বেসরকারি হাসপাতাল কতটা ব্যবসা, কতটা সেবা?

বেসরকারি হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ, চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া—বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে। সরকারি হাসপাতালের সীমিত সক্ষমতা, বেসরকারি খাতের লাগামহীন ব্যয়—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, দেশের স্বাস্থ্যখাত কি আদতে নাগরিকের সেবা দিচ্ছে, নাকি এটি পরিণত হয়েছে ভঙ্গুর এক ইকোসিস্টেমে?

আপডেট : ০২ জুন ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম

ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনরা অভিযোগ করছেন, ভোরবেলায় ‘পোস্ট-অপারেটিভ’ ওয়ার্ডে শিশুদের অবস্থার অবনতি হলেও ডাকাডাকি করে চিকিৎসক বা নার্স কাউকেই পাওয়া যায়নি।

গত ২৭এ মে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে ঘিরে। 

চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অতিরিক্ত বিল কিংবা পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামের অভাব–দেশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। 

অথচ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বড় অংশ এখন দাঁড়িয়ে আছে এসব হাসপাতালের ওপরই।

সরকারি হাসপাতালের সীমিত সক্ষমতা, দীর্ঘ অপেক্ষা, শয্যা সংকট এবং চিকিৎসক ও নার্সদের অপ্রতুলতার কারণে লাখো মানুষ বাধ্য হয়ে ছুটছেন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। 

এর ফলে দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য চিকিৎসা পরিণত হয়েছে আর্থিক ঝুঁকিতে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ)-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মাত্র ২৩ শতাংশ আসে সরকারি অর্থায়ন থেকে। ১৯৯৭ সালে এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ। 

অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কমেছে, বেড়েছে মানুষের নিজস্ব ব্যয়ের বোঝা।

বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, চিকিৎসা ব্যয়ের ৭২ থেকে ৭৪ শতাংশই সরাসরি নিজেদের পকেট থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই হার ২০ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি অসুস্থতা হয়ে উঠছে দারিদ্র্যেরও কারণ। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো- মানুষ যখন এত বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তখন কি তারা সেই অনুপাতে মানসম্মত চিকিৎসা পাচ্ছে?

বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালেই নেই পর্যাপ্ত নিজস্ব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স এবং ক্ষেত্র বিশেষে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। এদের প্রায় সবাই নির্ভরশীল সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের ওপর।   

অনেক হাসপাতাল কার্যত ব্যবসায়িক মডেলে পরিচালিত হলেও সেবার মান নিয়ে রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। 

এতে একদিকে মানুষের পকেট খালি হচ্ছে, অন্যদিকে চিকিৎসার নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ ইকনমিক্স ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদের ভাষায়, সমস্যাটি কোনো একক হাসপাতাল বা ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়।

“স্বাস্থ্যে যা হচ্ছে, ইনডিভিজুয়াল ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। পুরো ইকোসিস্টেমটাই কলাপসড করেছে,” আলাপ-কে বলেন তিনি। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, বেসরকারি খাতে অপর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যবিমার অনুপস্থিতি-সব মিলিয়ে দেশের স্বাস্থ্যখাত এখন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি।

প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো কতটা সেবা দিচ্ছে, আর কতটা ব্যবসা করছে? কেন চিকিৎসা খরচ ক্রমাগত বাড়ছে? সরকারি হাসপাতাল থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কেন? 

আর এই অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পথই বা কী?

বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীলতা কতটা?

বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীলতার কারণেই চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের মানুষের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।  

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান “হেলথকেয়ার ইন্ডাস্ট্রি ইন বাংলাদেশ: ন্যাভিগেটিং থ্রু চ্যালেঞ্জেস টু এনশিওর অ্যাকসেস টু হেলথকেয়ার ফর দ্য মাসেস” শীর্ষক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যখাতের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। 

ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর শয্যাসংখ্যা ছিলো ৭১ হাজার ৬৬০। আর বেসরকারি হাসপাতালে এই সংখ্যা ৯৯ হাজার ৯৭৫। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে মোট সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২ হাজার ২৫৮টি (কমিউনিটি ক্লিনিক বাদে।) আর বেসরকারি খাতে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা ৫ হাজার ৩২১টি। 

বেসরকারিখাতে সবচেয়ে বেশি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এই সংখ্যা সাড়ে নয় হাজারের বেশি। 

বেসরকারি বেশিরভাগ হাসপাতালেরই পরিবেশ পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন। বড় হাসপাতালগুলোতে নানা রকমের সেবা মেলে একই ভবনের নিচে। কিন্তু খরচ বেশি। কোনো কোনো পরীক্ষার জন্য সরকারি হাসপাতালের কয়েকগুণ অর্থ গুনতে হয়। 

বেসরকারি খাতের দিকে ঝুঁকে পড়ায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত বিনিয়োগের আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। 

বাংলাদেশে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি। 

২০২৩ সাল নাগাদ এই খাতে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে।

বিভিন্ন গবেষণায় মনে ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি রোগী যাচ্ছেন বেসরকারি খাতে।  

তবে এই হার আরও বেশি বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ। 

“প্রাইভেটে যায় ৮৫ থেকে ৮৮ শতাংশ মানুষ। তাহলে যদি প্রাইভেটের ওপর নির্ভরশীল হয় ৮৫ শতাংশের বেশি মানুষ, তাহলে সেখানে আউট অব পকেট পেমেন্ট হবেই,” বলেন তিনি। 

সৈয়দ আবদুল হামিদ মনে করেন, প্রাইভেট তিন ধরনের। এক. ওষুধের দোকান ও পল্লি চিকিৎসকরা। চিকিৎসা খরচের দুই তৃতীয়াংশ ওষুধের পেছনে খরচ হয়।

আর এরপরই বেসরকারি ডাক্তারের চেম্বার এবং ভর্তি বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেসরকারি হাসপাতালের শরণাপন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। 

সরকারি হাসপাতাল কেন পারছে না, কী করতে হবে

সরকারি হাসপাতালের মানোন্নয়ন করতে হলে অর্থায়ন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো সেখানকার ’নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর’ পরিবেশ এবং নানা ধরনের ‘অব্যবস্থাপনা’। 

ডাক্তার দেখানোর জন্য রোগীদের দীর্ঘ লাইন, ভর্তির পর বেড পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ এমনকি কখনো কখনো তদবির করা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগী নিয়ে ছোটাছুটি, অপরাশনের সিরিয়ালের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা এবং দালালদের দৌরাত্ম্য। 

আর এসব ছাড়িয়ে যায় সেখানকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। 

“আপনি একজন সৃুস্থ্ মানুষ। সরকারি হাসপাতালে সারাদিন থাকেন। আপনিও অসুস্থ হয়ে যাবেন,” বলেন সৈয়দ আবদুল হামিদ।   

তিনি বলেন, “বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হলে সরকারি হাসপাতালে যেন আমরা যাই, যেতে পারি, সেই ব্যবস্থাটা করতে হবে। সেইটা করতে হলে সরকারি হাসপাতালে যে সমস্ত সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ আছে, যেগুলোর জন্য আমরা যাই না বা যেয়ে সেবা পাই না, সেগুলো দূর করতে হবে।” 

এর ওপর রয়েছে নার্স ও ডাক্তারের অভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে এক হাজার মানুষের জন্য কমপক্ষে একজন নিবন্ধিত ডাক্তার থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে ১২০০ জনেরও বেশি মানুষের জন্য রয়েছেন একজন ডাক্তার। 

কিন্তু এইসব সমস্যা দূর করার উদ্যোগ কি সরকারের পক্ষ থেকে আছে? 

সবকিছু উন্নত করার জন্য প্রথমেই দরকার অর্থ সরবরাহ বাড়ানো। কিন্তু গত অর্থবছরে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ মোট জিডিপির মাত্র দশমিক ৬৭ শতাংশ। অথচ এটা দুই শতাংশের কাছাকাছি হওয়া উচিত। 

যুক্তরাষ্ট্রের এনআইএইচের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে। দরিদ্র ও গ্রামীণ বিভাগগুলো মাথাপিছু বরাদ্দ পায় কম। অন্যদিকে সরকারি তৃতীয় স্তরের (টারশিয়ারি) হাসপাতালগুলোর সেবার বড় অংশ ভোগ করে তুলনামূলকভাবে সচ্ছল জনগোষ্ঠী। ফলে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগের সুফল সমানভাবে সবার কাছে পৌঁছায় না।” 

“এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থায়নে বড় ধরনের সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন।” 

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের ব্যয় প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বরাদ্দও বাড়াতে হবে। কারণ জনগণের অধিকাংশ স্বাস্থ্য চাহিদা এই স্তরেই পূরণ করা সম্ভব।

স্বাভাবিকভাবেই সরকারি হাসপাতালের মানোন্নয়ন করতে হলে অর্থায়ন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। আর এই অর্থ দিয়ে আরও জনবল নিয়োগ, যন্ত্রপাতি কেনা এবং ব্যাপকভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে বলেও তাদের পরামর্শ। 

অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, “বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হলে সরকারি হাসপাতালে যেন আমরা যাই, যেতে পারি, সেই ব্যবস্থাটা করতে হবে। সেইটা করতে হলে সরকারি হাসপাতালে যে সমস্ত সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ আছে, যেগুলোর জন্য আমরা যাই না বা যেয়ে সেবা পাই না, সেগুলো দূর করতে হবে।” 

“সরকারি হাসপাতালের এই দুরবস্থা যদি আমরা দূর করতে না পারি, তাহলে কি সরকারি হাসপাতালমূখি আমরা হবো? বাধ্য হয়েই আমাদের প্রাইভেটে বা বিদেশে যেতে হচ্ছে।”  

কিন্তু প্রাইমারি ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়গুলো নাগরিকদের বিনামূল্যে পাওয়া উচিত বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন। 

“প্রাইমারি হেলথকেয়ারটা পুরোটাই ফ্রি থাকা উচিত। প্রাইমারি হেলথকেয়ার প্রাইভেট খাতে যদি কেউ করে, সেটা সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যেই করতে হবে। যেমন এনজিওগুলো প্রাইমারি হেলথকেয়ার দেয়।” 

তিনি বলেন, “সেকেন্ডারি এবং জরুরি সেবাটাও পুরোপুরি প্রাইভেটের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কাজেই প্রাইমারি, জরুরি এবং আংশিক সেকেন্ডারি সেবা মানুষের কাছে ফ্রি থাকতে হবে নামমাত্র মূল্যে। 

ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলছেন, “আউট অব পকেট পেমেন্ট যদি কমাতে হয়, তাহলে দুটো মডালিটিজ আছে। হয় বেসরকারি হাসপাতালের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। অথবা বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সরকার সেবা কিনে আমাদেরকে দেবে।” 

উদাহরণ হিসেবে তিনি প্রসূতি মায়ের কথা উল্লেখ করেন। 

“প্রতিবছর ৩০ লাখ মা সন্তান ডেলিভারি করেন। এই ডেলিভারি করানোর সক্ষমতা সরকারি হাসপাতালের নাই। এর প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িতে হয়, ১০ শতাংশ সরকারি হাসপাতালে, বাকিটা বেসরকারি হাসপাতালে হচ্ছে।” 

অধ্যাপক হামিদ বলছেন, “এই সেবাটা সরকার টাকা দিয়ে জনগণকে কিনে দিতে পারে। সরকার বলবে, তোমরা প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে এই সেবা নিলে কোনো টাকা দিতে হবে না। টাকাটা সরকার দিয়ে দেবে। 

“তাহলে মানুষের পকেট থেকে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। সরকারের পকেট থেকে গেলো। ঠিক একইভাবে ক্যান্সার, কিডনি ডায়ালাইসিস- এই ধরনের সেবা সরকার কিনে দিতে পারে।”  

বেসরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা

সরকারি হাসপাতালের নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে মানুষের পকেট ফাঁকা করছে বেসরকারি হাসপাতালগুলো।

আন্তর্জাতিক একাধিক গবেষণার হিসাবে, বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি হাসপাতাল ১৬ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বার্ষিক মুনাফা করে থাকে। যদিও উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার কম। 

অস্ট্রেলিয়ায় এই হার ৪ থেকে ৮ শতাংশ, ভারতে ৮ থেকে ১২ এবং কেনিয়ার মতো দেশে ৮ থেকে ১৫ শতাংশের মতো।

কিন্তু মুনাফার হারে এগিয়ে থাকলেও বারবার দুর্ঘটনা এবং চিকিৎসায় অবহেলা নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের একটি বিষয় বারবার সামনে আসে। তা হলো- বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বেশিরভাগেরই নিজস্ব কোনো চিকিৎসক নেই। 

সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা ’ডুয়েল জব’ বা ‘দ্বৈত চাকরি’র মাধ্যমেই বেসরকারি হাসপাতাল টিকিয়ে রেখেছেন। 

স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ নিজেই প্রশ্ন তোলেন, খরচ করার পরও কি মানসম্মত ট্রিটমেন্ট পাচ্ছি?

“না, আমরা পাচ্ছি না। এর কারণ হলো, পুরোপুরি বেসরকারি হাসপাতালের মানসম্মত জনবলই নাই। খুব কম হাসপাতালের এটা আছে। 

“তারা বাইরে থেকে ডুয়াল প্রাকটিসের নেয়। ফুল ফ্লেজড নাই। ফুল ফ্লেজডের আরেকটা বিপদ হলো- কোয়ালিটি লোক পাবেন না। ওই হাসপাতালেই সেবা দেবে, অন্য কোথাও দেবে না, সেই লোকগুলা পাবেন না।” 

এভারকেয়ার সিলেটে শাখা করতে চাইলেও ডাক্তার পায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। 

“প্রাইভেট হাসপাতাল নির্ভরশীল সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারদের ডুয়াল প্রাকটিসের ওপর। আর যাদের পাচ্ছে, তারা সরকারি চাকরিতে যেতে পারছে না। বেসরকারি চাকরিতে ক্যারিয়ার গড়তে চাচ্ছে তাদেরকে পাচ্ছে। তারা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে আসছে।” 

সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, “বেসরকারি মেডিকেল এবং সরকারের পরের জেনারেশনের মেডিকেল কলেজের কোয়ালিটি নাই। সেখান থেকে তারা এসে বেসরকারি হাসপাতালে জয়েন করছে।

“আর ওভারঅল ম্যানেজমেন্ট কোয়ালিটিতে আমাদের এখানে যেহেতু অ্যাক্রেডিটেশন সিস্টেম নাই। তাই কোয়ালিটি মনিটরিং আমাদের এখানে করা হয় না। কারণ, এখানে অ্যাক্রিডিটেশন সিস্টেম গড়ে ওঠে নাই।” 

তিনি আরও বলেন, “গ্যাপ আছে হিউম্যান রিসোর্স কোয়ালিটিতে, গ্যাপ আছে সার্ভিস ম্যানেজমেন্টে, নানা জায়গায় তাদের (বেসরকারি) কিন্তু গ্যাপ আছে। যার কারণে মাঝে মাঝে আমরা দেখতে পাই, এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটে।” 

“সর্বোপরি আমাদের বেসরকারি হাসপাতালগুলো ডাক্তার পাই না। মানে ডাক্তার আমাদের সিস্টেমে নাই। যারা ভালো, তারা বিসিএস দিয়ে সরকারি জায়গায় চলে যায়। তারা ডুয়াল প্র্যাকটিসের মাধ্যমে কোনো কোনো জায়গায় করে। নিজস্ব যে পুলটা সে (বেসরকারি হাসপাতাল) রিক্রুট করেছে, সেটা ভালো পাচ্ছে না।” 

এসবকিছু মিলেই “টোটাল ইকোসিস্টেমেরই গ্যাপ রয়েছে” বলে মনে করেন এই স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবা পুরোটাই ফ্রি করে দেওয়া উচিত। আর এটা যতক্ষণ না হচ্ছে, ততক্ষণ জরুরি ও প্রাথমিক এবং কিছু কিছু টারশিয়ারি সেবা বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সরকার ফ্রি নিতে পারে। এজন্য তাদের দিতে পারে ভর্তুকি। 

“বেসরকারি হাসপাতালের কাছ থেকে ওইরকম সেবা নিতে হলে তাদেরকেও সরকারের ভর্তুকি দিতে হবে। নট ফর প্রফিট অর্গানাইজেশন সরকারের কাছ থেকে সাবসিডি পায়, যেমন- বারডেম, আইসিডিডিআরবি,” বলেন তিনি। 

“তবে চিকিৎসার গুণগত মান সরকারের সঙ্গে সমান হতে হবে। আর ফাইভস্টার মানের কেউ হাসপাতাল করলে, তারা সেখানেতো সেই চার্জই রাখবে। বার্নের রোগীর প্লাস্টিক সার্জারি জন্য জরুরি সেবা রাখা। আবার যে চেহারা পরিবর্তন করতে চায়, তার জন্য এটা জরুরি না,” যোগ করেন তিনি। 

মুশতাক হোসেন বলেন, “আদর্শ হলো, ওয়েলফেয়ার স্টেটের মতো পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাই বিনামূল্যে করে দেওয়া।”  

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সেবা ও বাণিজ্যের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। সরকারি হাসপাতালের দুর্বলতা মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে বেসরকারি খাতের দিকে। আর সেই নির্ভরশীলতা থেকে তৈরি হচ্ছে উচ্চ ব্যয় ও অনিশ্চিত মানের এক চক্র।

বিশেষজ্ঞদের মনে করছেন, এই সংকট কোনো একক খাতের নয়। পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ইকোসিস্টেমের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল এটা। পর্যাপ্ত সরকারি বিনিয়োগ, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, মানসম্পন্ন মানবসম্পদ এবং কার্যকর স্বাস্থ্য বিমা ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয় বলেও মনে করছেন তারা।