বিদায়ের আগে শেষ চুক্তিটি কেন মাথা ব্যথার কারণ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের আগে এমন বিস্তৃত প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য নীতিগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে, যা শুধু অর্থনৈতিকভাবে অনিরাপদই নয়, রাজনৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যে আটকে থাকছে না। 

এর ছয়টি প্রধান বিভাগ এর বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শুল্ক কমানোর সঙ্গে চুক্তিটিতে বাংলাদেশের নীতিগত, নিরাপত্তাগত ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে বিশেষ শর্তাবলি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, অস্ত্র কেনা, প্রযুক্তিগত মান, কৃষিপণ্য, মেধাস্বত্ব, ডিজিটাল বাণিজ্য ও শ্রম অধিকারসহ বিপুল আমদানির নিয়ে এমন কিছু প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। 

বাণিজ্য শুল্ক কমায় রপ্তানিকারকরা খুশি হলেও দীর্ঘমেয়াদি এসব নীতিগত সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের স্বার্থ, নীতিগত স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। 

বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের আগে এমন বিস্তৃত প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য নীতিগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে, যা শুধু অর্থনৈতিকভাবে অনিরাপদই নয়, রাজনৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বিকেএমইএ‘র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক আলাপকে বলেন, “চুক্তিটা খুব একটা পজিটিভ মনে হয়নি। তাছাড়া যখন এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন একটি সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে তখন নৈতিকতার দিক থেকেও ঠিক হয়নি।”

আন্তর্জাতিক সম্পর্কে জটিলতা

বাণিজ্য চুক্তি অনুসারে, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো সীমান্ত বা বাণিজ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে, বাংলাদেশকে সেটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমান্তরাল ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশকে বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য ভাগ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। 

বাংলাদেশ নিশ্চিত করবে তৃতীয় দেশের কম দামের পণ্য মার্কিন বাজার বা স্থানীয় বাজার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।

যদি বাংলাদেশ কোনো নতুন ফ্রি ট্রেড বা প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট করে এমন কোনো দেশের সঙ্গে যা এই চুক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এবং আলোচনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমাধান না হয়, তারা এই চুক্তি বাতিল করতে পারে এবং পূর্বনির্ধারিত শুল্ক পুনরায় আরোপ করতে পারে।

আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে কোনো দেশ থেকে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না যা মার্কিন স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, শুধুমাত্র বিশেষ ক্ষেত্রে বা পূর্বের চুক্তি ছাড়া।

এর ফলে, আগামী সরকারকে নিজস্ব নীতি ও স্বার্থের পরিবর্তে মার্কিন বাণিজ্য নীতির সঙ্গে নিজেদের নীতি সামঞ্জস্য করতে বাধ্য হতে হবে বলেই মনে করছেন বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান।

তিনি বলেন, “এই চুক্তি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। তাই এটা একটি অন্তবর্তীকালীন সরকারের শেষ সময় এসে করা ঠিক হয়নি। এটা আগামীর নির্বাচিত সরকারকে চাপে ফেলবে।”

চুক্তির এসব শর্ত, বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক ভারসাম্য নীতিকে চাপে ফেলবে বলেও মনে করা হচ্ছে। 

তৌফিকুল ইসলাম খানের ভাষায়, চুক্তিটি “অর্থনৈতিকভাবে অনিরাপদ, রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।”

ডিজিটাল সার্বভৌমত্বে প্রশ্ন

চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করবে। বিনামূল্যে তথ্য স্থানান্তর নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি যদি বাংলাদেশ কোনো নতুন ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তিতে প্রবেশ করে যা মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে তাহলে শুল্ক পুনরায় আরোপ করার ধারা রাখা হয়েছে। 

এতে ডেটা লোকালাইজেশন বা দেশীয় প্রযুক্তি কোম্পানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো নীতি গ্রহণে সরকারের হাত কিছুটা বাঁধা পড়তে পারে।

চুক্তি বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মার্কিন কোম্পানির ওপর বৈষম্যমূলক ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স আরোপ করতে পারবে না। এটা হলে, ভবিষ্যতে গুগল, মেটা, অ্যামাজনের মতো আমেরিকন কোম্পানির ওপর বিশেষ কর আরোপ কঠিন হতে পারে যা রাজস্ব নীতিতে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।

এমনকি চীন বা অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রযুক্তিগত বাণিজ্যে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আলাপকে বলেন, “এই চুক্তিতে এমন অনেক শর্ত আছে যা বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত করবে।”

সমরাস্ত্র কেনায় সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশ চেষ্টা করবে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়াতে। শুধু তাই নয়, কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত করতে হবে বাংলাদেশকে।

বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সমস্যা হবে, কারণ বাংলাদেশ নিজের মতো করে সরঞ্জাম বা সরবরাহকারী বেছে নিতে পারবে না।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।”

তার ভাষায়, “শুরুতে অন্যায়ভাবে বাড়তি শুল্ক বসানো হয়েছিল, আর এখন তা কমানোর শর্ত হিসেবে নানা বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেওয়া হয়েছে।”

নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সংকুচিত

চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে স্বীকৃত মান অনুযায়ী সনদপ্রাপ্ত পণ্যে বাংলাদেশ অতিরিক্ত পরীক্ষা বা সার্টিফিকেশন আরোপ করবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এতে বাংলাদেশের নিজস্ব মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভূমিকা সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য, ওষুধ ও শিল্পপণ্যে স্থানীয় মানদণ্ড প্রয়োগের সুযোগ সংকুচিত হলে ভোক্তা সুরক্ষা ও নীতিগত স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

এসব বিষয় বাংলাদেশের রাজস্বসহ বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, “মাত্র দুই দিন পর যখন জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে তখন এত তাড়াহুড়ো করে কেন এমন একটি চুক্তি সই করা হলো, যা বাস্তবায়ন করবে পরের নির্বাচিত সরকার?”

একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের এমন চুক্তি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করার প্রয়োজন ছিল বলেই মনে করেন তিনি।

দেশীয় কৃষকের ঝুঁকি

মার্কিন কৃষিপণ্যে অযৌক্তিক বাধা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভর্তুকিনির্ভর কৃষি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে কঠিন হতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভুট্টা, গম, দুগ্ধ ও সয়াবিনজাত পণ্যে আমদানি বাড়লে স্থানীয় উৎপাদক চাপে পড়তে পারেন।

মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ওষুধ শিল্পে প্রভাব ফেলবে

কঠোর পেটেন্ট সুরক্ষা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের জেনেরিক ওষুধ শিল্পের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে কিছু সুবিধা ভোগ করছে। ভবিষ্যতে ওষুধ উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে এমন উদ্বেগ রয়েছে শিল্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

রপ্তানি খাতে প্রাথমিক চাপ

শ্রম অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষায় উচ্চ মান বজায় রাখার অঙ্গীকার ইতিবাচক হলেও, তা বাস্তবায়নে রপ্তানিমুখী শিল্প- বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে—ব্যয় বাড়তে পারে।

যদিও দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে, স্বল্পমেয়াদে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। 

এক শতাংশ শুল্ক কমানো খুব একটা প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করেন নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

তিনি আলাপকে বলেন, “মাত্র এক শতাংশ আমাদের জন্য খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না।”

তবে আমেরিকান তুলা আমদানি করে তা থেকে উৎপাদিত পণ্যে শুল্ক ছাড় বড় ধরনের সুবিধা দেবে বলে মনে করেন 

আমদানির আর্থিক চাপ

এই চুক্তির অন্যতম শর্ত হিসাবে উল্লেখ রয়েছে, বিমান বাংলাদেশ ১৪টি বোয়িং বিমান কিনবে। এছাড়ও আরও কিছু বিমান ক্রয় করার অপশন থাকবে।

বাংলাদেশ চেষ্টা করবে যাতে দেশীয় কোম্পানির মাধ্যমে মার্কিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সহ অন্যান্য জ্বালানী ক্রয় করা হয়। এর সম্ভাব্য মূল্য ১৫ বছরের জন্য ১৫ বিলিয়ন ডলার।

এছাড়া আগামী পাঁচ বছর প্রতি বছরের জন্য সাত লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি করতে হবে। পাশাপাশি বছরে এক দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন ও সয়াবিন পণ্য আমদানি করতে হবে।

এসব কৃষি পণ্যের পাশাপাশি মোট তিন দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তুলা কিনতে হবে। যেটা আবার সুবিধা দেবে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের। 

এটাকে চুক্তির বড় অর্জন বলে মনে করছেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবেল আলাপ-কে বলেন, “কমা মানেই উপকৃত হওয়া। তবে এর চেয়ে বেশি সুবিধা দেবে তুলার বিষয়টি। এটি যদি তুলা ব্যবহারে শুল্ক হ্রাসের সুবিধা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় এটা আমাদেরকে ভালো সুযোগ এনে দেবে।”

তবে মাত্র এক শতাংশ শুল্ক হ্রাস বাংলাদেশের জন্য যে সব শর্তে আসছে তাকে ভবিষ্যতের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে বলেই মনে করছেন তৌফিকুল ইসলাম খান। 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বা ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে, কারণ মার্কিন নীতির সঙ্গে মিল রাখতে গিয়ে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া সীমিত হবে।

ট্যারিফ চুক্তিটি যদি জনগন ও সরকারের পক্ষে যদি বোঝা হয়ও তাহলে চাইলেও কিন্তু এ চুক্তিটি বাতিল করা যাবে না,” আলাপকে বলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তাই যদি নতুন সরকার যারা গঠন করবে তাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা না হলে সরকার বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছে বলেই মনে করছেন তিনি।