বিদ্রোহ সমাচার: বিএনপি ‘রস’ নামায়, ‘জাউ’ খাবে জামায়াত

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীরা শুধু আসনভিত্তিক ক্ষতির ঝুঁকিই নয়, বরং বিএনপির দলীয় নিয়ন্ত্রণ, সমন্বয় ও ভোট ধরে রাখার সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:১৭ পিএম

‘বিএনপির প্রার্থী রস নামাইতিছে, আর জামাতের প্রার্থী জাউ রাইন্ধা খাবে’। 

বাগেরহাট-২ নির্বাচনি আসনে বিএনপির একজন উপজেলা পর্যায়ের কর্মী অনেকটা হতাশার সুরে কথাগুলো বলছিলেন আমাকে। 

শীতকালে গভীর রাতে খেজুর গাছ থেকে রস পেড়ে এনে সেটা দিয়ে পায়েস রেঁধে খাওয়া ওই এলাকায় একটা উৎসবের মত ব্যাপার। এই পায়েসকে বাগেরহাটের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘রসের জাউ’। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ব্যক্তি যদিও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী বিএনপির শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেনের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, কিন্তু তিনি মনে করছেন এই আসনে এবার জয় পাবেন জামায়াতে ইসলামীর মঞ্জুরুল হক রাহাদ। 

এটা যদি হয়, তাহলে বাগেরহাটে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে যাবে - স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মত এই আসনে একজন জামায়াতের এমপি নির্বাচিত হবেন। 

অনেক বিশ্লেষকেরই ধারণা, বাংলাদেশের অনেক আসনেই এবার এমন ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটবে। 

একটা সাধারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ত্রিশ-বত্রিশটির বেশি আসন পাবে না জামায়াত। 

যদিও বিএনপিরই একটি অভ্যন্তরীন হিসেবের কথা অনেক বিএনপি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির মুখে শুনেছি আমি, যেখানে ১২ই ফেব্রুুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতের প্রাপ্ত আসনসংখ্যা হবে অন্তত ৭০টি। 

কিন্তু বিগত তিন-চারদিন ভোটের মাঠে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করে বসতে পারে - এমন সম্ভাবনাও অনেকেই এখন আর উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

তারেক রহমান বাংলাদেশে আসার পর বিএনপিতে যে জোয়ার দেখা গিয়েছিল, অনেকেই বলছেন সেই জোয়ার এখন ঘুরে গেছে জামায়াতের দিকে। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীতে একটি জনসভায় যোগ দিয়ে খোদ জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানও তার বক্তব্যে বলেছেন, “জোয়ার এখন জামায়াতের দিকে”।

মঙ্গলবার রাতে ঢাকার এমন একজন নারী সাংবাদিকের সাথে আমার টেলিফোনে কথা হয়েছে, যিনি বহু বছর ধরে বিএনপির পক্ষে সরব। বিএনপির নেতৃস্থানীয় কেউ না হওয়া সত্বেও আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপির প্রতি প্রকাশ্য পক্ষপাত তাকে বিভিন্ন সময়ে বিপদে ফেলেছে। বিএনপির নীতি নির্ধারক পর্যায়েও তার ভালো যোগাযোগ আছে। এমনকি নির্বাচন সামনে রেখে নিজ অবস্থানে থেকে তিনি নিরলসভাবে ধানের শীষের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।

তিনি টেলিফোন আলাপে আমার কাছে তার হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি আমাকে বলেন, ‘বিএনপি এসব কী করছে? তারাতো জামায়াতের কাছে হেরে বসে আছে’? 

তিনি বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে জামায়াত লাভবান হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরো প্রশ্ন তোলেন, ‘তারেক রহমান কেন দলের বিদ্রোহ দমন করতে পারছেন না?’ 

তিনি আমাকে এসব কথা বলেন পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে। 

জামায়াত ইসলামি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে ব্যাপক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আসবে আশঙ্কা করে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সেই বাংলাদেশে আমরা কী করে থাকবো?’ 

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে তিনশোটি আসনের মধ্যে অন্তত ৭৯টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। 

এই আসনগুলোতে বিদ্রোহী হিসেবে এমপি প্রার্থী হওয়া ৯২ জনের অনেকেই দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ ও তৃণমূলভিত্তি থাকা নেতা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিদ্রোহ শুধু আসনভিত্তিক ক্ষতির ঝুঁকিই নয়, বরং বিএনপির দলীয় নিয়ন্ত্রণ, সমন্বয় ও ভোট ধরে রাখার সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

‘সিলভার সেলিম’-এর অভাবনীয় কাণ্ড

বাগেরহাটে বিদ্রোহী প্রার্থী এমএএইচ সেলিমের প্রচারণা

বাংলাদেশে বড় দলের প্রধানদের একাধিক আসনে নির্বাচন করার নজির রয়েছে। খালেদা জিয়া একাধিকবার নির্বাচনে ৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৫টিতেই জয় পেয়েছিলেন। শেখ হাসিনাকেও দেখা গেছে জাতীয় নির্বাচনে একাধিক আসন থেকে এমপি প্রার্থী হতে। 

খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান এবার দলীয় নেতৃত্বে আসার পর অবশ্য মাত্র দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এই নির্বাচনে আর কোনও দলীয় প্রধান একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না।

কিন্তু এই নির্বাচনে তারেক রহমানের চাইতেও বেশি সংখ্যক আসন থেকে একযোগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। 

তার নাম এমএএইচ সেলিম। অনেকেই তাকে চেনেন ‘সিলভার সেলিম’ নামে। সিলভার লাইন গ্রুপ নামে একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর প্রধান তিনি। ঢাকার গুলশান-১ চত্বরে সিলভার টাওয়ার নামে বহুতল বাণিজ্যিক ভবনটি তার প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন। 

এবারের নির্বাচনে অংশ নেয়া ধণাঢ্য প্রার্থীদের মধ্যে শীর্ষ দশে আছেন এমএএইচ সেলিম। 

তিনি বাগেরহাট জেলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।

তিনি জীবনে প্রথম নির্বাচন করেন বিএনপির হয়ে। ২০০১ সালে তিনি বাগেরহাট-২ আসন থেকে প্রথমবার নির্বাচন করেই এমপি হয়ে গিয়েছিলেন। সেসময় তারেক রহমানের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল বলেও অনেকে মনে করেন।

একসময় বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতিও ছিলেন তিনি। 

ওয়ান ইলেভেনের পট পরিবর্তনের পরপর তিনি গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান। বাগেরহাট জেলা বিএনপির দায়িত্ব তিনি তুলে দেন ছোট ভাই এমএ সালামের হাতে। 

যদিও ২০০৮ সালে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি, কিন্তু সেবার বিএনপির সাথে সাথে তারও ভরাডুবি হয়।

আওয়ামী লীগের পুরো শাসনামল জুড়েই বাগেরহাটে বিএনপির রাজনীতি মূলত টিকে ছিল এই পরিবারটির হাত ধরেই। ২০১৮ সালের যে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি সেখানে বাগেরহাট-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন এমএ সালাম। 

কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেলিম বা সালাম - কোনও ভাইকেই মনোনয়ন দেয়নি বিএনপি। 

তার বদলে বিএনপি বেছে নেয় দলে এর আগে অনেকটাই অপরিচিত মুখ শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে। তিনি একজন ব্যারিস্টার ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। 

কিছুদিন আগে নির্বাচন কমিশন বাগেরহাট জেলার চারটি আসন ভেঙে তিনটি করার সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে বাগেরহাটের চারটি আসনই বহাল থাকে।

স্থানীয় বিএনপি নেতারা অনেকেই মনে করেন, আদালতের এই রায় পাওয়ায় ভূমিকা রাখার পুরস্কার হিসেবেই শেখ মোহাম্মদ জাকিরকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। 

এ নিয়ে জেলা বিএনপির সিনিয়র অনেক নেতাই মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। দলের অখণ্ডতা রক্ষায় তারা প্রকাশ্য বিদ্রোহ না করলেও তাদের প্রচার প্রচারণায় এক ধরণের ঢিলেঢালা ভাব আছে।

মনোনয়ন না পাওয়া নিয়ে এমএ সালাম প্রকাশ্যে ক্ষোভ না দেখালেও প্রথম দিকে নির্বাচনি প্রচারণা থেকে নিজেকে দূরেই রেখেছিলেন তিনি। এমনকি শেখ মোহাম্মদ জাকিরের কোন নির্বাচনি জনসভায় গত রবিবারের আগে তাকে দেখা যায়নি। 

আর এমএএইচ সেলিমতো প্রকাশ্যেই বিদ্রোহ করে বসেছেন। তিনি বাগেরহাট ১, ২ ও ৩ - তিনটি আসন থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।

সম্প্রতি আমি বাগেরহাটে গিয়েছিলাম নির্বাচনি প্রচারণা দেখতে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে ধণাঢ্য প্রার্থী এমএএইচ সেলিমের প্রচারণাই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। 

তিনি সদর আসন থেকে লড়ছেন ঘোড়া প্রতীক নিয়ে। শহরজুড়ে ঘোড়ার ব্যাপক প্রচারণা চলছে। 

একটি সূত্র জানাচ্ছে, ঢাকায় সিলভার লাইন গ্রুপের যত কর্মী আছে তারা সবাই এখন বাগেরহাটে অবস্থান করছেন ঘোড়া মার্কার প্রচারণার জন্য। 

এমনকি বাগেরহাট শহরে কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ নারীকেও দেখা গেছে ভাঙা বাংলায় ঘোড়া মার্কার প্রচারণা চালাতে এবং লিফলেট বিতরণ করতে। ধারণা আছে এদেরকে এমএএইচ সেলিম বিদেশ থেকে আনিয়েছেন প্রচারণায় সাহায্য করার জন্য।

যদিও দেখা যাচ্ছে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে ধানের শীষের জন্য কাজ করছেন, কিন্তু বাগেরহাটের সাংবাদিক ইনজামামুল হক আমাকে বলেছেন, বিএনপি নেতারা দিনের বেলা ধানের শীষের জন্য কাজ করলেও অনেকেই রাতের বেলা গিয়ে ধরণা দিচ্ছেন এমএএইচ সেলিমের বাগেরহাট শহরের বাড়ি মেহেদি কুঞ্জে।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য মনিরুল ইসলাম খান এই বক্তব্যকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের করা ‘জিয়া চ‍্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা’র একজন আসামী এবং দীর্ঘ কারাবাসে ছিলেন। তিনি নিজেও একজন মনোনয়নপ্রত্যাশি ছিলেন। কিন্তু মনোনয়ন না পেয়ে দলীয় প্রার্থীকে জেতানোর জন্য এখন কাজ করছেন। 

বাগেরহাটে প্রচারণা চালাচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এমএএইচ সেলিম

তিনি মনে করেন, ধানের শীষের প্রার্থীই এখানে বিজয়ী হবেন। শেষ পর্যন্ত হয়তো ‘সেলিম সাহেব ভুল বুঝতে পেরে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন’ - মনিরুল ইসলাম খানের আশা। 

কচুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরদার জাহিদ আমাকে একটি কাগজ দেখান, সেখানে একটি হিসেব লেখা - বাগেরহাট-২ আসনে ধানের শীষ ৪০ শতাংশের মতো ভোট পাবে, জামায়াতের ভোট ৩০ শতাংশের বেশি নয় আর এমএইচ সেলিম খুব বেশি ভোট পাবেন না। বাগেরহাট সদর আসনে অবশ্য ইসলামি আন্দোলনের হাত পাখা মার্কার প্রার্থী শেখ আতিয়ার রহমানও জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন। 

গত সোমবার হাটবারের দিন দেখা গেল তিনি হাটের মধ্যে দলবল নিয়ে হ্যান্ডবিল বিতরণ করছেন। তার সাথে রয়েছে জ্যাকেট পরা কয়েকজন বডিগার্ড। তাদের জ্যাকেটের পেছনে লেখা ‘ইএএসএফ’।

বাগেরহাটের সাংবাদিক ইনজামাম অবশ্য কচুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতির সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। তার হিসেবে, এমএএইচ সেলিম বেশ ভাল রকম ভোটই টানবেন। এর ফলে হয়তো জামায়াত প্রার্থী মঞ্জুরুল হক রাহাদ জিতে যেতে পারেন। 

“বিদ্রোহের কারণে ধানের শীষের প্রার্থী এখানে তৃতীয় হয়ে বসতে পারেন।” 

তিনটি আসনের মধ্যে সেলিম অন্তত একটিতে জিতে বেরিয়ে আসতে পারেন - এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না ইনজামামুল।

বাগেরহাট বিএনপির অনেক নেতাই আশা করছিলেন, তারেক রহমান গত সোমবার খুলনার জনসভায় এই ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দেবেন। 

তবে তিনি খালিশপুরের জনসভায় বাগেরহাটের ধানের শীষের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিলেও বিদ্রোহী প্রার্থীর ব্যাপারে কিছু বলেননি, তার প্রতি কোন আহ্বানও জানাননি।

বাগেরহাট সদর আসনের এই বিদ্রোহী প্রার্থীর বিষয়টি নিয়ে চিন্তা রয়েছে বিএনপির কেন্দ্রেও। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. সাইমুম পারভেজ বলছেন, “সামগ্রিকভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন তিনি"।

 “তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবেই তিনি এটা করছেন”, আলাপকে বলেন ড. সাইমুম পারভেজ।

রুমিন ফারহানার  কাছে ‘জামানত হারাবেন’ বিএনপি জোট প্রার্থী

ম‍্যাজিস্ট্রেটের সাথে বিতণ্ডায় জড়িয়ে ভাইরাল হয়েছিলেন রুমিন ফারহানা

এবারের নির্বাচনে সবচাইতে আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থীটির নাম রুমিন ফারহানা।

রুমিন ফারহানা ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনয়নে একজন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ছিলেন। 

শেখ হাসিনার শাসনামলের পুরোটা সময় জুড়ে বিএনপির যে ক’জন নেতা সরব আন্দোলন করেছেন, তাদের একজন রুমিন ফারহানা। তিনি এসময়ে বিএনপির কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিলেন। 

সেই মানুষটিকে যখন এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়নি বিএনপি তখন অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। 

অবশ্য বিএনপির যুক্তি হচ্ছে, রুমিন ফারহানার আসন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২কে জোটের শরিকদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। 

কিন্তু রুমিন বিদ্রোহ করেছেন। তিনি সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। 

তিনি শুধু প্রার্থীই হননি, এই আসনে তার জোরালো ও সরব উপস্থিতি পুরো বাংলাদেশের নজর কেড়েছে।

তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত এই আসনে তিন শতাধিক উঠোন বৈঠক ও জনসভা করেছেন রুমিন ফারহানা।

নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হওয়ার আগে গত ১৭ই জানুয়ারি একটি উঠোন বৈঠককে কেন্দ্র করে একজন ম্যাজিস্ট্রেট আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনলে রুমিন ফারহানার সাথে তার বিতণ্ডা হয়। 

ওই বিতণ্ডার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে তা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়। এজন্য রুমিন ফারহানাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয়া হয়েছিলো। 

কিন্তু এসব কোন কিছু দমাতে পারেনি রুমিন ফারহানাকে। এমনকি দল থেকে বহিস্কারের সিদ্ধান্তেও তিনি পেছপা হননি। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংবাদিক মাসুক হৃদয় বলছেন, রুমিন ফারহানা সরাইলের একজন প্রখ্যাত ভাষা সৈনিক অলি আহাদের সন্তান। এলাকায় তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা। অন্যদিকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে ওলামা পরিষদ নেতা জুনাইদ আল হাবিব লড়ছেন খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান না। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক- এই সুবাদে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। 

মাসুক হৃদয় বলছেন, স্থানীয় না হওয়ায় জুনাইদ আল হাবিবকে এখানকার মানুষ গ্রহণ করতে চাইছে না। 

অন্যদিকে রুমিন ফারহানা এলাকায় সবার কাছে এমন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছেন যে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খেজুর গাছ প্রতীকের প্রার্থী এখানে ‘জামানত হারাবেন’ বলে মাসুক হৃদয় ধারণা করছেন।

এই আসনে জামায়াত জোটের শরিক এনসিপিরও একজন প্রার্থী রয়েছেন। তবে তিনিও স্থানীয় নন। 

এনসিপি প্রার্থী আশরাফ উদ্দিনের নানা মুফতি ফজলুল হক আমিনী ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা। 

তিনি বিএনপির এমপি ছিলেন। তিনি ‘নারী নেতৃত্ব’ হারাম বলে একবার খুব আলোচনায় এসেছিলেন। এবং এর পরবর্তীতে তিনি খালেদা জিয়ার অধীনে ধানের শীষের হয়ে নির্বাচন করে জয় পেয়েছিলেন। 

তার সূত্রে আশরাফ উদ্দিনের নানাবাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সাংবাদিক মাসুক হৃদয়ের বক্তব্য, তিনিও স্থানীয় না হওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ তাকে ‘পাত্তা দেবে না’।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানার জয় অনেকটাই সুনিশ্চিত, যা বিএনপির জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে। 

স্থানীয় বিএনপির বেশিরভাগ নেতাই রুমিন ফারহানার পক্ষে কাজ করছেন। এটা ঠেকাতে বিএনপির তরফ থেকে জেলা পর্যায়ের পঞ্চাশের বেশি নেতাকে বহিস্কার করা হয়েছে এবং একটি কমিটি ভেঙে দেয়া হয়েছে। 

তারপরও তাদেরকে রুমিন ফারহানার পক্ষে কাজ করানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি কেন্দ্রীয় বিএনপি।

আরো যারা চিন্তার কারণ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রুমিন ফারহানা কিংবা বাগেরহাটের এমএএইচ সেলিম ছাড়াও এই নির্বাচনে বিএনপির যেসব নেতা দলের গলার কাঁটা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখ করার মত আছেন: 

পটুয়াখালী-৩: হাসান মামুন, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন একসময়; 

ঝিনাইদহ-৪: সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ; 

কুমিল্লা-৪: বিএনপির সাবেক এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী;

কিশোরগঞ্জ-১: রেজাউল করিম খান চুন্নু; 

কিশোরগঞ্জ-৫: মুজিবুর রহমান ইকবাল; 

হবিগঞ্জ-১: বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজা মিয়া;

ঢাকা-১৩: প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। এখন অবশ্য তিনি ধানের শীষের প্রার্থী ববি হাজ্জাকে সমর্থন দিচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে।

ঢাকা-১৫: বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান। তবে তিনিও এখন বিএনপি জোটের প্রার্থীর হয়ে জনসংযোগ করছেন বলে জানা যাচ্ছে 

পাবনা-৪: জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু।

শেরপুর-১ জেলা: বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম মাসুদ। 

এর বাইরে দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করায় নড়াইল বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম, টাঙ্গাইলের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল এবং চান্দিনা উপজেলার সভাপতি আতিকুল আলম শাওনসহ ৫৯ জনকে গত ২১এ জানুয়ারি বহিস্কার করে বিএনপি।

বিদ্রোহীরা ‘ভোগাবে’?

নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে এবং বিএনপি শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে কি না সে প্রশ্নের উত্তর ভোটগ্রহণের মাত্র কয়েকদিন আগে এসেও মিলছে না।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বড় দল হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনি অভিজ্ঞতা বিদ্রোহ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে একইসঙ্গে তারা সতর্ক করে দিচ্ছেন, তৃণমূলভিত্তিক ও পরিচিতমুখের বিদ্রোহীরা ভোটার বিভক্তি তৈরি করলে কিছু আসনে অপ্রত্যাশিত ফলও দেখা যেতে পারে।

এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত বিএনপির জন্য ‘ম্যানেজেবল সংকট’ নাকি বড় রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হবে, তা নির্ভর করছে দলটির শেষ মুহূর্তের কৌশল ও সমঝোতার সক্ষমতার ওপর।

রাজনীতি পর্যবেক্ষক রেজাউল করিম রনি মনে করছেন বিএনপি সবদিক দিয়েই চাপে আছে তবে এই চাপ বিএনপির কাটিয়ে ওঠার সামর্থ্য আছে।

বিদ্রোহীদের মধ্যে যারা জয় পাবে তাদেরও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হবে মত দিয়ে রেজাউল করিম রনি বলেন, “কেউ জয় পেয়ে বিএনপিকে উৎসর্গও করতে পারে।” 

আর যারা পরাজিত হবে দ্বিগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভ কিবরিয়া মনে করেন, এই বিদ্রোহীরা বিএনপিকে কিছুটা বিপাকে ফেলবে। কিন্তু সেটা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা রয়েছে তাদের। 

“বিএনপি বড় দল, তারা প্রায় তিনশ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। বিপরীতে সত্তরটার মতো আসনে বিদ্রোহীরা দাঁড়িয়েছে। সেটা খুব বড় সংখ্যা নয়,” বলেন শুভ কিবরিয়া।

তবে দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলছেন, বিদ্রোহীরা বিএনপিকে “প্রচণ্ড ভোগাবে”।

এজন্য দল পরাজিত না হলেও সালাহউদ্দিন বাবর বলছেন, বিএনপি “ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

“জামায়াত এবং বিএনপির ক্ল্যাশে ৩৫টা আসন আওয়ামী লীগ জিতেছিলো। এইখানে এরকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে।”

বিএনপির এই বিদ্রোহের ফল জামায়াতের ঘরে যাবে কি না এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন বাবর বলছেন, “বলতে পারব না, তবে এনসিপি কিছু শেয়ার করবে।”

ডেডলাইন ৫ই ফেব্রুয়ারি

গত ২রা ফেব্রুয়ারি কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদনে বিএনপির হাইকমান্ডের বরাত দিয়ে লেখা হয়, ৫ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেসব বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে না আসবেন তাদের জন্য বিএনপির দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। 

গত কয়েকদিনে বেশ কিছু বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনের প্রচারণা থেকে সরে এসে দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন এমন খবর বের হলেও এখন পর্যন্ত মাঠ ছাড়েননি যারা তাদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। 

এদের মধ্যে এই প্রতিবেদনের শুরুতেই উল্লেখ করা এমএএইচ সেলিম এবং রুমিন ফারহানাও রয়েছেন।

অবশ্য এটাকে বড় কোন সমস্যা হিসেবে দেখছেন না বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি। তার ভাষায় বিদ্রোহীরা “হালে পানি পাবে না।” 

“এটা কোন বড় সমস্যা না।”

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. সাইমুম পারভেজ বলছেন, “আমরা আশা করছি এবং তাদের সাথে আমাদের কথাবার্তাও হচ্ছে যে তারা শিগগিরই আমাদের যে দলীয় প্রার্থী রয়েছে তাদের জন্যেই কাজ করবেন।”

তারপরেও “যদি কেউ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন এবং দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধাচারণ করেন এবং সেটা যদি নির্বাচন পর্যন্ত তারা চালিয়ে যেতে চান তাহলে কিন্তু তাদের জন্য ভবিষ্যতে রাজনীতি করা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।”

এতকিছুর পরেও  যারা বিদ্রোহী হিসেবে রয়ে যাবেন এবং তাদের দুএকজন যদি জিতেও যান, সাইমুম পারভেজ মনে করেন, সেটা “সামগ্রিক বিচারে ফলাফলে বড় ধরণের কোন পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারবে না এবং এটি নগণ্য কিছু হয়ত প্রভাব পড়তে পারে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভ কিবরিয়ার ধারণা, বিএনপি হয়তো শেষ পর্যন্ত “কিছু প্রার্থীকে বোঝাতে পারবে সরে দাঁড়ানোর জন্য।”

কিন্তু সেটা কবে?

এই প্রতিবেদন যখন লিখছি তখন ভোট গ্রহণের বাকি আছে আর মোটে ছয় দিন। 

সরাইলে বৃহস্পতিবার বিকেলে রুমিন ফারহানা একটি বড়সড় জনসভায় যোগ দেবেন বলে কথা রয়েছে।

মনে করা হচ্ছে বৃহস্পতিবারের এই জনসভাটি রুমিন ফারহানার যোগ দেয়া শ’তিনেক জনসভার মধ্যে সবচাইতে বড় হতে যাচ্ছে। 

আর এমএএইচ সেলিমও প্রতিদিনই জোরদার করছেন তার প্রচারণা। বাগেরহাটের সাংবাদিক ইনাজামামুল হক আমাকে জানিয়েছেন, এমএএইচ সেলিম এরইমধ্যে প্রচারণার জন্য তিন শতাধিক মোটরসাইকেল কিনেছেন। সাবিনা ইয়াসমিনের মতো প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পীকেও তিনি বাগেরহাটে নিয়ে আসতে যাচ্ছেন প্রচারণার জন্য, এমন খবরও ওই এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

এসব কারণে বাগেরহাটে যদি ধানের শীষের প্রার্থী হেরেই বসেন, তাহলে এটা নিশ্চিত যে, নির্বাচন কমিশনের আসন ভেঙে দেয়া ঠেকানোর মাধ্যমে যে ‘রস নামিয়েছিলেন’ বিএনপির প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন, সেই ‘রসের জাউ’ শেষ পর্যন্ত জামায়াতের প্রার্থী মঞ্জুরুল হক রাহাদের প্লেটেই উঠতে যাচ্ছে।