ধনীদের ‘স্বর্গ’ দুবাই এখন অনিরাপদ ও আতঙ্কের নগরী, সোনালি দিন কি আর ফিরবে

করমুক্ত বিলাস, আকাশছোঁয়া অট্টালিকা আর ‘সবচেয়ে নিরাপদ’ তকমায় গড়া দুবাই হঠাৎই ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোনের হামলায় কেঁপে উঠেছে। বিমানবন্দর বন্ধ, হোটেলে আগুন, ধনীদের পালানোর হুড়োহুড়ি। প্রশ্ন উঠছে মরুদ্যানের সেই সোনালি দিন কি আর ফিরবে?

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম

করমুক্ত সুবিধা, কঠোর নিরাপত্তা, আর মরুভূমির বুকে বিলাসী জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধনীদের ‘স্বর্গ’ হিসেবে ব্র্যান্ড করা দুবাই যেন হঠাৎ করেই ভেঙে পড়েছে এক নির্মম বাস্তবতার মুখে।

যে শহরকে অস্থির মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরেও একখণ্ড স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হতো, এখন সেই শহরেই শোনা যাচ্ছে সাইরেন, বিস্ফোরণ আর আতঙ্কের খবর।

দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, কৃত্রিম দ্বীপ, বিশ্বমানের শপিং মল ও বিলাসবহুল রিসোর্ট—সব মিলিয়ে দুবাই নিজেকে পরিচিত করেছিল আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে। 

বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফা, বিলাসীতার আইকন বুর্জ আল আরব এবং বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর- এসবই ছিল আত্মপ্রচারের স্তম্ভ। 

তেল, সোনা ও রিয়েল এস্টেট বাণিজ্যের প্রভাবে শহরটি হয়ে ওঠে বৈশ্বিক পুঁজি ও পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র।

‘সিটি অব সুপারলেটিভস’ মানে-সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে উঁচু, সবচেয়ে বিলাসবহুল; এই তকমাই ছিল দুবাই ব্র্যান্ডের পরিচয়।

কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধে অভ্যস্ত আরব অঞ্চলের মধ্যেও তুলনামূলক উদার জীবনযাত্রা, করমুক্ত আয়ের সুযোগ এবং উচ্চমানের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি এই মরুদ্যানে টেনেছিল বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ধনীদের।

প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশি অধ্যুষিত এই মহানগর ছিল বৈশ্বিক নাগরিকদের মিলনস্থল।

কিন্তু সব হিসাবনিকাশ এলোমেলো হয়ে যায় গত ২৮এ ফেব্রুয়ারি, যখন ইরানে যৌথভাবে হামলা চালায় আমেরিকা ও ইসরায়েল। দ্রুত বদলাতে থাকে পরিস্থিতি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যার পর পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। সেই প্রতিশোধের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হয় দুবাই।

ইরানের হামলার পর ব্যস্ত মহানগর দুবাইয়ের রাস্তাঘাট, শপিংমল, সৈকত এলাকা জনশূন্য।

ইরান থেকে ছুটে যায় শত শত ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন। আকাশ থেকে যেন আলো ঝলমলে তারা নেমে আসছে মাটিতে। 

সেগুলোর বেশিরভাগই প্রতিহত করা গেছে। তারপরও কিছু আঘাত হেনেছে অভিজাত আবাসিক এলাকা ও বিলাসবহুল স্থাপনায়। আগুন ধরে যায় হোটেলে, হামলার মুখে পড়ে দুবাইয়ের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত বিমানবন্দরেও। 

যে নগরী ছিল ধনীদের নিরাপদ আশ্রয়, মাত্র একদিনের ব্যবধানেই সেখানে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছায়া। বন্ধ হচ্ছে হোটেল ও বিমানসেবা, ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ব্যস্ত সড়ক। বিদেশি বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে দেশ ছাড়ার প্রবণতা।

মধ্যপ্রাচ্যের ঝড়ো ভূরাজনীতির বাইরে বিলাসী জীবনের যে স্বপ্ন এতদিন ধরে দুবাই বিক্রি করেছে, তা এখন প্রশ্নের মুখে। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার যে ব্র্যান্ডিং দুবাইকে বানিয়েছিল বৈশ্বিক প্রতীকে- সেই ভিতও নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। 

ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোনের আঘাত কতটা

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৩রা মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) লক্ষ্য করে পর্যন্ত ইরান ১৭৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। 

এর মধ্যে ১৬১টি প্রতিহত করা হয়েছে এবং ১৩টি সাগরে গিয়ে পড়েছে। আরো আটটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যেগুলোর সবকটিই ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইউএই। 

একই সময়ে ইউএই লক্ষ্য করে ইরান উৎক্ষেপণ করেছে ৬৮৯টি ড্রোন। এরমধ্যে ৬৪৫টি প্রতিহত করলেও আঘাত হানে ৪৪টি।

ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় জ্বলছে দুবাইয়ের অভিজাত এলাকা।

সাতটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত ইউএই’র প্রধান দুটি শহর হলো দুবাই ও আবুধাবি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলোর সিংহভাগ টার্গিই ছিল দেশটির এই দুই শহর। 

গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হচ্ছে, প্রতিহত করার সময় ধ্বংসাবশেষ এবং কিছু ড্রোন আবুধাবি ও দুবাইয়ের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পড়ে বেসামরিক অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে। 

এপির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “একটি পাঁচতারকা রিসোর্টে আগুন লাগে, বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন হুমকির মুখে পড়ে এবং রাজধানী আবুধাবির বিমানবন্দরে একজন নিহত ও সাতজন আহত হন।” 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বিলাসবহুল বাংলোর জন্য বিখ্যাত কৃত্রিম দ্বীপ পাম জুমেইরার ফেয়ারমন্ট দ্য পাম হোটেলের বাইরে আগুন জ্বলছে।

অভিজাত বুর্জ আল আরব হোটেলের সামনে আগুনের লেলিহান শিখা দাউদাউ করছে। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু (২,৭২৩ ফুট) ভবন বুর্জ খলিফার কাছাকাছি এলাকায় আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে বলেও এপ্রির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

হামলায় আগুন লেগেছে দুবাইয়ের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও বড় শিপিং হাব জেবেল আলি সমুন্দ্রবন্দরে। এছাড়া দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত এবং সেখানে চারজন কর্মী আহত হন বলে এপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফ্লাইট বন্ধ রাখা নিয়ে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের বিবৃতি।

হামলার জেরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স এমিরেটস-এর সব ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, আঞ্চলিক আকাশসীমা বন্ধ থাকার কারণে দুবাই থেকে এবং দুবাইগামী এমিরেটসের সব নির্ধারিত ফ্লাইট ৪ঠা মার্চ পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।

এই অবস্থায় আটকে ধনকুবেররা দুবাই ছাড়ার জন্য হুড়োহুড়ি লাগিয়েছে। উচ্চমূল্যে প্রাইভেট জেটের ভাড়া করছেন তারা। 

লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ইরানের হামলা ও দুবাই বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে বিকল্প পথে, বিশেষ করে ব্যক্তিগত জেটে আমিরাত ছাড়ার হিড়িক পড়েছে।

“সাধারণত ঝলমলে এই শহর—যা বিলিয়নিয়ার, ইনফ্লুয়েন্সার এবং লাখো আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীর অবকাশকেন্দ্র—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার জবাবে ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং কয়েকটি আলোচিত হোটেল ও স্থাপনায় আঘাত হানার পর থেকেই চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে।”

অনেকে সড়কপথে সাড়ে চার ঘণ্টায় গাড়িতে করে দুবাই থেকে ওমানে চলে গেছেন। মাস্কাট থেকে বিমান ধরার চেষ্টা করছেন। 

অনেক ধনী যাচ্ছেন রিয়াদে। সেখান থেকে প্রাইভেট জেট ভাড়া করছেন। 

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বুধবার ডজনখানেক পুনর্বাসন ফ্লাইট ছাড়ার কথা ছিল। বিভিন্ন দেশ আটকে পড়া নিজেদের দশ হাজার নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছে।

দুবাইকে বলা হয় বিশ্বের ‘ইনফ্লুয়েন্সার রাজধানী’। কনটেন্ট নির্মাতা, এজেন্ট, প্রযোজক ও বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে।

বুধবারও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ আকাশসীমা প্রায় ফাঁকাই ছিল। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দুবাইসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান বিমানবন্দরগুলো পঞ্চম দিনের মতো বন্ধ রয়েছে। 

কোভিড-১৯ মহামারির পর ভ্রমণের জন্য এটিই সবচেয়ে ‘বড় সংকট’ বলে লিখেছে রয়টার্স। 

দুবাইয়ের পর্যটক ও বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

দুবাইকে বলা হয় বিশ্বের ‘ইনফ্লুয়েন্সার রাজধানী’। কনটেন্ট নির্মাতা, এজেন্ট, প্রযোজক ও বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে, যারা এই প্রতিভা ভান্ডারকে কাজে লাগাতে প্রস্তুত। 

পেশাদার কনটেন্ট পোস্টকারীদের একটি লাইসেন্স নিতে হয়। এতে খরচ হয় সর্বোচ্চ ৪,০০০ ডলার পর্যন্ত। 

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রচারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ‘বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান’ তকমাটি। 

শারজাহর আমেরিকান ইউনিভার্সিটির মিডিয়া বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোই হার্লি। তিনি ‘সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সিং ইন দ্য সিটি অব লাইকস: দুবাই অ্যান্ড দ্য পোস্ট ডিজিটাল কনডিশন’ নামে বই লিখেছেন। 

দ্য গার্ডিয়ানকে জোই হার্লি বলেন, “দেশকে প্রচারের জন্য দুবাই এবং সামগ্রিকভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত খুব কৌশলগতভাবে কনটেন্ট নির্মাতা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের ধারণাকে ব্যবহার করেছে। তারা ডিজিটাল সম্পদকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সামনে এক ধরনের আয়না তুলে ধরে এবং আমেরিকান স্বপ্নের বিকল্প হিসেবে একটি সাশ্রয়ী গন্তব্যস্থল তুলে ধরে।” 

কিন্তু হামলার পর ইনফ্লুয়েন্সারদের মনোভাব কি আগের মতো আছে? 

হার্লি বলেন, “মানুষ এখানে থাকতে আকৃষ্ট হয়েছিল। কারণ আগে এই অঞ্চলের মধ্যে এক নিরাপদ মরূদ্যান ছিল দুবাই। কিন্তু সেই ধারণা ভেঙে গেছে।” 

ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে দুবাইকে গ্রহের অন্যতম নিরাপদ স্থান হিসেবে তুলে ধরা এবং বিলাসী পরিবেশ ও ব্যবসাবান্ধব নীতিমালাও প্রচার করা করা হয়।

অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকতে পেরেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাণিজ্য ও পর্যটন সম্প্রসারণ করে নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছে। 

কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যে রূপ নিয়েছে তাতে দুবাইয়ে নিরাপত্তা নিয়ে মানুষ যে শঙ্কিত হবে, তা অনুধাবন করতে পারছে দেশটির সরকারও। 

সরকারি কর্মকর্তারা স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন এই বলে যে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের সেরাগুলোর একটি এবং তা দিয়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হচ্ছে। 

ইউএই’র আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রীম আল হাশিমি সিএনএন-কে বলেন, “আমি জানি অনেক বাসিন্দার জন্য এটি ভয়ের সময়। আমরা এ ধরনের উচ্চ শব্দ শুনতে অভ্যস্ত নই। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো প্রতিহত করারও শব্দ। কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা মূলত ধ্বংসাবশেষের কারণে।”

তবে সাম্প্রতিক অবস্থা দুবাইয়ের জন্য ‘চরম দুঃস্বপ্ন’ বলে মনে করছেন এজন বিশেষজ্ঞ। মানুষ এই শহরকে আগের মতো আস্থায় আর নিতে পারবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।  

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর পারস্য উপসাগর বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হলেন সিনজিয়া বিয়াঙ্কো। 

এক্স-এ লিখেছেন, “এটি দুবাইয়ের জন্য চূড়ান্ত দুঃস্বপ্ন। কারণ, অস্থির অঞ্চলের মধ্যে একটি নিরাপদ আশ্রয় হওয়াটাই ছিল এর মূল পরিচয়।” 

“বিপর্যয় কাটিয়ে থাকার কোনো উপায় হয়ত আছে, কিন্তু আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পথ নেই,” লিখেছেন এই বিশেষজ্ঞ। 

আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে ব্যবসায়িক কাজে দুবাই যান ক্রিস্টি এলমার। তিনি হোটেলের জানালা থেকে দূরে থাকছিলেন। এ কারণেই অনেকগুলো বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনার পরও নিজেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদই মনে হয়েছে তার। 

“মাঝে মাঝে অনেকগুলো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়—শত শত হতে পারে। এটা খুবই অস্বস্তিকর। কারণ, আমি বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ শুনতে অভ্যস্ত নই,” বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন তিনি।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর কেঁপে উঠেছে দুবাই। ‘সিটি অব সুপারলেটিভস’-এর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ব্র্যান্ডিং কি টিকে থাকবে?

দুবাইয়ের রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর বড় ক্রেতা ইউরোপ ও আমেরিকার ধনীরা। তাদের কাছে ঝলমলে সুউচ্চ ভবন ও সুইমিংপুলওয়ালা ভিলা বিক্রি করা হয়। 

ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে দুবাইকে গ্রহের অন্যতম নিরাপদ স্থান হিসেবে তুলে ধরা এবং বিলাসী পরিবেশ ও ব্যবসাবান্ধব নীতিমালাও প্রচার করা করা হয়। 

কিন্তু শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাত দুবাইয়ের সেই সুনাম নড়বড়ে করে ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

“গত রাতটা আমার কাছে পরাবাস্তবের মতো মনে হয়েছে। আকাশে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যেতে দেখছি।”

কথাগুলো বলেছেন ব্রিটিশ ঘোড়দৌড় প্রশিক্ষক জেমি ওসবোর্ন। তিনি এমিরেটস সুপার স্যাটারডে উপলক্ষে দুবাইয়ে গিয়েছিলেন।

২৩ বছর বয়সি মিয়া প্লেইনার সোশ্যাল মিডিয়া পরিকল্পনাকারী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন লন্ডনের একটি ফ্যাশন ও বিউটি-ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চ্যানেলে। 

অফিসের কর্মব্যস্ততা থেকে ‘বিরতি’ নিতে এক বন্ধুকে নিয়ে অবকাশযাপনে দুবাইয়ে গিয়েছিলেন। তারা যখন নৌকায় ঘুরছিলেন তখন শুরু হয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। 

কোস্ট গার্ড তাদের তীরে ফিরিয়ে আনেন। এরপর রাত কাটাতে হয় হোটেলের গ্যারেজে। সেখানে শোয়ার জন্য দেওয়া হয়, সুইমিং পুলের ডেক থেকে আনা সান লাউঞ্জ। 

মিয়া প্লেইনার নিজের সেই অভিজ্ঞতার ভিডিও ধারণ করে তা পোস্ট করেন বলে দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুবাই এমন একটি ব্র্যান্ডের গল্প-যে ব্র্যান্ডের ভিত্তি ছিল নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সীমাহীন সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার ভেতরে থেকেও নিজেকে আলাদা এক ‘মরুদ্যান’ হিসেবে তুলে ধরেছিল দুবাই।

কিন্তু ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে সেই ‘নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায়’ চিড় ধরেছে। 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বড় বিপর্যয় ঠেকাতে পারলেও, দুবাই যে ঝুঁকিমুক্ত নয়, এই বার্তাও ছড়িয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক পুঁজি, পর্যটন ও আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দুবাইয়ের অর্থনীতির জন্য এই বার্তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।