ঈদযাত্রা কি জ্বালানি সংকটে বাধাগ্রস্ত হবে?

রেশনিংয়ের চাপে দূরপাল্লার বাসগুলোকেও পাম্পে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিছু কোম্পানি দিচ্ছে ট্রিপ বাতিলের সতর্কতা। শেষ মুহূর্তে ভাড়া বাড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন যাত্রীরা।

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম

ঈদে বাড়ি যাওয়ার জন্য আগাম রৌমারির টিকিট কেটেছিলেন রুবেল হোসেন। তবে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে চলমান তেল সংকটে পলি পরিবহন থেকে তাকে গত সপ্তাহে জানানো হয়, “টিকিট নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। টাকা ফেরত নিয়ে যেতে”।

অনেকটা একই অভিজ্ঞতা আইকনিক এক্সপ্রেসে চট্টগ্রাম থেকে বরিশালের টিকিট কাটা আলাউদ্দিন জমাদ্দারের। কোম্পানিটি দিন তিনেক আগে তাদের ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে সাফ জানিয়েছে, বাংলাদেশে যে তেল সংকট সৃষ্টি হয়েছে এতে ‘ট্রিপ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে’।

পরিবহন কোম্পানির এমন অগ্রিম টিকিট বিক্রি বন্ধ বা সীমিত করে রাখায় দ্বিধা আর উদ্বেগের দোলাচলে প্রশ্ন, এবারের ঈদযাত্রা আবার জ্বালানী সংকটে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে না তো?

ইতোমধ্যেই যাত্রীদের অভিযোগ, তেলের সংকটকে অজুহাত বানিয়ে শেষ মুহূর্তে বাড়তি ভাড়া আদায়ের পথ তৈরি করা হচ্ছে।

তবে পরিবহন মালিকদের দাবি, অনিশ্চিত সরবরাহ ও সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিতে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা তাদের জন্যই বড় ঝুঁকি।

সবমিলে প্রতিবারের মতো ঈদযাত্রায় বাস সংকটে টিকিটের দাম আর ভোগান্তি বাড়ার পুরোনো চিত্রের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের সংকটের নতুন এই অনিশ্চয়তা।

যদিও রবিবার থেকে গণপরিবহনের জন্য তেলের রেশনিং শিথিল করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

কিন্তু বাস্তবে শনিবার সকালেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। যা রেশনিংয়ের কারণে তৈরি হওয়া প্যানিক পারচেজ পরিস্থিতির অব্যাহত চিত্র হিসেবেই মনে করা হচ্ছে।

টিকিট বিক্রিতে হঠাৎ ব্রেক 

গত ৩রা মার্চ থেকে বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানি অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছিল। কিন্তু জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে দেশজুড়ে অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর অনেক পরিবহন মালিক সেই কার্যক্রম স্থগিত করে দেন।

পরিবহন মালিকদের যুক্তি, তেলের সংকট বা হঠাৎ দাম বাড়লে আগেই নির্ধারিত ভাড়ায় বিক্রি করা টিকিটে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে। তাই যাত্রার কাছাকাছি সময়ে সরাসরি টিকিট বিক্রির পরিকল্পনা করছেন তারা।

আইকনিক এক্সপ্রেসের ফেসবুক পোস্ট ও বর্তমান সংকট নিয়ে কোম্পানিটির মনিটরিং অফিসার আশীষ কুমার জানান, তারা টিকিট দিলেও সঙ্গে সতর্ক করে দিচ্ছেন।

“যদি তেল সরবরাহে চলমান সরবরাহ ঘাটতি অব্যাহত থাকে তবে ট্রিপ ক্যানসেল করা ছাড়া উপায় থাকবে না,” শনিবার সকালে আলাপকে বলেছেন তিনি।

আইকনিক এক্সপ্রেসের নোটিশ

কাটেনি যাত্রা বাতিল ও দাম বাড়ার শঙ্কা

সাতক্ষীরার আশাশুনির যাত্রী মুকুল হোসেন বলেন,“অনলাইনে যে টিকিট ছাড়া হয়েছিল তা কয়েক মিনিটেই শেষ হয়ে গেছে। এখন কাউন্টারে গেলে বিভিন্ন কথা বলে আড়ালে আবডালে বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে।”

শেষ পর্যন্ত সাতশ থেকে সাড়ে সাতশ টাকার টিকিট নয়শো টাকায় কিনলেও তার ভয়, ‘বাস আদৌ ছাড়বে তো?’

এবারের অবস্থা ঈদের আগে পরিবহন সেক্টরে বাড়তি ভাড়া আদায়ের পুরোনো কৌশলে আরেকটি অজুহাত সৃষ্টি করছে বলেই জানান জামালপুর রুটের যাত্রী রিপন রহমান।

তার ভাষ্য,“যাত্রার আগে টিকিট দেওয়া হবে, কাউন্টার থেকে এমনটাই জানানো হচ্ছে। কিন্তু সেটা সবাই জানে ঈদের ভিড়ের সময় টিকিট পাওয়া কতটা কঠিন।”

স্বাভাবিক সময়ের ৩৫০ টাকার ভাড়া তখন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা তার।

“বাসের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ঈদযাত্রার গন্তব্যও নিশ্চিত করা যাবে না। এই পরিস্থিতিকে পুঁজি করেই ভাড়া নৈরাজ্য বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে,” আলাপকে বলেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

রেশনিংয়ে ভিড় তবে মন্ত্রীর আশ্বাস

পরিবহন মালিকরা বলছেন, জ্বালানি সংগ্রহ করাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক (সদর) এ এস এম আহাম্মেদ খোকন আলাপকে বলেন, “ডিজেল ক্রাইসিস এবং রেশনিংয়ের কারণে কিছুটা সমস্যা তো হচ্ছেই। বিশেষ করে ডিজেল নিতে স্বাভাবিকের চেয়ে সময় অনেক বেশি লাগছে। এটা অব্যাহত থাকলে ঈদের বাড়তি ট্রিপের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হবে।”

দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনারবাহী যানবাহনে ২০০–২২০ লিটার পর্যন্ত তেল নেওয়ার সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)

তবে রবিবার থেকে এই রেশনিং পুনর্বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন সড়ক পরিবহন রেল ও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

শুক্রবার তিনি বলেছেন, “তেলের কোনো সমস্যা হবে না। তেলের দামও বাড়বে না। বিশেষ করে পাবলিক পরিবহন যারা আছে, ১৫ (মার্চ) তারিখ থেকে প্রয়োজন মতো তেল তারা অবাধে পাবে।”

তেলের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে ঈদের সময় একদিকে বাসের ট্রিপ কমে যেতে পারে।

আর তাতে ঈদ যাত্রা শুরুর আগেই যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাকে পুঁজি করে অসৎ ব্যবসায়ীদের বাড়তি ভাড়া আদায় আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, গত ঈদুল ফিতরের যাত্রায় শুধু ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় গণপরিবহনে ঈদ বকশিশ বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নামে ৮৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায় হয়েছিল।