লেবাননকে ‘বাফার জোন’ বানিয়ে মানচিত্র বড় করতে চায় ইসরায়েল

যুদ্ধ বন্ধের উপায় খুঁজতে ইরানের সঙ্গে যখন আলোচনায় আমেরিকার প্রতিনিধিদল, ঠিক তখনই লেবাননে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে ইসরায়েল। ইতোমধ্যে সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী এবং সেই ভূখণ্ডকে ‘বাফার জোন’ হিসেবে ধরে রাখার পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ্যে বলছে তারা। এই দখল ও ‘বাফার জোন’ পরিকল্পনার প্রভাব কী হবে?

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৪ এএম

“ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চের একজন জোরালো সমর্থক। তিনি নিজেকে ধার্মিক ব্যক্তি বলেই দাবি করেন। পুতিন যেহেতু ধার্মিক মানুষ, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় ঈশ্বরের কাছে অনুযোগ জানান, হে ইশ্বর, ইউক্রেনে তুমি কয়েকটা পর্বত দিলে না কেন!” 

উপরের এই কথাগুলো লেখা হয়েছে ‘প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফি’ বইয়ের শুরুতেই, যে বই সারাবিশ্বে তুমুল জনপ্রিয় এবং নিউইয়র্ক টাইমস বেস্ট সেলার তালিকাতে জায়গা করে নিয়েছে। 

বইয়ের লেখক টিম মার্শাল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্রিটিশ সাংবাদিক। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। পরে সেইসব অভিজ্ঞতা থেকেই লিখেছেন কয়েকটি সাড়া জাগানো বই। 

পুতিনের দুশ্চিন্তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে টিম মার্শাল লিখেছেন, ইউক্রেনে তেমন কোনো পর্বত নেই। এর বদলে রয়েছে বিস্তীর্ণ উত্তর ইউরোপীয় সমভূমি।

আর এই সমতলভূমিই হলো রাশিয়ার দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ। পর্বতের মতো প্রাকৃতিক বাধা না থাকায় পশ্চিম ইউরোপ থেকে শত্রু দেশগুলো সমতলভূমি দিয়ে বারবার রাশিয়া আক্রমণ করেছে।

প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফিতে লেখা হয়েছে, “ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে এই দুশ্চিন্তা শুধু পুতিন বা রাশিয়ারই নয়। প্রাচীনকাল থেকেই দেশের সীমান্ত নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নেতারা এই ধরনের দুশ্চিন্তা করতে বাধ্য হয়েছেন। পুতিনের মতোই এমন চিন্তায় পড়তে হয়েছে সাবেক অ্যাথেনিয়, পারস্য এবং ব্যাবিলনের শাসকদেরকেও।” 

“যুগে যুগে যে এত যুদ্ধ হয়েছে, তার পেছনেও ভৌগোলিক অবস্থানের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। একটি দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনীতির ধরন, সামাজিক উন্নয়ন এসবের পেছনেও রয়েছে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণ,” লিখেছেন টিম মার্শাল। 

সমসাময়িক বিশ্ব ইতিহাসে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইসরায়েল। ১৯৪৮ সালে ইহুদি রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর অন্তত ৯টি বড় যুদ্ধ এবং অসংখ্য ছোট, বড় ও মাঝারি সংঘাতে জড়িয়েছে দেশটি। 

‘জটিল’ এক ভৌগোলিক কাঠামোর মধ্যে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর থেকে বিরামহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই যেন লক্ষ্য হয়ে দাড়িয়েছে। 

এর প্রভাবে গত ৭৮ বছরে ওই অঞ্চলের মানচিত্র বদলে যাচ্ছে, লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটছে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। 

ইসরায়েলের সর্বশেষ আগ্রাসন চলছে লেবাননে। বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে দেশটির ভেতরের ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত দখল করে নিয়েছে।  

ইরান যুদ্ধের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির সংকট নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে যখন আলোচনা চলছে, সেই সুযোগে ইসরায়েলের মানচিত্র নতুনভাবে আঁকার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। 

লেবাননের দখল করা ভূমি ছাড়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল এবং নিরাপত্তার জন্য সেখানে ‘বাফার জোন’ বা সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করবে তারা। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, ’গ্রেটার ইসরায়েল’ রাষ্ট্র গঠনের ‘স্বপ্ন’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সফল হলে এর প্রভাব পড়বে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে।

অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং ইসরায়েলের ‘কৌশল’ খাটিয়ে অন্যান্য শক্তিও ভূখণ্ড দখলের রাজনীতিতে জড়াতে পারে। 

এবারের হামলায় অন্তত ১ হাজার ২৩৮ জন নিহত এবং ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লেবাননে এখন কী হচ্ছে? 

ইসরায়েলে ‘হকিশ’ হিসেবে পরিচিত যেসব কট্টরপন্থি রাজনীতিবিদ রয়েছেন, তারা হেজবোল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান স্থল ও বিমান অভিযান আরো জোরদার করতে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। 

গত ৫ই এপ্রিল দেশটির ১৮ জন আইনপ্রণেতা প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আহ্বান জানান যে, লিতানি নদী পর্যন্ত লেবাননের দক্ষিণ অংশ পুরোপুরি দখল করে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সেখানকার নাগরিকদর সরিয়ে দিতে হবে। 

এর আগে ক্ষমতাসীন জোটের প্রভাবশালী কট্টরপন্থী নেতা ও ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ দাবি তোলেন যে, দক্ষিণ লেবাননকে সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। 

এসব ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে, যখন আকাশ ও স্থল দিয়ে লেবাননে রক্তক্ষয়ী অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। 

ইরানে হামলার মধ্যেই লেবাননে শুরু হয় আগ্রাসন। গত দোসরা মার্চ দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। একইসঙ্গে দেশজুড়ে চালানো হয় ব্যাপক বিমান হামলা। 

ইসরায়েলের যুক্তি, ইরানের হামলার প্রতিবাদে ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়েছে হেজবোল্লাহ। 

এখানে বলে রাখা যায়, ২০২৪ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরও তা ভেঙে নিয়মিত লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। 

এবারের হামলায় অন্তত ১ হাজার ২৩৮ জন নিহত এবং ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এট ফলে লেবাননের চলমান মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে ‘বাফার জোন’ (নিরাপত্তা বলয়) তৈরি করা হবে এবং যুদ্ধ শেষ হলেও অঞ্চলটির একটি বড় অংশে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে ইসরায়েল।

তিনি বলেছেন, দখল করা এলাকা দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই নদী ইসরাইল সীমান্ত থেকে ৩০ কিলোমিটার ভেতরে। 

এছাড়া ইসরায়েল সীমান্তের কাছে লেবাননের গ্রামগুলোর সব বাড়িঘর ধ্বংস করা হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছে কাটজ।  

ইসরায়েল ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে, লেবাননে সর্বশেষ স্থল অভিযান শুরুর আগে পালিয়ে যাওয়া নাগরিকদের আর ফিরে আসতে দেওয়া হবে না। 

ইসরায়েল রাষ্ট্রের শুরু থেকেই দক্ষিণ লেবাননের ভূরাজনীতিতেও লিতানি নদীর কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।

এই ধরনের নীতি ইসরায়েলের নতুন নয়। ১৯৪৮ সাল থেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি ও তাদের বংশধরদের প্রত্যাবর্তনের অধিকার বারবার অস্বীকার করে আসছে ইসরায়েল। 

এমন অবস্থার মধ্যে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

কারণ, ইরানের সঙ্গে  যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত করার সময় মধ্যস্থতাকারীরা মনে করেছিলেন, একই ঘটনা লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

কোন লক্ষ্য নিয়ে লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল, তা ফুটে উঠেছে আমেরিকান সাংবাদিক ফিলিপ ওয়েইস-এর ব্লগে। মনডোওয়েইস নামের ব্লগে ইসরাইল ও প্যালেস্টাইন বিষয়ে বিশ্লেষণী ও অনুসন্ধানমূলক নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়।

এক বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, লেবাননের বর্তমান আক্রমণের ধরণ অতীতের আগ্রাসনেরই পুনরাবৃত্তি। যেমন- দক্ষিণের গ্রামগুলো খালি করতে বেসামরিক লোকজনকে নির্দেশ দেওয়া, প্রায় ১০ লাখ লেবানিজের বাস্তুচ্যুতি হওয়া এবং অবকাঠামোতে হামলা করা।

লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত সীমানা বিস্তৃত করার যে কৌশল নিয়েছে ইসরায়েল, সেই নদীর ছয়টি সেতু এবারের হামলায় একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল। এই অঞ্চল নিয়েই বাফার জোন তৈরির পরিকল্পনা হচ্ছে।  

“অবকাঠামো ধ্বংস শুধু যুদ্ধকৌশল নয়। এটি ইসরায়েলের নতুন নীতির আরেকটি প্রকাশ। নতুন এলাকা দখল করা, অনেক ক্ষেত্রে জোরপূর্বক জনশূন্য করা এবং স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা। মূলত বাফার জোন তৈরির মাধ্যমে ইসরায়েলের সীমানা সম্প্রসারণের চেষ্টা,” লেখা হয়েছে ওই ব্লগে। 

এর আগে লেবাননে যেসব অভিযান চালানো হয়, তার তুলনায় এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

এমন এক সময়ে লেবাননে হামলা ও দখল চলছে, যখন উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো বিশ্ব। 

তাই ইসরায়েল এখন প্রকাশ্যেই বলছে, তারা স্থায়ীভাবে নতুন আরব ভূখণ্ড দখল করতে চায়। আর এটা ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণা নিয়ে তাদের দেওয়া বক্তব্যরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।

সিরিয়া, মিশর, লেবানন ও আরব অঞ্চলের বিস্তৃত ভূমি নিয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের জন্য শতাব্দীকাল থেকে প্রচারণা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। 

প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রেটার ইসরায়েলের ধারণা এলো কীভাবে এবং লেবানন কেন ভুক্তভোগী?

অমীমাংসিত সীমান্ত এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের বারবার সামরিক অভিযানের কারণে দেশটির পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত দুরুহ হয়ে উঠেছে। প্রকট হয়েছে মানবিক সংকট।

জায়নিজম ও দক্ষিণ লেবানন সংকট

প্রভাবশালী জায়নিস্ট নেতা এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত ডেভিড বেন গুরিয়ন ১৯১৮ সালে যুক্তি দেন যে, ইসরায়েলের সীমান্ত বর্তমানের সিরিয়া, মিশর, আরব উপসাগরের কিছু অংশ এবং উত্তর দিকে লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া উচিত।

বেকা উপত্যকা থেকে উৎপত্তি হওয়া ১০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ লিতানি হলো লেবাননের প্রধান নদী। 

দেশটির মিঠাপানির উৎস এই নদীটি কৃষি সেচের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। আর ইসরায়েল রাষ্ট্রের শুরু থেকেই দক্ষিণ লেবাননের ভূরাজনীতিতেও লিতানি নদীর কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯১৯ সালেও জায়নিস্ট সংগঠনের পক্ষ থেকে ‘প্যারিস শান্তি সম্মেলন’-এ ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র তৈরি পক্ষে দাবি তুলে ধরেন। 

তখন সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, এই রাষ্ট্রের একদিকের সীমানা লেবাননের সাইদা শহর থেকে লিতানি পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া উচিত।

শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সকে বৃহত্তর সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। আগে এই ছিলো অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। 

এই অঞ্চলগুলোকে একটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হয়, যা পরিচিত হয় ‘ম্যান্ডেট সিস্টেম’ নামে। 

ফরাসি ম্যান্ডেট দেশটিকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর বর্তমান লেবাননের সীমানা নির্ধারণ করা হয় ১৯২০ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর। এই সীমানা দেশটির দক্ষিণে সাইদা ও টায়ার শহর এবং লিতানি নদীর নিচে পর্যন্ত ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের ফিলিস্তিনের সীমানার সঙ্গে মিলিত হয়।

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে ১৯৪৮ সালে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে সাড়ে ৭ লাখ ফিলিস্তিনি। এরপর শুরু হয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। লেবাননের দক্ষিণের সাতটি গ্রাম দখল করে সেগুলোকে সংযুক্ত করে নেয় ইসরায়েল। 

পরের বছরই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ইসরায়েল ও লেবানন একটি অস্ত্রবিরতি রেখা নির্ধারণে সম্মত হয়। যদিও এটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র সীমা নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তি ছিল না। তবে এই অস্ত্রবিরতি রেখা কার্যত ছিলো সীমান্ত স্বীকৃতির একটি রূপ। 

কিন্তু পরিস্থিতি আবার বদলে যায় ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর। যদিও লেবানন ওই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়নি। কিন্তু ইসরায়েল তখন ১৯৪৯ সালের অস্ত্রবিরতি চুক্তিকে অকার্যকর হিসেবে দেখতে শুরু করে, এমনকি লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করে। 

১৯৭৮ সালে লেবানন থেকে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা ইসরায়েলে হামলা করে। এর জেরে লেবাননে আক্রমণ চালায় ইসরাইল এবং দক্ষিণাঞ্চল দখল করে। ওই অভিযানের নাম ছিলো ‘অপারেশন লিতানি’। 

২২ বছর লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল দখল করে রাখে ইসরায়েলি সেনারা। ২০০০ সালের ২৫শে মে সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয়। 

এরপর ‘ব্লু লাইন’ নামে ইসরায়েল ও লেবাননের মাঝে একটি সীমান্ত রেখা টেনে দেয় জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত না হলেও এটা দুই দেশের মধ্যে একটি কার্যকর সীমারেখা হিসেবে কাজ করে। 

একই সঙ্গে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে লেবাননের লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলকে একটি বাফার অঞ্চল তৈরি করে সেখানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন মোতায়েন করা হয়।

সীমান্ত প্রশ্নটি পুরোপুরি সমাধান হয়নি কখনোই। এর মধ্যেই পরিস্থিতি আরো জটিল হয় অর্থনৈতিক এক কারণে। ২০১০ সালে ভূমধ্যসাগরে আবিষ্কৃত হয় বিশাল আকারের লেভিয়াথন গ্যাস ফিল্ড। এটি ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। ধারণা করা হয়, সেখানে গ্যাসের মজুত থাকতে পারে ২২ ট্রিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি, যা বাংলাদেশের মোট গ্যাসের মজুদের দ্বিগুণেরও বেশি। 

বিপুল এই গ্যাস ভাণ্ডার সম্ভাব্য সামুদ্রিক সীমান্ত বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ করে। তবে ২০২২ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সমুদ্র সীমান্ত নিয়ে একটি চুক্তি করে ইসরায়েল ও লেবানন। গ্যাসক্ষেত্রটির পুরো মালিকানা ইসরায়েলের থেকে যায়। 

ওই শান্তিচুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সূচনা হিসেবে দেখেছিলেন অনেক বিশ্লেষক। তবে দীর্ঘদিনের স্থলসীমান্ত বিরোধ সংঘাত নিরসনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।  

বিশ্লেষকরা বলছেন, অমীমাংসিত সীমান্ত এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের বারবার সামরিক অভিযানের কারণে দেশটির পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত দুরুহ হয়ে উঠেছে। 

এর আরেক কারণ হলো- ইসরায়েলের বিরোধিতা করে ১৯৮৫ সালে গড়ে ওঠে ইরান সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবোল্লাহ। তখন থেকেই লেবাননের অভ্যন্তরীণ সামরিক পরিস্থিতিতে আধিপত্য বিস্তার করতে সংগঠনটি এবং বারবার ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে থাকে। 

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে ইসরায়েল ও হেজবোল্লাহর মধ্যে পালটাপালটি হামলা বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই সংঘাত রূপ নেয় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে। সেই যুদ্ধে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং এবং ১২ লাখেরও বেশি লেবানিজ বাস্তুচ্যুত হয়।

এরপর ২০২৪ সালের ২৭এ নভেম্বর ইসরায়েল ও হেজবোল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। কিন্তু এটাও বারবার লঙ্ঘিত হতে থাকে। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বেশি অভিযোগ ওঠে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। 

ইরান যুদ্ধের পর লেবাননে আবারও পূর্ণমাত্রায় শুরু হয়েছে ইসরাইলের আগ্রাসন এবং এখন তারা লিতানি নদী পর্যন্ত বাফার জোন ঘোষণা করতে চাচ্ছে।

সংবাদভিত্তিক গবেষণামূলক প্রতিবেদনের জন্য পরিচিত ডিজিটাল মিডিয়া ‘দ্য কনভারসেশন’-এর এক নিবন্ধের লেখা হয়েছে, “ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থিরা দেশটির সীমানা লিতানি নদী পর্যন্ত সম্প্রসারণের দাবি জানান। তবে এটিকে তারা সাধারণত ধর্মীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করেন এবং ইসরায়েলের উত্তর অংশের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেন।” 

“তবে বাস্তবে লিতানি নদী পর্যন্ত সীমান্ত বিস্তৃত হলে, ইসরায়েলে সীমিত মিঠা পানির সরবরাহ বাড়বে এবং বাড়তি চাহিদার মুখে থাকা ইসরায়েলের জন্য এই নদী হবে নতুন পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎসও।” 

বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী ৫০ শতাংশের বেশি এলাকা দখল করে রেখেছে। সেখানেে ‘ইয়েলো লাইন’ বরাবর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে। ম্যাপে সাদা অংশটুকু রয়েছে গাজা বাসীরাদের নিয়ন্ত্রণে।

গাজার ‘ইয়েলো লাইন’ লেবাননে প্রয়োগ

সাম্প্রতিক যুদ্ধে লেবাননের গ্রাম ও অবকাঠামোতে ব্যাপক বিস্ফোরণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। 

গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নিতে যে কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল, তার সঙ্গে লেবাননের কৌশলের ‘অনেকটাই মিল’ রয়েছে বলে মনডোওয়েইস-এর ব্লগে উল্লেখ করা হয়েছে। 

গাজার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্পষ্ট লক্ষ্য ছিল, নির্দিষ্ট এলাকাগুলো থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়া। যেমন- উত্তর গাজার বেইত হানুন ও বেইত লাহিয়া শহর এবং দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহর।

লেবাননে যুদ্ধ তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ স্পষ্ট করে দেন যে, গাজার মতোই ‘ধ্বংস ও জাতিগত’ উচ্ছেদের মডেল প্রয়োগ করা হবে সেখানে। 

সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘রাফাহ ও বেইত হানুন মডেল’ মডেল প্রয়োগ করা হবে লেবাননেও। 

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গাজার যে মডেলের কথা বলেছেন, তা ‘ইয়েলো জোন’ তৈরির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল। সেটা ছিলো, গাজা উপত্যকার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।

সেখানে ইসরায়েলি বাহিনী বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে ফিলিস্তিনিদের আল-মাওয়াসি ও দেইর আল-বালাহর মতো ঘনবসতিপূর্ণ তাঁবু শিবিরে পাঠিয়ে দেয়। 

যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ‘ইয়েলো লাইন’-এর পেছনের এলাকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সরে যাওয়ার কথা থাকলেও, গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান ওই ‘ইয়েলো লাইন’-কেই গাজার নতুন সীমান্ত হিসেবে ঘোষণা করেন।

মনডোওয়েইস-এর ব্লগে লেখা হয়েছে, “এর অর্থ হলো- বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু লেবাননের ভেতরে ১০ কিলোমিটার গভীর একটি বাফার জোন তৈরির যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা শুধু সামরিক কৌশল নয়। এটি প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনর্গঠনের একটি ঘোষণা।” 

“এখানে লেবাননের বাসিন্দাদের জন্য বসবাসের এলাকা অযোগ্য করে তোলা হবে এবং সেটিকে ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।” 

ভূমি দখলে নেওয়ার কৌশল খাটানো হচ্ছে সিরিয়াতেও। দেশটিতে লেবানন বা গাজার মতো ধ্বংসযজ্ঞ না চালালেও সেখানে নেওয়া হচ্ছে ভিন্ন কৌশল। 

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের তনের পর নতুন নতুন এলাকা দখল করেছে এবং সেখানে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। 

“ফলে লেবানন ও সিরিয়া মিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে, যা তথাকথিত ‘বাফার জোন’ তৈরির অংশ,” লেখা হয়েছে প্যালেস্টাইন ও ইসরায়েল বিশেষজ্ঞ ওই সাংবাদিকের ব্লগে। 

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট-এর এক বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, “বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী ৫০ শতাংশের বেশি এলাকা দখল করে রেখেছে। লেবাননে ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা অনির্দিষ্টকালের জন্য দখলে রাখার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। আর পশ্চিম তীরে, কোনো শান্তি চুক্তির ক্ষেত্রে জর্ডান নদীর পশ্চিম পাশের জর্ডান ভ্যালিকে বাফার জোন হিসেবে ধরে রাখার দাবি ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে।” 

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের বর্তমান কার্যক্রমে এটা পরিস্কার যে, গাজার মতো একই ধরনের ‘ইয়েলো লাইন’ নীতি দক্ষিণ লেবাননেও প্রয়োগ করতে চায় তারা। মানে, প্রথমে একটি অস্থায়ী ‘বাফার জোন’ তৈরি করে, পরে সেটিকে স্থায়ী সীমান্তে রূপ দেওয়া।

গাজার কৌশলে লেবাননে বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করে নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

নতুন করে লেবানন দখলের ঝুঁকি কতটা 

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৯টির মতো বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরায়েল। আর লেবাননেই হামলা করেছে সাতবার। 

কিন্তু লেবানন দখলের নতুন পরিকল্পনা অতীতের মতোই ইসরায়েলের জন্য অনেক রকমের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

কারণ, বাস্তুচ্যুতির ঘটনা পুরো লেবাননজুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। এতে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আর সংঘাত কেবল লেবাননের ভেতরেই সীমাবদ্ধ না থেকে তা প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে আঞ্চলিক  অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে তুলছে। এটা ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

কনভারসেশন-এর নিবন্ধে লেখা হয়েছে, “গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধ, সিরিয়ায় অভিযান এবং ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পূর্ণ দখল কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।” 

“ইসরায়েল বর্তমানে একাধিক চাপের মুখে রয়েছে–আন্তর্জাতিক সমর্থন কমে আসা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং লেবাননের ভেতরে সম্ভাব্য সহিংসতা ইতিহাস বলছে, এমন ধরনের উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বিপজ্জনক এবং অনেক সময় উলটো ফল বয়ে আনতে পারে।” 

প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের বিশ্লেষণ লেখা হয়েছে, ইসরায়েলের এই ‘দখলদারিত্ব’ আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং দেশটির ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।

“বরং এটি ইসরায়েলিদের–বিশেষ করে ইসরায়েলি সৈন্যদের আরো ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।” 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একমত হয় যে, কোনো দেশই বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অন্যের ভূখণ্ড দখল করতে পারবে না। 

এরপর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২ রেজ্যুলেশনে ১৯৬৭ সালের জুনে দখল করা অঞ্চল থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। 

“তবুও গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে পুরো বিশ্ব দেখছে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে শক্তি প্রয়োগ করে বড় বড় এলাকা দখল করছে,” লেখা হয়েছে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের বিশ্লেষণে।  

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়ে আমেরিকার আলোচনা শুরু করলেও ইসরায়েল সেই নীতি মানেনি। তারা লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় এবং আক্রমণ অব্যাহত রাখে। 

এই কৌশল নতুন এবং তা বিপজ্জনক পদ্ধতির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

“প্রথমে সামরিকভাবে বাস্তবতা তৈরি করা, যেখানে কোনো রাজনৈতিক বাধা থাকে না। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে দীর্ঘমেয়াদি ও একতরফা যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে সেই বাস্তবতাকে স্থায়ী রূপ দেওয়া হবে” মনডোওয়েইস-এর ব্লগে। 

“যদি লেবাননে এটি সফল হয়, তাহলে সিরিয়া বা পশ্চিম তীরের মতো অন্যান্য এলাকাতেও সহজেই এই কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।” 

আর ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্য শক্তিধর দেশগুলিও তাদের সংঘাতে একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

তারা বলছেন, ইসরায়েলের নতুন ভূখণ্ডগত নীতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পুনর্নির্ধারণের মধ্যেই আটকে থাকবে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে অন্যত্রও।

আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে সামরিক শক্তির মাধ্যমে বিশ্বকে নতুন আকার দেওয়ার প্রচেষ্টা চলতে পারে। 

দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং অন্যান্য প্রজেক্টাইল যখন ক্রমেই বেশি নির্ভুলভাবে দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে, তখন ‘বাফার জোন’-এর মতো প্রতিরক্ষামূলক ধারণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যকে সেকেলে, অর্থহীন ও ভুল হিসেবে মনে করা হচ্ছে। 

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে ইউক্রেনকে নিরপেক্ষ বাফার হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু সেই দেশই পরে তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং শেষমেষ শুরু হয় যুদ্ধ। 

প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, “প্রতিপক্ষ যেখানে থাকবেই, সেখানে আরো বেশি ভূখণ্ড দখলের বদলে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোনোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। গাজা ও লেবানন–উভয় ক্ষেত্রেই সমাধানের পথ আছে।

“কিন্তু ইসরায়েলি রাজনীতিবিদরা, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার সরকার বাস্তব অগ্রগতির চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী বলে মনে হয়।” 

তাই গাজা ও লেবাননে বাফার জোন দিয়ে নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সেখানে এমন এক রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভব, যা দিয়ে মানবিক সংকট ও সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করে ফেলা যাবে।

তবে এর জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে চলা, জবাবদিহির পরিবেশ সৃষ্টি এবং সর্বোপরি আন্তরিকর সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য নেতাদের মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। 

আর শান্তি স্থাপনের মাধ্যমে টেকসই সমাধানে না পৌঁছাতে পারলে অন্তহীন সহিংসতার চক্র সামনে অপেক্ষা করছে বলে মনে করা হচ্ছে।