শিরীন শারমিন চৌধুরী এতদিন কোথায় ছিলেন?

সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ বলছে তাকে ধানমন্ডির একটি বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে। অথচ আইএসপিআর-এর একটি পুরনো তালিকা অনুযায়ী ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর সপরিবারে সেনাবাহিনীর কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি।

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম

সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের পর বিলুপ্ত হওয়া সংসদের স্পিকার ছিলেন। এরপর তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এক পর্যায়ে এমনও ধারণা করা হয়েছিল, তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।

গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর গণসংযোগ শাখা আইএসপিআর একটি তালিকা প্রকাশ করে যেখানে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের নিয়োগ করা যেসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও কর্মকর্তা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন তাদের মধ্যে শিরীন শারমিন চৌধুরী ছিলেন।

ডিবি অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম আলাপ-কে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ধানমন্ডির ৮/এ রোডের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেটি আসলে কার বাসা সেই ব্যাপারে তিনি কিছু জানাননি।

তবে ভোরবেলা গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করা কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে বাড়িটিকে শিরীন শারমিন চৌধুরীর বাসভবন বলে উল্লেখ করা হয়। 

পরে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর খবরে ডিবি পুলিশকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, সেটি ছিল শিরীন শারমিন চৌধুরীর চাচাতো ভাইয়ের বাসা।

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার জানিয়েছেন, লালবাগ থানার একটি মারামারি ও ভাঙচুরের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে তাকে আদালতে নেওয়ার কথা রয়েছে।

গ্রেপ্তারের পর শিরীন শারমিন চৌধুরীর এই ছবিটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

এতদিন কোথায় ছিলেন?

শিরীন শারমিন চৌধুরীর অবস্থানকে ঘিরে নানারকম আলোচনা ছিল অনেক দিন ধরেই।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই আত্মগোপনে চলে যান। সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হন।

তবে শিরীন শারমিন চৌধুরী আর প্রকাশ্যে আসেননি।

অনলাইন সংবাদপত্র বাংলা ট্রিবিউন সাবেক স্পিকারের দেখভালের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বরাত দিয়ে লিখেছে, “২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট বেলা দেড়টার দিকে সংসদ ভবন এলাকার সরকারি বাসভবন থেকে বের হন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। সপরিবারে একটি সাধারণ প্রাইভেট কারে করে তড়িঘড়ি বের হন তিনি। 

“এ সময় স্পিকারের জন্য বরাদ্দ গাড়ি ও সংসদ সচিবালয়ের পরিবহন পুল থেকে পাঠানো গাড়িও ব্যবহার করেননি। তবে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে তিনি কোথায় গেছেন তা বলতে পারনেনি তারা।"

২০২৫ সালের মে মাসে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া যে ৬২৬ জনের তালিকা প্রকাশ করেছিল সেখানে চার নম্বর নামটি ছিল শিরীন শারমিন চৌধুরীর। তিনি পরিবারসহ অবস্থান নিয়েছিলেন বলেও জানানো হয়েছিল।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, "মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড" থেকে তাদের জীবন রক্ষা করার জন্য আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল।

"পরিস্থিতি উন্নয়ন সাপেক্ষে আশ্রয় গ্রহণকারীদের বেশির ভাগই এক–দুই দিনের মধ্যে সেনানিবাস ত্যাগ করেন। এর মধ্যে পাঁচজনকে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বা মামলার ভিত্তিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়," ২০২৫ সালের ২২ মে আইএসপিআর-এর প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বলা হয়েছে।

এরপর থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরী কোথায় ছিলেন তা নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। তিনি দেশে আছেন, নাকি বিদেশে চলে গেছেন এ নিয়েও বিভিন্ন আলোচনা ছিল।

সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে যে তথ্য জানিয়ে ছিলেন তাতে  শিরীন শারমিন চোধুরীর কথাও উঠে এসেছিল।

তিনি বলেছিলেন, “বলা হচ্ছে, গত ৫ই অগাস্ট বাড্ডার খুনের ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত। একটা বিষয় আপনাকে (আদালত) জানিয়ে রাখি। গত বছরের ৫ই অগাস্ট বেলা ১১টার সময় আমি সংসদে অবস্থান করি। একটা পর্যায়ে আমরা সংসদে আক্রান্ত হই। একপর্যায়ে আমি, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারসহ ১২ জন সংসদের বিশেষ কক্ষে অবস্থান করতে বাধ্য হই। রাত আড়াইটার সময় সেনাবাহিনী আমাদের সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।”

তারপর থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরী কোথায় ছিলেন তার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এরপর মঙ্গলবার ভোরে তাকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় পুলিশ।

প্রথম নারী স্পিকার

জাতীয় সংসদে আসেন শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০০৯ সালে, সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসাবে। সেসময় তাকে দেওয়া হয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব।

নবম সংসদের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর সেই জায়গায় আসেন তখনকার স্পিকার আবদুল হামিদ।

এরপর ২০১৩ সালে ৩০এ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন চৌধুরী। তারপর থেকে টানা তিন মেয়াদে তিনিই ছিলেন স্পিকার।

২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরদিনই সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়া হলেও স্পিকারের পদ তাৎক্ষণিভাবে শূন্য হয় না। পরবর্তী স্পিকারের শপথ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থেকে যান।

তবে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ২৭ দিনের মাথায় ২রা সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। ফলে ৮ই অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানেও তিনি যাননি।

তার বিরুদ্ধে যত মামলা 

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিরীন শারমীন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলা ছিল। তবে এর মধ্যে তিনটি মামলা খারিজ হয়ে গেছে।

এসব মামলার মধ্যে অন্তত একটি হত্যা মামলা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। রংপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন (৩৮) হত্যা মামলার আসামী তিনি।

২০২৪ সালের ২৭এ আগস্ট রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি আমলি আদালতে শিরীন শারমিনসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছিলেন রংপুর শহরের পূর্ব গনেশপুর এলাকার নিহত মুসলিম উদ্দিনের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার।