রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে জড়ান অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশি, নিহত ৩৪জন: গবেষণা

বাংলাদেশিদের একে একে বিমানবন্দরের ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে সিসিটিভি ক্যামেরা এড়িয়ে নগদ টাকা সংগ্রহ করা যায়। তিনি বলেন, “চাপের মুখে আমি প্রায় ১ হাজার মার্কিন ডলার দিয়েছিলাম।” 

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০২:০৬ পিএম

“তারপর হঠাৎ রাতারাতি আমাদেরকে অন্য একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং একজন অনুবাদককে দিয়ে আমাদের জানানো হয়েছে যে, যুদ্ধ করার জন্য আমাদের কিনে নেওয়া হয়েছে।”

কথাগুলো বলেছিলেন মাকসুদুর রহমান, একজন অভিবাসী বাংলাদেশি। যিনি রাশিয়া গিয়েছিলেন চাকরির আশায়। কিন্তু তাকে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে হয়েছিল। যুদ্ধে যাওয়া নিয়ে এক লোমহর্ষক গল্প শোনান তিনি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে মানবপাচার চক্র রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের ঠেলে দিচ্ছে।

এই গবেষণায় পাচারের শিকার বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন কীভাবে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। ঠেলে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুর মুখে।

মাকসুদ বলেন, “আমাদের বলা হয়েছে রাশিয়ান সরকার আমাদের প্রত্যেকের জন্য বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করেছে, যুদ্ধ না করে আমাদের আর কোনো উপায় নেই।” 

মাকসুদের মতো আরও অনেক বাংলাদেশিকে কোনো সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই সামনের সারিতে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে যুদ্ধে অনেকে প্রাণও হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মাকসুদ। 

ট্রুথ হাউন্ডস-এর গবেষক মারিয়া তোমাক আলাপকে বলেন, “অনেক ক্ষেত্রেই এই ব্যক্তিদের মানবপাচারের শিকার হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। তারা এই যুদ্ধে যোগ দিতে চাননি, তারা মূলত একটি সাধারণ বা বেসামরিক চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।”

গবেষণায় আরও একজন বাংলাদেশির কথা উঠে এসেছে। আরমান মণ্ডল নামে ওই বাংলাদেশিকেও রাশিয়ায় পাচার করা হয়। তিনি বলেন, “দালালরা আমাকে ধোঁকা দিয়ে এই যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করেছে।”

ফোর্টিফাই রাইটস এবং ট্রুথ হাউন্ডস মোট ২৪ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের মধ্যে আছেন রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশি পুরুষ, রাশিয়ায় যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত বাংলাদেশিদের স্বজন, মানবপাচারবিরোধী সেবা প্রদানকারী এবং বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা যোদ্ধাদের বিষয়ে আরও বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহে ট্রুথ হাউন্ডস ইউক্রেইনের যুদ্ধবন্দি শিবিরে থাকা নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বন্দিদেরও সাক্ষাৎকার নিয়েছে।

পাচারের শিকার মাকসুদুর রহমান বলেন, “দালালরা আমাকে বারবার আশ্বস্ত করেছিল যে এটি কোনো সামরিক কাজ নয় এবং যুদ্ধের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আর্থিক চাপ এবং অন্য কোনো বিকল্প উপায় না থাকায় আমি রাজি হয়েছিলাম।”

তিনি আরও জানান যে, মস্কো বিমানবন্দরে দালালরা তাদের কাছে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে। সেখানে বাংলাদেশিদের একে একে বিমানবন্দরের ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে সিসিটিভি ক্যামেরা এড়িয়ে নগদ টাকা সংগ্রহ করা যায়। তিনি বলেন, “চাপের মুখে আমি প্রায় ১ হাজার মার্কিন ডলার দিয়েছিলাম।” 

এরপর দালালরা মাকসুদুর রহমানকে রুশ ভাষায় একটি নথি দিয়েছিল এবং সেটি ‘ক্লিনিং সার্ভিস’ বা পরিচ্ছন্নতা সেবার চুক্তি মনে করে তিনি তাতে স্বাক্ষর করেন। মূলত এটাই ছিল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সম্পর্কিত সেই চুক্তি। 

২০২৩ সাল থেকে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করতে হলে বিদেশি নাগরিকদের রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হয়। এতে করে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী তারা রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। 

মারিয়া তোমাক জানান, এই গবেষণার জন্য যতগুলো ঘটনা নিয়ে কাজ করা হয়েছে, সবক্ষেত্রেই রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সাথেই বুঝে বা না বুঝে চুক্তি সই করেছে যুদ্ধে যোগ দেওয়া বিদেশি নাগরিকরা।  

তিনি বলেন, “তারা শেষ পর্যন্ত রুশ সেনাবাহিনীর চুক্তিতে স্বাক্ষর করে যুদ্ধের একদম সম্মুখ সারিতে গিয়ে পৌঁছায়। চুক্তির একটি শব্দও তারা বুঝতে পারেনি কারণ সেটি রুশ ভাষায় লেখা ছিল। এরপর তাদের বারবার যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তাদের মূলত মরণফাঁদে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। যারা অনেক বেশি ভাগ্যবান ছিল, তারা কেবল যুদ্ধবন্দি হয়ে কার্যত বেঁচে গিয়েছিল।”

“অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে শেষ পর্যন্ত এই মানুষগুলোকে দাসত্ব কিনে নিতে হয়েছে, না হলে মৃত্যু।”

এই পাচার চক্রের মাধ্যমে মূলত বিদেশি দরিদ্র মানুষদের “বলির পাঁঠা” হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করেন গবেষকরা। 

সংস্থা দুটি বলছে, সবক্ষেত্রেই যে মানুষ প্রতারিত হয়ে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, ব্যাপারটা তা নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেকে স্বেচ্ছায় রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। কিন্তু তারপর তাদেরও সেই একই ভাষ্য, তাদেরও একইভাবেই নির্যাতন করা হয়েছে। 

এই গবেষণায় উঠে এসেছে যে, রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর বাংলাদেশি ও অন্যান্যদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য পরিচয়পত্র আটকে রাখা হয়। তাদের ওপর এমন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় যাতে তারা পদত্যাগ করতে বা নিরাপদে দেশে ফিরতে না পারে। শাস্তির ভয় দেখিয়ে তাদের বারবার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে কখনও কখনও মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কাও থাকে।

ট্রুথ হাউন্ডস- এর গবেষক বলেন, “ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তাই আমরা তাদের কাছে এই বিষয়ে তথ্য চেয়েছিলাম। আমার ধারণা, প্রকৃত সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি, তবে ইউক্রেনের শনাক্ত করা তথ্যমতে, অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশিকে সরাসরি যুদ্ধের সামনের সারিতে মোতায়েন করা হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে ৩৪ জন ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন।” 

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া থেকে মানুষদের যুদ্ধক্ষেত্রে নিতে যাতে ঐ দেশ থেকে কোনো জটিলতায় পড়তে না হয়। সেজন্য দালালরা সবসময় সরাসরি তাদের রাশিয়ায় পাঠাতো না।  সৌদি আরব বা আরব আমিরাতের মতো অন্য কোনো দেশ হয়ে তারপর রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হতো। 

বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় মানব পাচারের রুট। ছবি: গবেষণা প্রতিবেদন

পালেরমো প্রটোকলে মানবপাচারের যে তিনটি উপাদান শনাক্ত করা আছে। কাউকে নিয়োগ, পরিবহন, স্থানান্তর, আশ্রয় দেওয়া বা নেওয়া, তারপর এসব কাজ যদি হুমকি দিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে, অথবা অপহরণ, জালিয়াতি, প্রতারণা বা কারও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে করা হয় এবং উদ্দেশ্য যদি হয় ওই ব্যক্তিকে শোষণ করা বা দাস হিসাবে কাজ করানো, তাহলে সেক্ষেত্রে তা মানবপাচার হিসাবে গণ্য হবে।

গবেষণায় যে ঘটনাগুলো নিয়ে কাজ করা হয়েছে, সেগুলো এই উপাদানগুলোর সাথে প্রায় পরোপুরি মিলে যায়। বিশেষ করে বাধ্যতামূলক সেবা বা শ্রমের উদ্দেশ্যে পাচার করা এবং কিছু ক্ষেত্রে দাসত্বে পরিণত করার সাথে। ২০০০ সালের মানব পাচারকে সংজ্ঞায়িত করে জাতিসংঘের এই চুক্তিতে রাশিয়াও স্বাক্ষর করেছিল।

চাকরি করে ভালো জীবনের আশায় রাশিয়া পাড়ি জমিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন এমন অনেকে বাংলাদেশি এখনও নিখোঁজ। তাদের ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বেধে আছেন স্বজনরা।

কিন্তু তাদের ‍খুঁজে বের করে দেবে কে? কার কাছে যাবেন, কাকে বলবেন তাও জানে না পরিবারগুলো।

এই গবেষণাপত্রের শেষে বাংলাদেশ, রাশিয়া ও ইউক্রেন সরকারের প্রতি কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে এই পাচার চক্রকে শনাক্ত করে বিচার নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।

একইসঙ্গে রাশিয়া বা ইউক্রেনে আটকা পড়া পাচারের শিকার বাংলাদেশিদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়।

গবেষণাটি প্রকাশের আগে এই সমস্যা ও সুপারিশগুলো নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করেছেন বলে জানান গবেষক মারিয়া তোমাক। এই বৈঠকে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে উল্লেখ করে মারিয়া বলেন, তিনি আশা করছেন এই সমস্যা সমাধানে তারা কার্যকরী ভূমিকা রাখবেন।

ইউক্রেন সরকারকে আটক হওয়া বিদেশি যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে কারা মানবপাচার বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার, তা শনাক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

অন্যদিকে রাশিয়ান সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয় যাতে দেশটি যেসব বিদেশি যোদ্ধাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে বা যারা সামরিক বাহিনী ছাড়তে চান, তাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং দ্রুত দেশে ফেরার ব্যবস্থা নিশ্চিত কর হয়।

একইসঙ্গে মানবপাচার, জবরদস্তি বা প্রতারণামূলক নিয়োগের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও নেটওয়ার্কগুলোকে তদন্তের আওতায় আনা হয় ও বিচার করা হয়।  

এই গবেষণার শেষে গবেষকরা জাতিসংঘ ও মানবপাচারবিরোধী বিভিন্ন সংস্থার কাছেও এ কাজে সহায়তা করার জন্য সুপারিশ করে।