ফেসবুকে গান, ঢাবি শিক্ষকের অব্যাহতি: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি পেশাগত সীমা?
ঢাবির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্তের পর প্রশ্ন উঠেছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রকাশ কতটা স্বাধীন, আর কোথায় শুরু হয় পেশাগত সীমারেখা?
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০৭:৩৩ পিএমআপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ০৭:৩৩ পিএম
মাহাদী হাসান
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গেয়ে আলোচনায় আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে সাময়িকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন, পিএইচডি থিসিস নিয়ে প্রশ্ন এবং সাম্প্রতিক অনলাইন কার্যক্রমসহ একাধিক অভিযোগ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনাটি সামনে আসার পর শিক্ষকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, শিল্পচর্চা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার সীমা কোথায়, এসব প্রশ্ন আবারও আলোচনায় এসেছে।
সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে একজন শিক্ষকের কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?
গণমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, ফেইসবুকে ‘বেসুরো’ গান গাওয়ার জন্য আলোচিত ছিলেন অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিব। তার ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে দেখা যায়, বাংলা ও হিন্দি বিভিন্ন জনপ্রিয় গানের ভিডিও করে আপলোড করেছেন তিনি। সেখানে অনেক তীর্যক কমেন্টও আছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম আলাপকে বলেন, অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবের বিরুদ্ধে কোনো একক অভিযোগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগ, পিএইচডি থিসিস নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্ন এবং বিভাগের একাডেমিক কমিটির অবস্থানসহ একাধিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিন্ডিকেট এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, “একটা হলো ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাপারে কমপ্লেইন্ট, দ্বিতীয় হলো তার পিএইচডি, আর তৃতীয় হলো তার বিভাগের একাডেমিক কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে উপাচার্য স্যারের কাছে চিঠি দিয়েছে যে তারা তার সঙ্গে কাজ করবেন না। কোনোটাই একক কারণ না; সবগুলো মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গাওয়ার বিষয়টি সিদ্ধান্তের কারণ কি না,এমন প্রশ্নে অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, বিষয়টি আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, “গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যেটা বেশি আলোচিত হচ্ছে, যে তিনি গান গাইতেন, শুধু এ কারণে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিষয়টা আসলে তা নয়। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ছিল। সবকিছু মিলেই সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “তার পিএইচডি, ফাইন্যান্সিয়াল করাপশন, গণমাধ্যমে আসা বিষয় সবই আছে।”
তবে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগটি সাম্প্রতিক নয় বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, অনেক আগেই সিন্ডিকেট এ বিষয়ে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি করেছিল। সেই কমিটি কাজ করে রিপোর্ট দিয়েছে। এখন আরেকটি তদন্ত কমিটিও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আছে কি না এমন প্রশ্নে উপ-উপাচার্য জানান, এ বিষয়ে আগে একটি সাধারণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
তবে সেই নীতিমালায় কি আছে তা সুস্পষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের একটা নোটিশ ছিল বেশ আগে। রাষ্ট্র থেকে আসা একটি কমন নির্দেশনা শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন সেটি আমার অফিসে নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বললে হয়তো পাওয়া যেতে পারে।”
অন্যদিকে অভিযোগের ব্যাপারে তাশরিক-ই-হাবিবকে একাধিকবার ফোন ও মেসেজ দেওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রথমত, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক গান গাইতে পারেন কি না। এ ছাড়া কোনো শিক্ষকের শিল্পচর্চা যদি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান কি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
এর আগে ১৮ই জুন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রাথমিকের শিক্ষকদের জন্য সামাজিক যোগাযেগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালা প্রকাশ করেছিল।
সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কটূক্তি, অপপ্রচার এবং আপত্তিকর পোস্টের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা হয়েছিল।
নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন, তাদের চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে বিভাগীয় বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (যেমন- ফেইসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি) এমন কিছু পোস্ট, শেয়ার ও মন্তব্য করছেন, যা এই নির্দেশিকার পরিপন্থী।
এসব আপত্তিকর পোস্টের মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানায় তারা।
শুধু শিক্ষক নয় অন্যান্য পেশাজাবীদের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালা রয়েছে।
২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে অনুসরণীয় নির্দেশনা জারি করেন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।
সেখানে বলা হয়েছিল, অতিমাত্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ফলে এক ধরনের আসক্তি তৈরি হয়। যা ব্যক্তি ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
কোনো কোনো বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা বিচারিক কর্মঘণ্টায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের চেম্বার অথবা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বরত অবস্থায় তোলা ছবি বা ভিডিও আপলোড করাসহ নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা ভঙ্গকারী ছবি পাবলিক পোস্ট হিসেবে আপলোড করছেন, অন্যের আপলোড করা ছবি, ভিডিও বা কন্টেন্ট শেয়ার বা তাতে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য করছেন।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য/শেয়ার করছেন এবং ইউটিউব বা অন্যকোন মাধ্যমে নিজ বা ছদ্মনামে চ্যানেল খুলে ভিডিও আপলোড করাসহ অপ্রয়োজনীয় ও গুরুত্বহীন অনুষ্ঠানের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করছেন। কতিপয় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার এরূপ কর্মকান্ডের ফলে বিচার বিভাগ সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ভাবমূর্তি সৃষ্টি হচ্ছে, যা অপ্রত্যাশিত।
এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার আগেই ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯’ রয়েছে।
এই নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য, ফেইসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানো, জনসচেতনতা তৈরি করা এবং জনবান্ধব প্রশাসন নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন অসত্য তথ্য, অপপ্রচার বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করাও এই নীতিমালার অন্যতম উদ্দেশ্য।
কনটেন্ট প্রকাশের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থী, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে, এমন কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার না করার নির্দেশনা রয়েছে।
একইভাবে কোনো রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করা, লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য করা, অথবা জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে, এমন ভিত্তিহীন বা অসত্য তথ্য প্রচার থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীল আচরণের কথা বলা হয়েছে।
কোনো অপব্যবহার বা ক্ষতিকর কোনো কনটেন্ট প্রকাশের দায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীকেই বহন করতে হবে। নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তিন মাস অন্তর পরিবীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার বাধ্যবাধকতাও দেওয়া হয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ
নৃবিজ্ঞানী জোবায়দা নাসরিন মনে করেন, ফেসবুককে শুধু বিনোদনের জায়গা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, তথ্য আদান-প্রদান, জনপরিসরের বিতর্ক এবং এমনকি সংবাদ অনুসন্ধানেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে কোনো শিক্ষকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যক্রমকে শুধু ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ করার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা ঝুঁকিপূর্ণ।
তার মতে, কারও ব্যক্তিগত প্রকাশভঙ্গি পছন্দ না হলেই সেটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা যায় না। একজন শিক্ষক গান গাইলে বা ফেসবুকে ব্যক্তিগত কনটেন্ট প্রকাশ করলে সেটি তার একাডেমিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো বিষয় কি না, তা সতর্কভাবে বিবেচনা করা দরকার। তিনি মনে করেন, শাস্তিমূলক পদক্ষেপের আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল-তিনি কেন এমন কনটেন্ট প্রকাশ করছেন, তিনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন এবং এর পেছনে কোনো ব্যক্তিগত বা একাডেমিক ব্যাখ্যা আছে কি না, তা জানা দরকার ছিল।
জোবায়দা নাসরিনের ভাষায়, ফেসবুককে কেন্দ্র করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে লক্ষ্য করে বিচারমূলক অবস্থান তৈরি করা বিপজ্জনক। কারণ এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিল্পচর্চা এবং ব্যক্তিগত পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, শিক্ষকতা পেশায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য কিছু নৈতিক ও সামাজিক সীমারেখা থাকা স্বাভাবিক। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়-সব পর্যায়ের শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের কাছে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাই তাদের আচরণ, নৈতিকতা, ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক উপস্থাপন গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, সবকিছু লিখিত আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক রীতি, পেশাগত নর্ম ও কনভেনশন অনুসরণ করতে হয়। একজন শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ করলে, যা পেশার সঙ্গে অসংগত বা ‘আনবিকামিং অব দ্য প্রফেশন’ হিসেবে দেখা যায়, তাহলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নেও তিনি বলেন, স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সীমাহীন নয়। সংবিধানেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই শিক্ষকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু প্রকাশ করার সময় মনে রাখবেন, তা যেন সমাজে বিদ্বেষ, উত্তেজনা, সহিংসতা বা কোনো গোষ্ঠীর অনুভূতিতে আঘাত তৈরি না করে।
এই দুই অবস্থানের মধ্যেই মূল বিতর্কটি স্পষ্ট হয়। একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ ও শিল্পচর্চার জায়গা; অন্যদিকে শিক্ষকতা একটি সামাজিকভাবে সংবেদনশীল ও অনুসরণীয় পেশা। ফলে প্রশ্নটি শুধু একজন শিক্ষক গান গাইতে পারবেন কি না তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, ব্যক্তিস্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের সীমারেখা কোথায় টানা হবে।
ফেসবুকে গান, ঢাবি শিক্ষকের অব্যাহতি: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি পেশাগত সীমা?
ঢাবির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্তের পর প্রশ্ন উঠেছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রকাশ কতটা স্বাধীন, আর কোথায় শুরু হয় পেশাগত সীমারেখা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গেয়ে আলোচনায় আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে সাময়িকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন, পিএইচডি থিসিস নিয়ে প্রশ্ন এবং সাম্প্রতিক অনলাইন কার্যক্রমসহ একাধিক অভিযোগ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনাটি সামনে আসার পর শিক্ষকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, শিল্পচর্চা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার সীমা কোথায়, এসব প্রশ্ন আবারও আলোচনায় এসেছে।
সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে একজন শিক্ষকের কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?
গণমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, ফেইসবুকে ‘বেসুরো’ গান গাওয়ার জন্য আলোচিত ছিলেন অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিব। তার ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে দেখা যায়, বাংলা ও হিন্দি বিভিন্ন জনপ্রিয় গানের ভিডিও করে আপলোড করেছেন তিনি। সেখানে অনেক তীর্যক কমেন্টও আছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম আলাপকে বলেন, অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবের বিরুদ্ধে কোনো একক অভিযোগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগ, পিএইচডি থিসিস নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্ন এবং বিভাগের একাডেমিক কমিটির অবস্থানসহ একাধিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিন্ডিকেট এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, “একটা হলো ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাপারে কমপ্লেইন্ট, দ্বিতীয় হলো তার পিএইচডি, আর তৃতীয় হলো তার বিভাগের একাডেমিক কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে উপাচার্য স্যারের কাছে চিঠি দিয়েছে যে তারা তার সঙ্গে কাজ করবেন না। কোনোটাই একক কারণ না; সবগুলো মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গাওয়ার বিষয়টি সিদ্ধান্তের কারণ কি না,এমন প্রশ্নে অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, বিষয়টি আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, “গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যেটা বেশি আলোচিত হচ্ছে, যে তিনি গান গাইতেন, শুধু এ কারণে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিষয়টা আসলে তা নয়। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ছিল। সবকিছু মিলেই সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “তার পিএইচডি, ফাইন্যান্সিয়াল করাপশন, গণমাধ্যমে আসা বিষয় সবই আছে।”
তবে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগটি সাম্প্রতিক নয় বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, অনেক আগেই সিন্ডিকেট এ বিষয়ে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি করেছিল। সেই কমিটি কাজ করে রিপোর্ট দিয়েছে। এখন আরেকটি তদন্ত কমিটিও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আছে কি না এমন প্রশ্নে উপ-উপাচার্য জানান, এ বিষয়ে আগে একটি সাধারণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
তবে সেই নীতিমালায় কি আছে তা সুস্পষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের একটা নোটিশ ছিল বেশ আগে। রাষ্ট্র থেকে আসা একটি কমন নির্দেশনা শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন সেটি আমার অফিসে নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বললে হয়তো পাওয়া যেতে পারে।”
অন্যদিকে অভিযোগের ব্যাপারে তাশরিক-ই-হাবিবকে একাধিকবার ফোন ও মেসেজ দেওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রথমত, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক গান গাইতে পারেন কি না। এ ছাড়া কোনো শিক্ষকের শিল্পচর্চা যদি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান কি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
এর আগে ১৮ই জুন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রাথমিকের শিক্ষকদের জন্য সামাজিক যোগাযেগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালা প্রকাশ করেছিল।
সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কটূক্তি, অপপ্রচার এবং আপত্তিকর পোস্টের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা হয়েছিল।
নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন, তাদের চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে বিভাগীয় বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (যেমন- ফেইসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি) এমন কিছু পোস্ট, শেয়ার ও মন্তব্য করছেন, যা এই নির্দেশিকার পরিপন্থী।
এসব আপত্তিকর পোস্টের মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানায় তারা।
শুধু শিক্ষক নয় অন্যান্য পেশাজাবীদের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালা রয়েছে।
২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে অনুসরণীয় নির্দেশনা জারি করেন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।
সেখানে বলা হয়েছিল, অতিমাত্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ফলে এক ধরনের আসক্তি তৈরি হয়। যা ব্যক্তি ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
কোনো কোনো বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা বিচারিক কর্মঘণ্টায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের চেম্বার অথবা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বরত অবস্থায় তোলা ছবি বা ভিডিও আপলোড করাসহ নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা ভঙ্গকারী ছবি পাবলিক পোস্ট হিসেবে আপলোড করছেন, অন্যের আপলোড করা ছবি, ভিডিও বা কন্টেন্ট শেয়ার বা তাতে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য করছেন।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য/শেয়ার করছেন এবং ইউটিউব বা অন্যকোন মাধ্যমে নিজ বা ছদ্মনামে চ্যানেল খুলে ভিডিও আপলোড করাসহ অপ্রয়োজনীয় ও গুরুত্বহীন অনুষ্ঠানের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করছেন। কতিপয় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার এরূপ কর্মকান্ডের ফলে বিচার বিভাগ সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ভাবমূর্তি সৃষ্টি হচ্ছে, যা অপ্রত্যাশিত।
এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার আগেই ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯’ রয়েছে।
এই নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য, ফেইসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানো, জনসচেতনতা তৈরি করা এবং জনবান্ধব প্রশাসন নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন অসত্য তথ্য, অপপ্রচার বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করাও এই নীতিমালার অন্যতম উদ্দেশ্য।
কনটেন্ট প্রকাশের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থী, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে, এমন কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার না করার নির্দেশনা রয়েছে।
একইভাবে কোনো রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করা, লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য করা, অথবা জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে, এমন ভিত্তিহীন বা অসত্য তথ্য প্রচার থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীল আচরণের কথা বলা হয়েছে।
কোনো অপব্যবহার বা ক্ষতিকর কোনো কনটেন্ট প্রকাশের দায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীকেই বহন করতে হবে। নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তিন মাস অন্তর পরিবীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার বাধ্যবাধকতাও দেওয়া হয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ
নৃবিজ্ঞানী জোবায়দা নাসরিন মনে করেন, ফেসবুককে শুধু বিনোদনের জায়গা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, তথ্য আদান-প্রদান, জনপরিসরের বিতর্ক এবং এমনকি সংবাদ অনুসন্ধানেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে কোনো শিক্ষকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যক্রমকে শুধু ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ করার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা ঝুঁকিপূর্ণ।
তার মতে, কারও ব্যক্তিগত প্রকাশভঙ্গি পছন্দ না হলেই সেটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা যায় না। একজন শিক্ষক গান গাইলে বা ফেসবুকে ব্যক্তিগত কনটেন্ট প্রকাশ করলে সেটি তার একাডেমিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো বিষয় কি না, তা সতর্কভাবে বিবেচনা করা দরকার। তিনি মনে করেন, শাস্তিমূলক পদক্ষেপের আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল-তিনি কেন এমন কনটেন্ট প্রকাশ করছেন, তিনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন এবং এর পেছনে কোনো ব্যক্তিগত বা একাডেমিক ব্যাখ্যা আছে কি না, তা জানা দরকার ছিল।
জোবায়দা নাসরিনের ভাষায়, ফেসবুককে কেন্দ্র করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে লক্ষ্য করে বিচারমূলক অবস্থান তৈরি করা বিপজ্জনক। কারণ এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিল্পচর্চা এবং ব্যক্তিগত পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, শিক্ষকতা পেশায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য কিছু নৈতিক ও সামাজিক সীমারেখা থাকা স্বাভাবিক। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়-সব পর্যায়ের শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের কাছে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাই তাদের আচরণ, নৈতিকতা, ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক উপস্থাপন গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, সবকিছু লিখিত আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক রীতি, পেশাগত নর্ম ও কনভেনশন অনুসরণ করতে হয়। একজন শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ করলে, যা পেশার সঙ্গে অসংগত বা ‘আনবিকামিং অব দ্য প্রফেশন’ হিসেবে দেখা যায়, তাহলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নেও তিনি বলেন, স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সীমাহীন নয়। সংবিধানেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই শিক্ষকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু প্রকাশ করার সময় মনে রাখবেন, তা যেন সমাজে বিদ্বেষ, উত্তেজনা, সহিংসতা বা কোনো গোষ্ঠীর অনুভূতিতে আঘাত তৈরি না করে।
এই দুই অবস্থানের মধ্যেই মূল বিতর্কটি স্পষ্ট হয়। একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ ও শিল্পচর্চার জায়গা; অন্যদিকে শিক্ষকতা একটি সামাজিকভাবে সংবেদনশীল ও অনুসরণীয় পেশা। ফলে প্রশ্নটি শুধু একজন শিক্ষক গান গাইতে পারবেন কি না তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, ব্যক্তিস্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের সীমারেখা কোথায় টানা হবে।