৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা আসলে কত টাকা? এই টাকা দিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মতো কুড়িটি বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফেলা সম্ভব। আর অলিম্পিকসের মতো ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আয়োজন করে ফেলা যাবে ৭ থেকে ৮টি। যদিও অর্থমন্ত্রী ‘ঋণনির্ভর অর্থনীতি’ থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যয় জানিয়েছেন তারপরও তার ঘোষিত বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকাই ঘাটতি - তার মানে ঋণ নিয়েই এই ঘাটতি মেটাতে হবে।
আহরার হোসেন
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএমআপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম
অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো বাজেট পেশ করলেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: এআই
৯ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন টাকা বা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা লিখতে কতগুলো সংখ্যা লাগে জানেন? তেরোটি।
ছোটবেলায় আমার বাবার দোকানের হিসেব কষার ক্যালকুলেটরটা নিয়ে মাঝেমাঝে টেপার সুযোগ পেতাম। সেই ক্যালকুলোটরে আটটির বেশি সংখ্যা লেখা যেত না। এখন মানুষ অবশ্য মোবাইলের ক্যালকুলেটর অ্যাপ দিয়েই বেশিরভাগ হিসেব-নিকেশের কাজ সারেন। উচ্চ প্রযুক্তির সফটওয়্যারভিত্তিক এসব ক্যালকুলেটরে যত ইচ্ছে ডিজিট লেখা যায়। কিন্তু আমি নিশ্চিত বাজারে যে সাধারণ ডিজিটাল ক্যালকুলেটরগুলো পাওয়া যায় তার মনিটরে বাংলাদেশের বাজেটের অংকটা ধরবে না।
৯৩৮০০০০০০০০০০ লেখার পর সেটা একক-দশক-শতক হিসেব করে একবার পড়ে ফেলা আমার মতো সাধারণ যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ কম জানা মানুষের জন্য একটু দুঃসাধ্যই বটে। হ্যাঁ, এটাই বাংলাদেশের আগামী এক বছরের ব্যয়ের বহর, মানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট।
আচ্ছা, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা আসলে কত টাকা? বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একটি ‘পপুলার ওয়ার্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাই আমিও দ্বারস্থ হই এআই’এর। চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করলে জবাব পেলাম, এই টাকা দিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মতো কুড়িটি বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফেলা সম্ভব। আর অলিম্পিকসের মতো ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আয়োজন করে ফেলা যাবে ৭ থেকে ৮টি।
এই টাকা আপনি যদি ব্যাংক থেকে ক্যাশ করেন এবং এক হাজার টাকার বান্ডল নেন, তাহলে আপনি পাবেন মোট ৯৩৮ কোটি ব্যাংক নোট। বান্ডলের সংখ্যা হবে ৯ কোটি ৩৮ লাখ। প্রতিটি ব্যাংক নোটের ওজন ১ গ্রাম হিসেবে এই সবগুলো বান্ডলের মোট ওজন দাঁড়াবে ৯ হাজার ৩শ ৮০ মেট্রিকটন।
এই পুরো টাকার ওজন দেড় হাজার আফ্রিকান হাতির ওজনের সমান। বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি, প্যারিসের আইফেল টাওয়ার যদি দাড়িপাল্লার একপাশে রেখে অন্যপাশে এই সব টাকার বান্ডল রাখা হয়, তাহলে দেখা যাবে আইফেল টাওয়ারের ওজন সামান্য কিছু বেশি।
এই নোটের বান্ডলগুলো যদি একটার ওপর আরেকটা রেখে স্তুপ করা হয় তাহলে সেই স্তুপের উচ্চতা হবে ৯৩৮ কিলোমিটার। টাকার বান্ডলগুলো প্রায় আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে, ছাড়িয়ে যাবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশান আইএসএসকে। আসলে এই টাকার বান্ডল আইএসএসকে ছাড়াতে পারবে দুইবার।
আর এই স্তুপটাকে আপনি যদি কাত করেন, অর্থাৎ টেকনাফ থেকে শুরু করে একটার পর একটা বান্ডল পাশাপাশি সাজাতে থাকেন তাহলে তেঁতুলিয়া ছাড়িয়ে যেতে পারবেন। তারপরও আপনার টাকার বান্ডল শেষ হবে না।
কিন্তু নোটগুলো যদি আপনি একটার ওপর একটা স্তুপ না করে একটার পর একটা বিছিয়ে দিতে শুরু করেন তাহলে তাহলে তার দৈর্ঘ্য হবে প্রায় দেড় কোটি কিলোমিটার। মানে এভাবে টাকা বিছিয়ে পৃথিবী থেকে চাঁদে চারবার আপডাউন করতে পারবেন আপনি।
আপনার মাসিক আয় যদি ৫০ হাজার টাকা হয় তাহলে পুরো বাজেটের সমান টাকা আয় করতে আপনার লাগবে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৩৩ হাজার বছর। যদি ততদিন পৃথিবী টিকে থাকে আরকি! বুড়ো পৃথিবীর বয়সতো কম হল না, সাড়ে চারশো কোটি বছর ছাড়িয়ে গেল।
এই বাজেট তো সরকারের বার্ষিক ব্যয়ের একটা হিসেব। সরকার জনগণের হয়ে এই ব্যয় করবে। তাহলে জনগণ হিসেবে আপনার ভাগে খরচ কত পড়লো? পরিসংখ্যা ব্যুরোর হিসেবে বাংলাদেশের অফিসিয়াল জনসংখ্যা এই মুহূর্তে ১৭ কোট ৩৫ লাখ ২০ হাজার জন। সেই হিসেবে আপনার ভাগে পড়ছে ৫৪ হাজার ৫৭ টাকা ১৭ পয়সা প্রায়।
পৌনে এক হাজার কোটি থেকে ট্রিলিয়ন
১৯৭২ সালের ৩০এ জুন সে সময়ের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের প্রথম যে জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছিলেন তার আকার ছিল ৭শ ৮৬ কোটি টাকা। এই ঘটনার ৫০ বছর পর ২০২২ সালের ২৫এ জুন বাংলাদেশে একটি সেতুর উদ্বোধন হয়। পদ্মা সেতু নামের সেই মেগা স্ট্রাকচার বানাতে খরচ লেগেছিল ত্রিশ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রথম বাজেট ঘোষণার ৫০ বছর পর এসে বাংলাদেশ একটিমাত্র ব্রিজ বানাতে খরচ করেছিল বাহাত্তর সালের আটত্রিশটি বাজেটের বেশি পরিমাণ টাকা।
প্রথম বছরের পৌনে এক হাজার কোটির বাজেট বছর বছর বাড়তে বাড়তে এক ট্রিলিয়ন ছোঁয় ২০০৯ সালের জুন মাসে। সেবারও এবারের মতো একটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ছিল সেটি। আট বছর পর দেশের শাসনক্ষমতোায় ফিরে আওয়ামী লীগের নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার সেই বাজেটের নাম দিয়েছিলেন ‘দিন বদলের বাজেট’। তারপর আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশে ‘দিন বদল’ কতটা হয়েছিল কে জানে, কিন্তু বাংলাদেশ এই দেড় দশকে পেয়েছে পদ্মা সেতুর মতো কয়েক গণ্ডা মেগা স্ট্রাকচার।
আওয়ামী লীগের প্রথম ট্রিলিয়ন টাকার বাজেট দেড় দশকে বাড়তে বাড়তে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের দেয়া শেষ বাজেটে এসে ঠেকে ৬ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায়। তারপর প্রফেসর ইউনূসের দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেয়া বাজেটের সংশোধিত আকার দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট সেখান থেকে বড় লাফ দিল। এক ধাক্কায় বাজেটের আকার বাড়লো দেড় লাখ কোটি টাকা।
তারেক সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার প্রথম বাজেটের শিরোনাম দিয়েছেন ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। এই খটোমটো নামের বাজেটের যে আকার তা বৈশ্বিক হিসেবে মাঝারি বলা চলে। কিন্তু বাংলাদেশে এটা রেকর্ড ব্রেকিং।
এবার প্রধানমন্ত্রী হবার আগে থেকেই তারেক রহমান মেগা স্ট্রাকচারের বিপক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতিতে। তারপরও বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাবদই সরকারের বরাদ্দ রয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা, এটাও একটা রেকর্ড ব্রেকিং বরাদ্দ।
আপনার ভাগে কত পড়লো?
এই পুরো ব্যয়ের বোঝাই কিন্তু আপনার ঘাড়ে। আগেই বলেছি বাজেটের বরাদ্দের মধ্যে আপনার দায় ৫৪ হাজার ৫৭ টাকা ১৭ পয়সা প্রায়।
যদিও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘ঋণনির্ভর অর্থনীতি’ থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যয় জানিয়েছেন। বাজেট বক্তৃতায় কয়েকবার ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া কমানোর উল্লোখ করেছেন তিনি। তারপরও তিনি যে বাজেট ঘোষণা করেছেন, তার মধ্যে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা রোজগারের কোন সংস্থান না থাকায় দেশ ও বিদেশ থেকে ঋণ নিয়েই এই ঘাটতি মেটাতে হবে।
তার মানে আগামী অর্থবছর আপনার ঘাড়ে ঋণের বোঝা থাকবে ১৪ হাজার টাকা। এর আগের কোন বাজেটে কখনো আপনার ঘাড়ে এত বড় ঋণের বোঝা ছিল না।
ভাবছেন, খেলাপি হবেন! শোধ করবেন না এই ১৪ হাজার!
আপনার রোজগার করা প্রতিটি টাকায়, আপনার কেনা প্রতিটি পণ্য ও সেবায় ট্যাক্স বসিয়ে ঠিকই আপনার কাছ থেকে এই অর্থ নিয়ে নেবে সরকার।
প্রতি ৭ টাকা ব্যয়ে ১ টাকা সুদ
আগের সরকারগুলোর নেওয়া ঋণের সুদ শোধ করতেই এবার চলে যাচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। মানে আপনার ভাগে যে ৫৪ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল, তার মধ্যে ৭,৩০০ টাকাই চলে যাচ্ছে শুধু পুরোনো লোনের ইন্টারেস্ট বা সুদ দিতে!
এই ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের আগামী অর্থবছরের মোট ব্যয়ের সাড়ে ১৩ শতাংশ, মানে এই সরকার তার ব্যয় করা প্রতি সাত টাকার বিপরীতে এক টাকা ব্যয় করবে ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ।
এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশে আরো চারটি পদ্মা সেতু তৈরি করা যেত। মেট্রোরেলও তৈরি করা যেত চারটি।
আপনি যদি প্রতি মিনিটে এক লাখ টাকা খরচ করেন তাহলে যে পরিমান টাকা এক বছরে বাংলাদেশ সুদ বাবদ দিচ্ছে তার সবটা খরচ করতে আপনার সময় লেগে যেত প্রায় চব্বিশ বছর। অথচ এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশ কিছুই পাবে না। এটা স্রেফ পূর্বের দেনার জের।
বাজেটে আপনার ভাগের ওই ৫৪ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার ১৫০ টাকারও বেশি চলে যাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন আর ভাতা দিতে।
সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ১৮ হাজার টাকা চলে যাবে এডিপি অর্থাৎ উন্নয়ন বাবদ। ভাগের তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে করা উন্নয়ন আপনার উন্নয়নে কতটা আসবে সেটাও নিশ্চয়ই আপনি বুঝে নেবেন।
বাজেটে রেকর্ড ৭ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের প্ল্যান করেছে সরকার। হিসাব করলে, আগামী বছর আপনার কাছ থেকে গড়ে ৪০ হাজার টাকা ট্যাক্স আর ভ্যাট আদায়ের টার্গেট করা হয়েছে।
সরাসরি নিক কিংবা ঘুরিয়ে পেচিয়ে নিক, সরকার কিন্তু টাকাটা আপনার পকেট থেকেই নেবে।
তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণাতো হয়ে গেল। এটা কার্যকর হতে শুরু করবে পয়লা জুলাই থেকেই। এখন প্রশ্ন, আপনার ভাগের এই ৫৪ হাজার টাকার বাজেট পরিকল্পনা কি আপনার মানিব্যাগে শান্তি আনবে? নাকি আগামী বছরও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে, ‘ভাই, জিনিসপত্রের এত দাম কেন?’
বাজেট ২০২৬-২৭
উচ্চাভিলাষী ব্যয়ের বহর - আপনার ভাগে পড়ছে কত?
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা আসলে কত টাকা? এই টাকা দিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মতো কুড়িটি বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফেলা সম্ভব। আর অলিম্পিকসের মতো ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আয়োজন করে ফেলা যাবে ৭ থেকে ৮টি। যদিও অর্থমন্ত্রী ‘ঋণনির্ভর অর্থনীতি’ থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যয় জানিয়েছেন তারপরও তার ঘোষিত বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকাই ঘাটতি - তার মানে ঋণ নিয়েই এই ঘাটতি মেটাতে হবে।
৯ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন টাকা বা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা লিখতে কতগুলো সংখ্যা লাগে জানেন? তেরোটি।
ছোটবেলায় আমার বাবার দোকানের হিসেব কষার ক্যালকুলেটরটা নিয়ে মাঝেমাঝে টেপার সুযোগ পেতাম। সেই ক্যালকুলোটরে আটটির বেশি সংখ্যা লেখা যেত না। এখন মানুষ অবশ্য মোবাইলের ক্যালকুলেটর অ্যাপ দিয়েই বেশিরভাগ হিসেব-নিকেশের কাজ সারেন। উচ্চ প্রযুক্তির সফটওয়্যারভিত্তিক এসব ক্যালকুলেটরে যত ইচ্ছে ডিজিট লেখা যায়। কিন্তু আমি নিশ্চিত বাজারে যে সাধারণ ডিজিটাল ক্যালকুলেটরগুলো পাওয়া যায় তার মনিটরে বাংলাদেশের বাজেটের অংকটা ধরবে না।
৯৩৮০০০০০০০০০০ লেখার পর সেটা একক-দশক-শতক হিসেব করে একবার পড়ে ফেলা আমার মতো সাধারণ যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ কম জানা মানুষের জন্য একটু দুঃসাধ্যই বটে। হ্যাঁ, এটাই বাংলাদেশের আগামী এক বছরের ব্যয়ের বহর, মানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট।
আচ্ছা, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা আসলে কত টাকা? বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একটি ‘পপুলার ওয়ার্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাই আমিও দ্বারস্থ হই এআই’এর। চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করলে জবাব পেলাম, এই টাকা দিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মতো কুড়িটি বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফেলা সম্ভব। আর অলিম্পিকসের মতো ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আয়োজন করে ফেলা যাবে ৭ থেকে ৮টি।
এই টাকা আপনি যদি ব্যাংক থেকে ক্যাশ করেন এবং এক হাজার টাকার বান্ডল নেন, তাহলে আপনি পাবেন মোট ৯৩৮ কোটি ব্যাংক নোট। বান্ডলের সংখ্যা হবে ৯ কোটি ৩৮ লাখ। প্রতিটি ব্যাংক নোটের ওজন ১ গ্রাম হিসেবে এই সবগুলো বান্ডলের মোট ওজন দাঁড়াবে ৯ হাজার ৩শ ৮০ মেট্রিকটন।
এই পুরো টাকার ওজন দেড় হাজার আফ্রিকান হাতির ওজনের সমান। বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি, প্যারিসের আইফেল টাওয়ার যদি দাড়িপাল্লার একপাশে রেখে অন্যপাশে এই সব টাকার বান্ডল রাখা হয়, তাহলে দেখা যাবে আইফেল টাওয়ারের ওজন সামান্য কিছু বেশি।
এই নোটের বান্ডলগুলো যদি একটার ওপর আরেকটা রেখে স্তুপ করা হয় তাহলে সেই স্তুপের উচ্চতা হবে ৯৩৮ কিলোমিটার। টাকার বান্ডলগুলো প্রায় আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে, ছাড়িয়ে যাবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশান আইএসএসকে। আসলে এই টাকার বান্ডল আইএসএসকে ছাড়াতে পারবে দুইবার।
আর এই স্তুপটাকে আপনি যদি কাত করেন, অর্থাৎ টেকনাফ থেকে শুরু করে একটার পর একটা বান্ডল পাশাপাশি সাজাতে থাকেন তাহলে তেঁতুলিয়া ছাড়িয়ে যেতে পারবেন। তারপরও আপনার টাকার বান্ডল শেষ হবে না।
কিন্তু নোটগুলো যদি আপনি একটার ওপর একটা স্তুপ না করে একটার পর একটা বিছিয়ে দিতে শুরু করেন তাহলে তাহলে তার দৈর্ঘ্য হবে প্রায় দেড় কোটি কিলোমিটার। মানে এভাবে টাকা বিছিয়ে পৃথিবী থেকে চাঁদে চারবার আপডাউন করতে পারবেন আপনি।
আপনার মাসিক আয় যদি ৫০ হাজার টাকা হয় তাহলে পুরো বাজেটের সমান টাকা আয় করতে আপনার লাগবে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৩৩ হাজার বছর। যদি ততদিন পৃথিবী টিকে থাকে আরকি! বুড়ো পৃথিবীর বয়সতো কম হল না, সাড়ে চারশো কোটি বছর ছাড়িয়ে গেল।
এই বাজেট তো সরকারের বার্ষিক ব্যয়ের একটা হিসেব। সরকার জনগণের হয়ে এই ব্যয় করবে। তাহলে জনগণ হিসেবে আপনার ভাগে খরচ কত পড়লো? পরিসংখ্যা ব্যুরোর হিসেবে বাংলাদেশের অফিসিয়াল জনসংখ্যা এই মুহূর্তে ১৭ কোট ৩৫ লাখ ২০ হাজার জন। সেই হিসেবে আপনার ভাগে পড়ছে ৫৪ হাজার ৫৭ টাকা ১৭ পয়সা প্রায়।
পৌনে এক হাজার কোটি থেকে ট্রিলিয়ন
১৯৭২ সালের ৩০এ জুন সে সময়ের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের প্রথম যে জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছিলেন তার আকার ছিল ৭শ ৮৬ কোটি টাকা। এই ঘটনার ৫০ বছর পর ২০২২ সালের ২৫এ জুন বাংলাদেশে একটি সেতুর উদ্বোধন হয়। পদ্মা সেতু নামের সেই মেগা স্ট্রাকচার বানাতে খরচ লেগেছিল ত্রিশ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রথম বাজেট ঘোষণার ৫০ বছর পর এসে বাংলাদেশ একটিমাত্র ব্রিজ বানাতে খরচ করেছিল বাহাত্তর সালের আটত্রিশটি বাজেটের বেশি পরিমাণ টাকা।
প্রথম বছরের পৌনে এক হাজার কোটির বাজেট বছর বছর বাড়তে বাড়তে এক ট্রিলিয়ন ছোঁয় ২০০৯ সালের জুন মাসে। সেবারও এবারের মতো একটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ছিল সেটি। আট বছর পর দেশের শাসনক্ষমতোায় ফিরে আওয়ামী লীগের নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার সেই বাজেটের নাম দিয়েছিলেন ‘দিন বদলের বাজেট’। তারপর আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশে ‘দিন বদল’ কতটা হয়েছিল কে জানে, কিন্তু বাংলাদেশ এই দেড় দশকে পেয়েছে পদ্মা সেতুর মতো কয়েক গণ্ডা মেগা স্ট্রাকচার।
আওয়ামী লীগের প্রথম ট্রিলিয়ন টাকার বাজেট দেড় দশকে বাড়তে বাড়তে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের দেয়া শেষ বাজেটে এসে ঠেকে ৬ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায়। তারপর প্রফেসর ইউনূসের দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেয়া বাজেটের সংশোধিত আকার দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট সেখান থেকে বড় লাফ দিল। এক ধাক্কায় বাজেটের আকার বাড়লো দেড় লাখ কোটি টাকা।
তারেক সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার প্রথম বাজেটের শিরোনাম দিয়েছেন ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। এই খটোমটো নামের বাজেটের যে আকার তা বৈশ্বিক হিসেবে মাঝারি বলা চলে। কিন্তু বাংলাদেশে এটা রেকর্ড ব্রেকিং।
এবার প্রধানমন্ত্রী হবার আগে থেকেই তারেক রহমান মেগা স্ট্রাকচারের বিপক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতিতে। তারপরও বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাবদই সরকারের বরাদ্দ রয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা, এটাও একটা রেকর্ড ব্রেকিং বরাদ্দ।
আপনার ভাগে কত পড়লো?
এই পুরো ব্যয়ের বোঝাই কিন্তু আপনার ঘাড়ে। আগেই বলেছি বাজেটের বরাদ্দের মধ্যে আপনার দায় ৫৪ হাজার ৫৭ টাকা ১৭ পয়সা প্রায়।
যদিও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘ঋণনির্ভর অর্থনীতি’ থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যয় জানিয়েছেন। বাজেট বক্তৃতায় কয়েকবার ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া কমানোর উল্লোখ করেছেন তিনি। তারপরও তিনি যে বাজেট ঘোষণা করেছেন, তার মধ্যে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা রোজগারের কোন সংস্থান না থাকায় দেশ ও বিদেশ থেকে ঋণ নিয়েই এই ঘাটতি মেটাতে হবে।
তার মানে আগামী অর্থবছর আপনার ঘাড়ে ঋণের বোঝা থাকবে ১৪ হাজার টাকা। এর আগের কোন বাজেটে কখনো আপনার ঘাড়ে এত বড় ঋণের বোঝা ছিল না।
ভাবছেন, খেলাপি হবেন! শোধ করবেন না এই ১৪ হাজার!
আপনার রোজগার করা প্রতিটি টাকায়, আপনার কেনা প্রতিটি পণ্য ও সেবায় ট্যাক্স বসিয়ে ঠিকই আপনার কাছ থেকে এই অর্থ নিয়ে নেবে সরকার।
প্রতি ৭ টাকা ব্যয়ে ১ টাকা সুদ
আগের সরকারগুলোর নেওয়া ঋণের সুদ শোধ করতেই এবার চলে যাচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। মানে আপনার ভাগে যে ৫৪ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল, তার মধ্যে ৭,৩০০ টাকাই চলে যাচ্ছে শুধু পুরোনো লোনের ইন্টারেস্ট বা সুদ দিতে!
এই ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের আগামী অর্থবছরের মোট ব্যয়ের সাড়ে ১৩ শতাংশ, মানে এই সরকার তার ব্যয় করা প্রতি সাত টাকার বিপরীতে এক টাকা ব্যয় করবে ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ।
এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশে আরো চারটি পদ্মা সেতু তৈরি করা যেত। মেট্রোরেলও তৈরি করা যেত চারটি।
আপনি যদি প্রতি মিনিটে এক লাখ টাকা খরচ করেন তাহলে যে পরিমান টাকা এক বছরে বাংলাদেশ সুদ বাবদ দিচ্ছে তার সবটা খরচ করতে আপনার সময় লেগে যেত প্রায় চব্বিশ বছর। অথচ এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশ কিছুই পাবে না। এটা স্রেফ পূর্বের দেনার জের।
বাজেটে আপনার ভাগের ওই ৫৪ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার ১৫০ টাকারও বেশি চলে যাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন আর ভাতা দিতে।
সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ১৮ হাজার টাকা চলে যাবে এডিপি অর্থাৎ উন্নয়ন বাবদ। ভাগের তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে করা উন্নয়ন আপনার উন্নয়নে কতটা আসবে সেটাও নিশ্চয়ই আপনি বুঝে নেবেন।
বাজেটে রেকর্ড ৭ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের প্ল্যান করেছে সরকার। হিসাব করলে, আগামী বছর আপনার কাছ থেকে গড়ে ৪০ হাজার টাকা ট্যাক্স আর ভ্যাট আদায়ের টার্গেট করা হয়েছে।
সরাসরি নিক কিংবা ঘুরিয়ে পেচিয়ে নিক, সরকার কিন্তু টাকাটা আপনার পকেট থেকেই নেবে।
তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণাতো হয়ে গেল। এটা কার্যকর হতে শুরু করবে পয়লা জুলাই থেকেই। এখন প্রশ্ন, আপনার ভাগের এই ৫৪ হাজার টাকার বাজেট পরিকল্পনা কি আপনার মানিব্যাগে শান্তি আনবে? নাকি আগামী বছরও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে, ‘ভাই, জিনিসপত্রের এত দাম কেন?’
বিষয়: