দেড় বছরে সারাদেশে ৯৭টি মাজারে হামলা। সবশেষ এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে কুষ্টিয়ার ফিলিপনগর। যেখানে ৩৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে হত্যা করা হয়েছে একজন পীরকে। গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মাজার। প্রশ্ন উঠছে, এটা কী শুধু ধর্ম অবমাননার প্রতিক্রিয়া নাকি এর পেছনে আছে সংগঠিত শক্তি, মতাদর্শ আর রাজনীতি?
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৯ পিএমআপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম
দেড় বছরে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে। সবশেষ এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে কুষ্টিয়ায় পীর হত্যা।
মাত্র ৩৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও, যা তিন বছর আগের বলে পুলিশের ভাষ্য। সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করেই গ্রাণ গেল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের আব্দুর রহমান বা শামীম রেজা জাহাঙ্গীরের।
নিজেকে তিনি পীর দাবি করতেন, বেশকিছু মুরিদ ছিল তার। শনিবার দুপুরে পুলিশের সামনেই ফিলিপনগর গ্রামে নিজের বাড়িতে কোপানো হয় তাকে। দৌলতপুর হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয় তার।
ওই ঘটনার পেছনেও ‘তৌহিদি’ জনতা নামধারী স্থানীয় কিছু মানুষ জড়িত বলে পুলিশ ধারণা করছে।
কিন্তু, তিন বছর আগের একটি ভিডিও ক্লিপ কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো এবং কীভাবে ‘অসংখ্য’ মানুষ লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়ে হামলা চালালো তা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
একইসঙ্গে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশে সুফি ঘরানার অনুসারীদের নিয়ে ওপর হামলা নিয়ে।
সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন, ২০২৪ সালে অগাস্ট থেকে পীরদের মাজারে হামলার ঘটনা বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীতে কবর থেকে নুরা পাগলার মরদেহ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এর সাত মাস পরই আবারও মাজারে হামলা এবং কুপিয়ে হত্যা করা হলো শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে।
প্রশ্ন উঠছে, ভিন্নমত পোষণ করলেই কি তাকে হত্যা করতে হবে? বাংলাদেশে মাজার হামলা ও পীররা কেন বারবার টার্গেট হচ্ছেন?
পীর কারা?
বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পীর আউলিয়াদের ভূমিকা। অহিংস উপায়ে ধর্ম প্রচারের জন্য এরা সুপরিচিত।
ফার্সি শব্দ পীর-এর বাংলা অর্থ হলো বৃদ্ধ, বয়োজ্যেষ্ঠ, বা সম্মানিত মুরুব্বী।
তবে ইসলামী পরিভাষায় বা সুফিবাদে পীর বলতে এমন একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বা গুরুকে বোঝায়, যিনি মুরিদদের (শিষ্য) আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালনা করেন। “পীর হলো এমন একজন- যার চিন্তা, চেতনা, ভাবনা, তার কথা বলার জন্য তাকে আরেকজন মান্য করেন। তার অনুসারী হন,” আলাপ-কে বলেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।
আর যারা পীরের বক্তব্য শুনে বিবেচনা করেন, ভালো হলে সঙ্গে থাকেন- তাদেরকে বলা হয় মুরিদ বা অনুসারী।
ফরহাদ মজহার বলেন, “আমাদের সমাজের ধনী এবং গরীব দুই জায়গাতেই কিন্তু এমন মানুষ রয়েছে। শিক্ষিত সমাজে আমরা হয়তো তাকে পিএইচডিধারী বা জ্ঞানী মানুষ বলি। আর গ্রামের দিকে গরিব সমাজে তারা অনেক সময় পীর বিবেচিত হন।” ১৭ মাসে ৯৭টি মাজারে হামলা
কুষ্টিয়ার এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব’-এর নামে মাজার, দরগাসহ সুফিদের ওপর তাণ্ডব বেড়ে যায়।
সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’–এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১৭ মাসে বাংলাদেশে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে।
সে সময় তিনজন নিহত এবং ৪৬৮ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে ওইসব ঘটনার মধ্যে ১১টি মামলা হলেও কোনোটিরই ‘কার্যকর অগ্রগতি’ হয়নি বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
হামলার পেছনে বেশ কিছু কারণও অনুসন্ধান করে বের করেছে ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “হামলার প্রধান কারণ ধর্মীয় মতবিরোধ। ৯৭টি হামলার মধ্য ৫৯টি হামলার পেছনেই ছিল ধর্মীয় মতবিরোধ।”
এছাড়া বাদ বাকি ২১টির পেছনে কারণ স্থানীয় বিরোধ, ১৬টি হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এবং একটি ঘটনার পেছনে পারিবারিক দ্বন্দ্ব খুঁজে পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
হামলার ধরণে পার্থক্য থাকলেও প্রায় সবক্ষেত্রে ‘তৌহিদী জনতা’ নামধারী নির্দিষ্ট ‘বেশভূষা’র ব্যক্তিরাই এসব ঘটনা ঘটান।
‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি ১৩টি হামলায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের স্থানীয় নেতা–কর্মী ও সমর্থকেরা জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ৪টি ঘটনায় বিএনপি, ৪টিতে জামায়াতে ইসলামী, ২টিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ১টিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনিসিপির) ও ১টিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা–কর্মীদের জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে।
কারা ও কেন মারল কুষ্টিয়ার পীরকে?
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে শত শত মানুষ ফিলিপনগরের 'শামীম জাহাঙ্গীর দরবার শরিফ' এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। যার মধ্যে রয়েছে তরুণ, শিশু ও কিশোররাও।
দরবার শরিফটির চারদিক থেকে অসংখ্য মানুষ তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। পাকা ঘরের ভেতর ঢুকে তাদের ভাঙচুর চালাতে দেখা যায়। হামলার এক পর্যায়ে সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দিতেও দেখা গেছে।
এত এত মানুষ হামলায় অংশ নিলেও রবিবার সকাল পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ তৌহিদ বিন-হাসান।
আর কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন ‘হামলাকারীরা সবাই স্থানীয়’ বলে জানিয়েছেন।
“আমরা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। ইটস টু আর্লি টু সে কবে নাগাদ…” আলাপ-কে রবিবার বিকেলে বলেছেন তিনি।
আগে থেকে জানার পরও কেন মাজার এবং শামীমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি- এই প্রশ্নের উত্তরে জেলা প্রশাসক বলেন, “আস্তানার পেছনের দিকে বাঁশবাগান। সেখান দিয়ে সহস্রাধিক মানুষ এসে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। এত মানুষের হামলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল।”
হামলার নেপথ্য কারণ হিসাবে ‘ধর্ম অবমাননা’কেই মনে করছে প্রশাসন। যার পেছনে রয়েছে ওই ৩৩ সেকেন্ডের ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি।
“অভিযান চলমান অবস্থায় রয়েছে। আগের যে ভিডিওকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটেছে সেটা নিয়ে আমাদের সাইবার টিম কাজ করছে,” বলেন তৌহিদ বিন-হাসান।
এদিকে পুরো ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং ‘ধর্মীয় রাজনীতি’ এবং ‘পেট্রোডলার’ সংস্কৃতির অংশ বলে মনে করছেন ফরহাদ মজহার।
“সারা বিশ্বে পেট্রোডলার সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। আমেরিকা ঝাপিয়ে পড়ছে ইরানে। আর এখানে গরিবদের ওপর হামলা হচ্ছে। নাচ, গানতো ঢাকার অভিজাত এলাকাতেও হচ্ছে কই সেখানে তো তারা হামলার সাহস পাচ্ছে না।”
বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় এবারের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল এবং এর তিনটিতেই জামায়াতের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নতুন কোনো শক্তির উত্থান নিয়েও তিনি কুষ্টিয়াবাসীকে ভাবতে বলছেন এই কবি ও চিন্তক।
“যে এলাকা পুরো বিশ্বে লালনের জন্য পরিচিত সেখানে এমন শক্তি কোথা থেকে, কাদের হাত ধরে শক্তিশালী হচ্ছে? কুষ্টিয়াবাসীকে এটা ভাবতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনকেও খুঁজে বের করতে হবে এরা কারা?,” বলছেন ফরহাদ মজহার।
প্রসঙ্গত, কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনে, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে, সে আসনে বিএনপির রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা নির্বাচিত হলেও কুষ্টিয়ার অন্য তিন আসনে নির্বাচিত হয়েছে জামায়ের তিন প্রার্থী।
এরা হচ্ছেন মুহাম্মদ আব্দুল গফুর (কুষ্টিয়া-২, মিরপুর-ভেড়ামারা), মুফতি আমির হামজা (কুষ্টিয়া-৩, সদর) ও মোঃ আফজাল হোসেন (কুষ্টিয়া-৪, কুমারখালী-খোকসা)।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিএনপি সরকারের সদিচ্ছার অভাব ও দৃশ্যমান গাফিলতির ফলেই কুষ্টিয়ায় এমন নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছে ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’।
শামীম বা জাহাঙ্গীর পীর নামে তিনি এলাকাতে পরিচিত হলেও তার অনেকগুলো নাম রয়েছে বলে জানান কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার।
“তিনি আসলে অনেকগুলো নামেই পরিচিত ছিলেন। তবে আমরা তার যে পাসপোর্ট পেয়েছি সেখানে নাম রয়েছে আব্দুর রহমান”, বলেছেন মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।
নিহত শামীম ২০২১ সালে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তিন মাস কারাগারে ছিলেন।
২০২১ সালের ১৬ মার্চ এক শিশুর মরদেহ দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন শামীম। পরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এক সময় চাকরি করেছেন শামীম। তার পীর জীবন শুরু হয় সেখান থেকেই। সেখানে প্রথমে ছিলেন এক পীরের মুরিদ। কিছুদিন খাদেম থাকার পর নিজেই হন পীর।
২০১৮ সালে ফিলিপনগর গ্রামে নিজ বাড়িতে এসে পৈতৃক জমিতে দরবার শরিফ গড়ে তোলেন।
পীর কেন টার্গেট? কুষ্টিয়ায় হত্যার নেপথ্যে কারা?
দেড় বছরে সারাদেশে ৯৭টি মাজারে হামলা। সবশেষ এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে কুষ্টিয়ার ফিলিপনগর। যেখানে ৩৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে হত্যা করা হয়েছে একজন পীরকে। গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মাজার। প্রশ্ন উঠছে, এটা কী শুধু ধর্ম অবমাননার প্রতিক্রিয়া নাকি এর পেছনে আছে সংগঠিত শক্তি, মতাদর্শ আর রাজনীতি?
মাত্র ৩৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও, যা তিন বছর আগের বলে পুলিশের ভাষ্য। সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করেই গ্রাণ গেল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের আব্দুর রহমান বা শামীম রেজা জাহাঙ্গীরের।
নিজেকে তিনি পীর দাবি করতেন, বেশকিছু মুরিদ ছিল তার। শনিবার দুপুরে পুলিশের সামনেই ফিলিপনগর গ্রামে নিজের বাড়িতে কোপানো হয় তাকে। দৌলতপুর হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয় তার।
ওই ঘটনার পেছনেও ‘তৌহিদি’ জনতা নামধারী স্থানীয় কিছু মানুষ জড়িত বলে পুলিশ ধারণা করছে।
কিন্তু, তিন বছর আগের একটি ভিডিও ক্লিপ কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো এবং কীভাবে ‘অসংখ্য’ মানুষ লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়ে হামলা চালালো তা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
একইসঙ্গে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশে সুফি ঘরানার অনুসারীদের নিয়ে ওপর হামলা নিয়ে।
সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন, ২০২৪ সালে অগাস্ট থেকে পীরদের মাজারে হামলার ঘটনা বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীতে কবর থেকে নুরা পাগলার মরদেহ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এর সাত মাস পরই আবারও মাজারে হামলা এবং কুপিয়ে হত্যা করা হলো শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে।
প্রশ্ন উঠছে, ভিন্নমত পোষণ করলেই কি তাকে হত্যা করতে হবে? বাংলাদেশে মাজার হামলা ও পীররা কেন বারবার টার্গেট হচ্ছেন?
পীর কারা?
বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পীর আউলিয়াদের ভূমিকা। অহিংস উপায়ে ধর্ম প্রচারের জন্য এরা সুপরিচিত।
ফার্সি শব্দ পীর-এর বাংলা অর্থ হলো বৃদ্ধ, বয়োজ্যেষ্ঠ, বা সম্মানিত মুরুব্বী।
তবে ইসলামী পরিভাষায় বা সুফিবাদে পীর বলতে এমন একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বা গুরুকে বোঝায়, যিনি মুরিদদের (শিষ্য) আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালনা করেন।
“পীর হলো এমন একজন- যার চিন্তা, চেতনা, ভাবনা, তার কথা বলার জন্য তাকে আরেকজন মান্য করেন। তার অনুসারী হন,” আলাপ-কে বলেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।
আর যারা পীরের বক্তব্য শুনে বিবেচনা করেন, ভালো হলে সঙ্গে থাকেন- তাদেরকে বলা হয় মুরিদ বা অনুসারী।
ফরহাদ মজহার বলেন, “আমাদের সমাজের ধনী এবং গরীব দুই জায়গাতেই কিন্তু এমন মানুষ রয়েছে। শিক্ষিত সমাজে আমরা হয়তো তাকে পিএইচডিধারী বা জ্ঞানী মানুষ বলি। আর গ্রামের দিকে গরিব সমাজে তারা অনেক সময় পীর বিবেচিত হন।”
১৭ মাসে ৯৭টি মাজারে হামলা
কুষ্টিয়ার এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব’-এর নামে মাজার, দরগাসহ সুফিদের ওপর তাণ্ডব বেড়ে যায়।
সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’–এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১৭ মাসে বাংলাদেশে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে।
সে সময় তিনজন নিহত এবং ৪৬৮ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে ওইসব ঘটনার মধ্যে ১১টি মামলা হলেও কোনোটিরই ‘কার্যকর অগ্রগতি’ হয়নি বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
হামলার পেছনে বেশ কিছু কারণও অনুসন্ধান করে বের করেছে ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “হামলার প্রধান কারণ ধর্মীয় মতবিরোধ। ৯৭টি হামলার মধ্য ৫৯টি হামলার পেছনেই ছিল ধর্মীয় মতবিরোধ।”
এছাড়া বাদ বাকি ২১টির পেছনে কারণ স্থানীয় বিরোধ, ১৬টি হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এবং একটি ঘটনার পেছনে পারিবারিক দ্বন্দ্ব খুঁজে পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
হামলার ধরণে পার্থক্য থাকলেও প্রায় সবক্ষেত্রে ‘তৌহিদী জনতা’ নামধারী নির্দিষ্ট ‘বেশভূষা’র ব্যক্তিরাই এসব ঘটনা ঘটান।
‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি ১৩টি হামলায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের স্থানীয় নেতা–কর্মী ও সমর্থকেরা জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ৪টি ঘটনায় বিএনপি, ৪টিতে জামায়াতে ইসলামী, ২টিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ১টিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনিসিপির) ও ১টিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা–কর্মীদের জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে।
কারা ও কেন মারল কুষ্টিয়ার পীরকে?
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে শত শত মানুষ ফিলিপনগরের 'শামীম জাহাঙ্গীর দরবার শরিফ' এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। যার মধ্যে রয়েছে তরুণ, শিশু ও কিশোররাও।
দরবার শরিফটির চারদিক থেকে অসংখ্য মানুষ তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। পাকা ঘরের ভেতর ঢুকে তাদের ভাঙচুর চালাতে দেখা যায়। হামলার এক পর্যায়ে সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দিতেও দেখা গেছে।
এত এত মানুষ হামলায় অংশ নিলেও রবিবার সকাল পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ তৌহিদ বিন-হাসান।
আর কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন ‘হামলাকারীরা সবাই স্থানীয়’ বলে জানিয়েছেন।
“আমরা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। ইটস টু আর্লি টু সে কবে নাগাদ…” আলাপ-কে রবিবার বিকেলে বলেছেন তিনি।
আগে থেকে জানার পরও কেন মাজার এবং শামীমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি- এই প্রশ্নের উত্তরে জেলা প্রশাসক বলেন, “আস্তানার পেছনের দিকে বাঁশবাগান। সেখান দিয়ে সহস্রাধিক মানুষ এসে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। এত মানুষের হামলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল।”
হামলার নেপথ্য কারণ হিসাবে ‘ধর্ম অবমাননা’কেই মনে করছে প্রশাসন। যার পেছনে রয়েছে ওই ৩৩ সেকেন্ডের ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি।
“অভিযান চলমান অবস্থায় রয়েছে। আগের যে ভিডিওকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটেছে সেটা নিয়ে আমাদের সাইবার টিম কাজ করছে,” বলেন তৌহিদ বিন-হাসান।
এদিকে পুরো ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং ‘ধর্মীয় রাজনীতি’ এবং ‘পেট্রোডলার’ সংস্কৃতির অংশ বলে মনে করছেন ফরহাদ মজহার।
“সারা বিশ্বে পেট্রোডলার সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। আমেরিকা ঝাপিয়ে পড়ছে ইরানে। আর এখানে গরিবদের ওপর হামলা হচ্ছে। নাচ, গানতো ঢাকার অভিজাত এলাকাতেও হচ্ছে কই সেখানে তো তারা হামলার সাহস পাচ্ছে না।”
বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় এবারের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল এবং এর তিনটিতেই জামায়াতের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নতুন কোনো শক্তির উত্থান নিয়েও তিনি কুষ্টিয়াবাসীকে ভাবতে বলছেন এই কবি ও চিন্তক।
“যে এলাকা পুরো বিশ্বে লালনের জন্য পরিচিত সেখানে এমন শক্তি কোথা থেকে, কাদের হাত ধরে শক্তিশালী হচ্ছে? কুষ্টিয়াবাসীকে এটা ভাবতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনকেও খুঁজে বের করতে হবে এরা কারা?,” বলছেন ফরহাদ মজহার।
প্রসঙ্গত, কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনে, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে, সে আসনে বিএনপির রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা নির্বাচিত হলেও কুষ্টিয়ার অন্য তিন আসনে নির্বাচিত হয়েছে জামায়ের তিন প্রার্থী।
এরা হচ্ছেন মুহাম্মদ আব্দুল গফুর (কুষ্টিয়া-২, মিরপুর-ভেড়ামারা), মুফতি আমির হামজা (কুষ্টিয়া-৩, সদর) ও মোঃ আফজাল হোসেন (কুষ্টিয়া-৪, কুমারখালী-খোকসা)।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিএনপি সরকারের সদিচ্ছার অভাব ও দৃশ্যমান গাফিলতির ফলেই কুষ্টিয়ায় এমন নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছে ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’।
কে এই কুষ্টিয়ার পীর?
শামীম বা জাহাঙ্গীর পীর নামে তিনি এলাকাতে পরিচিত হলেও তার অনেকগুলো নাম রয়েছে বলে জানান কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার।
“তিনি আসলে অনেকগুলো নামেই পরিচিত ছিলেন। তবে আমরা তার যে পাসপোর্ট পেয়েছি সেখানে নাম রয়েছে আব্দুর রহমান”, বলেছেন মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।
নিহত শামীম ২০২১ সালে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তিন মাস কারাগারে ছিলেন।
২০২১ সালের ১৬ মার্চ এক শিশুর মরদেহ দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন শামীম। পরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এক সময় চাকরি করেছেন শামীম। তার পীর জীবন শুরু হয় সেখান থেকেই। সেখানে প্রথমে ছিলেন এক পীরের মুরিদ। কিছুদিন খাদেম থাকার পর নিজেই হন পীর।
২০১৮ সালে ফিলিপনগর গ্রামে নিজ বাড়িতে এসে পৈতৃক জমিতে দরবার শরিফ গড়ে তোলেন।
বিষয়: