বেড়ে চলা জ্বালানি সংকটে কী ভাবছে সরকার?

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সংকট শুরু হতে পারে। হঠাৎই বেড়ে যেতে পারে দাম। এমন শঙ্কায় মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টায় দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে।

ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টায় দেখা গেছে মোটরসাইকেলের লম্বা লাইন। সেখানে তেল নিচ্ছিলেন পাঠাও চালক কামরুজ্জামান।

তিনি আলাপকে বলেন, “তেলের দাম নাকি বাড়বে, তাই ট্যাংক ফুল করে নিলাম। যদিও যে তেল ছিল তাতে আগামী দুই দিন চলতে পারতাম।”

বুধবার সকালের চিত্র আরও প্রকট। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে যানবাহনের লাইন কিন্তু নেই তেল।

এমন চিত্র দেখা গেল গাজীপুরের শ্রীপুরের আহমেদ ফিলিং স্টেশনে। ব্রিক্রেতার দাবি, “তেল কালকে রাতে আমাদের স্টকে যা ছিল, তিন দিনের তেল, একদিনে কাস্টমার শেষ করে ফেলেছে।”

জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বড় আঘাত আসতে পারে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়, গ্যাস রেশনিং, পাচার রোধসহ নানান পরিকল্পনা করছে সরকার।

সরকারকে দেশের ভেতরে সাশ্রয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মার্কেটে আগে থেকেই যোগাযোগের পরামর্শ দিচ্ছেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

“জ্বালানির সম্ভাব্য উৎস যেগুলো রয়েছে তা আগে থেকে যোগাযোগ করা না গেলে পরে দাম বাড়ার চাপ নিতে হবে। তখন বিডিং প্রাইস বাড়বে,” আলাপকে বলেছেন তিনি।

মজুত শঙ্কা কতটা?

দেশে বছরে ৭০ লাখ টনের আশেপাশে পেট্রোলিয়াম বা তরল জ্বালানি বি ক্রি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর ৯৮ শতাংশের মতো আমদানি করতে হয়।

বিপিসি’র ২রা মার্চ পর্যন্ত দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন ডিপোতে সব মিলিয়ে পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৭৬৫ টন।

এর মধ্যে ডিজেল রয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ১২৭ টন। যা দিয়ে দেশে ১৪ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

তাছাড়া ৩৪ হাজার ১৩৩ টন অকটেন রয়েছে যা দিয়ে চলবে ৩০ দিন।

অন্যদিকে পেট্রোল রয়েছে ২১ হাজার ৭০৫ টন, যা দেশের ২০ দিনের মজুত।

এছাড়া ১৬ হাজার ৫৪৮ টন কেরোসিন, ৩৮ হাজার ৭৭৭ টন জেট ফুয়েল, ৭৮ হাজার ২৭৮ টন ফার্নেস অয়েল, ৬ হাজার ২৭৫ টন মেরিন ফুয়েল মজুত রয়েছে।

চলতি মাসে জ্বালানি সংকট হবে না জানিয়ে বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, “এখন যে জ্বালানি আছে তা মার্চ মাস পর্যন্ত চলবে।”

গ্যাসে রেশনিংয়ের পরিকল্পনা সরকারের

জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান মজুত দিয়েই পরিস্থিতি সামলাতে হবে। সেজন্য বিভিন্ন সেক্টরে রেশনিং করার কথা ভাবছে সরকার।

রেশনিং হচ্ছে সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দুষ্প্রাপ্য পণ্য বা পরিষেবা জনসাধারণের মধ্যে সুপরিকল্পিতভাবে এবং সীমাবদ্ধ পরিমাণে বণ্টন করার ব্যবস্থা।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ভাষায়, “সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। ঈদের ছুটির সময়ে শিল্পকারখানার কার্যক্রম কমে গেলে বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে, ফলে চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে। বিভিন্ন খাতে গ্যাস সরবরাহ রেশনিং করা হবে।”

বর্তমানে দেশের প্রায় যে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে রয়েছে। এর মধ্যে ১৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দিয়ে শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি ও সিএনজি স্টেশনের চাহিদা মেটানো হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট যাচ্ছে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে।

যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চায় সরকার

“সম্ভাব্য সমস্যার কথা বিবেচনায় রেখে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের ইমেইল করা হয়েছে,” আলাপকে জানিয়েছেন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এর মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো: শফিকুল ইসলাম।

সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহেরও চেষ্টা করলেও ‘স্পট পারচেজে’ সেরকম সাড়া মিলছে না বলে ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী।

সব দিক বিবেচনা করে তাই দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলোচনা করে পল কাপুর বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে সরকারকে জানিয়েছেন।

বর্তমানে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন এই সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমানে রয়েছেন বাংলাদেশ সফর।

আরও যত ভাবনা সরকারের

ঈদকে সমনে রেখে দেশের শপিংমলগুলো আলোকসজ্জায় জ্বলে উঠেছে। তবে শিগগিরই আলোকসজ্জা বন্ধের নির্দেশনা আসতে পারে।

এদিকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ডিজেল বিক্রি কেবল বাড়ার শঙ্কা নয় এর পেছনে পাচার জড়িত থোকতে পারে বলে সীমান্তেও চোখ রাখছে সরকার।

“গত কয়েক দিনে ডিজেল বিক্রি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এ কারণে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,” বলেছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।