ঢাবিতে ছাত্রশিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষ, কী হয়েছিল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘাতে মারধরের শিকার হয়েছেন ডাকসু নেতা এবি জুবায়ের ও মুসাদ্দেক আলী। দুজনই আগে থেকেই ক্যাম্পাসের নানা মবকাণ্ডে আলোচিত ছিলেন।

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি স্ক্রিনশটকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাবি ক্যাম্পাস সংলগ্ন শাহবাগ থানার সামনে সংঘাতে জড়িয়েছে ছাত্রদল ও ডাকসু নেতারা। একইসঙ্গে আবারও আলোচনায় এসেছে বিভিন্ন সময় মবকাণ্ডে অভিযুক্ত দুই ডাকসু নেতা এবি জুবায়ের ও  মুসাদ্দেকও। 

বৃহস্পতিবার শাহবাগ থানার সামনে মারধরের শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এই দুই নেতা। শিক্ষকের উপর প্রকাশ্যে মব করে আলোচনায় আসা এবি জুবায়েয়ের অভিযোগ, তিনি মবের শিকার হয়েছেন। 

মূলত ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জায়মা রহমানকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য সম্মিলিত একটি ছবিকে ঘিরে এ ঘটনার শুরু। ছড়িয়ে পড়া ছবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবির নেতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ফেসবুক আইডি থেকে পোস্টটি করতে দেখা গেছে। 

২৩এ এপ্রিল সন্ধ্যায় তিনি স্ক্রিনশটটিকে ভুয়া দাবি করে শাহবাগ থানায় জিডি করতে গিয়েছিলেন। এ সময় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হন। পরে রাত ৮টার দিকে শাহবাগ থানায় প্রবেশ করেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দেক আলী।

এ সময় আগে থেকে সেখানে অবস্থান করা ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের ঘিরে ধরেন। পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। 

কী হয়েছিল

ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর, এমনকি এআই-তৈরি কনটেন্টও ছড়ানো হয়েছে। 

তিনি ঢাবি শিবিরের সাবেক তথ্য প্রযুক্তি সম্পাদক ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র। তবে তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটটি ভুয়া বা সম্পাদিত।

ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রিউমার স্ক্যানারও স্ক্রিনশটটিকে ‘এডিটেড’ বলেছে এবং জানিয়েছে, ছবিটি মূলত অন্য একটি অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছিল। 

নিরাপত্তা শঙ্কার কথা উল্লেখ করে ২৩এ এপ্রিল সন্ধ্যায় শাহবাগ থানায় জেনারেল ডায়েরি (জিডি) করতে যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। তার সঙ্গে ছিলেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ এবং ফাতিমা তাসনিম জুমা। 

শাহবাগ থানার সামনে মারধরের শিকার হন ডাকসু নেতারা। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

একই সময়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও ওই পোস্টের ঘটনায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা করতে থানায় যান। ফলে শুরু থেকেই দুই পক্ষের উপস্থিতিতে থানার ভেতর ও বাইরে উত্তেজনা তৈরি হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের বর্ণনা অনুযায়ী, থানায় মুখোমুখি হওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে তর্ক-বিতর্ক, পরে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতি শুরু হয়। 

হামলার পর এ বি জুবায়ের ও মোসাদ্দিককে উদ্ধার করে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে নেওয়া হয়। সে সময় থানার সামনে ছাত্রদল কর্মীরা অবস্থান নেয়।

প্রায় এক ঘণ্টা তারা সেখানে আটকে ছিলেন। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে তাদের থানার জামে মসজিদের ফটক দিয়ে বের করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

উত্তেজনা সেখানেই থেমে থাকেনি। রাত সোয়া ৯টার দিকে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের নেতৃত্বে ডাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা শাহবাগ থানার সামনে জড়ো হন। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া ছাত্রদলকর্মীদের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়।

এ সময় পানির বোতল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি স্লোগানের ঘটনাও ঘটে। পরে শিবির-সমর্থিত অংশটি সেখান থেকে সরে গিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয় এবং পরে একটি মিছিল নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যায়।

এ বি জুবায়ের ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, ভুয়া স্ক্রিনশটকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষার্থীর ওপরে চড়াও হয় ছাত্রদল। তাকে সহযোগিতা করতে যাওয়া আরো কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সেখানে আটকে রাখা হয়। সূর্যসেন হল সংসদের সদস্য আলভিকে মারধর করা হয়। 

পোস্টে তিনি বলেন, “আমরা ডাকসুর প্রতিনিধি। শিক্ষার্থীদের বিপদে-আপদে আমাদের একটা রেসপনসেবলিটি আছে৷ মুসাদ্দিক, জুমা, উম্মে সালমা সহ ডাকসুর কয়েকজন প্রতিনিধি সেখানে যাই প্রশাসনের সাথে কথা বলে আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে আসতে।”

তবে থানায় ঢোকার মুখে গেইট থেকেই তাদের মারধর শুরু করে ছাত্রদলের কর্মীরা।  তার দাবি, “দুই শতাধিক স'ন্ত্রাসী ঘিরে ধরে বৃষ্টির মতো ঘুসি, কিল, লাথি মারতে থাক।”

আর ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, একটি কুরুচিপূর্ণ ও অশালীন ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সংলগ্ন শাহবাগ থানায় একটি ঘটনা ঘটেছে। 

ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এক ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, গুপ্ত রাজনীতি এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীল ফটোকার্ডকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটেছে।

তার দাবি, ছাত্রদল বিগত প্রায় ২ বছর যাবত শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রতিবাদ জারি রেখেছে। নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া তারা যেন কোন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি না করে। 

সাংবাদিকদের মারধর

এই সংঘাতে সাংবাদিকরাও আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। বৃহস্পতিবার রাতেই এক সংবাদ সম্মেলন করে তারা জানান অন্তত ১০ জন গণমাধ্যমকর্মী আহত হছেন। তারা ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন। প্রশাসনকে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছেন তারা। 

হামলার জন্য তারা ছাত্রদলের ওপর অভিযোগ এনেছেন। 

জবাবে ছাত্রদলের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগের তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।  

কে এই জুবায়ের ও  মুসাদ্দেক

ডাকসুতে নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই এবি জুবায়ের ও মুসাদ্দেক আলী ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ঘটনায় আলোচনায় ছিলেন। 

ডাকসু নির্বাচনে তারা দুজনই আংশিক স্বতন্ত্র প্যানেল গঠন করেন। এরপর দুজনই বিজয়ী হন। যদিও তাদের বিরুদ্ধে সব সময় ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল। 

তবে বারবারই সেটা অস্বীকার করেছেন তারা। 

বিভিন্ন মবে নেতৃত্ব দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তাদের নামে। ডাকসুতে নির্বাচিত হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভ্রাম্যমান দোকান, হকার, মাদকসেবী ও ভবঘুরে উচ্ছেদে অভিযান চালিয়ে আলোচনায় আসেন তারা। 

গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এবি জুবায়েরের পুরো নাম মোহাম্মদ জুবায়ের বিন নেসারী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী। থাকেন স্যার এএফ রহমান হলে। 

জুবায়ের অতীতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৫৮ বিশিষ্ট  কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য ছিলেন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। 

তবে তিনি ডাকসুতে বিজয়ী হওয়ার পর থেকেই বেশি আলোচনায় আসেন। বিশেষ করে একজন শিক্ষককের মারধরের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। 

২০২৫ সালের ১১ই ডিসেম্বর দুপুরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কয়েকজন শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে আসেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে কিছু শিক্ষার্থী সেখানে জড়ো হন এবং এক পর্যায়ে এবি জুবায়রের নেতৃত্বে অধ্যাপক জামালউদ্দিনকে তাড়া করা হয়।  

সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, অনুষদ ভবনের সিঁড়িতে এবি জুবায়ের অধ্যাপক জামালকে আটকানোর চেষ্টা করছেন। জামালউদ্দিন নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে নিচে নামলে জুবায়ের তার পিছু নেন।  

মুসাদ্দেক আলীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মুখ। এবি জুবায়ের সঙ্গে প্রায়ই দেখা যায় তাকে। মবের কিছু ঘটনায় তার নামটাও সামনে এসেছে। 

বাংলাদেশে প্রচুর ইউরেনিয়াম আছে তার এমন একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন মোসাদ্দেক। 

এরপর আরও কিছু ভিডিও ভাইরাল হতে থাকে তার। ডাকসুর সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক  মুসাদ্দেক আলী শেখ মুজিব হলের নাম মুছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর ভারতীয় হাই কমিশন ভবনের ইট খুলে নেওয়ারও হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।  

যে স্ক্রিনশট নিয়ে সংঘাতে শুরু, সেটি ভুয়া দাবি করা হলেও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। 

এ ছাড়া উদ্ভূত ঘটনায় তিন সদস্যের দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের অভ্যন্তরে দেয়াল লিখনে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।