সময়টা দেড় যুগেরও বেশি। সংসদ নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের মধ্যে ফিরেছে উৎসবের আবহ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আজ।
নানা বিতর্ক, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও বড় একটি দলের অনুপস্থিতির মধ্যেও বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা জনমতের নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
একজন প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় শেরপুর-৩ আসনে ভোট স্থগিত হয়েছে। তাই ভোটগ্রহণ হচ্ছে ২৯৯টি আসনে। অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন।
বুধবার রাতের মধ্যেই ঢাকাসহ সারা দেশের ৪২ হাজার ৬৫১টি ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে ব্যালট পেপার, বক্স, সিল, কালিসহ অন্যান্য নির্বাচনি সরঞ্জাম।
সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। ধানের শীষ প্রতীকের দলীয় প্রার্থী আছেন ২৯১টি আসনে। যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সমমনা দলগুলোকে আটটি আসনে ছাড় দিয়েছে বিএনপি।
আরেক বড় দল আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচন করার সুযোগ পায়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। নিবন্ধন স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশনও।
বিএনপির পর সর্বোচ্চ আসনে প্রার্থী দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তাদের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ২৫৮ জন প্রার্থী।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আছে ২২৪ জন। জামায়াতের জোটে থাকা এনসিপির প্রার্থী দিয়েছে ৩০ আসনে। এছাড়া জাতীয় পার্টির ১৯১ জন, গণঅধিকার পরিষদের ৯৪ জন প্রার্থী লড়ছেন ভোটে।
উৎসবের আমেজ
নির্বাচন উপলক্ষে ভোটারদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। শুক্র-শনি মিলিয়ে মোট চারদিনের ছুটি হওয়ায় ঢাকা ছেড়েছেন অসংখ্য মানুষ।
সাধারণ মানুষের কাছে ভোট একটা বিরাট ক্ষমতা বলে মত দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাকিল আনোয়ার। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের পর থেকে তারা ভোট দিতে পারেনি। তাই তাদের কাছে এটা উৎসবের মতো।

আগের নির্বাচনগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “২০১৪ সালে প্রধান বিরোধী দল ছিল না, ২০১৮ সালে বিএনপির মতে একটা দল যখন ৬টি আসন পায় তখনই বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আর ২০২৪ সালে এসে নির্বাচনের প্রতি মানুষের আগ্রহই চলে গেছে।”
“এবারের নির্বাচন তাই জনগণের কাছে আলাদা বলে মন্তব্য করেন তিনি”, যোগ করেন তিনি।
নিরাপত্তা উদ্বেগ
ভোটের দিনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মাঠে আছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এর মধ্যে সেনাসহ এক লাখেরও বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নির্বাচনে নিরাপত্তা দায়িত্বে আছেন। ভোটকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে যে তালিকা পাঠানো হয়েছে সেখানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৭৫ শতাংশের বেশি ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। দেশের সব ভোট কেন্দ্রের মধ্যে 'ঝুঁকিপূর্ণ' কেন্দ্র ৪০ শতাংশের ওপরে।
পুলিশ দাবি করেছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী মনে করেন, নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ আছে।
তিনি বলেন, “পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা নেই। সারাবিশ্বের মানুষই সামাজিক নিরাপত্তা ও বোঝাপড়ার ওপরে আস্থা রাখে। যখন এই বোঝাপড়া থাকবে না তখন পুলিশ আর্মি কিছু দিয়েই কাজ হবে না।”

“নির্বাচন একটা মহাযজ্ঞ। কত পুলিশ দিয়ে এই নিরাপত্তা ঠিক রাখবেন। সামাজিক বোঝাপড়াতো জরুরি। সেটাই নেই”, যোগ করেন সাইফুল আলম চৌধুরী।
তবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নেই বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাকিল আনোয়ার।
তিনি বলেন, “আমি যে পাঁচ-ছয়টা নির্বাচনি আসনে ঘুরেছি। সেখানে নিরাপত্তা নিয়ে কেউ তেমন উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। তারা চোখে এমন কিছু দেখছেন না যেখানে সহিংসতার আশঙ্কা আছে।”
অন্তবর্তীকালীন সরকারের গত ১৭ মাসে নিরাপত্তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি থাকার পরও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল সাধারণ মানুষ।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফাহাম আবদুস সালাম মনে করেন, রাজনৈতিক সরকার এলে পুলিশ আবার শক্ত ভূমিকা রাখতে পারবে। আলাপকে তিনি বলেন, “ইউ উইল বি সারপ্রাইজড এই পুলিশ নেক্সট পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট আসলে কিরকম এফিশিয়েন্ট হয়ে ওঠে।”
তিনি বলেন, “নতুন সরকার আসলে অর্গানিক মব এটা হয়তো বন্ধ করা যাবে না কিন্তু যেগুলো ‘প্ল্যানড পলিটিক্যাল মব’ সেটাকে বন্ধ করা যাবে।”
এই নির্বাচন কেন আলাদা
অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নির্বাচন কবে হবে সেই প্রশ্নই বারবার উঠছিল। তবে নির্বাচন নিয়ে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্য দেখা গেছে।
সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাকিল আনোয়ার বলেন, “বড় দলগুলো যেকোনো মূল্যে নির্বাচন চেয়েছে। বিএনপি চায়, জামায়াত যে চায় না তাও আমার মনে হয়নি। নির্বাচন নিয়ে তারা অনেক আগে থেকে কাজ করছেন।”
তবে এবারের নির্বাচন আদর্শ হবে না মত দিয়েই তিনি বলছেন, “এখানে বড় দল নেই, আওয়ামী লীগ নেই। ২০০১ সালে তারা হেরেছিল, একানব্বইয়ে হেরেছিল কিন্তু ভোটের সংখ্যা কিন্তু আওয়ামী লীগ-বিএনপির কাছাকাছিই। অর্থাৎ তাদের বড় অংশের ভোটার রয়েছে।”
তারপরও এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে করেন তিনি।
নির্বাচনি প্রচার ও ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা
২২এ জানুয়ারি থেকে ১০ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে এবারের নির্বাচনি প্রচার। সারা দেশের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ৪৬১টি নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ করার অভিযোগে ২৫৯টি মামলা দায়ের ও ৩২ লাখ ১৫ হাজার ৯৫০ টাকা জরিমানা করেছেন।
রাজপথে প্রচারের পাশাপাশি এবার অনলাইনে প্রচার ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে তা ভোটারদের কতটুকু আস্থা অর্জন করতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
শাকিল আনোয়ার বলেন, “সাধারণ মানুষরা বলছে আমরা শান্তিতে থাকতে চাই। কে কী দিচ্ছে, ফ্যামিলি কার্ড, চাকরি এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাথাবাথ্যা নেই। এগুলো তারা বিশ্বাসই করে না। তারা শুধু শান্তি চায়।”
তিনি আরও বলেন, “দিনমজুর মহিলা পর্যন্ত বলছেন আমাদের খেটে খেতে হবে। আমাদের যেন ঝামেলা সহ্য করতে না হয়। অর্থাৎ তারা সুশাসন চায়। যেই সরকারই আসুক না কেন এগুলোই তাদের নিশ্চিত করতে হবে।”
জুলাই আন্দোলনে সুশাসনের জন্যই আন্দোলন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সমালোচনা তীরে বিদ্ধ সরকার
বিগত সময়ে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা হয়েছে। নিরাপত্তা ইস্যু, সংস্কার কমিশন ও সবশেষ গণভোট নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছে অন্তবর্তীকালীন সরকার। বিশ্লেষকরাও বলছেন, সরকার জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
সংস্থাটি বলছে, এই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সীমান্ত হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানামুখী মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
শাকিল আনোয়ার বলেন, “এই সরকারকে সেনাবাহিনী সমর্থন দেয়নি। পুলিশ এখনো উঠে দাঁড়াতে পারেনি। আমলাতন্ত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি।”
১৬ বছরে তৈরি হওয়া পার্টিজান ব্যুরোক্রেসির পরিবর্তন হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মানুষের ভেতরে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।”
“তারা হয়তো সমর্থন পায়নি। কিন্তু তারা প্রায়োরিটি দিয়েছে কি-না সেটাও প্রশ্ন থেকে যায়।”
শাকিল আনোয়ার বলেন, “রাজনৈতিক সংস্কারে যতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, নিরাপত্তা নিয়ে ততটা দেননি। আগামী ৫০ বছরে রাজনৈতিক মানচিত্র কেমন হবে সেটা জরুরি ছিল, নাকি সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করা করা, সুশাসন তৈরি করা বেশি জরুরি ছিল।
গণভোট নিয়ে অন্তবর্তীকালীন সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন সাইফুল আলম চৌধুরী। তিনি মনে করেন, সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা করতে পারে না।
পরবর্তী ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা থেকে সরে এলেও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, “কোনো অপরাধ করে আদালতে গিয়ে বলার সুযোগ নেই যে আমি আইন জানতাম না।”
“আপনি যখন শপথ নিয়েছেন যে সংবিধান সমুন্নত রাখবেন, ওইটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। আপনি শপথ নিয়েছেন যে কোনো অনুরাগ-বিরাগ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন না। কিন্তু গত ১৮ মাসে ১৮০০ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনুরাগ-বিরাগ নিয়ে”, যোগ করে সাইফুল আলম চৌধুরী।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “এই সরকার সংস্কারের কথা বললেও সংস্কারের বিপরীতেও অবস্থান নিয়েছিল। আর এতে প্রধান বাধা ছিল আমলাতন্ত্র।”
তিনি বলেন, “সরকারের উপদেষ্টাদের সৎ সাহসের অভাব ছিল। উপদেষ্টারা যেসব সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন, তারা আসলেই সে সিদ্ধান্ত নেননি। তারা শুধু স্বাক্ষর করেছেন।”
এ ছাড়া বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি, তিন দলেরই অভিযোগ, উপদেষ্টাদের কেউ কেউ পক্ষপাতের চেষ্টা করেছেন।
তবে এতোসব শঙ্কা, সমালোচনার পরও দেশের মানুষ অপেক্ষায় নতুন দিনের। স্থিতিশীল বাংলাদেশের। অপেক্ষা ব্যালটে জনরায়ের।



