেবে কাজ করেছে।
পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা অনেক দিন ধরেই রয়েছে। পাকিস্তান গত কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি বড় নিরাপত্তা প্রদানকারী দেশ হিসেবে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে আমরা বিশ্বজুড়ে এই ভূমিকা পালন করতে চাই।
এক বছর আগে একটি আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম, সেখানে কথা হচ্ছিল যে, শুধু জেএফ-১৭, পিএল-১৫ বা এমন অন্য কোনো অস্ত্র বা সামরিক সহায়তা নিয়েই যে চুক্তি করতে হবে, তা নয়।
বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানেরও শক্তিশালী টেক্সটাইল শিল্প রয়েছে। তাই নিরাপত্তা প্রদানকারী প্যাকেজের মধ্যে শুধু সামরিক সহায়তা বা অস্ত্র থাকবে না। টেক্সটাইল শিল্পও এই নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হতে পারে। যেমন, অন্যান্য দেশ থেকে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে হেলমেট, জ্যাকেট, জুতা, মোজার মতো পণ্যগুলো না কিনে, আমাদের থেকে দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক চুক্তি, জিএসপি প্লাস সুবিধার পরিবর্তে সস্তায় কিনতে পারেন।
এক্ষেত্রে হয়তো সিবিএএম বা কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট ম্যাকানিজমের মতো নতুন নীতিগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড়ও পাওয়া যেতে পারে।
এতে করে পাকিস্তান শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের জন্য নিরাপত্তা প্রদানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগোতে পারবে। আর পাকিস্তানও এধরনের চুক্তি করতে বেশ আগ্রহী।
তবে এখানে সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ব্যাপারও আছে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুপাক্ষিক ফোরামে নিজেদের অবস্থান নিয়ে পাকিস্তান বেশ সচেতন। আমাদের বক্তব্য হলো, এই যুদ্ধ বৈধ নয়, এটি জাতিসংঘ বা এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের সমর্থনও পায়নি। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলাও বন্ধ হওয়া উচিত। তাই পাকিস্তানকে বেশ সতর্ক হয়েই এগোতে হচ্ছে।
আমরা সিপিএসি ও বিআরআই ফ্রন্টে চীনের সাথে সমন্বয় করার চেষ্টা করছি, অনেকাংশে সফলও হয়েছি। তবে চ্যালেঞ্জ তো আছেই।
পাকিস্তানের সঙ্গে নন-স্টেট অ্যাক্টরদের সম্পর্ক বিষয়েও প্রশ্ন আসতে পারে। বিশেষ করে আফগান তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের বিকল্প কী?
আমরা আফগানিস্তানকে অনেক সাম্রাজ্যের সঙ্গেই যুদ্ধে জড়াতে দেখেছি। একে ‘গ্রেভিয়ার্ড অব এম্পায়ারস’ বা ‘সাম্রাজ্যের কবরস্থান’ বলার কারণ তো আছে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর প্রায় ৭০ লাখ শরণার্থী পাকিস্তানে আসে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের চার্লি উইলসন ও আফগানিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট, জিয়া-উল-হকের সহযোগিতায় মুজাহিদিন গঠিত হয়, যা পরে তালেবানে রূপ নেয়। তারা এখনও আছে। আমার মতে, পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গিটা এমন যে সাম্রাজ্য ভাঙ্গে আবার গড়ে।
অনেকপক্ষই আফগানিস্তানের উপর হামলা করেছে এবং দখল নিয়েছে। কিন্তু একটা সময় তারা চলে যায়। তারা হয়তো তাদের লক্ষ্য অর্জন করে ফেলেছে। না হয় তাদের লক্ষ্যগুলো অর্জন করার মতো কিছু ছিল না। কিন্তু তাদের ফেলে যাওয়া বিশৃঙ্খলা আমাদেরই পরিষ্কার করতে হবে। তাই এসব মাথায় রেখে, ইতিহাস মনে রেখে, যারা ক্ষমতায় আছে বা ভবিষ্যতে আসতে পারে, তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত।
আর পাকিস্তান ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। ২০২১ সালের ১৫ অগাস্ট তালেবান ঠিকই কাবুল দখল করে এবং তারা এখনো ক্ষমতায় রয়েছে। তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা যুক্তিযুক্ত ছিল। কারণ ন্যাটো, আইএসএএফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী হয়তো তাদের সি-১৩০ নিয়ে চলে যেতে পারে। কিন্তু আমরা তা করতে পারি না। আফগানিস্তানের সাথে আমাদের ১৬০০ কিলোমিটারের সীমান্ত। আমাদের দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক স্বার্থ বজায় রাখার জন্যই আফগানিস্তানের সব পক্ষের সাথেই আমাদের একটা সম্পর্ক রাখতে হয়।
তবে সমস্যা হলো, তালেবান কোনো একক গোষ্ঠী নয়। এই মূহূর্তে হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বে একটি দল তালেবানের ক্ষমতায় আছে। এবং তালেবানের অন্যান্য যেসব গোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে পাকিস্তান আগে সম্পর্ক গড়েছিল, যেমন- হাক্কানি গোষ্ঠী। তারা এখন ততটা প্রভাবশালী নয়। ফলে টিটিপি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে তাদের প্রভাব কমে গেছে। তাই সে সময়ের বিবেচনায়, যেহেতু বিদেশি শক্তির প্রভাব একটা না একটা সময় থাকবে না, যেসব গোষ্ঠী ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসতে পারে, তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে এসব দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও কৌশল সবসময় সফল হয় না, নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে। এখন আমরা তারই ফল ভোগ করছি।
আমি মনে করি না বাংলাদেশে সরাসরি এর কোনো প্রভাব পড়বে। আমাদের মধ্যে সীমান্ত নেই, যা একদিকে সুবিধা, অন্যদিকে অসুবিধা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ও নাগরিকদের নিরাপদ রাখতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, প্যারামিলিটারি বাহিনী অসাধারণ কাজ করছে। শুরুতে বিভিন্ন আলোচনা ও বৈঠকের মাধ্যমে কূটনৈতিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল।
টিটিপিকে পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলেও, অন্তত পাকিস্তানে ঢোকা থেকে তো তাদের আটকাতে হবে। কিন্তু আফগানিস্তানের সরকার শক্ত অবস্থান নেওয়ায় সাড়ে চার বছরের এই প্রচেষ্টা থেকে কোনো ফল আসেনি। তাই এখন কাইনেটিক (সামরিক) পদ্ধতিতে সমাধান করতে হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান করতেই হবে, এর অন্য কোনো বিকল্প নেই।
সাহাব: দিল্লির দৃষ্টিকোণ থেকে একটা প্রতিষ্ঠিত ধারণা হলো, পাকিস্তানের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের দীর্ঘদিনের যোগসূত্র আছে। তাদের দুশ্চিন্তা হলো, সন্ত্রাসবাদের এই সংযোগ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এই নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ বা বয়ানের জবাব কীভাবে দেওয়া যায়?
জিশান: ভারত বিশ্বজুড়ে নিজেদের প্রচারণা চালানো বা স্ট্র্যাটকম যুদ্ধে বেশ পারদর্শী। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ততোটা না। তারা বিশ্বকে এমন কিছু বিষয় বিশ্বাস করাতে পেরেছে, যা সবসময় পুরোপুরি সত্য নয়। কিন্তু যেহেতু তাদের প্রচারের সুযোগ বেশি, তাই তাদের কথাগুলো মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
অথচ বাস্তব চিত্রটা কিন্তু অন্যরকম। বেলুচিস্তানে কী ঘটছে? সেখানে বিএলএ বা অন্যান্য সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো কীভাবে বাইরের শক্তির সাহায্য পাচ্ছে, তা এখন একেবারেই স্পষ্ট।
বিদেশি সাহায্য বা হস্তক্ষেপ থাকলে এই ধরনের গোষ্ঠীগুলো যতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, শুধু স্থানীয়ভাবে তা সম্ভব হতো না। আর এখানেই আসল সমস্যা। এই যুদ্ধটা কেবল অস্ত্র দিয়ে শত্রু নির্মূল করার মতো সহজ কিছু নয়; কারণ এই গোষ্ঠীগুলোর মতাদর্শের পেছনে বাইরের দেশের বড় ধরনের সমর্থন ও প্রভাব রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আসলেই অনেক জটিল।
প্রশ্ন হলো, এ নিয়ে কি ঢাকার চিন্তিত হওয়া উচিত? আমার উত্তর হলো, না। কারণ পাকিস্তানে এখনকার মূল লক্ষ্য হলো আমাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করা। রাষ্ট্রের কাঠামো ও ব্যবস্থায় যে ত্রুটিগুলো আমাদের এতদিন ভুগিয়েছে, সেগুলো ঠিক করা।
আপনি জানেন পাকিস্তান গত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যে ট্যারিফ বা শুল্ক নীতি গ্রহণ করেছিল, তা এক ধরনের ‘সংরক্ষণবাদ’ তৈরি করেছে। শুরুতে এটি দেশি শিল্পের জন্য ভালো মনে হলেও শেষ পর্যন্ত উদ্ভাবনী ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। আমাদের শিল্প খাতকে স্থবির করে ফেলেছে। গত বছর বিশ্বব্যাংকের একটি জরিপেও দেখা গেছে পাকিস্তানের খুব কম সংখ্যক প্রতিষ্ঠান নতুন কোনো পণ্য বা সেবা তৈরি করছে।
আমি নিরাপত্তা আলোচনায় এই বিষয়টি আনছি, কারণ মূল ফোকাস থাকবে অর্থনীতি ঠিক করার ওপর। বর্তমানে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কাজের একটি পরিষ্কার বিভাজন দেখা যাচ্ছে। সেনাবাহিনী মূলত সীমান্ত এবং দেশের ভেতরের সন্ত্রাসবাদ দমনের বিষয়টি সামলাচ্ছে। অন্যদিকে, বেসামরিক নেতৃত্ব পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলার দিকে।
আমি আঞ্চলিক সংহতি দেখতে চাই এবং ইতিহাসের বোঝা পেছনে ফেলে এসে একজন আশাবাদী ও বাস্তববাদী হিসেবে কথা বলতে চাই। পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক উভয় নেতৃত্বই এখন নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসতে আগ্রহী। তারা ইতিহাসের ভারে পঙ্গু হয়ে থাকতে চায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমি গত ১৫-২০ বছরে দেখেছি যে, পাকিস্তানের নীতি আর আগের মতো ভারত-কেন্দ্রিক নয়। ভারত আমাদের নিয়ে কী ভাবছে বা করছে, তাতে আমাদের আর কিছু যায় আসে না। কিন্তু ভারত এখনো পাকিস্তান নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামায়। মোদী সরকার বা বিজেপি, এমনকি আরএসএস-এর নজরের সিংহভাগই থাকে পাকিস্তানের ওপর। ভারত এখন এক বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি। তাদের উচিত নিজেদের মানুষের দিকে এবং তাদের যে অভাবনীয় উন্নয়নের গতি আছে, তার দিকে নজর দেওয়া। মেরিল লিঞ্চ-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের ইকোনমি বিশ্বের তৃতীয় স্থানে অবস্থান করবে।
আমার মনে হয়, এই বিশাল অর্থনীতির কারণে ভারতের মধ্যে এক ধরনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনে জোর করে হলেও তারা এটি করতে চায়। কিন্তু তারা এটা বুঝতে পারছে না, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নিজস্ব কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও তাদের আলাদা শক্তি ও সক্ষমতা আছে।
আমাদের মধ্যে হয়তো অর্থনীতির পাল্লায় সমান সমান লড়াই হবে না, কিন্তু ভারত চাইলেই এই অঞ্চলে একতরফা আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না।
সহজ কথায় বললে, বাংলাদেশ দেখতে পাবে যে, এখন পাকিস্তানের সামরিক, বেসামরিক এবং শক্তিশালী আমলাতন্ত্র, এই তিন পক্ষই অর্থনীতির দিকে মনোযোগী। আর এই অর্থনীতির সূত্র ধরেই তারা বাংলাদেশের সাথে একটি মজবুত, দীর্ঘমেয়াদী এবং নমনীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
সাহাব: সরকার নির্ভর নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি ছাড়াই বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্পর্ক যদি স্বাভাবিক হয়, তাহলে অর্থনৈতিকভাবে আমরা কী কী সুফল পাবো। ইসলামাবাদ কি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের থেকেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা কমাতে বেশি আগ্রহী?
জিশান: আমি পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন নাগরিক হিসেবে কথা বলছি। আমি আঞ্চলিক সম্পর্ক মজবুত করতে আগ্রহী।
অনেক সময় অন্য দেশের মানুষ, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের পর্যবেক্ষকরা, পাকিস্তানকে কেবল ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখে। কেন এমনটা হয়, তা আমি বুঝি। আমরা একাধিক যুদ্ধ করেছি। গত বছরও একটি সংঘাতে জড়িয়েছি। সেই যুদ্ধের সবচেয়ে আলোচিত পরিসংখ্যানটি (৭-০) আপনি হয়তো মনে করতে পারেন, তবে আমি সেদিকে আর যাচ্ছি না।
কিন্তু বিশ্বাস করুন, ইসলামাবাদের এই সুসম্পর্ক গড়ার আগ্রহের পেছনে ভারতের সাথে সংশ্লিষ্টতা এতটাই কম যে বিষয়টি প্রায় হাস্যকর।
চলুন সেই কারণগুলো একটু খতিয়ে দেখি:
প্রথমত, আমি আগেও বলেছি, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের বিভাজন চলছে। ২৫ বছর আগে আফগানিস্তানে যে সম্মিলিত বিশ্বশক্তি একজোট হয়ে এসেছিল, আজ তারা ইরানে হামলা করার সময় আর আগের মতো এক নেই। স্পেন সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে তারা এতে থাকবে না। কানাডাও দীর্ঘমেয়াদে এই প্রক্রিয়ায় থাকতে নারাজ। অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্বেও বিভাজন বাড়ছে, আর আমাদের অঞ্চলসহ অন্যান্য জায়গায় এই বিভাজন তো আছেই। তাই এটিই উপযুক্ত সময় একটি ‘বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি’ গ্রহণ করার। যেখানে আপনি বিভিন্ন দিক থেকে সম্পর্ক তৈরি করবেন, ঝুঁকি ভাগ করে নেবেন, এবং সামনে এগুতে গিয়ে আপনার হাতে একাধিক বিকল্প থাকবে, বিশেষ করে বহুপাক্ষিক পর্যায়ে।
গত এক বছরে আমরা দেখেছি পাকিস্তান পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে সাজাচ্ছে। আমরা এখন যেকোনো আন্তর্জাতিক শক্তির সাথে কাজ করতে প্রস্তুত। যাতে আমাদের অনেকগুলো পথ খোলা থাকে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী চীনে গিয়ে এমন কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছেন যেখানে রাশিয়া এমনকি উত্তর কোরিয়ার নেতারাও ছিলেন। আবার আমরা তাকে ফিল্ড মার্শালের সাথে হোয়াইট হাউসে যেতে দেখেছি, যেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি খনিজ পদার্থের বাক্স উপহার দিয়েছেন, যা পাকিস্তানে এখন খুব পরিচিত একটি ছবি। এছাড়া আমাদের নেতারা জিসিসি দেশগুলোতে যাচ্ছেন, মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
পাকিস্তান এখন তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে এবং বহুমুখী যোগাযোগ তৈরিতে অত্যন্ত আগ্রহী। যেহেতু আমরা উভয়ই মুসলিম প্রধান দেশ এবং আমাদের মধ্যে অনেক মৌলিক বোঝাপড়া, অভিন্ন ইতিহাস ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি আছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ আমাদের একজন অংশীদার।
আমরা যখনই বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নিয়ে কথা বলি, তখন শুধু ‘ইতিহাসের বোঝা’ বা তিক্ততা নিয়ে আলাপ করি। কিন্তু ঐতিহাসিক বন্ধনও তো কম নয়, আর আমার মনে হয়, সেগুলো যথেষ্টভাবে কাজে লাগানো হয় না।
বিকল্প পথ খোলা রাখার বিষয়টি নিয়ে আমি আগেই বলেছি। আমার মতে, সার্ক (SAARC)-এর পুনর্জাগরণ প্রয়োজন। বাস্তবে এটি এখন অনেকটাই স্থবির। ‘অকার্যকর’ বললে হয়তো খুব কঠোর শোনাবে। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সংস্থাটি গঠন করা হয়েছিল, তা এখন আর পূরণ হচ্ছে না। তাই দ্বিপাক্ষিক পথগুলো গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আর এই অঞ্চলের ‘ড্রাগন’ অর্থাৎ চীনকে তো আপনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না। আমার মতে, চীন দুই দেশের জন্য কোনো বাধা নয়। বরং, চীন একধরনের সেতুবন্ধন। কারণ তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজনে এবং বিআরআই (BRI) বা আধুনিক সিল্ক রোড প্রসারের মাধ্যমে তারা এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বাড়াতে চায়। এটি আসলে আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ।
বাণিজ্য ও অর্থনীতির দিক থেকে কাজ করার মতো অনেক জায়গা আছে।
আগে আমি টেক্সটাইলের কথা বলেছি। পাকিস্তান তুলা এবং সুতা উৎপাদনে অনেক এগিয়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বৃহৎ এবং বিশ্বজুড়ে এর কদর রয়েছে।
তাই আমাদের মধ্যে ‘সাপ্লাই চেইন’ বা সরবরাহ ব্যবস্থার একটি প্রাকৃতিক সমন্বয় হওয়ার সুযোগ আছে। আমি যে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের কথা বলেছি- এটি মূলত অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রাথমিক হিসাব। যদি আমরা আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থাগুলোকে এক করতে পারি, তবে দুই দেশই অভাবনীয় লাভবান হবে। এখানেই ‘নন-জিরো’, ‘জিরো-সাম’ গেইমের ধারণাটা সামনে আসে। এটা এমন একটা পরিস্থিতি হবে যেখানে কোনো দেশকেই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো ওষুধ শিল্প। পাকিস্তানের ওষুধ শিল্প বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পও খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই যৌথ উৎপাদন থেকে শুরু করে একে অপরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার স্পষ্ট সুযোগ রয়েছে।
আমার মনে হয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অধিকাংশ বাণিজ্য এখন দুবাই বা সিঙ্গাপুর হয়ে ঘুরে আসে। যদি সরাসরি যাতায়াতের পথ তৈরি করা যায়, তবে বাণিজ্যের খরচ অনেক কমে আসবে। এক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে। আমাদের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার যখন বাংলাদেশে গিয়েছিলেন, তখনও আলোচনায় এই বিষয়টি উঠে এসেছিল। তারা মূলত নীতিগত কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি রুট চালু করার কথা বলেছিলেন। যেন তৃতীয় কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি পণ্য আদান-প্রদান করা যায়।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমেই বিভক্ত বিশ্বে আমাদের সামনে আরও অনেক বিকল্প পথ খুলে যায়। আমার মতে, এই বিশ্বে বহুপাক্ষিক ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতিই সামনে এগোনোর পথ। যাতে কোনো একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক বিকল্প পথ ও দরজা খুলে রাখা যায়। এর ফলে সিদ্ধান্তহীনতা বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
বাণিজ্য যেমন বড় বিষয়, তেমনি ‘কানেক্টিভিটি’ বা সংযোগও খুব গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বঙ্গোপসাগর আর অন্যদিকে আরব সাগর ও সিপেক (CPEC) হাব। এই সবকিছুকে সংযুক্ত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিশন দরকার। আমরা যে ধরনের কাজ করি, সেখানে একটু ‘হোপলেস রোমান্টিক’ বা অবাস্তব আবেগপ্রবণ না হলে এই প্রতিকূলতার মধ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাওয়া কঠিন।
এছাড়া জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক সমন্বয়, এগুলোও খুব জরুরি। এখনকার সময়ে এআই, টেক স্টার্টআপ বা ভেঞ্চার ক্যাপিটালিজমের মতো আধুনিক ক্ষেত্রগুলোতেও আমাদের একসাথে কাজ করার সুযোগ আছে।
সাহাব: আমাদের ধর্মীয় পরিচয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যে থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা নারীদের শক্তি বা ক্ষমতায়নকে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি? আর বাংলাদেশের এই মডেল থেকে পাকিস্তান আসলে সততার সাথে কী শিখতে পারে?
জিশান: এই বিষয়ে আপনার যতটা সম্ভব গর্ব করা উচিত।
সাহাব: আমাদের মেয়েরা, ছেলেদের চেয়ে অনেক ভালো ক্রিকেট খেলছে!
জিশান: আপনি যদি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কোনো সাধারণ’ জায়গা খোঁজেন, তবে দুই দেশের পুরুষ ক্রিকেট দলের শোচনীয় পারফরম্যান্স হবে এক নম্বর পয়েন্ট!
আমরা এই ক্ষেত্রে মোটেও ভালো করছি না। আমার মনে হয়, এখন পুরুষ দলের চেয়ে আমাদের নারী ক্রিকেট দলগুলোকে বেশি সমর্থন ও গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।
আবারও বলছি, নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে আপনাদের গর্ব করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিছুদিন আগের একটি আলোচনার কথা মনে পড়ছে। যেখানে একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের মধ্যে মূল পার্থক্য কী? পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে ৭৮ বছর আগে, আর বাংলাদেশ মাত্র ৫০ বছর। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ তাদের তৈরি পোশাক শিল্পে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০-৩৫ বিলিয়ন ডলারের উপরে এবং তারা বাইরের শক্তির ওপর সবসময় নির্ভরশীল নয়।
আর আমার উত্তরটা ছিল খুবই সহজ। আমি মনে করি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সাফল্য হলো, তারা তাদের মেয়েদের অনেক ভালোভাবে শিক্ষিত করেছে। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে পাকিস্তান এখনো কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংক ‘কান্ট্রি ইকোনমিক মেমোরেন্ডাম’ নামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। পাকিস্তানের একজন গুণী অর্থনীতিবিদ, গঞ্জালো ভ্যারেলা এই রিপোর্টটি লিখেছিলেন। তাকে আমরা অনেক সময় সম্মানসূচক পাকিস্তানি বলে থাকি।
গঞ্জালো এবং তার দল সেই রিপোর্টে উল্লেখ করেছিলেন যে, পাকিস্তানের উৎপাদন শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৪ শতাংশ। আর সামগ্রিকভাবে শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ ২৫ শতাংশের মতো। ২৫ শতাংশও খুব একটা ভালো সংখ্যা নয়। কিন্তু অন্তত অন্যান্য পরিসংখ্যান থেকে ভালো। উৎপাদন খাতে মাত্র ৪ শতাংশ থাকার মানে কার্যত আপনি আপনার অর্থনীতিকে একটি বড় সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হচ্ছে নারী-কেন্দ্রিক অংশগ্রহণ—আর সেটি নিশ্চিত করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলে আপনি নিজের উন্নয়নকেই সীমিত করে দিচ্ছেন।
আমরা উভয়ই মুসলিম প্রধান দেশ এবং দুই দেশেই অত্যন্ত শক্তিশালী, জনপ্রিয় এবং কিংবদন্তি নারী প্রধানমন্ত্রীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। যদিও তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা ছিল। এটি আমাদের কাজ শুরু করার জন্য একটি বড় ভিত্তি হতে পারে।
আর জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগের কথা যদি বলি, তবে ১৯৭১-এর আগে আমাদের ২৪ বছরের একটি অভিন্ন ইতিহাস ছিল। আমার মনে হয়, সেই সম্পর্কগুলোকে কৃত্রিমভাবে দমিয়ে রাখা হয়েছে। হ্যাঁ, ভারতের ওপর দিয়ে বিমান চালানো যাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু আমরা তো বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে উড়তে পারি। পৃথিবীটা গোল এবং বিশাল; এই বাধাগুলো কাটিয়ে ওঠার অনেক পথ আছে।
আমার মতে, এই সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে সহজ কিছু উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, ভিসা প্রক্রিয়া অনেক সহজ করে দেওয়া, যাতে মানুষ সহজে যাতায়াত করতে পারে। শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণা, আজকের মতো আলোচনা এবং থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব। অর্থাৎ গবেষকদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানো।
আর আপনি যেহেতু নারী ক্রিকেটের কথা বললেন, আমার মনে হয়, সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর একটি ভালো সূচনা হতে পারে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সিরিজ, বিশেষ করে নারী দলের মধ্যে। এই উদ্যোগ কিছুটা হলেও সম্পর্কের গতিশীলতা বাড়াতে পারে।
এটাই মানুষে-মানুষে যোগাযোগ। তবে এই সংযোগ শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে এমন নয়। দুই দেশের মধ্যে একটি অভিন্ন সামরিক নীতিগত ঐতিহ্য রয়েছে। দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এমন এক ধরনের জানাশোনা বা পরিচিতি রয়ে গেছে যা অন্য কোনো দেশের সাথে নেই। তাই নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সমন্বয় করা খুব একটা কঠিন বা অচেনা কিছু হবে না।
উদাহরণস্বরূপ, যদি আমাদের কাজাখস্তানের মতো কোনো দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা ইস্যুতে সমন্বয় করতে হতো, তাহলে তা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হতো। কারণ আক্ষরিক এবং রূপক, উভয় অর্থেই আমাদের মধ্যে অনেক ‘শেয়ারড ডিএনএ’ বা অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ইত্যাদি।
আমি পুরো বিষয়টিকে একজন পেশাদার থেকে অন্য পেশাদারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে চাই। এতে করে ‘আঞ্চলিক কোনো জোট গঠন হচ্ছে’, এই ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা মোকাবিলা করা সহজ হবে। আর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়ে শেষ যে কথাটি বলব- বর্তমান দিল্লির ক্ষমতার সমীকরণ এবং মোদী সরকারের সবকিছুর জন্য পাকিস্তানকে দোষারোপ করার যে প্রবণতা, তাতে এই সমস্যার সমাধান কবে বা কীভাবে হবে তা আমি জানি না।
তবে সরাসরি বাণিজ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক গবেষণায় উঠে এসেছে- মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর সেরা পথ হলো করাচি বন্দর। অবশ্য এর মধ্যে আফগানিস্তান সমস্যাটিও রয়েছে। কারণ মধ্য এশিয়ার স্থলপথগুলো আফগানিস্তানের ওপর দিয়েই গেছে। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক জটিলতা বাদ দিলে, আরব সাগর থেকে বঙ্গোপসাগরে পণ্য পৌঁছাতে মাত্র ১০ দিন সময় লাগে। এতে খুব বেশি দেরি হয় না। সবমিলিয়ে ৬ থেকে ৭ দিন দেরি হতে পারে। এটি হয়তো ‘আদর্শ’ কোনো পরিস্থিতি নয়, কিন্তু যা আমাদের হাতে আছে তা ব্যবহার করেই এই বাধা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
আমরা অনেক সময় ‘আদর্শ পরিস্থিতির’ কাছে জিম্মি হয়ে থাকি। সবকিছু একদম নিখুঁত হতে হবে তবেই কাজ হবে। ভারত ও পাকিস্তানকে তাদের সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে হবে এবং স্থলপথগুলো খুলে দিতে হবে। তবেই বাণিজ্য চলবে। আসলে কাজ শুরু করার জন্য স্থলপথ খোলার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা এখনই এটি কার্যকর করতে পারি। হয়তো এটি সেরা রুট নয়। এটা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যদি আমরা সবসময় একেবারে নিখুঁত পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করি, তবে সেই সময় হয়তো কোনোদিন আসবেই না।
সাহাব: ধরা যাক, সবকিছু মোটামুটি ভালোভাবে এগোলো, কূটনৈতিক উষ্ণতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলো। বাণিজ্যিক আলোচনাও পরিপক্ক হলো। অতীতের ক্ষোভগুলো হয়তো পুরোপুরি সমাধান না হলেও অন্তত সামলানো গেলো। তাহলে আগামী ১০ বছরে আপনি এই দুই দেশকে কোথায় দেখছেন?
জিশান: আমি বিষয়টা দুইভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই। প্রথমত বলতে চাই, ১০ বছর পর কোন কোন সূচকে আমরা উন্নয়নের আশা করি। আর দ্বিতীয়ত, কথা বলবো যেসব প্রতিবন্ধকতা বা সমস্যাগুলোর দিকে আমাদের তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।
যে দেশগুলো গত ৫০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বিষয়ে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের ক্ষেত্রে সময়সীমা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়া ঠিক নয়।
ইসলামাবাদ যে ধরনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। ঢাকা আবার চায় বহুপাক্ষিকতার সম্পর্ক, যার মধ্যে বিশেষ করে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। এসব সম্পর্ক গড়ে তুলতে সময় লাগে। তাই সময়সীমা নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করা উচিত না।
অন্য বিষয়টি হলো, সাধারণত পাকিস্তানিরা এই বিষয়টি এড়িয়ে চলতে চায়, কিন্তু আমি তা করবো না। আমার মনে হয় না ১৯৭১ সালকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। তবে এটি নিয়ে পড়ে থাকারও কোনো মানে হয় না। আমাদের সামনের দিকে এগোতে হবে।
আমাদের পক্ষ থেকে এই বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত আত্মরক্ষামূলক আচরণ বা অতি-ব্যাখ্যা দেওয়া, আবার অপরদিকে আপনাদের পক্ষ থেকে একটি বছরের ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া- দুটোই আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর হবে। এই বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে।
সূচক হিসেবে কী কী বিষয় খেয়াল করা উচিত? আমার মতে, এক নম্বর সূচক হলো বাণিজ্য। ১০ বছর পর দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণই বলে দেবে যে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা কতটা সফল হয়েছে। তবে এই বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানের সাধারণ গতির চেয়ে অনেক বেশি হতে হবে। যদি সঠিক নীতিমালা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তবে বাণিজ্যের এই অংকটি বর্তমান ধারার চেয়ে কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো মানুষে-মানুষে যোগাযোগ। যার মধ্যে নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত। পাকিস্তানে যেমন কিছু চমৎকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেও রয়েছে। এ কারণে আমাদের স্টুডেন্ট ভিসা, মেডিকেল ট্যুরিজম এবং সাধারণ পর্যটন খাতের ওপর জোর দিতে হবে।
গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের পর্যটন খাত অনেক উন্নত হয়েছে। আমাদের উত্তরে প্রায় ২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার জুড়ে যে পার্বত্য অঞ্চল রয়েছে, তা অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর, যা বিশ্ববাসীর দেখা উচিত। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা পাকিস্তানি জনগণের আতিথেয়তার জন্যই নয়, বরং এটি বিশ্বের অন্যান্য অনেক স্থানের তুলনায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী একটি গন্তব্য।
তাই পর্যটন, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, ভিসা ব্যবস্থার সহজ করা- এগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ। আর তৃতীয় ও শেষ বিষয়টি হলো, জাতিসংঘ থেকে শুরু করে সার্ক ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক ফোরামে এই দুই পক্ষ কতটা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আপনিও জানেন ‘সার্ক’ ও ‘কোয়াড’এর কথা বলেছিলেন, যেগুলো বলতে গেলে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তবে এখানে এসসিও (SCO) বা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে বলি, আমি আগেই বলেছি, চীন কোনো বাধা নয়, বরং একটি সেতু। আর সেই সেতুকে মজবুত করার একটি উপায় হলো এসসিও-এর মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানো।
সুতরাং, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি কীভাবে এগোচ্ছে তা বোঝার জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো আমাদের পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
ভারত চাইলেই এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না: জিশান সালাহউদ্দিন
জিশান সালাহউদ্দিন ইসলামাবাদের অন্যতম গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘তাবাদল্যাব’ (Tabadlab)-এর একজন অংশীদার। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংযোগ কেন্দ্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একইসঙ্গে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক চরমপন্থা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ নিয়েও কাজ করেন। জিশান নিয়মিত লিখছেন ডন, ফরেন পলিসি, দ্য ডিপ্লোম্যাট এবং দ্য ফ্রাইডে টাইমসে। অতীতে তিনি সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এ স্ট্র্যাটেজি প্রোগ্রামের পরিচালক ছিলেন।
আলাপের পডকাস্টে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সাহাব এনাম খানের সঙ্গে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন জিশান। সেই আলোচনার ঈষৎ সম্পাদিত অংশ প্রকাশিত হলো। ইংরেজিতে হওয়া কথোপকথনটির অনুবাদ করেছেন ফাতিন নূর অবনি।
সাহাব এনাম খান: বাংলাদেশে ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ’ সম্পর্কের পুরো বিষয়টি সার্বভৌমত্ব এবং ঐতিহাসিক জবাবদিহিতার জায়গা থেকে দেখা হয়। পাঁচ দশক ধরে প্রায় থমকে থাকা সম্পর্ক, পাকিস্তানের দিক থেকে ১৯৭১-এর অমীমাংসিত অধ্যায়, এবং এমন দুটি দেশ যারা একে অপরের সাথে কোনো কঠিন বা খোলামেলা আলোচনা বরাবরই এড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দীর্ঘ দূরত্বের কারণ কী? আর এই দূরত্বের জন্য আসলে কার দায় বেশি?
জিশান সালাহউদ্দিন: এই বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বলা দরকার। কারণ এই বিষয়ে কথা উঠলে মানুষ এটা প্রায়ই এড়িয়ে যায়। আমি নিজে যেহেতু আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা নিয়ে কাজ করি, তাই আমার কাছে ইতিহাসের গুরুত্ব স্বীকার করাটা জরুরি; তবে ইতিহাসের ভারে স্থবির হয়ে থাকাটা সমাধান নয়।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান, উভয়ই শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং মধ্যম শক্তির দেশ। দুই দেশেরই নিজস্ব শক্তি ও সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু আমাদের একে-অপরের পরিপূরক হওয়ার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। আমি সরকারের কোনো প্রতিনিধি নই। আমি একজন পাকিস্তানি সাধারণ নাগরিক এবং ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে বলছি- আমার মনে হয়, পাকিস্তান ১৯৭১ সালের ক্ষত এবং ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট কিছু করেনি। তবে একই সাথে আমাদের বাস্তবসম্মত উপায়ে সামনে এগোনোর পথ খুঁজতে হবে, আর ‘লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক’ বা ট্রানজেকশনালিজমই হতে পারে সেই পথ।
এখন আমরা একটি বহুমুখী পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে ছোট ছোট আঞ্চলিক বা উপ-আঞ্চলিক জোট তৈরি হচ্ছে। যখনই এমনটা হয়, আমাদের মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, আমি জানি সামনে আমরা এটা নিয়ে আরও কথা বলবো, আর তা হলো, এই লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের আওতায় বাণিজ্য, অর্থনীতি, সংযোগ, নিরাপত্তা এবং টেক্সটাইল বা ওষুধ শিল্পের মতো বাণিজ্যিক খাতে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, সবকিছুই আসতে পারে। দুটি দেশ একে-অপরের কাছে কী শিখতে পারে, সেটিও দেখার বিষয়।
ভূ-রাজনৈতিকভাবে দুই দেশের জন্যই তাদের বন্ধুত্বের পরিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সমন্বয় বাড়ানো এবং স্বার্থের বৈচিত্র্য আনা এখন খুব জরুরি। কারণ বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়, ইরান যুদ্ধের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। ইরান যুদ্ধ চলছে। এমন এক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বহুপাক্ষিকতা ও বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ততা বজায় রাখতে হবে। বর্তমানে প্রভাবশালী দেশগুলোর একতরফা সিদ্ধান্তের সামনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও প্রায় অকেজো হয়ে পড়ছে।
আমাদের ইতিহাসের ভারে কোণঠাসা হয়ে থাকা উচিত নয়। আমাদের ইতিহাসকে স্বীকার করতে হবে, গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু সামনে এগোনোর পথও খুঁজে বের করতে হবে। এতদিন আমরা এই সম্পর্ক ঠিক করতে পারিনি, কারণ যখনই কোনো পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ছিল মূলত ব্যক্তি-কেন্দ্রিক বা কোনো বিশেষ নেতার ব্যক্তিগত ইচ্ছা। এর পেছনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না।
যেমন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীতে যোগাযোগ করেছিলেন। তখন অনেক আশা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি না থাকায় সেগুলো টেকসই হয়নি।
শুধুমাত্র দুজন নেতা বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্পর্ক এগোবে না। এর জন্য ব্যবসায়ী, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের সংযোগ প্রয়োজন। সামনে আমাদের জন্য নতুন সুযোগ আসতে পারে। আমাদের উচিত সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। আবার তিনিও পাকিস্তান ডে অথবা স্বাধীনতা দিবসে, আমার ঠিক মনে নেই, ফিরতি শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন। তখন থিঙ্ক ট্যাংক বা গবেষক মহলে অনেক উৎসাহ দেখা দিয়েছিল। তারা ভাবছিলেন হয়তো সম্পর্কের বরফ গলছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা টেকেনি। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হলো, সম্পর্ক শিথিল হতে থাকলে কখনো কখনো ইতিহাসের বোঝা ভারি হয়ে যায়। দ্বিতীয় কারণ হলো, শুধু দুইজন ব্যক্তি বা নেতার ইচ্ছায় সম্পর্ক এগোয় না। যদি না এর পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন থাকে।
ঠিক একইভাবে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা পাকিস্তানের বর্তমান বেসামরিক নেতৃত্বের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। আমাদের ব্যবসায়ী সমাজ, থিঙ্ক ট্যাংক, পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। আমার সাথে আপনার এই আলোচনাও একটা ভালো উদ্যোগ।
এই যোগাযোগগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খুব অল্প সময়ের জন্য এই ধরনের আলোচনার সুযোগ থাকে। আমরা প্রায়ই যা করা দরকার তার মাত্র ১০ শতাংশ কাজ করি। পরে আক্ষেপ করে বলি, কিছুই হলো না। আমার মনে হয়, এখন সেই আক্ষেপ কাটিয়ে কাজে নামার সময় এসেছে।
সাহাব: আপনি বললেন ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন পাকিস্তানে অনেক উৎসাহ ছিল। বর্তমানে ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি যে সরকার গঠন করেছে এবং ঠিক আগের অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাপারেও কি ইসলামাবাদে একই ধরনের উৎসাহ কাজ করছে? নাকি এটি শুধু নির্দিষ্ট কোনো সরকারের ওপর নির্ভর করে? ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকার আসতে পারে। এই সম্পর্ক যাতে শুধু সরকার-কেন্দ্রিক না হয় এজন্য পাকিস্তান কি এমন কোনো ব্যবস্থা বা মেকানিজম তৈরি করেছে?
জিশান: এখানে দুটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথমত, অন্যান্য যেকোনো দেশের মতো পাকিস্তানও রাজনৈতিক ও সামাজিক রদবদলের মধ্য দিয়ে যায়। তবে আমাদের কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, ব্যবস্থা বা ধারণা টিকে থাকে। এখন বিভিন্ন সেমিনারে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়, তার মধ্যে একটা বড় বিষয় উঠে আসে। তা হলো, আমরা এর আগে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি; এই উত্তেজনা আগেও ছিল, এই আগ্রহও ছিল, অন্তত রাজনৈতিক স্তরে। কিন্তু কীভাবে আগালে দীর্ঘস্থায়ী, নমনীয়, স্থিতিস্থাপক ও টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা যায়। আমরা এমন এক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা তৈরি পারি যেন উভয় দেশে যে সরকারই আসুক না কেন, সম্পর্ক তখনও টিকে থাকবে।
আমি মনে করি, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। সত্যি বলতে আমাদের সম্পর্ক এখন নেই বললেই চলে, শূন্যেরও নিচে।
ভারত ও চীনের বাণিজ্যের ১২০ বিলিয়ন ডলারের হিসাবের কথা আনা যায়। লাদাখ সীমান্ত নিয়ে চরম উত্তেজনা আর ঐতিহাসিক তিক্ততা থাকার পরও তারা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা বুঝেছে যে মানুষের প্রয়োজনে ‘লেনদেন’ বা বাণিজ্যকে সব কিছুর উপরে রাখতে হবে।
অন্যদিকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বাণিজ্যের দিকে তাকান, আমার জানা মতে এটি বিলিয়ন ডলারেরও কম। বছরে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার। যা আমার মতে খুবই হতাশাজনক।
যদি দুই দেশ বুদ্ধিমানের মতো সঠিক নীতি গ্রহণ করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন দেয়, তবে আগামী পাঁচ বছরেই এই বাণিজ্য ৪ থেকে ৫ গুণ বাড়িয়ে ৩ বা ৪ বিলিয়ন ডলারে নেওয়া সম্ভব।
এবার দ্বিতীয় বিষয়টি বলি, পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোতে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। ভারতের সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা আছে, তবে আমি এ নিয়ে বেশি কিছু বলবো না। কারণ অনেক কিছুই ভারত-কেন্দ্রীক হয়ে যায়।
সত্যি বলতে গেলে, এই মুহূর্তে ভারতকে নিয়ে পাকিস্তান খুব একটা ভাবছে না। কারণ আমাদের নিজেদেরই অনেক কিছু সামাল দিতে হয়। বর্তমানে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা’।
আমরা কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাড়াতে চাই। কর ব্যবস্থার সংস্কার করতে চাই। যাতে আইএমএফ বা বিদেশি ঋণের ওপর আমাদের সবসময় নির্ভরশীল থাকতে না হয়।
আপনি হয়তো জানেন, গত কয়েক মাস ধরে আফগানিস্তানের সাথে আমাদের সরাসরি সংঘর্ষ চলছে। এর কারণও খুব স্পষ্ট। আফগানিস্তানের বর্তমান সরকার, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সব ধরনের ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, তাদের অবস্থান কট্টর। পাকিস্তান গত চার বছরে শত শত কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ এবং ধর্মীয় নেতাদের আফগানিস্তানে পাঠিয়েছে; যেন তালেবানদের আলোচনার টেবিলে আনা যায়।
পাকিস্তানের জন্য আরেকটি চিন্তার বিষয় হলো ইরান পরিস্থিতি। আমরা এর আগে দেখেছি- আফগানিস্তানে যখন শেষবার যুদ্ধ হয়েছিল। তখন পাকিস্তানকে কত বড় মূল্য দিতে হয়েছে। ওই ২০ বছরে প্রায় ৯০ হাজার পাকিস্তানি বিভিন্ন ঘটনায় ও সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল এবং দেশটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এখনও হচ্ছে।
ন্যাটো, আইএসএএফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ২০২১ সালের ৩০ অগাস্ট আফগানিস্তান ছেড়ে যায়। এর প্রায় চার বছর বা তারও বেশি সময় কেটে গেছে। অথচ এখন টিটিপি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পাকিস্তান তাদের ওপর কঠোর অভিযান চালালেও বাস্তবতা হলো, এটি এক ধরনের অসম যুদ্ধ। এখন ইরানের সাথেও একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আমি নিশ্চিত যে এই সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলবে। ইরানিরা এক দীর্ঘ, টানটান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং সংঘাত আরো বাড়তে থাকবে।
এ ধরনের পরিস্থিতি যখন পাকিস্তানের আশপাশে ঘটে, তখন আমাদের কিছু করার থাকে না। আমরা তো আর সীমান্ত বেছে নিতে পারি না। সুইজারল্যান্ডের মতো নিরপেক্ষ সীমান্ত থাকলে ভালো হতো। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চীন ছাড়া এখন আমাদের সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী সম্ভবত আরব সাগর।
তাই আমরা চেষ্টা করছি যেন এই সংঘাতের প্রভাব পাকিস্তানে না পড়ে। আমরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, তা যেন ব্যাহত না হয়। মূল বিষয়টি এখানেই।
আমার মনে হয়, এই কারণেই পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীল ও নমনীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। পাশাপাশি আমাদের দেশের ভেতরেও অনেক পুনর্বিন্যাস চলছে এবং অর্থনীতির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
এই লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র উপায় হলো আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানো, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করা এবং সার্বভৌম পর্যায়ে কাজ করে দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা।
সাহাব: আপনি যদি ঢাকার নীতিনির্ধারক বা রাজনৈতিক মহলকে দেখেন, তারা সবসময় পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এখন যে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলো নিয়ে তারা বেশ চিন্তিত।
একইসঙ্গে সৌদি আরব–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি, সেখানে ইরানের উপস্থিতি। আবার ওয়াশিংটন ও রাওয়ালপিন্ডির সম্পর্ক। আমি ইসলামাবাদের কথা বলছি না, আমি ‘পিন্ডি’-র কথা বলছি। এই সম্পর্কটি বেশ শক্তিশালী। আপনি কি মনে করেন, সৌদি–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি, ইসলামাবাদ বা রাওয়ালপিন্ডি–ওয়াশিংটন সম্পর্ক এবং পাকিস্তানের চরমপন্থী ইকোসিস্টেমের প্রেক্ষাপটে, ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিয়ে ঢাকার যে দুশ্চিন্তা, তা কি যুক্তিসঙ্গত?
জিশান: আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি, নিরাপত্তা নিয়ে ঢাকার মনে যে সংশয় তার থেকেও বেশি চিন্তিত পাকিস্তান। কারণ আমরা প্রতিদিন এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাই না? এখানে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার।
প্রথমত, পাকিস্তান একটি ‘কঠিন অবস্থানে’ আছে। আমি এটাকে একটু ভিন্নভাবে বলব, এটি আসলে একটি ‘সুক্ষ্ম ভারসাম্য’।
সম্প্রতি আমরা সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। এই চুক্তি অনেক দিন ধরেই আলোচনায় ছিল এবং ইসরায়েল যখন গাজায় হামলা শুরু করে, তারও অনেক আগে থেকে এই চুক্তির পরিকল্পনা ছিল। কাতারের দোহায় আলোচনা করতে যাওয়া এক দলের উপর বোমা হামলা চালায় ইসরায়েল, সেই ঘটনাও প্রক্রিয়াটিকে কিছুটা ত্বরান্বিত করেছে। যদিও এটি সরাসরি কারণ নয়, তবে এটি একটি ট্রিগার হিসেবে কাজ করেছে।
পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা অনেক দিন ধরেই রয়েছে। পাকিস্তান গত কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি বড় নিরাপত্তা প্রদানকারী দেশ হিসেবে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে আমরা বিশ্বজুড়ে এই ভূমিকা পালন করতে চাই।
এক বছর আগে একটি আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম, সেখানে কথা হচ্ছিল যে, শুধু জেএফ-১৭, পিএল-১৫ বা এমন অন্য কোনো অস্ত্র বা সামরিক সহায়তা নিয়েই যে চুক্তি করতে হবে, তা নয়।
বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানেরও শক্তিশালী টেক্সটাইল শিল্প রয়েছে। তাই নিরাপত্তা প্রদানকারী প্যাকেজের মধ্যে শুধু সামরিক সহায়তা বা অস্ত্র থাকবে না। টেক্সটাইল শিল্পও এই নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হতে পারে। যেমন, অন্যান্য দেশ থেকে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে হেলমেট, জ্যাকেট, জুতা, মোজার মতো পণ্যগুলো না কিনে, আমাদের থেকে দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক চুক্তি, জিএসপি প্লাস সুবিধার পরিবর্তে সস্তায় কিনতে পারেন।
এক্ষেত্রে হয়তো সিবিএএম বা কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট ম্যাকানিজমের মতো নতুন নীতিগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড়ও পাওয়া যেতে পারে।
এতে করে পাকিস্তান শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের জন্য নিরাপত্তা প্রদানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগোতে পারবে। আর পাকিস্তানও এধরনের চুক্তি করতে বেশ আগ্রহী।
তবে এখানে সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ব্যাপারও আছে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুপাক্ষিক ফোরামে নিজেদের অবস্থান নিয়ে পাকিস্তান বেশ সচেতন। আমাদের বক্তব্য হলো, এই যুদ্ধ বৈধ নয়, এটি জাতিসংঘ বা এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের সমর্থনও পায়নি। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলাও বন্ধ হওয়া উচিত। তাই পাকিস্তানকে বেশ সতর্ক হয়েই এগোতে হচ্ছে।
আমরা সিপিএসি ও বিআরআই ফ্রন্টে চীনের সাথে সমন্বয় করার চেষ্টা করছি, অনেকাংশে সফলও হয়েছি। তবে চ্যালেঞ্জ তো আছেই।
পাকিস্তানের সঙ্গে নন-স্টেট অ্যাক্টরদের সম্পর্ক বিষয়েও প্রশ্ন আসতে পারে। বিশেষ করে আফগান তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের বিকল্প কী?
আমরা আফগানিস্তানকে অনেক সাম্রাজ্যের সঙ্গেই যুদ্ধে জড়াতে দেখেছি। একে ‘গ্রেভিয়ার্ড অব এম্পায়ারস’ বা ‘সাম্রাজ্যের কবরস্থান’ বলার কারণ তো আছে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর প্রায় ৭০ লাখ শরণার্থী পাকিস্তানে আসে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের চার্লি উইলসন ও আফগানিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট, জিয়া-উল-হকের সহযোগিতায় মুজাহিদিন গঠিত হয়, যা পরে তালেবানে রূপ নেয়। তারা এখনও আছে। আমার মতে, পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গিটা এমন যে সাম্রাজ্য ভাঙ্গে আবার গড়ে।
অনেকপক্ষই আফগানিস্তানের উপর হামলা করেছে এবং দখল নিয়েছে। কিন্তু একটা সময় তারা চলে যায়। তারা হয়তো তাদের লক্ষ্য অর্জন করে ফেলেছে। না হয় তাদের লক্ষ্যগুলো অর্জন করার মতো কিছু ছিল না। কিন্তু তাদের ফেলে যাওয়া বিশৃঙ্খলা আমাদেরই পরিষ্কার করতে হবে। তাই এসব মাথায় রেখে, ইতিহাস মনে রেখে, যারা ক্ষমতায় আছে বা ভবিষ্যতে আসতে পারে, তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত।
আর পাকিস্তান ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। ২০২১ সালের ১৫ অগাস্ট তালেবান ঠিকই কাবুল দখল করে এবং তারা এখনো ক্ষমতায় রয়েছে। তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা যুক্তিযুক্ত ছিল। কারণ ন্যাটো, আইএসএএফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী হয়তো তাদের সি-১৩০ নিয়ে চলে যেতে পারে। কিন্তু আমরা তা করতে পারি না। আফগানিস্তানের সাথে আমাদের ১৬০০ কিলোমিটারের সীমান্ত। আমাদের দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক স্বার্থ বজায় রাখার জন্যই আফগানিস্তানের সব পক্ষের সাথেই আমাদের একটা সম্পর্ক রাখতে হয়।
তবে সমস্যা হলো, তালেবান কোনো একক গোষ্ঠী নয়। এই মূহূর্তে হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বে একটি দল তালেবানের ক্ষমতায় আছে। এবং তালেবানের অন্যান্য যেসব গোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে পাকিস্তান আগে সম্পর্ক গড়েছিল, যেমন- হাক্কানি গোষ্ঠী। তারা এখন ততটা প্রভাবশালী নয়। ফলে টিটিপি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে তাদের প্রভাব কমে গেছে। তাই সে সময়ের বিবেচনায়, যেহেতু বিদেশি শক্তির প্রভাব একটা না একটা সময় থাকবে না, যেসব গোষ্ঠী ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসতে পারে, তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে এসব দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও কৌশল সবসময় সফল হয় না, নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে। এখন আমরা তারই ফল ভোগ করছি।
আমি মনে করি না বাংলাদেশে সরাসরি এর কোনো প্রভাব পড়বে। আমাদের মধ্যে সীমান্ত নেই, যা একদিকে সুবিধা, অন্যদিকে অসুবিধা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ও নাগরিকদের নিরাপদ রাখতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, প্যারামিলিটারি বাহিনী অসাধারণ কাজ করছে। শুরুতে বিভিন্ন আলোচনা ও বৈঠকের মাধ্যমে কূটনৈতিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল।
টিটিপিকে পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলেও, অন্তত পাকিস্তানে ঢোকা থেকে তো তাদের আটকাতে হবে। কিন্তু আফগানিস্তানের সরকার শক্ত অবস্থান নেওয়ায় সাড়ে চার বছরের এই প্রচেষ্টা থেকে কোনো ফল আসেনি। তাই এখন কাইনেটিক (সামরিক) পদ্ধতিতে সমাধান করতে হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান করতেই হবে, এর অন্য কোনো বিকল্প নেই।
সাহাব: দিল্লির দৃষ্টিকোণ থেকে একটা প্রতিষ্ঠিত ধারণা হলো, পাকিস্তানের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের দীর্ঘদিনের যোগসূত্র আছে। তাদের দুশ্চিন্তা হলো, সন্ত্রাসবাদের এই সংযোগ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এই নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ বা বয়ানের জবাব কীভাবে দেওয়া যায়?
জিশান: ভারত বিশ্বজুড়ে নিজেদের প্রচারণা চালানো বা স্ট্র্যাটকম যুদ্ধে বেশ পারদর্শী। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ততোটা না। তারা বিশ্বকে এমন কিছু বিষয় বিশ্বাস করাতে পেরেছে, যা সবসময় পুরোপুরি সত্য নয়। কিন্তু যেহেতু তাদের প্রচারের সুযোগ বেশি, তাই তাদের কথাগুলো মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
অথচ বাস্তব চিত্রটা কিন্তু অন্যরকম। বেলুচিস্তানে কী ঘটছে? সেখানে বিএলএ বা অন্যান্য সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো কীভাবে বাইরের শক্তির সাহায্য পাচ্ছে, তা এখন একেবারেই স্পষ্ট।
বিদেশি সাহায্য বা হস্তক্ষেপ থাকলে এই ধরনের গোষ্ঠীগুলো যতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, শুধু স্থানীয়ভাবে তা সম্ভব হতো না। আর এখানেই আসল সমস্যা। এই যুদ্ধটা কেবল অস্ত্র দিয়ে শত্রু নির্মূল করার মতো সহজ কিছু নয়; কারণ এই গোষ্ঠীগুলোর মতাদর্শের পেছনে বাইরের দেশের বড় ধরনের সমর্থন ও প্রভাব রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আসলেই অনেক জটিল।
প্রশ্ন হলো, এ নিয়ে কি ঢাকার চিন্তিত হওয়া উচিত? আমার উত্তর হলো, না। কারণ পাকিস্তানে এখনকার মূল লক্ষ্য হলো আমাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করা। রাষ্ট্রের কাঠামো ও ব্যবস্থায় যে ত্রুটিগুলো আমাদের এতদিন ভুগিয়েছে, সেগুলো ঠিক করা।
আপনি জানেন পাকিস্তান গত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যে ট্যারিফ বা শুল্ক নীতি গ্রহণ করেছিল, তা এক ধরনের ‘সংরক্ষণবাদ’ তৈরি করেছে। শুরুতে এটি দেশি শিল্পের জন্য ভালো মনে হলেও শেষ পর্যন্ত উদ্ভাবনী ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। আমাদের শিল্প খাতকে স্থবির করে ফেলেছে। গত বছর বিশ্বব্যাংকের একটি জরিপেও দেখা গেছে পাকিস্তানের খুব কম সংখ্যক প্রতিষ্ঠান নতুন কোনো পণ্য বা সেবা তৈরি করছে।
আমি নিরাপত্তা আলোচনায় এই বিষয়টি আনছি, কারণ মূল ফোকাস থাকবে অর্থনীতি ঠিক করার ওপর। বর্তমানে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কাজের একটি পরিষ্কার বিভাজন দেখা যাচ্ছে। সেনাবাহিনী মূলত সীমান্ত এবং দেশের ভেতরের সন্ত্রাসবাদ দমনের বিষয়টি সামলাচ্ছে। অন্যদিকে, বেসামরিক নেতৃত্ব পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলার দিকে।
আমি আঞ্চলিক সংহতি দেখতে চাই এবং ইতিহাসের বোঝা পেছনে ফেলে এসে একজন আশাবাদী ও বাস্তববাদী হিসেবে কথা বলতে চাই। পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক উভয় নেতৃত্বই এখন নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসতে আগ্রহী। তারা ইতিহাসের ভারে পঙ্গু হয়ে থাকতে চায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমি গত ১৫-২০ বছরে দেখেছি যে, পাকিস্তানের নীতি আর আগের মতো ভারত-কেন্দ্রিক নয়। ভারত আমাদের নিয়ে কী ভাবছে বা করছে, তাতে আমাদের আর কিছু যায় আসে না। কিন্তু ভারত এখনো পাকিস্তান নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামায়। মোদী সরকার বা বিজেপি, এমনকি আরএসএস-এর নজরের সিংহভাগই থাকে পাকিস্তানের ওপর। ভারত এখন এক বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি। তাদের উচিত নিজেদের মানুষের দিকে এবং তাদের যে অভাবনীয় উন্নয়নের গতি আছে, তার দিকে নজর দেওয়া। মেরিল লিঞ্চ-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের ইকোনমি বিশ্বের তৃতীয় স্থানে অবস্থান করবে।
আমার মনে হয়, এই বিশাল অর্থনীতির কারণে ভারতের মধ্যে এক ধরনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনে জোর করে হলেও তারা এটি করতে চায়। কিন্তু তারা এটা বুঝতে পারছে না, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নিজস্ব কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও তাদের আলাদা শক্তি ও সক্ষমতা আছে।
আমাদের মধ্যে হয়তো অর্থনীতির পাল্লায় সমান সমান লড়াই হবে না, কিন্তু ভারত চাইলেই এই অঞ্চলে একতরফা আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না।
সহজ কথায় বললে, বাংলাদেশ দেখতে পাবে যে, এখন পাকিস্তানের সামরিক, বেসামরিক এবং শক্তিশালী আমলাতন্ত্র, এই তিন পক্ষই অর্থনীতির দিকে মনোযোগী। আর এই অর্থনীতির সূত্র ধরেই তারা বাংলাদেশের সাথে একটি মজবুত, দীর্ঘমেয়াদী এবং নমনীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
সাহাব: সরকার নির্ভর নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি ছাড়াই বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্পর্ক যদি স্বাভাবিক হয়, তাহলে অর্থনৈতিকভাবে আমরা কী কী সুফল পাবো। ইসলামাবাদ কি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের থেকেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা কমাতে বেশি আগ্রহী?
জিশান: আমি পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন নাগরিক হিসেবে কথা বলছি। আমি আঞ্চলিক সম্পর্ক মজবুত করতে আগ্রহী।
অনেক সময় অন্য দেশের মানুষ, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের পর্যবেক্ষকরা, পাকিস্তানকে কেবল ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখে। কেন এমনটা হয়, তা আমি বুঝি। আমরা একাধিক যুদ্ধ করেছি। গত বছরও একটি সংঘাতে জড়িয়েছি। সেই যুদ্ধের সবচেয়ে আলোচিত পরিসংখ্যানটি (৭-০) আপনি হয়তো মনে করতে পারেন, তবে আমি সেদিকে আর যাচ্ছি না।
কিন্তু বিশ্বাস করুন, ইসলামাবাদের এই সুসম্পর্ক গড়ার আগ্রহের পেছনে ভারতের সাথে সংশ্লিষ্টতা এতটাই কম যে বিষয়টি প্রায় হাস্যকর।
চলুন সেই কারণগুলো একটু খতিয়ে দেখি:
প্রথমত, আমি আগেও বলেছি, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের বিভাজন চলছে। ২৫ বছর আগে আফগানিস্তানে যে সম্মিলিত বিশ্বশক্তি একজোট হয়ে এসেছিল, আজ তারা ইরানে হামলা করার সময় আর আগের মতো এক নেই। স্পেন সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে তারা এতে থাকবে না। কানাডাও দীর্ঘমেয়াদে এই প্রক্রিয়ায় থাকতে নারাজ। অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্বেও বিভাজন বাড়ছে, আর আমাদের অঞ্চলসহ অন্যান্য জায়গায় এই বিভাজন তো আছেই। তাই এটিই উপযুক্ত সময় একটি ‘বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি’ গ্রহণ করার। যেখানে আপনি বিভিন্ন দিক থেকে সম্পর্ক তৈরি করবেন, ঝুঁকি ভাগ করে নেবেন, এবং সামনে এগুতে গিয়ে আপনার হাতে একাধিক বিকল্প থাকবে, বিশেষ করে বহুপাক্ষিক পর্যায়ে।
গত এক বছরে আমরা দেখেছি পাকিস্তান পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে সাজাচ্ছে। আমরা এখন যেকোনো আন্তর্জাতিক শক্তির সাথে কাজ করতে প্রস্তুত। যাতে আমাদের অনেকগুলো পথ খোলা থাকে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী চীনে গিয়ে এমন কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছেন যেখানে রাশিয়া এমনকি উত্তর কোরিয়ার নেতারাও ছিলেন। আবার আমরা তাকে ফিল্ড মার্শালের সাথে হোয়াইট হাউসে যেতে দেখেছি, যেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি খনিজ পদার্থের বাক্স উপহার দিয়েছেন, যা পাকিস্তানে এখন খুব পরিচিত একটি ছবি। এছাড়া আমাদের নেতারা জিসিসি দেশগুলোতে যাচ্ছেন, মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
পাকিস্তান এখন তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে এবং বহুমুখী যোগাযোগ তৈরিতে অত্যন্ত আগ্রহী। যেহেতু আমরা উভয়ই মুসলিম প্রধান দেশ এবং আমাদের মধ্যে অনেক মৌলিক বোঝাপড়া, অভিন্ন ইতিহাস ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি আছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ আমাদের একজন অংশীদার।
আমরা যখনই বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নিয়ে কথা বলি, তখন শুধু ‘ইতিহাসের বোঝা’ বা তিক্ততা নিয়ে আলাপ করি। কিন্তু ঐতিহাসিক বন্ধনও তো কম নয়, আর আমার মনে হয়, সেগুলো যথেষ্টভাবে কাজে লাগানো হয় না।
বিকল্প পথ খোলা রাখার বিষয়টি নিয়ে আমি আগেই বলেছি। আমার মতে, সার্ক (SAARC)-এর পুনর্জাগরণ প্রয়োজন। বাস্তবে এটি এখন অনেকটাই স্থবির। ‘অকার্যকর’ বললে হয়তো খুব কঠোর শোনাবে। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সংস্থাটি গঠন করা হয়েছিল, তা এখন আর পূরণ হচ্ছে না। তাই দ্বিপাক্ষিক পথগুলো গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আর এই অঞ্চলের ‘ড্রাগন’ অর্থাৎ চীনকে তো আপনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না। আমার মতে, চীন দুই দেশের জন্য কোনো বাধা নয়। বরং, চীন একধরনের সেতুবন্ধন। কারণ তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজনে এবং বিআরআই (BRI) বা আধুনিক সিল্ক রোড প্রসারের মাধ্যমে তারা এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বাড়াতে চায়। এটি আসলে আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ।
বাণিজ্য ও অর্থনীতির দিক থেকে কাজ করার মতো অনেক জায়গা আছে।
আগে আমি টেক্সটাইলের কথা বলেছি। পাকিস্তান তুলা এবং সুতা উৎপাদনে অনেক এগিয়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বৃহৎ এবং বিশ্বজুড়ে এর কদর রয়েছে।
তাই আমাদের মধ্যে ‘সাপ্লাই চেইন’ বা সরবরাহ ব্যবস্থার একটি প্রাকৃতিক সমন্বয় হওয়ার সুযোগ আছে। আমি যে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের কথা বলেছি- এটি মূলত অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রাথমিক হিসাব। যদি আমরা আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থাগুলোকে এক করতে পারি, তবে দুই দেশই অভাবনীয় লাভবান হবে। এখানেই ‘নন-জিরো’, ‘জিরো-সাম’ গেইমের ধারণাটা সামনে আসে। এটা এমন একটা পরিস্থিতি হবে যেখানে কোনো দেশকেই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো ওষুধ শিল্প। পাকিস্তানের ওষুধ শিল্প বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পও খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই যৌথ উৎপাদন থেকে শুরু করে একে অপরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার স্পষ্ট সুযোগ রয়েছে।
আমার মনে হয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অধিকাংশ বাণিজ্য এখন দুবাই বা সিঙ্গাপুর হয়ে ঘুরে আসে। যদি সরাসরি যাতায়াতের পথ তৈরি করা যায়, তবে বাণিজ্যের খরচ অনেক কমে আসবে। এক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে। আমাদের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার যখন বাংলাদেশে গিয়েছিলেন, তখনও আলোচনায় এই বিষয়টি উঠে এসেছিল। তারা মূলত নীতিগত কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি রুট চালু করার কথা বলেছিলেন। যেন তৃতীয় কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি পণ্য আদান-প্রদান করা যায়।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমেই বিভক্ত বিশ্বে আমাদের সামনে আরও অনেক বিকল্প পথ খুলে যায়। আমার মতে, এই বিশ্বে বহুপাক্ষিক ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতিই সামনে এগোনোর পথ। যাতে কোনো একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক বিকল্প পথ ও দরজা খুলে রাখা যায়। এর ফলে সিদ্ধান্তহীনতা বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
বাণিজ্য যেমন বড় বিষয়, তেমনি ‘কানেক্টিভিটি’ বা সংযোগও খুব গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বঙ্গোপসাগর আর অন্যদিকে আরব সাগর ও সিপেক (CPEC) হাব। এই সবকিছুকে সংযুক্ত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিশন দরকার। আমরা যে ধরনের কাজ করি, সেখানে একটু ‘হোপলেস রোমান্টিক’ বা অবাস্তব আবেগপ্রবণ না হলে এই প্রতিকূলতার মধ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাওয়া কঠিন।
এছাড়া জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক সমন্বয়, এগুলোও খুব জরুরি। এখনকার সময়ে এআই, টেক স্টার্টআপ বা ভেঞ্চার ক্যাপিটালিজমের মতো আধুনিক ক্ষেত্রগুলোতেও আমাদের একসাথে কাজ করার সুযোগ আছে।
সাহাব: আমাদের ধর্মীয় পরিচয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যে থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা নারীদের শক্তি বা ক্ষমতায়নকে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি? আর বাংলাদেশের এই মডেল থেকে পাকিস্তান আসলে সততার সাথে কী শিখতে পারে?
জিশান: এই বিষয়ে আপনার যতটা সম্ভব গর্ব করা উচিত।
সাহাব: আমাদের মেয়েরা, ছেলেদের চেয়ে অনেক ভালো ক্রিকেট খেলছে!
জিশান: আপনি যদি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কোনো সাধারণ’ জায়গা খোঁজেন, তবে দুই দেশের পুরুষ ক্রিকেট দলের শোচনীয় পারফরম্যান্স হবে এক নম্বর পয়েন্ট!
আমরা এই ক্ষেত্রে মোটেও ভালো করছি না। আমার মনে হয়, এখন পুরুষ দলের চেয়ে আমাদের নারী ক্রিকেট দলগুলোকে বেশি সমর্থন ও গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।
আবারও বলছি, নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে আপনাদের গর্ব করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিছুদিন আগের একটি আলোচনার কথা মনে পড়ছে। যেখানে একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের মধ্যে মূল পার্থক্য কী? পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে ৭৮ বছর আগে, আর বাংলাদেশ মাত্র ৫০ বছর। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ তাদের তৈরি পোশাক শিল্পে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০-৩৫ বিলিয়ন ডলারের উপরে এবং তারা বাইরের শক্তির ওপর সবসময় নির্ভরশীল নয়।
আর আমার উত্তরটা ছিল খুবই সহজ। আমি মনে করি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সাফল্য হলো, তারা তাদের মেয়েদের অনেক ভালোভাবে শিক্ষিত করেছে। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে পাকিস্তান এখনো কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংক ‘কান্ট্রি ইকোনমিক মেমোরেন্ডাম’ নামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। পাকিস্তানের একজন গুণী অর্থনীতিবিদ, গঞ্জালো ভ্যারেলা এই রিপোর্টটি লিখেছিলেন। তাকে আমরা অনেক সময় সম্মানসূচক পাকিস্তানি বলে থাকি।
গঞ্জালো এবং তার দল সেই রিপোর্টে উল্লেখ করেছিলেন যে, পাকিস্তানের উৎপাদন শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৪ শতাংশ। আর সামগ্রিকভাবে শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ ২৫ শতাংশের মতো। ২৫ শতাংশও খুব একটা ভালো সংখ্যা নয়। কিন্তু অন্তত অন্যান্য পরিসংখ্যান থেকে ভালো। উৎপাদন খাতে মাত্র ৪ শতাংশ থাকার মানে কার্যত আপনি আপনার অর্থনীতিকে একটি বড় সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হচ্ছে নারী-কেন্দ্রিক অংশগ্রহণ—আর সেটি নিশ্চিত করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলে আপনি নিজের উন্নয়নকেই সীমিত করে দিচ্ছেন।
আমরা উভয়ই মুসলিম প্রধান দেশ এবং দুই দেশেই অত্যন্ত শক্তিশালী, জনপ্রিয় এবং কিংবদন্তি নারী প্রধানমন্ত্রীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। যদিও তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা ছিল। এটি আমাদের কাজ শুরু করার জন্য একটি বড় ভিত্তি হতে পারে।
আর জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগের কথা যদি বলি, তবে ১৯৭১-এর আগে আমাদের ২৪ বছরের একটি অভিন্ন ইতিহাস ছিল। আমার মনে হয়, সেই সম্পর্কগুলোকে কৃত্রিমভাবে দমিয়ে রাখা হয়েছে। হ্যাঁ, ভারতের ওপর দিয়ে বিমান চালানো যাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু আমরা তো বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে উড়তে পারি। পৃথিবীটা গোল এবং বিশাল; এই বাধাগুলো কাটিয়ে ওঠার অনেক পথ আছে।
আমার মতে, এই সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে সহজ কিছু উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, ভিসা প্রক্রিয়া অনেক সহজ করে দেওয়া, যাতে মানুষ সহজে যাতায়াত করতে পারে। শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণা, আজকের মতো আলোচনা এবং থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব। অর্থাৎ গবেষকদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানো।
আর আপনি যেহেতু নারী ক্রিকেটের কথা বললেন, আমার মনে হয়, সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর একটি ভালো সূচনা হতে পারে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সিরিজ, বিশেষ করে নারী দলের মধ্যে। এই উদ্যোগ কিছুটা হলেও সম্পর্কের গতিশীলতা বাড়াতে পারে।
এটাই মানুষে-মানুষে যোগাযোগ। তবে এই সংযোগ শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে এমন নয়। দুই দেশের মধ্যে একটি অভিন্ন সামরিক নীতিগত ঐতিহ্য রয়েছে। দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এমন এক ধরনের জানাশোনা বা পরিচিতি রয়ে গেছে যা অন্য কোনো দেশের সাথে নেই। তাই নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সমন্বয় করা খুব একটা কঠিন বা অচেনা কিছু হবে না।
উদাহরণস্বরূপ, যদি আমাদের কাজাখস্তানের মতো কোনো দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা ইস্যুতে সমন্বয় করতে হতো, তাহলে তা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হতো। কারণ আক্ষরিক এবং রূপক, উভয় অর্থেই আমাদের মধ্যে অনেক ‘শেয়ারড ডিএনএ’ বা অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ইত্যাদি।
আমি পুরো বিষয়টিকে একজন পেশাদার থেকে অন্য পেশাদারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে চাই। এতে করে ‘আঞ্চলিক কোনো জোট গঠন হচ্ছে’, এই ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা মোকাবিলা করা সহজ হবে। আর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়ে শেষ যে কথাটি বলব- বর্তমান দিল্লির ক্ষমতার সমীকরণ এবং মোদী সরকারের সবকিছুর জন্য পাকিস্তানকে দোষারোপ করার যে প্রবণতা, তাতে এই সমস্যার সমাধান কবে বা কীভাবে হবে তা আমি জানি না।
তবে সরাসরি বাণিজ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক গবেষণায় উঠে এসেছে- মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর সেরা পথ হলো করাচি বন্দর। অবশ্য এর মধ্যে আফগানিস্তান সমস্যাটিও রয়েছে। কারণ মধ্য এশিয়ার স্থলপথগুলো আফগানিস্তানের ওপর দিয়েই গেছে। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক জটিলতা বাদ দিলে, আরব সাগর থেকে বঙ্গোপসাগরে পণ্য পৌঁছাতে মাত্র ১০ দিন সময় লাগে। এতে খুব বেশি দেরি হয় না। সবমিলিয়ে ৬ থেকে ৭ দিন দেরি হতে পারে। এটি হয়তো ‘আদর্শ’ কোনো পরিস্থিতি নয়, কিন্তু যা আমাদের হাতে আছে তা ব্যবহার করেই এই বাধা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
আমরা অনেক সময় ‘আদর্শ পরিস্থিতির’ কাছে জিম্মি হয়ে থাকি। সবকিছু একদম নিখুঁত হতে হবে তবেই কাজ হবে। ভারত ও পাকিস্তানকে তাদের সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে হবে এবং স্থলপথগুলো খুলে দিতে হবে। তবেই বাণিজ্য চলবে। আসলে কাজ শুরু করার জন্য স্থলপথ খোলার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা এখনই এটি কার্যকর করতে পারি। হয়তো এটি সেরা রুট নয়। এটা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যদি আমরা সবসময় একেবারে নিখুঁত পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করি, তবে সেই সময় হয়তো কোনোদিন আসবেই না।
সাহাব: ধরা যাক, সবকিছু মোটামুটি ভালোভাবে এগোলো, কূটনৈতিক উষ্ণতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলো। বাণিজ্যিক আলোচনাও পরিপক্ক হলো। অতীতের ক্ষোভগুলো হয়তো পুরোপুরি সমাধান না হলেও অন্তত সামলানো গেলো। তাহলে আগামী ১০ বছরে আপনি এই দুই দেশকে কোথায় দেখছেন?
জিশান: আমি বিষয়টা দুইভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই। প্রথমত বলতে চাই, ১০ বছর পর কোন কোন সূচকে আমরা উন্নয়নের আশা করি। আর দ্বিতীয়ত, কথা বলবো যেসব প্রতিবন্ধকতা বা সমস্যাগুলোর দিকে আমাদের তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।
যে দেশগুলো গত ৫০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বিষয়ে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের ক্ষেত্রে সময়সীমা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়া ঠিক নয়।
ইসলামাবাদ যে ধরনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। ঢাকা আবার চায় বহুপাক্ষিকতার সম্পর্ক, যার মধ্যে বিশেষ করে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। এসব সম্পর্ক গড়ে তুলতে সময় লাগে। তাই সময়সীমা নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করা উচিত না।
অন্য বিষয়টি হলো, সাধারণত পাকিস্তানিরা এই বিষয়টি এড়িয়ে চলতে চায়, কিন্তু আমি তা করবো না। আমার মনে হয় না ১৯৭১ সালকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। তবে এটি নিয়ে পড়ে থাকারও কোনো মানে হয় না। আমাদের সামনের দিকে এগোতে হবে।
আমাদের পক্ষ থেকে এই বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত আত্মরক্ষামূলক আচরণ বা অতি-ব্যাখ্যা দেওয়া, আবার অপরদিকে আপনাদের পক্ষ থেকে একটি বছরের ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া- দুটোই আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর হবে। এই বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে।
সূচক হিসেবে কী কী বিষয় খেয়াল করা উচিত? আমার মতে, এক নম্বর সূচক হলো বাণিজ্য। ১০ বছর পর দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণই বলে দেবে যে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা কতটা সফল হয়েছে। তবে এই বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানের সাধারণ গতির চেয়ে অনেক বেশি হতে হবে। যদি সঠিক নীতিমালা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তবে বাণিজ্যের এই অংকটি বর্তমান ধারার চেয়ে কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো মানুষে-মানুষে যোগাযোগ। যার মধ্যে নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত। পাকিস্তানে যেমন কিছু চমৎকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেও রয়েছে। এ কারণে আমাদের স্টুডেন্ট ভিসা, মেডিকেল ট্যুরিজম এবং সাধারণ পর্যটন খাতের ওপর জোর দিতে হবে।
গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের পর্যটন খাত অনেক উন্নত হয়েছে। আমাদের উত্তরে প্রায় ২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার জুড়ে যে পার্বত্য অঞ্চল রয়েছে, তা অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর, যা বিশ্ববাসীর দেখা উচিত। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা পাকিস্তানি জনগণের আতিথেয়তার জন্যই নয়, বরং এটি বিশ্বের অন্যান্য অনেক স্থানের তুলনায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী একটি গন্তব্য।
তাই পর্যটন, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, ভিসা ব্যবস্থার সহজ করা- এগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ। আর তৃতীয় ও শেষ বিষয়টি হলো, জাতিসংঘ থেকে শুরু করে সার্ক ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক ফোরামে এই দুই পক্ষ কতটা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আপনিও জানেন ‘সার্ক’ ও ‘কোয়াড’এর কথা বলেছিলেন, যেগুলো বলতে গেলে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তবে এখানে এসসিও (SCO) বা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে বলি, আমি আগেই বলেছি, চীন কোনো বাধা নয়, বরং একটি সেতু। আর সেই সেতুকে মজবুত করার একটি উপায় হলো এসসিও-এর মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানো।
সুতরাং, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি কীভাবে এগোচ্ছে তা বোঝার জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো আমাদের পর্যবেক্ষণ করা উচিত।