“নির্বাচনের আগে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে রাজি বাংলাদেশ…যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই নীতি সাংঘর্ষিক নয়।”
নাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৬:৫২ পিএমআপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
তিনি বেরিয়ে যেতে যেতে শুধু বললেন, “বৈঠক ভালো হয়েছে”। তার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা অবশ্য তাই বলছিল।
সকাল নয়টার আগে থেকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড়। পল কাপুর আসবেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কলকাঠি তার হাতেই।
পুরো নাম সামির পল কাপুর। ভারতীয় বংশোদ্ভূত কাপুর নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক একাডেমিশিয়ান।
ইউনাইটেড স্টেটস নেভাল পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্কুলের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক বিভাগের এই অধ্যাপক শিক্ষক জীবন থেকে ছুটি নিয়ে যোগ দিয়েছেন স্টেট ডিপার্টমেন্টে।
তবে আগে থেকেই যুক্ত আছেন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সাথে। ২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি প্ল্যানিং স্টাফের দায়িত্বে ছিলেন।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া, ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের নানা মাত্রার আলোচনায় যুক্ত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ভারত ‘ট্র্যাক ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ’ কৌশলগত সংলাপ এবং দুই দেশের মধ্যে অন্যান্য প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ২০২৫ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব নেন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি হিসাবে।
প্রথমে প্রতিমন্ত্রী ও পরে মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন। গণমাধ্যমকর্মীরা আশা করেছিলেন কথা বলবেন তিনি।
বেরিয়ে যাওয়ার সময় শুধু তিনটি শব্দই বললেন, ‘বৈঠক ভালো হয়েছে’। বাংলাতেই বলেছেন।
পাশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বললেন, “পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসতে সব সময়ই ভালো লাগে”।
ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে পল কাপুর এই সফরে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের “কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী” করতে কাজ করবেন। এতে প্রাধান্য পাবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার এবং ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলের যৌথ স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার ইস্যু।
পল কাপুরের পূর্বসূরি ছিলেন ডনাল্ড লু। তার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আলোচ্য ইস্যুই ছিল মানবাধিকার,গণতন্ত্র ইত্যাদি।
ওইসব আলোচনার মধ্যে র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে। পরে সেই তালিকায় যোগ হয় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ।
বাইডেন প্রশাসনে তখন পল কাপুরের আসনে ছিলেন ডনাল্ড লু। চব্বিশের ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক হালচাল নিয়ে সরব ছিল স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশের সমালোচনা গিয়ে গড়িয়েছিল র্যাব ও এর ছয় কর্মকর্তার ওপর। সেই নির্বাচনও যে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়নি তাও স্পষ্ট করে জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর ওই বছরের মে মাসেই ঢাকায় আসেন ডনাল্ড লু। তখন পেছনে না তাকিয়ে সম্পর্ক সামনে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছিল ঢাকা-ওয়াশিংটনের তরফে। যদিও সম্পর্কের টানাপোড়েন কমেনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে গতি আসে। অস্বস্তি কেটে যায়।
সেপ্টেম্বরে ডনাল্ড লু ফের ঢাকা আসেন; বার্তা দিয়ে যান সুশাসন আর উন্নয়ন সহযোগিতার।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পরই দৃশ্যপট পালটে যায়। গণতন্ত্র-মানবাধিকারের জায়গা নেয় বাণিজ্য আর বাণিজ্য।
ট্রাম্পের ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ আর ‘ট্রেড ডিল’ হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি। বাংলাদেশও তাতে বাদ যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার তার শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করে। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা দেখা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন সব মহলেই।
নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট থাকায় চুক্তির সবটা প্রকাশও হয়নি। পল কাপুরের সফরে বাণিজ্য যে আলোচনার শীর্ষে থাকবে তা অনুমেয়ই ছিল।
তবে বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে অবশ্য সেই বার্তা নেই। সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন পল কাপুর।
সেখানেও পল কাপুর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেননি। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী কথা বলেছেন।
অবশ্য চুক্তির কোন পরিবর্তন প্রয়োজন হলে তা সম্ভব বলে মনে করিয়ে দিয়েছেন। “কোন চুক্তিই শেষ না। যদি মনে হয়ে কোন ধারার সংযোজন ও বিয়োজন হতে পারে। এর সুযোগ তো চুক্তিতে আছে।”
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় খানিকটা ভিন্নতা লক্ষণীয়। তিনি কথা বলেছেন শেষ বিকালে। পল কাপুর তার সাথে দেখা করেছেন সকালে। তারপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘুরে এসে সাংবাদিকেদের সাথে কথা বলেন তিনি।
ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, “নির্বাচনের আগে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে রাজি বাংলাদেশ…যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই নীতি সাংঘর্ষিক নয়।”
বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে পল কাপুর আশ্বস্ত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “১৯ শতাংশ ট্যারিফ যখন কার্যকর হবে তখন যেন তা আরো কিছুটা কমে সে বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছি। বাণিজ্যমন্ত্রীকেও পরামর্শ দেবো এটি নিয়ে কাজ করতে।”
পল কাপুর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন বাংলাদেশের নির্বাচন ‘এতটা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ’ হবে তা যুক্তরাষ্ট্রের ধারণাতেও ছিল না।
তিনি বলেন, “যুদ্ধ কবে বন্ধ করবে সেটাতো সম্পূর্ণভাবে তাদের হাতেও নাই।”
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন পল কাপুরের এই সফরে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু গুরুত্বের সাথে আলোচনা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যতোটা সম্ভব বিশ্ব সমর্থন নিশ্চিত করতে চাইবে।”
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের খুব বেশি ‘টেনশন’ নেই বলে মনে করেন মুন্সি ফয়েজ আহমেদ।
আলাপ-কে তিনি বলেছেন, “ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের বিবৃতিতে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নামই থাকেনি, তখন অবস্থানও স্পষ্ট হয়। এই বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের খুশি হয়ে যাওয়ার কথা।”
এই ধরনের সফর সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মুন্সি ফয়েজ আহমেদ। “আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র কোনদিকে যাবে তা নিয়ে ধারনা দেওয়া এবং সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কিভাবে তারা পাশে চায় সেই বার্তা এই সফরের মূল আলোচ্য বলে মনে হয়।”
মনে করা যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন গত ২১ জানুয়ারি ঢাকায় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানান।
গত বছরের অক্টোবরে মার্কিন সিনেটে তার নিয়োগের শুনানিতে ক্রিস্টেনসেন বলেছিলেন বাংলাদেশের ওপর চীনের প্রভাব তিনি ‘গুরুত্ব সহকারে’ দেখবেন।
ঢাকায় দায়িত্ব নিয়ে ওই কথাই মনে করিয়ে দেন।
তিনি বলেন,“আমি শুনানিতে যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আমি আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব, সরকারে যারা থাকবেন, সেটা অন্তর্বর্তী হোক বা নির্বাচিত সরকার। যদি বাংলাদেশ সরকার সেই পথে যেতে চায়, তাহলে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকিগুলো আমি স্পষ্টভাবে তুলে ধরব।"
চীনা দূতাবাস অবশ্য পরদিন, ২২ জানুয়ারিই ওই মন্তব্যকে “দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন” বলে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
পল কাপুরের এই সফরে এই আলোচনা ছিল কি-না তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। কূটনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এ নিয়ে আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক।
যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটি দ্বিপাক্ষিক সফর। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সম্পর্কের মধ্যে বাংলাদেশ পড়েনি।
তবে সব কিছু ছাপিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু এই আলোচনায় সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে বলে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। তাই পল কাপুরের সফরে মধ্যপ্রাচ্যের হাল অবস্থা নিয়ে স্বভাবতই গুরুত্ব পাবে।”
“পল কাপুর এমন এক সময় ঢাকা সফরে এলেন যখন মধ্যপ্রাচ্য সংকট ক্রমেই বাড়ছে। তাই ঢাকা তার আহ্বান জানিয়ে রাখবে।”
তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট কিভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত অবস্থান কী হবে বা কিভাবে সংকট কাটতে পারে তা নিয়ে পারস্পরিক আলাপ গুরুত্বপূর্ণ।”
তবে প্রফেসর সাহাব এনাম খান মনে করেন মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যু যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে তা নয়।
“বাণিজ্য যে এখন গুরুত্ব পাবে সেটা স্বাভাবিক। আর অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঠিক থাকলে বাকি বিষয়গুলো এমনিই এগিয়ে যাবে।”
পল কাপুর বৃহস্পতিবার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সাথে দেখা করবেন। কূটনৈতিক আলোচনার পর সেখানে রাজনৈতিক বার্তা বিনিময়ও আগামী দিনে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার গতিপথ ঠিক করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
বাণিজ্যচুক্তি অব্যাহত রাখবে ঢাকা, আশ্বস্ত হয়েছে ওয়াশিংটন
“নির্বাচনের আগে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে রাজি বাংলাদেশ…যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই নীতি সাংঘর্ষিক নয়।”
তিনি বেরিয়ে যেতে যেতে শুধু বললেন, “বৈঠক ভালো হয়েছে”। তার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা অবশ্য তাই বলছিল।
সকাল নয়টার আগে থেকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড়। পল কাপুর আসবেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কলকাঠি তার হাতেই।
পুরো নাম সামির পল কাপুর। ভারতীয় বংশোদ্ভূত কাপুর নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক একাডেমিশিয়ান।
ইউনাইটেড স্টেটস নেভাল পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্কুলের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক বিভাগের এই অধ্যাপক শিক্ষক জীবন থেকে ছুটি নিয়ে যোগ দিয়েছেন স্টেট ডিপার্টমেন্টে।
তবে আগে থেকেই যুক্ত আছেন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সাথে। ২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি প্ল্যানিং স্টাফের দায়িত্বে ছিলেন।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া, ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের নানা মাত্রার আলোচনায় যুক্ত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ভারত ‘ট্র্যাক ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ’ কৌশলগত সংলাপ এবং দুই দেশের মধ্যে অন্যান্য প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ২০২৫ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব নেন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি হিসাবে।
পল কাপুর ঢাকা পৌঁছেছেন মঙ্গলবার রাতে। বুধবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার সূচি জেনেই গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড় জমে।
প্রথমে প্রতিমন্ত্রী ও পরে মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন। গণমাধ্যমকর্মীরা আশা করেছিলেন কথা বলবেন তিনি।
বেরিয়ে যাওয়ার সময় শুধু তিনটি শব্দই বললেন, ‘বৈঠক ভালো হয়েছে’। বাংলাতেই বলেছেন।
পাশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বললেন, “পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসতে সব সময়ই ভালো লাগে”।
ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে পল কাপুর এই সফরে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের “কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী” করতে কাজ করবেন। এতে প্রাধান্য পাবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার এবং ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলের যৌথ স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার ইস্যু।
পল কাপুরের পূর্বসূরি ছিলেন ডনাল্ড লু। তার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আলোচ্য ইস্যুই ছিল মানবাধিকার,গণতন্ত্র ইত্যাদি।
ওইসব আলোচনার মধ্যে র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে। পরে সেই তালিকায় যোগ হয় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ।
বাইডেন প্রশাসনে তখন পল কাপুরের আসনে ছিলেন ডনাল্ড লু। চব্বিশের ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক হালচাল নিয়ে সরব ছিল স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশের সমালোচনা গিয়ে গড়িয়েছিল র্যাব ও এর ছয় কর্মকর্তার ওপর। সেই নির্বাচনও যে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়নি তাও স্পষ্ট করে জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর ওই বছরের মে মাসেই ঢাকায় আসেন ডনাল্ড লু। তখন পেছনে না তাকিয়ে সম্পর্ক সামনে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছিল ঢাকা-ওয়াশিংটনের তরফে। যদিও সম্পর্কের টানাপোড়েন কমেনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে গতি আসে। অস্বস্তি কেটে যায়।
সেপ্টেম্বরে ডনাল্ড লু ফের ঢাকা আসেন; বার্তা দিয়ে যান সুশাসন আর উন্নয়ন সহযোগিতার।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পরই দৃশ্যপট পালটে যায়। গণতন্ত্র-মানবাধিকারের জায়গা নেয় বাণিজ্য আর বাণিজ্য।
ট্রাম্পের ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ আর ‘ট্রেড ডিল’ হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি। বাংলাদেশও তাতে বাদ যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার তার শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করে। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা দেখা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন সব মহলেই।
নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট থাকায় চুক্তির সবটা প্রকাশও হয়নি। পল কাপুরের সফরে বাণিজ্য যে আলোচনার শীর্ষে থাকবে তা অনুমেয়ই ছিল।
তবে বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে অবশ্য সেই বার্তা নেই। সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন পল কাপুর।
সেখানেও পল কাপুর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেননি। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী কথা বলেছেন।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয়নি।”
অবশ্য চুক্তির কোন পরিবর্তন প্রয়োজন হলে তা সম্ভব বলে মনে করিয়ে দিয়েছেন। “কোন চুক্তিই শেষ না। যদি মনে হয়ে কোন ধারার সংযোজন ও বিয়োজন হতে পারে। এর সুযোগ তো চুক্তিতে আছে।”
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় খানিকটা ভিন্নতা লক্ষণীয়। তিনি কথা বলেছেন শেষ বিকালে। পল কাপুর তার সাথে দেখা করেছেন সকালে। তারপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘুরে এসে সাংবাদিকেদের সাথে কথা বলেন তিনি।
ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, “নির্বাচনের আগে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে রাজি বাংলাদেশ…যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই নীতি সাংঘর্ষিক নয়।”
বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে পল কাপুর আশ্বস্ত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “১৯ শতাংশ ট্যারিফ যখন কার্যকর হবে তখন যেন তা আরো কিছুটা কমে সে বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছি। বাণিজ্যমন্ত্রীকেও পরামর্শ দেবো এটি নিয়ে কাজ করতে।”
পল কাপুর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন বাংলাদেশের নির্বাচন ‘এতটা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ’ হবে তা যুক্তরাষ্ট্রের ধারণাতেও ছিল না।
মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুও এসেছে আলোচনায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট কাটানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, “যুদ্ধ কবে বন্ধ করবে সেটাতো সম্পূর্ণভাবে তাদের হাতেও নাই।”
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন পল কাপুরের এই সফরে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু গুরুত্বের সাথে আলোচনা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যতোটা সম্ভব বিশ্ব সমর্থন নিশ্চিত করতে চাইবে।”
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের খুব বেশি ‘টেনশন’ নেই বলে মনে করেন মুন্সি ফয়েজ আহমেদ।
আলাপ-কে তিনি বলেছেন, “ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের বিবৃতিতে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নামই থাকেনি, তখন অবস্থানও স্পষ্ট হয়। এই বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের খুশি হয়ে যাওয়ার কথা।”
এই ধরনের সফর সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মুন্সি ফয়েজ আহমেদ। “আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র কোনদিকে যাবে তা নিয়ে ধারনা দেওয়া এবং সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কিভাবে তারা পাশে চায় সেই বার্তা এই সফরের মূল আলোচ্য বলে মনে হয়।”
মনে করা যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন গত ২১ জানুয়ারি ঢাকায় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানান।
গত বছরের অক্টোবরে মার্কিন সিনেটে তার নিয়োগের শুনানিতে ক্রিস্টেনসেন বলেছিলেন বাংলাদেশের ওপর চীনের প্রভাব তিনি ‘গুরুত্ব সহকারে’ দেখবেন।
ঢাকায় দায়িত্ব নিয়ে ওই কথাই মনে করিয়ে দেন।
তিনি বলেন,“আমি শুনানিতে যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আমি আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব, সরকারে যারা থাকবেন, সেটা অন্তর্বর্তী হোক বা নির্বাচিত সরকার। যদি বাংলাদেশ সরকার সেই পথে যেতে চায়, তাহলে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকিগুলো আমি স্পষ্টভাবে তুলে ধরব।"
চীনা দূতাবাস অবশ্য পরদিন, ২২ জানুয়ারিই ওই মন্তব্যকে “দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন” বলে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
পল কাপুরের এই সফরে এই আলোচনা ছিল কি-না তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। কূটনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এ নিয়ে আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক।
যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটি দ্বিপাক্ষিক সফর। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সম্পর্কের মধ্যে বাংলাদেশ পড়েনি।
তবে সব কিছু ছাপিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু এই আলোচনায় সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে বলে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। তাই পল কাপুরের সফরে মধ্যপ্রাচ্যের হাল অবস্থা নিয়ে স্বভাবতই গুরুত্ব পাবে।”
“পল কাপুর এমন এক সময় ঢাকা সফরে এলেন যখন মধ্যপ্রাচ্য সংকট ক্রমেই বাড়ছে। তাই ঢাকা তার আহ্বান জানিয়ে রাখবে।”
তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট কিভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত অবস্থান কী হবে বা কিভাবে সংকট কাটতে পারে তা নিয়ে পারস্পরিক আলাপ গুরুত্বপূর্ণ।”
তবে প্রফেসর সাহাব এনাম খান মনে করেন মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যু যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে তা নয়।
“বাণিজ্য যে এখন গুরুত্ব পাবে সেটা স্বাভাবিক। আর অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঠিক থাকলে বাকি বিষয়গুলো এমনিই এগিয়ে যাবে।”
পল কাপুর বৃহস্পতিবার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সাথে দেখা করবেন। কূটনৈতিক আলোচনার পর সেখানে রাজনৈতিক বার্তা বিনিময়ও আগামী দিনে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার গতিপথ ঠিক করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।