বিশ্ব যখন পুড়ছে, ভারত তুলনামূলক ঠান্ডা: স্বস্তির আড়ালে কি বড় বিপদ
বিশ্বের অন্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় ভারতে তাপমাত্রা বাড়ছে কম। কিন্তু এই ‘ঠান্ডা’ থাকার পেছনে যে কারণগুলো কাজ করছে, সেগুলোই হয়তো ভবিষ্যতের বিপদের ইঙ্গিত।
আলাপ ডেস্ক
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএমআপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড্যানিয়েল শ্র্যাগ ২০২৫ সালের মার্চে দিল্লিতে যান একটি জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে। ভারতের রাজধানীতে তাপমাত্রা তখন ছিলো ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে তাপমাত্রা ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে, যা শ্র্যাগের ভাষায় ছিলো ‘‘পাগল হওয়ার মতো গরম।’’ সেই সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে শ্র্যাগ বলেছিলেন, ভারতে অনেক গরম হলেও ২০২৫ সালে তাপমাত্রা যতটা বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছিলো ততটা বাড়েনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র পিএলওএস ক্লাইমেট জানাচ্ছে, অন্যান্য দেশের চেয়ে ভারতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব কম। তারা বলছে, ভারতের তাপমাত্রা সাধারণত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকে। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ভারতের গড় তাপমাত্রা শুন্য দশমিক নয় ডিগ্রিরও কম পরিমাণে বেড়েছে বা কমেছে। অন্যদিকে, নাসা বলছে, গেল ৫০ বছরের কিছুটা কম সময়ে সারাবিশ্বের তাপমাত্রা গড়ে এক দশমিক চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।
১৯৮০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রার পরিবর্তন দেখাতে নাসা একটি ম্যাপ প্রকাশ করেছে।
ম্যাপে দেখা যায়, গত অর্ধশতাব্দীতে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ অঞ্চলে তাপমাত্রা ১ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে থাকলেও, একই সময়ে ভারতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি হয়েছে শুন্য দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম।
যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক গবেষক ড. বেনজামিন কুক বিবিসিকে বলেন, “এই সময়ে ভারতে উষ্ণায়নের পরিমাণ খুবই কম ছিলো, বা প্রায় ছিলোও না বলা যায়।”
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত এক শ্বেতপত্রে এই বিষয়টিকে ‘ওয়ার্মিং হোল’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, উষ্ণায়ন বেড়ে চলা অঞ্চলগুলোর মধ্যে এমন একটি ‘গর্ত’, যেখানে তাপমাত্রা বাড়ছে না। সেখানে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তরাঞ্চলে স্বল্প পরিমাণে উষ্ণায়ন এবং কিছু ক্ষেত্রে তাপমাত্রা কমার কারণে এই প্রভাব পড়ছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব ভারতে কম থাকার কারণটা কেউ সঠিকভাবে না জানলেও, গবেষকরা এ বিষয়ে কয়েকটি তত্ত্ব দিয়েছেন, বলে জানিয়েছে বিবিসি।
কিছু গবেষক বলছেন, ভারতে বর্ষার কারণে এই প্রভাব পড়ে থাকতে পারে। তবে ড. বেনজামিন কুকের মতে, এটা সত্য হলে অন্যান্য ভারী বর্ষার অঞ্চলেও এই প্রভাব দেখা যেতো।
“দক্ষিণপূর্ব এশিয়া কিংবা চীন এসব অঞ্চলেও ভারী বর্ষা হয়। তবে এখানে ভারতের মতো ওয়ার্মিং হোল দেখা যায় না,” বিবিসিকে তিনি বলেন।
ড্যানিয়েল শ্র্যাগ বিবিসিকে বলেন, ভারতে এই ওয়ার্মিং হোল তৈরির কারণ কী, তা নিয়ে আরও অনেক তত্ত্ব আছে। তবে তার কাছে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বের পরিমাণ অল্প।
এর মধ্যে প্রথম তত্ত্বটি হলো কৃষি নিয়ে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬০ এর দশক থেকে ভারতের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক পরিমাণ পানি সেচ করা হয় ধান ও গমের চাষের জন্য। মাটির নিচ থেকে পাম্প দিয়ে পানি তুলে এনে ধান ও গমের ক্ষেতের মাটি ভেজানো হয়। বিবিসি বলছে, মাটির নিচ থেকে টেনে আনা পানি যখন বাষ্পে পরিণত হয়, তখন তা তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়।
“জমির ওপর যত বেশি পানি ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তত বেশি পানি বাষ্পে পরিণত হয়। এর ফলে আর্দ্রতা বেড়ে যায়, যা তাপমাত্রাকে বাড়তে দেয় না,” বিবিসিকে শ্র্যাগ বলেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যে অঞ্চলগুলোতে ভুট্টা চাষ হয় সেখানেও একইরকম ‘ওয়ার্মিং হোল’ দেখা গেছে।
আরেকটি তত্ত্ব বলছে, এর পেছনে আছে ভারতের বায়ুদূষণ। বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যানবাহন ও বিভিন্ন ফ্যাক্টরি থেকে নিষ্কৃত ‘এরোসল’ জাতীয় কণা বায়ুমণ্ডলকে ভারী করে তোলে। এটি আদতে পরিবেশের জন্য খারাপ হলেও, এই কণাগুলো সূর্যের আলোকে আটকে দেয়। বিবিসি বলছে, এই ধরনের দূষণের মধ্যে সূর্যের তাপ আটকে যায় বলে তাপমাত্রা বৃদ্ধিও কমে যায়।
জলবায়ু বিষয়ক গবেষণাকেন্দ্র কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভাইরনমেন্ট এর একটি গবেষণা বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে চীন ব্যাপক হারে এরোসল নির্গমনের হার কমিয়ে আনায় সেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারও বাড়ছে।
হার্ভার্ডের শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ভারতের ওয়ার্মিং হোলের পেছনের কারণ আলাদাভাবে কৃষিক্ষেত্রে সেচ কিংবা বায়ুদূষণ না, বরং সম্মিলিত প্রভাবের কারণে হয়ে থাকতে পারে। ড্যানিয়েল শ্র্যাগ বলছেন, “আপাতত যেটুকু তথ্য আমাদের কাছে আছে, তার ভিত্তিতে আমি মনে করি, এই দু’টি বিষয়ই ভারতে তাপমাত্রা তুলনামূলক ভাবে কম বাড়ার পেছনে অবদান রাখছে।”
আরও তত্ত্ব আছে। সম্প্রতি নেচার কমিউনিকেশনসে চীনা গবেষকদের বরাতে একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ভারতের ওয়ার্মিং হোলের পেছনে কার্বন ডাই অক্সাইডের হাত থাকতে পারে। বেইজিংয়ে চাইনিজ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের ড. শিয়া ছু বলেন, “গবেষণার ফল দেখার পর আমরা নিজেরাও বিস্মিত হয়েছিলাম।”
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণে হিমালয়ের ওপর ঘন মেঘ সৃষ্টি হয়। দূষণের মতো, এসব মেঘও সূর্যের আলোকে আটকে দেয়, এবং তাপের প্রভাব কমিয়ে দেয়। ড. বেনজামিন কুক বিবিসিকে বলেন, “কার্বন ডাই অক্সাইডের যেই ভূমিকা রাখে, তার প্রভাব এই মেঘ সৃষ্টি দিয়ে কমানো সম্ভব কিনা তা আমি জানি না।”
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়ার্মিং হোলের পেছনে যেই কারণই থাকুক না কেন, একটি উদ্বেগের বিষয় আছে। বিবিসি বলছে, বিভিন্ন মানবসৃষ্ট বিষয়ের কারণে ভারতের বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আসল প্রভাবটি ঢাকা পড়ছে, এবং এগুলো যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতে শুধু এরোসল নির্গমনের প্রভাবে প্রতি বছর ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এই সংখ্যা কমাতে হলে এরোসল নির্গরম কমানোর জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে দেশটিকে। ওয়ার্মিং হোলের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা ধরছেন কৃষিকাজে মাটির নিচ থেকে টেনে আনা পানিকে। বিবিসি বলছে, মাটির নিচে পানির পরিমাণ ক্রমশ কমে আসছে।
ড্যানিয়েল শ্র্যাগ বলেন, “এই প্রভাবগুলো আগামী ৫০ বছরের মধ্যেই কমে যাবে। এতদিন ধরে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবগুলো প্রশমিত ছিলো, এবং হঠাতই ভারতে বাকি বিশ্বের তুলনায় অনেক দ্রুত তাপমাত্রা বেড়ে যাবে।”
বিবিসি বলছে, ২০২৪ সালে ভারতে হিট স্ট্রোকের কারণে কমপক্ষে ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ড্যানিয়েল শ্র্যাগ বিবিসিকে বলেন, ভারত ও বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এয়ার কন্ডিশনার নেই। পাশাপাশি, তীব্র গরমের মধ্যেও এই অঞ্চলের মানুষ্কে কাজ করতে বের হতে হয়। এসব কারণে, আপাতত ওয়ার্মিং হোলের প্রভাব ইতিবাচক মনে হলেও, এর পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে আরও বিরূপ প্রভাবের শংকা।
বিশ্ব যখন পুড়ছে, ভারত তুলনামূলক ঠান্ডা: স্বস্তির আড়ালে কি বড় বিপদ
বিশ্বের অন্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় ভারতে তাপমাত্রা বাড়ছে কম। কিন্তু এই ‘ঠান্ডা’ থাকার পেছনে যে কারণগুলো কাজ করছে, সেগুলোই হয়তো ভবিষ্যতের বিপদের ইঙ্গিত।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড্যানিয়েল শ্র্যাগ ২০২৫ সালের মার্চে দিল্লিতে যান একটি জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে। ভারতের রাজধানীতে তাপমাত্রা তখন ছিলো ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে তাপমাত্রা ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে, যা শ্র্যাগের ভাষায় ছিলো ‘‘পাগল হওয়ার মতো গরম।’’ সেই সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে শ্র্যাগ বলেছিলেন, ভারতে অনেক গরম হলেও ২০২৫ সালে তাপমাত্রা যতটা বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছিলো ততটা বাড়েনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র পিএলওএস ক্লাইমেট জানাচ্ছে, অন্যান্য দেশের চেয়ে ভারতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব কম। তারা বলছে, ভারতের তাপমাত্রা সাধারণত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকে। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ভারতের গড় তাপমাত্রা শুন্য দশমিক নয় ডিগ্রিরও কম পরিমাণে বেড়েছে বা কমেছে। অন্যদিকে, নাসা বলছে, গেল ৫০ বছরের কিছুটা কম সময়ে সারাবিশ্বের তাপমাত্রা গড়ে এক দশমিক চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।
১৯৮০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রার পরিবর্তন দেখাতে নাসা একটি ম্যাপ প্রকাশ করেছে।
ম্যাপে দেখা যায়, গত অর্ধশতাব্দীতে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ অঞ্চলে তাপমাত্রা ১ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে থাকলেও, একই সময়ে ভারতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি হয়েছে শুন্য দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম।
যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক গবেষক ড. বেনজামিন কুক বিবিসিকে বলেন, “এই সময়ে ভারতে উষ্ণায়নের পরিমাণ খুবই কম ছিলো, বা প্রায় ছিলোও না বলা যায়।”
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত এক শ্বেতপত্রে এই বিষয়টিকে ‘ওয়ার্মিং হোল’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, উষ্ণায়ন বেড়ে চলা অঞ্চলগুলোর মধ্যে এমন একটি ‘গর্ত’, যেখানে তাপমাত্রা বাড়ছে না। সেখানে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তরাঞ্চলে স্বল্প পরিমাণে উষ্ণায়ন এবং কিছু ক্ষেত্রে তাপমাত্রা কমার কারণে এই প্রভাব পড়ছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব ভারতে কম থাকার কারণটা কেউ সঠিকভাবে না জানলেও, গবেষকরা এ বিষয়ে কয়েকটি তত্ত্ব দিয়েছেন, বলে জানিয়েছে বিবিসি।
কিছু গবেষক বলছেন, ভারতে বর্ষার কারণে এই প্রভাব পড়ে থাকতে পারে। তবে ড. বেনজামিন কুকের মতে, এটা সত্য হলে অন্যান্য ভারী বর্ষার অঞ্চলেও এই প্রভাব দেখা যেতো।
“দক্ষিণপূর্ব এশিয়া কিংবা চীন এসব অঞ্চলেও ভারী বর্ষা হয়। তবে এখানে ভারতের মতো ওয়ার্মিং হোল দেখা যায় না,” বিবিসিকে তিনি বলেন।
ড্যানিয়েল শ্র্যাগ বিবিসিকে বলেন, ভারতে এই ওয়ার্মিং হোল তৈরির কারণ কী, তা নিয়ে আরও অনেক তত্ত্ব আছে। তবে তার কাছে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বের পরিমাণ অল্প।
এর মধ্যে প্রথম তত্ত্বটি হলো কৃষি নিয়ে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬০ এর দশক থেকে ভারতের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক পরিমাণ পানি সেচ করা হয় ধান ও গমের চাষের জন্য। মাটির নিচ থেকে পাম্প দিয়ে পানি তুলে এনে ধান ও গমের ক্ষেতের মাটি ভেজানো হয়। বিবিসি বলছে, মাটির নিচ থেকে টেনে আনা পানি যখন বাষ্পে পরিণত হয়, তখন তা তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়।
“জমির ওপর যত বেশি পানি ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তত বেশি পানি বাষ্পে পরিণত হয়। এর ফলে আর্দ্রতা বেড়ে যায়, যা তাপমাত্রাকে বাড়তে দেয় না,” বিবিসিকে শ্র্যাগ বলেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যে অঞ্চলগুলোতে ভুট্টা চাষ হয় সেখানেও একইরকম ‘ওয়ার্মিং হোল’ দেখা গেছে।
আরেকটি তত্ত্ব বলছে, এর পেছনে আছে ভারতের বায়ুদূষণ। বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যানবাহন ও বিভিন্ন ফ্যাক্টরি থেকে নিষ্কৃত ‘এরোসল’ জাতীয় কণা বায়ুমণ্ডলকে ভারী করে তোলে। এটি আদতে পরিবেশের জন্য খারাপ হলেও, এই কণাগুলো সূর্যের আলোকে আটকে দেয়। বিবিসি বলছে, এই ধরনের দূষণের মধ্যে সূর্যের তাপ আটকে যায় বলে তাপমাত্রা বৃদ্ধিও কমে যায়।
জলবায়ু বিষয়ক গবেষণাকেন্দ্র কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভাইরনমেন্ট এর একটি গবেষণা বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে চীন ব্যাপক হারে এরোসল নির্গমনের হার কমিয়ে আনায় সেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারও বাড়ছে।
হার্ভার্ডের শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ভারতের ওয়ার্মিং হোলের পেছনের কারণ আলাদাভাবে কৃষিক্ষেত্রে সেচ কিংবা বায়ুদূষণ না, বরং সম্মিলিত প্রভাবের কারণে হয়ে থাকতে পারে। ড্যানিয়েল শ্র্যাগ বলছেন, “আপাতত যেটুকু তথ্য আমাদের কাছে আছে, তার ভিত্তিতে আমি মনে করি, এই দু’টি বিষয়ই ভারতে তাপমাত্রা তুলনামূলক ভাবে কম বাড়ার পেছনে অবদান রাখছে।”
আরও তত্ত্ব আছে। সম্প্রতি নেচার কমিউনিকেশনসে চীনা গবেষকদের বরাতে একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ভারতের ওয়ার্মিং হোলের পেছনে কার্বন ডাই অক্সাইডের হাত থাকতে পারে। বেইজিংয়ে চাইনিজ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের ড. শিয়া ছু বলেন, “গবেষণার ফল দেখার পর আমরা নিজেরাও বিস্মিত হয়েছিলাম।”
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণে হিমালয়ের ওপর ঘন মেঘ সৃষ্টি হয়। দূষণের মতো, এসব মেঘও সূর্যের আলোকে আটকে দেয়, এবং তাপের প্রভাব কমিয়ে দেয়। ড. বেনজামিন কুক বিবিসিকে বলেন, “কার্বন ডাই অক্সাইডের যেই ভূমিকা রাখে, তার প্রভাব এই মেঘ সৃষ্টি দিয়ে কমানো সম্ভব কিনা তা আমি জানি না।”
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়ার্মিং হোলের পেছনে যেই কারণই থাকুক না কেন, একটি উদ্বেগের বিষয় আছে। বিবিসি বলছে, বিভিন্ন মানবসৃষ্ট বিষয়ের কারণে ভারতের বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আসল প্রভাবটি ঢাকা পড়ছে, এবং এগুলো যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতে শুধু এরোসল নির্গমনের প্রভাবে প্রতি বছর ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এই সংখ্যা কমাতে হলে এরোসল নির্গরম কমানোর জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে দেশটিকে। ওয়ার্মিং হোলের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা ধরছেন কৃষিকাজে মাটির নিচ থেকে টেনে আনা পানিকে। বিবিসি বলছে, মাটির নিচে পানির পরিমাণ ক্রমশ কমে আসছে।
ড্যানিয়েল শ্র্যাগ বলেন, “এই প্রভাবগুলো আগামী ৫০ বছরের মধ্যেই কমে যাবে। এতদিন ধরে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবগুলো প্রশমিত ছিলো, এবং হঠাতই ভারতে বাকি বিশ্বের তুলনায় অনেক দ্রুত তাপমাত্রা বেড়ে যাবে।”
বিবিসি বলছে, ২০২৪ সালে ভারতে হিট স্ট্রোকের কারণে কমপক্ষে ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ড্যানিয়েল শ্র্যাগ বিবিসিকে বলেন, ভারত ও বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এয়ার কন্ডিশনার নেই। পাশাপাশি, তীব্র গরমের মধ্যেও এই অঞ্চলের মানুষ্কে কাজ করতে বের হতে হয়। এসব কারণে, আপাতত ওয়ার্মিং হোলের প্রভাব ইতিবাচক মনে হলেও, এর পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে আরও বিরূপ প্রভাবের শংকা।