এপস্টিন ফাইলস: ক্ষমতাবানদের যৌন নিপীড়নের ভয়ানক এক নেটওয়ার্ক

ডনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, ইলন মাস্ক, বিল গেটস, মাইকেল জ্যাকসন- বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাজকীয় ক্ষমতার চূড়ায় থাকা এই মানুষগুলোর নাম জড়িয়ে আছে সেই গোপন নথির সঙ্গে। এই ফাইল ক্ষমতা, অর্থ আর শত শত নিরীহ কিশোরীর শৈশব কেড়ে নেওয়া এক সুপরিকল্পিত যৌন নিপীড়নের ভয়ানক নেটওয়ার্কের প্রামাণ্য দলিল।

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম

ছিলেন অংকের মাস্টার। তারপর ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার। ট্যাক্স আইনজীবী বা সার্টিফায়েড অ্যাকাউন্ট্যান্ট না হয়েও বিলিয়নেয়ারদের কর ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা করতেন। আর এভাবে তিনি গড়ে তোলেন বিপুল সাম্রাজ্য।

আস্ত দুটি দ্বীপের মালিক। বিলাসবহুল জীবন। বিল ক্লিনটন তার ব্যক্তিগত বিমানে চড়তেন। ডনাল্ড ট্রাম্প যোগ দেন ব্যক্তিগত পার্টিতে। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর তালিকায় ছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য, টপ বিলিয়নেয়ার, এমনকি পপ সুপারস্টার পর্যন্ত।

কিন্তু তারপরও তিনি ধরা পড়লেন পুলিশের জালে। অভিযোগ, যৌন নিপীড়ণের এক বিরাট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার। কিন্তু ধরা পরার পর মারা গেলেন কারা প্রকোষ্ঠেই।

এরপর বেরিয়ে আসতে শুরু করলো দীর্ঘ দুই দশক ধরে চাপা থাকা এক ভয়ংকর গোপন সাম্রাজ্যের পর্দা- যা এরই মধ্যে পরিচিতি পেয়েছে 'এপস্টিন ফাইলস' নামে- যেটাকে বর্ণনা করা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অন্ধকার দিকের এক মর্মন্তুদ দলিল হিসেবে।

এই ফাইলের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ক্ষমতা, অর্থ আর শত শত নিরীহ কিশোরীর শৈশব কেড়ে নেওয়ার এক সুপরিকল্পিত ও ভয়ানক নেটওয়ার্কের ইতিহাস।

কয়েক হাজার পৃষ্ঠার এই নথি শুধু সীমাহীন অপরাধকেই প্রকাশ করে না, বরং সমাজের একেবারের ওপরের স্তরের পচনকে চোখের সামনে উন্মোচন করে।

ডনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, ইলন মাস্ক, বিল গেটস, মাইকেল জ্যাকসন- বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাজকীয় ক্ষমতার চূড়ায় থাকা এই মানুষগুলোর নাম জড়িয়ে আছে সেই গোপন নথির সঙ্গে; কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষভাবে। 

এপস্টিনের ভয়ংকর ফাঁদের শিকার হয়েছিল শত শত কিশোরী, যাদের বয়স মাত্র ১৪ থেকে ১৬ বছর। তারা ছিল সমাজের দুর্বলতম অংশ; দারিদ্র্য বা পারিবারিক বিচ্ছেদের শিকার, কিন্তু স্বপ্ন দেখা সহজ-সরল মেয়ে। তারা কেবল শৈশবকেই হারায়নি, হারিয়েছে জীবনের প্রতি আস্থা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তাদের কান্না, হারানো সময়, আর নীরব সংগ্রামই হলো এই ফাইলসের মর্মকথা।

তাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কীভাবে জেফরি এপস্টিন ও তার সহযোগীরা সুসংগঠিত এক যৌন পাচার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, তার অবিশ্বাস্য চিত্র আঁকা আছে এই ফাইলসে।

বহু বছর পর, যখন এই ফাইলসের প্রতিটি পৃষ্ঠা জনসমক্ষে আসছে, তখন প্রশ্ন উঠছে- কীভাবে এত বছর ধরে এই ক্ষমতাবানরা বিচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পার পেয়ে গেলেন? কোন অদৃশ্য শক্তির বলে এপস্টিন এত বড় মাপের অপরাধ করেও সামান্য শাস্তি পেয়ে বেরিয়ে আসতে পারতেন?

আর এখনো ন্যায়বিচারের জন্য লড়ছেন সেই ভুক্তভোগীরা, যারা তাদের জীবন দিয়ে এই নেটওয়ার্কের ভয়াবহতা প্রমাণ করছেন। তাদের লড়াই শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি সমাজের উচ্চস্তরের দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবতার এক অদম্য প্রতিবাদের গল্পও।

এপস্টিনের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

আশির দশকে এপস্টিন ছিলেন সাধারণ এক আর্থিক পরামর্শক। এরপর দুই দশক পেরোতে না পেরোতেই হয়ে ওঠেন এমন এক ধনকুবের, যার ব্যক্তিগত জেটে চড়তেন বিল ক্লিনটন। আর পার্টিতে যোগ ‍দিতেন ডনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টিন নিউ জার্সিতে গ্রেপ্তার হন ২০১৯ সালের ছয়ই জুলাই। সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের যৌন পাচার ও মানবপাচারের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার। 

কিন্তু বিচার শুরুর আগেই গ্রেপ্তারের ৩৫ দিনের মাথায় নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন কারাগার থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আর এই মৃত্যু জন্ম দেয় বিরাট রহস্যের।

তদন্তে নামে আমেরিকার ফেডারেল গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। তারা জানায়, আত্মহত্যা করেছেন এপস্টিন। কিন্তু এতে সন্দেহ মুছে যায়নি, বরং আরো বেশি দাঁনা বাধে।

তার ভাই মার্ক এপস্টিনসহ অনেকে দাবি করেন- আত্মহত্যা নয়, খুন করা হয়েছে এপস্টিনকে। প্রভাবশালী মহলের গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া ঠেকাতেই এপস্টিনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফরেনসিক রিপোর্টে উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য-উপাত্ত। এপিস্টিনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন যে ধরনের, তা আত্মহত্যা থেকে হতে পারে না বলে জানান ডাক্তাররা।

গায়েব হয়ে যায় সিসিটিভি ফুটেজ। কারাগারে পাহারার গাফিলতির চিত্র সামনে আসে। সবকিছু মিলিয়ে এপস্টিনের ‘রহস্যজনক’ মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ বদ্ধমূল হয় একজনের বক্তব্যে।

সাবেক এক মাফিয়া নেতা হলেন মাইকেল ফ্রানজেসি। এপস্টিন যে সেলে মারা যান, সেখানেই একসময় বন্দী ছিলেন তিনি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজ নেশনকে দেয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে ফ্রানজেসি বলেন, প্রভাবশালী অনেক রাজনীতিবিদ, রাজপরিবারের সদস্য ও ধনকুবেরদের অপরাধের কথা জানতেন এপস্টিন। সেই ব্যক্তিদের রক্ষার জন্যই হয়তো চিরতরে তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সাবেক এই মাফিয়া নিজে অনেকদিন একই কারাগারে ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ফ্রানজেসি বলেন, সেলটির উচ্চতা কম। সেখানে ঝুলে আত্মহত্যা করা সম্ভব নয়।

“আর এপস্টিনের মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ বন্দীর দায়িত্বে থাকা গার্ডদের অবহেলা বা সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হয়ে যাওয়াটাও অস্বাভাবিক। এটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে,” দাবি করেন ক্যাপো মাইকেল ফ্রানজিস।

কে এই জেফরি এপস্টিন, কীভাবে উত্থান? 

নারীদের অন্তর্বাসের জনপ্রিয় ব্রান্ড ‘ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট’সহ একাধিক ব্রান্ডের মালিক হলেন মার্কিন ধনকুবের লেস ওয়েক্সনার। এপস্টিনের উত্থানের পেছনে বড় ধরনের ভূমিকা ছিল তার।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই জেফরি এপস্টিন আসলে কে? কীভাবে তিনি বিশ্বের ক্ষমতাশালী মহলের জন্য হয়ে উঠেছিলেন এক বিপজ্জনক নাম?

ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের দুটি দামি দ্বীপ হলো- লিটল সেইন্ট জেমস ও গ্রেট সেইন্ট জেমস। এই দুই দ্বীপেরই মালিক ছিলেন এপস্টিন।

নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, প্যারিস, নিউ মেক্সিকো- সবখানেই তার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, সম্পত্তি। ছিল ব্যক্তিগত বিমান। তবে তার আসল শক্তি ছিল অন্য জায়গায়- প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্কের জাল। বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রিন্স অ্যান্ড্রুর মতো বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা।

এপস্টিনের চমকপ্রদ এই জীবনের আড়ালেই ছিল অন্ধকার সাম্রাজ্য।

১৯৫৩ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম হয় জেফরি এপস্টিনের। বাবা ছিলেন পার্কের মালী, মা স্কুল সহকারী। ছোটবেলা থেকেই গণিতে ছিল এপস্টিনের অসাধারণ মেধা। কপার ইউনিয়ন কলেজে পড়লেও ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেননি।

কর্মজীবন শুরু হয় ডালটন স্কুলে, গণিত শিক্ষক হিসেবে। সেখানেই পরিচয় ঘটে ওয়াল স্ট্রিটের অভিজাত মহলের সঙ্গে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি যোগ দেন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বেয়ার স্টার্নসে। সেখান থেকেই তার উত্থানের শুরু।

আশির দশকে এপস্টিন ছিলেন সাধারণ এক আর্থিক পরামর্শক। এরপর দুই দশক পেরোতে না পেরোতেই হয়ে ওঠেন এমন এক ধনকুবের, যার ব্যক্তিগত জেটে চড়েন বিল ক্লিনটন। আর পার্টিতে যোগ দেন ডনাল্ড ট্রাম্প।

কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এই অস্বাভাবিক উত্থান? এই প্রশ্নের জবাব আজও রহস্যে ঘেরা, ঠিক যেমনটি রয়েছে তার সম্পদের উৎস নিয়ে।

তিনি না ছিলেন ট্যাক্স আইনজীবী, না সার্টিফায়েড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তবুও ধনকুবেরদের কর ও সম্পত্তি পরিকল্পনার পরামর্শ দিয়ে গড়ে তোলেন বিপুল সাম্রাজ্য।

নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান খুলে এপস্টিন ঘোষণা দেন, তিনি কেবল বিলিয়নিয়ারদের জন্য কাজ করবেন। কর ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিনিময়ে নিতেন আকাশছোঁয়া ফি। আর ব্যবহার করতেন কর ছাড়ের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের সুবিধা। ইনভেস্টোপিডিয়া ও ফোবর্স-এর প্রতিবেদন অনুসারে, মৃত্যুর সময় তার সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার।

নারীদের অন্তর্বাসের জনপ্রিয় ব্রান্ড ‘ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট’সহ একাধিক ব্রান্ডের মালিক হলেন মার্কিন ধনকুবের লেস ওয়েক্সনার। এপস্টিনের উত্থানের পেছনে বড় ধরনের ভূমিকা ছিল তার।

এপস্টিনের প্রথম ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্লায়েন্ট ছিলেন লেস ওয়েক্সনার। এপস্টিনের ওপর তার এতটাই আস্থা ছিল যে, অল্প সময়ের মধ্যে নিজের আর্থিক সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ ক্ষমতা বা পাওয়ার অব এটর্নি দিয়ে দেন।

আর এটাই এপস্টিনকে সমাজের সর্বোচ্চ মহলে প্রবেশাধিকার দেয়। রাজনীতিবিদ, রাজপরিবারের সদস্য, হলিউড তারকাসহ নানা মহলের প্রভাবশালীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করেন তিনি।

ব্যক্তিগত বিমান ললিতা এক্সপ্রেসে প্রভাবশালী বন্ধুদের সাথে পৃথিবীজুড়ে ঘুরে বেড়াতেন এপস্টিন। এই সামাজিক বলয়ই তাকে দীর্ঘদীন আইনি সুরক্ষা দিয়েছিল।

অপরাধ করে যেভাবে সুরক্ষা পেতেন এপস্টিন

এপস্টিনের আসল শক্তি ছিল অন্য জায়গায়- প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্কের জাল। বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রিন্স অ্যান্ড্রুর মতো বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা।

২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে মারা যাওয়ার আগে, একই ঘটনায় আরেকবার আসামি হয়েছিলেন এপস্টিন। তবে সেবার রহস্যময় কারনে বিনা সাজাতেই পার পেয়ে যান।

কীভাবে এই ঘটনা ঘটে, তা বেরিয়ে এসেছে একজন পুলিশ অফিসারের বর্ণনা থেকে।

ফ্লোরিডার ছোট শহর পাম বিচের সমুদ্র তীর ঘেঁষে রয়েছে ধনকুবেরদের রাজকীয় প্রাসাদ। নির্জন, মনোরম, সাজানো-গোছানো ওই শহরে ৩৮ বছর ধরে বসবাস মাইকেল রাইটার-এর। ২৮ বছর চাকরি করেছেন পাম বিচ পুলিশ ডিপার্টমেন্টে। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ছিলেন পুলিশ প্রধান।

২০০৫ সালের ঘটনা। পাম বিচ পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ফ্রন্ট ডেস্কের ফোন বেজে ওঠে। রিসিভ করতেই অন্যপাশ থেকে একজন নারী গুরুতর একটি ঘটনা রিপোর্ট করলেন- তার ১৪ বছরের মেয়ে যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম জেফ। ঘটনাটি ঘটেছে পাম বিচেরই একটি বাড়িতে। 

অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নামে পুলিশ। পাম বিচের এল ব্রিলো ওয়ে সড়কের ৩৫৮ নম্বর বাড়িতে যান তারা- অভিযোগকারীর বর্ণনার সঙ্গে বাড়িটির হুবহু মিল পাওয়া যায়।

পুলিশ প্রধান মাইকেল রাইটারের সন্দেহ হয় আরেক জায়গায়। এর আগেও এই বাড়ির বিষয়ে কেউ তাকে তথ্য দিয়েছিলেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীদের সন্দেহজনক যাতায়াত রয়েছে এখানে।

সেবারও খোঁজ নিয়েছিলেন রাইটার। বাড়িতে প্রবেশ করার সময়, কয়েকজন নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক এবং ওই বাড়িতে কাজ করেন বলে জানান।

সেবার তেমন কিছু মনে না হলেও, এবার কিন্তু সন্দেহ ঘনীভূত হয় পুলিশ প্রধানের। মাইকেল রাইটার নিখুঁত তদন্ত করতে সঙ্গে নেন দুঁদে গোয়েন্দা জো রেকারকে। 

তদন্ত শুরু করে তারা বুঝতে পারেন, অভিযোগটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বারবার ঘটছে বলে এনবিসি নিউজকে বলেছিলেন মাইকেল রাইটার। 

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে শ্রমমন্ত্রী ছিলেন অ্যালেক্স অ্যাকোস্টা। তিনি ২০০৬ সালে ছিলেন ফ্লোরিডার ফেডারেল প্রসিকিউটর। তিনিই ২০০৭ সালে জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে গোপন একটি চুক্তি করেন।

আর এই চুক্তির ফলেই এপস্টিনের বিরুদ্ধে ফেডারেল অভিযোগ বাতিল হয়ে যায়। 

যৌনকর্মী সংগ্রহের দায়ে এপস্টিন আদালতে শুধু দোষ স্বীকার করেন। ১৮ মাসের কারাবাসের আদেশ হয়। তাও আবার দিনে ব্যবসার কাজে বাইরে যাওয়ার অনুমতি মেলে। শেষমেশ ১৩ মাস জেল খেটেই মুক্তি পান তিনি।

এই চুক্তিতে শুধু এপস্টিন নন, তার সঙ্গে জড়িত অজানা অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিও ভবিষ্যৎ মামলার হাত থেকে রেহাই পেয়ে যান। বিষয়টি দেখে বিস্মিত হন পুলিশ প্রধান রাইটার ও ডিটেকটিভ রেকারে। কারণ, তদন্তে তারা ৪০ জনের বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগীকে চিহ্নিত করেছিলেন- যাদেরকে অর্থের বিনিময়ে মাসাজ দিতে বাধ্য করতেন এপস্টিন। 

ওই ঘটনা এক ধরনের যৌন নির্যাতন ছিল বলে এনবিসি নিউজকে বলেন রাইটার। 

ভুক্তভোগীরা মনে করেন, অ্যালেক্স অ্যাকোস্টার সঙ্গে এপস্টিনের গোপন চুক্তি তাদের ন্যায়বিচারের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। ফলে শুধু একজন অপরাধীই নয়, ক্ষমতাশালী পুরো নেটওয়ার্কই আড়ালে থেকে যায়। 

এই ঘটনার পরই শুরু হয় আইনি লড়াই ও নতুন নতুন অভিযোগের স্রোত।

অদম্য সাহসী এক নারীর লড়াই

যে কয়েকজন নারী এপস্টিন ফাইলসের ভয়ংকর অন্ধকার ঘটনা সামনে এনে সত্য প্রকাশের সাহস দেখিয়েছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ভার্জিনিয়া।

এপস্টিনের শিকার হওয়া অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী হলেন ভার্জিনিয়া জিউফ্রে রবার্টস। গত এপ্রিলে অষ্ট্রেলিয়াতে নিজের জীবন নিজেই কেড়ে নেন তিনি।

যে কয়েকজন নারী এপস্টিন ফাইলসের ভয়ংকর অন্ধকার ঘটনা সামনে এনে সত্য প্রকাশের সাহস দেখিয়েছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ভার্জিনিয়া। 

তিনি একসময় ছিলেন এই নেটওয়ার্কের শিকার। কিন্তু পরে হয়ে ওঠেন ন্যায়ের পক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠ। আইনি লড়াইয়ে একেবারে সামনের সারিতে থেকেছিলেন সাহসী এই নারী।

ব্রিটেনের রাজা চার্লসের আপন ছোট ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রু রাজকীয় সব পদপদবী ত্যাগ করতে হয়েছে। কারণ ভার্জিনিয়া জিউফ্রে অভিযোগ করেন যে, অপ্রাপ্ত বয়সে তাকে যৌনতার জন্য পাঠানো হতো প্রিন্স অ্যান্ড্রুসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে।

এই অভিযোগে কেঁপে ওঠে ব্রিটিশ রাজপরিবার। শুরুতে অস্বীকার করেছিলেন প্রিন্স অ্যান্ড্রু। কিন্তু জিউফ্রের সঙ্গে তার একটি অন্তরঙ্গ ছবি ফাঁস হয়ে যায়। এরপর তুঙ্গে ওঠে বিতর্ক।

২০২২ সালে আদালতের বাইরে জিউফ্রের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়। ক্ষতিপূরণ দিয়ে মিটিয়ে ফেলা হয় মামলা। যদিও বরাবরের মতোই অ্যান্ড্রু দাবি করে আসছেন যে, তিনি নির্দোষ।

এক সময়ের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন রবার্ট ম্যাক্সওয়েল। তাকে বলা হতো ব্রিটিশ মিডিয়া মোগল, ছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সংসদ। চেকোস্লোভাকিয়ায় জন্ম নেওয়া এই ব্যবসায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনে স্থায়ী হন এবং ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন এক বিশাল প্রকাশনা সাম্রাজ্য।

মিরর গ্রুপ নিউজপেপার্সের মালিক হিসেবে তিনি ছিলেন ব্রিটিশ মিডিয়ার এক শক্তিশালী মুখ। তবে তার সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল দুর্নীতি ও প্রতারণার অভিযোগ। ১৯৯১ সালে রহস্যজনকভাবে স্পেনের উপকূলে নিজের ইয়ট থেকে নিখোঁজ হন। পরে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ।

মৃত্যুর পর ফাঁস হয়- কোম্পানির কর্মীদের পেনশন ফান্ড থেকে শত শত মিলিয়ন পাউন্ড আত্মসাৎ করেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। এই কেলেঙ্কারি তার সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেয় এবং রেখে যায় বিতর্ক ও রহস্যে ঘেরা এক উত্তরাধিকার।

তার মেয়ের নাম গিলেইন ম্যাক্সওয়েল। বাবার বিতর্কিত ছায়া যেন তার জীবনেও ফিরে আসে অন্যরূপে। তিনি ছিলেন জেফরি এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ম্যাক্সওয়েলের মৃত্যুর পর নিউ ইয়র্কের অভিজাত সমাজে প্রবেশ করেন গিলেইন।

১৯৯০-এর দশকে জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে তার সম্পর্কের শুরু। প্রথমে প্রেমিকা, পরে হয়ে ওঠেন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও যৌন পাচার চক্রের মূল সংগঠক। 

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভার্জিনিয়া বলেছিলেন, মাত্র ১৬ বছর বয়সে গিলেইন তাকে উচ্চ বেতনের মাসাজ থেরাপিস্টের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো ক্লাব থেকে এপস্টিনের হাতে তুলে দেন। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার দুঃস্বপ্ন।

ভার্জিনিয়া জিউফ্রে অভিযোগ করেন যে, অপ্রাপ্ত বয়সে তাকে যৌনতার জন্য পাঠানো হতো প্রিন্স অ্যান্ড্রুসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে।

ওই ঘটনায় পরে গিলেইনের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন ভার্জিনিয়া। 

তার সাহসী আইনি লড়াই শুধু অতীতের গোপন চুক্তিকে চ্যালেঞ্জই করেনি, বরং ২০১৯ সালে এপস্টিনকে দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তারের পথও তৈরি করে দেয়। 

একজন কিশোরীর স্বীকারোক্তি ও এক নারীর নীরব ভূমিকা- উন্মোচন করেছিল ক্ষমতা, লোভ আর অন্ধকারের এক বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক।

চাপ সৃষ্টি ও আইনি পদক্ষেপ

যুক্তরাষ্ট্রের দ্য মিয়ামি হেরাল্ড পত্রিকার সাংবাদিক জুলি ব্রাউন। ২০১৮ সালে জেফরি এপস্টিন কেলেঙ্কারি নিয়ে তার ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপরই জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে শতাব্দীর অন্যতম এক অন্ধকার কাহিনী।

সেই প্রতিবেদনে প্রায় ৮০ জন ভুক্তভোগীর অভিযোগ প্রকাশ পায়। সাংবাদিক ব্রাউন প্রমাণ করেন, এপস্টিনের জন্য গোপন যে চুক্তি করা হয়েছিল, তা ভুক্তভোগীদের অধিকার সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। আর এপস্টিনকে গুরুতর ফেডারেল অভিযোগের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছিল।

জনগণের চাপ ও গণমাধ্যমের নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণার ফলে, শেষ পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের ফেডারেল প্রসিকিউটররা নতুন করে তদন্ত শুরু করেন। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে এপস্টিনের বিরুদ্ধে আবারও মানবপাচার ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়।

ওই বছরের ছয় জুলাই প্যারিস থেকে ফেরার পথে নিউ জার্সির বিমানবন্দরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৩৫ দিন পর ১০ আগস্ট বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে মারা যান এপস্টিন।

প্রতিবেদনগুলো সামনে আসার পরই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের তখনকার শ্রমমন্ত্রী অ্যালেক্স অ্যাকোস্টা প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন। কারণ, তিনিই ২০০৮ সালে ইউএস অ্যাটর্নি হিসেবে জেফরি এপস্টিনের জন্য বিতর্কিত নন-প্রসিকিউশন চুক্তি করেন, যা তাকে ফেডারেল অভিযোগ থেকে রেহাই দেয়। ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয় অ্যাকোস্টাকে।

এপস্টিনের মৃত্যুর পর ফেডারেল কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার করে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিলেইনকে।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, গিলেইন ম্যাক্সওয়েলই ছিলেন এপস্টিনের যৌন পাচারচক্রের মূল সংগঠক। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের খুঁজে বের করা, সম্পর্ক তৈরি করে বিশ্বাস অর্জন করা এবং গ্রুমিংয়ের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনকে স্বাভাবিক করে তোলা- এসব কিছুই হতো তার পরিকল্পনামাফিক।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে ম্যাক্সওয়েলকে একাধিক অপরাধের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে জুরি। পরের বছর তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ট্রাম্প ও বিল গেটস

এপস্টিনকে প্রায়ই দেখা যেত ট্রাম্পের বিলাসবহুল ক্লাব মার-এ-লাগোতে। তারা নিয়মিত একসঙ্গে পার্টি করতেন এবং যোগ দিতেন সামাজিক অনুষ্ঠানে।

আমেরিকান স্পোর্টস মডেল স্টেসি উইলিয়ামস ছিলেন এপস্টিনের সাবেক প্রেমিকা। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ১৯৯৩ সালে এপস্টিন তাকে নিয়ে যান ডনাল্ড ট্রাম্পের অফিসে। সেখানে ট্রাম্প তার সঙ্গে নিপীড়নমূলক আচরণ করেন।

ওই ঘটনার সময় এপস্টিন নিজে উপস্থিত ছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এপস্টিনের সঙ্গে কীভাবে জুটলেন ডনাল্ড ট্রাম্প?

এপস্টিন ও ট্রাম্প দুজনেই নব্বইয়ের দশকে নিউ ইয়র্ক ও ফ্লোরিডার অভিজাত মহলে পরিচিত মুখ ছিলেন। এপস্টিনকে প্রায়ই দেখা যেত ট্রাম্পের বিলাসবহুল ক্লাব মার-এ-লাগোতে। তারা নিয়মিত একসঙ্গে পার্টি করতেন এবং যোগ দিতেন সামাজিক অনুষ্ঠানে।

২০০২ সালে নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিনে এক সাক্ষাৎকারে এপস্টিনকে ‘চমৎকার লোক’ এবং তার সঙ্গে সময় কাটানো ‘দারুণ’ বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। কিন্তু অভিযোগের ঝড় উঠতেই ট্রাম্প জানান, তিনি এপস্টিনকে তার ক্লাব থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।

দুই বোন হলেন মারিয়া ফারমার ও অ্যান ফারমার। এপস্টিন ও ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের অন্যতম। গত জুলাই মাসে মারিয়ার সাক্ষাৎকার প্রচার করে সিএনএন।  সেখানে তিনি বলেন, ১৯৯৫ সাল থেকে অভিযুক্তদের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ম্যাক্সওয়েল তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে এপস্টিনের ম্যানশনে নিয়ে গিয়েছিলেন। 

১৯৯৬ সালে কিশোরী অ্যান ফারমারও একইভাবে নির্যাতিত হন।

মারিয়ার অভিযোগ, ১৯৯৬ সালে তিনি এফবিআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনাটি জানানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিষয়টি তখন গুরুত্ব পায়নি। সেই সময় তিনি আরেকজনের নাম উল্লেখ করেন, যিনি ছিলেন এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডনাল্ড।

এই ডনাল্ডই বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলে মনে করা হচ্ছে। কীভাবে মারিয়াকে তখন ট্রাম্পের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই বর্ণনাও দিয়েছেন তিনি।

মারিয়া বলেছেন, এপস্টিন কাজের কথা বলে তাকে অফিসে ডাকেন। কিছুক্ষণ পর অন্য রুম থেকে আসেন ডনাল্ড। তিনি খুব কাছে এসে দাঁড়ান। তখন এপস্টিন রুমে ঢুকে বলেন, “ও তোমার জন্য না।” 

বিল গেটসের সংসারে ভাঙন

এপস্টিন ফাইলসের ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব হলেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। এই ঘটনার জন্য তার সংসার ভেঙে যায় বলে আলোচনায় উঠে আসছে।

বিল গেটসের প্রাক্তন স্ত্রী মেলিন্ডা গেটস তাদের ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটান ২০২১ সালে। আর এই বিচ্ছেদের পেছনেও নাম জড়িয়েছে এপস্টিনের।

২০২২ সালে সিবিএসে প্রচারিত ভিডিও স্বাক্ষাৎকারে মেলিন্ডা বলেন, বিল গেটস ও এপস্টিনের ঘনিষ্ঠতার কারণেই ছাড়াছাড়ি হয়েছে তাদের। এপস্টিনকে ভয়ংকর, অশুভ ও বিপজ্জনক লোক হিসেবে আখ্যায়িত করেন মেলিন্ডা। 

সম্প্রতিক অগ্রগতি

জেফরি এপস্টিনের কেলেঙ্কারি নিয়ে চাপের মুখে মার্কিন সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, এতে অন্ধকার জগতের গোপন সব তথ্য এখন জনসমক্ষে আসতে শুরু করেছে। 

গত ৩০এ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস জেফরি এপস্টিন সম্পর্কিত ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথি, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি, ২ হাজার ভিডিও প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে এপস্টিন সম্পর্কিত সব নথি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।

আর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার ছয় সপ্তাহ পর সর্বশেষ নথিগুলো জনসমক্ষে এলো। 

জাস্টিজ ডিপার্টমেন্ট বলছে, ভূক্তভোগীদের পরিচয় গোপন রেখে এবং ধাপে ধাপে প্রকাশ করতে গিয়েই সময় বেশি লেগেছে। 

এর আগেও বিভিন্ন সময়ে কয়েক দফায় প্রকাশিত হয়েছে এপস্টিন সম্পর্কিত নথি। 

২০২৫ সালের ১৯এ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ‘এপিস্টিন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি এ্যাক্ট’ বিলে সই করেন। এর ফলে জেফরি এপস্টিন ও তার চক্রের বিরুদ্ধে ফেডারেল তদন্তের সমস্ত নথি প্রকাশ করার জন্য মার্কিন বিচার বিভাগ আইনিভাবে বাধ্য হয়।

এতে কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির মুখোশ উন্মোচন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই

এপস্টিন ফাইলসের মূল নথিগুলো সামনে আসে ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রের করা মানহানির মামলার মাধ্যমে। ওই মামলা হয়েছিল- এপস্টিনের সহযোগী গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে।

মামলায় জমা হওয়া সাক্ষ্য, জবানবন্দি, ইমেইল ও ব্যক্তিগত নথি আদালতের নির্দেশে বহু বছর গোপন রাখা হয়। কিন্তু ২০১৯ সালে এপস্টিনের মৃত্যুর পর সংবাদমাধ্যম ও ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা নথি উন্মুক্ত করে দিতে আদালতের কাছে আবেদন করেন।

আবেদনে তারা বলেন, যেহেতু এপস্টিন আর জীবিত নন, তাই তার গোপনীয়তা রক্ষা করার কোনো কারণ নেই। জনগণের জানার অধিকার থাকায় নথিগুলো প্রকাশ করা হোক।

বছরের পর বছর আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে একজন ফেডারেল বিচারক নির্দেশ দেন যে, এসব নথির বহু অংশ প্রকাশ করা যাবে। এরপর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জনসমক্ষে আসে এপস্টিনের যোগাযোগ, সফর এবং তার যৌন পাচারচক্রে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য।

অজানা তথ্য সামনে আসতেই ২০২৫ সালে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয় এপস্টিন ক্লায়েন্ট লিস্ট নিয়ে। প্রথমে তালিকা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু পরে তা অস্বীকার করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে।

ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন তোলেন- নামগুলো প্রকাশ করতে কেন ভয় পাচ্ছে সরকার? তাহলে কি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম আছে সেখানে? 

এসব প্রশ্ন আরও উসকে দেয় এপস্টিনের সেলের ভিডিও ফুটেজ গায়েব হওয়া এবং কারারক্ষীদের দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা। ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের নাম ফাঁস হওয়ার ভয়েই কি  তাকে খুন করা হয়েছিল? প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

তবুও এই ঘটনা বিশ্বের সামনে উন্মোচন করেছে ক্ষমতা, অর্থ ও ন্যায়বিচারের প্রকৃত মুখ। এপস্টিনের সহযোগী গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের সাজা এবং সাম্প্রতিক এপস্টিন ফাইলসের উন্মোচন- ভুক্তভোগীদের দিয়েছে নতুন আশার আলো। তারা এখনো লড়ে যাচ্ছেন- ন্যায়বিচার, সত্য আর নিজেদের সম্মানের জন্য।

এপস্টিন ফাইলস- ক্ষমতার অন্ধকার দুনিয়া। এক নথি, যা কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো বিশ্ব। আর মনে করিয়ে দিয়েছে- সত্যকে চুপ করানো যায় না।