বিবাদ মেটানোর ক্রীড়াই যখন বিভাজন চরমে নিলো

“এর আগেও এমন অনেক পরিস্থিতি হয়েছে। কিন্তু খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি কেউ। এটাতো ভারতের খেলা না, আইসিসির খেলা। নেগোসিয়েশনের কাজটা ছিল ক্রিকেট বোর্ডের। সরকারের অবস্থানতো থাকবেই। কিন্তু বিসিবি কী করলো?”

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম

পিংপং ডিপ্লোমেসির নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই অনেকে। তবু একটু মনে করিয়ে দেই। কিভাবে একটা খেলা হয়ে ‍উঠেছিলো দুইটি দেশের রাজনৈতিক বিবাদ মোচনের চাবিকাঠি।

১৯৪৯ সালে চীনে গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক শীতল হয়ে ওঠে।

পরের বছর কোরিয়ান যুদ্ধে উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন দেওয়ায় সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। দুই দেশের মধ্যে কোনও কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল না।

দুই দশক ধরে চলে এই শীতলতা। দুই রাষ্ট্রই এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন বোধ করছিলো, কিন্তু উপায় মিলছিলো না।

১৯৭১ সালে জাপানে বিশ্ব টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ চলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ১৯ বছর বয়সী খেলোয়াড় গ্লেন কোয়ান ভুল করে চীনের খেলোয়াড় বহন করা বাসে উঠে বসেন।

বাসে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। দুই পক্ষই খানিক বিব্রত হয়। নীরবতা ভাঙেন চীনের সেরা খেলোয়াড় জোয়াং সেতুং। কোয়ানকে চীনের হুয়াংশেন পর্বতমালার একটি ছবি উপহার দেন তিনি।

পরদিন কোয়ানও জোয়াংকে শান্তিচিহ্নযুক্ত একটি টি-শার্ট উপহার দেন। তাতে বিটলসের বিখ্যাত গান ‘লেট ইট বি’-এর কথা লেখা ছিল।

ঘটনাটি গণমাধ্যমের নজর কাড়ে। এড়াতে পারেননি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সেতুং। এই ঘটনাটিই মোড় ঘুরিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সম্পর্ক।

মাও সেতুং যুক্তরাষ্ট্রের টেবিল টেনিস দলকে চীনে আমন্ত্রণ জানান। সব খরচ বহন করে স্বাগতিক দেশ। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বরফ গলতে শুরু করে দুই দেশের।

যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়রা চীনের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেন। তাদের সফর চলা অবস্থায়ই প্রেসিডেন্ট নিক্সন চীনের ওপর থাকা ভ্রমণ ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন।

প্রেসিডেন্ট নিক্সন নিজেই প্রথম চীন সফর করেন। শেষমেষ ১৯৭৯ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হয়। দুই দেশ হয়ে ওঠে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার।

২০০১ সালে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি গিয়ে দাঁড়ায় ১০০ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৩ সালে তা ছাড়িয়েছে ৪০০ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে যতোই ঝই-ঝামেলা থাক, কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট হয়নি, বরং বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বেড়েছে।

বাংলাদেশ-আর্জেন্টিনা

খেলা কিভাবে দুই দেশকে কাছে টানে তার উদাহরণ আছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। যেখানে কূটনীতির মাধ্যম ছিল ফুটবল।

আর্জেন্টিনার সাথে ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হয় বাংলাদেশের। কিন্তু ১৯৭৮ সালে দেশটি ঢাকায় তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দেয়।

আর্জেন্টিনার ভিসা নিতে বাংলাদেশিদের যেতে হতো ভারতের দিল্লিতে। পৃথিবীর দুই প্রান্তে থাকা দুই দেশের সেতুবন্ধন ছিল ফুটবল।

২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ চলার সময় বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার জাতীয় ফুটবল দলের প্রতি বিপুল সমর্থন বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। আর্জেন্টিনারও নজর এড়ায়নি।

বিশ্বকাপ চলাকালীনই আর্জেন্টিনা ঘোষণা দেয় ফের বাংলাদেশে তাদের দূতাবাস পুনরায় খুলবে। সেই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

উল্টোরথে বাংলাদেশ-ভারত

যে খেলা বিশ্বজুড়ে সম্পর্ক তৈরি আর উন্নয়নের হাতিয়ার, বাংলাদেশ ভারতের ক্ষেত্রে তাই যেন হয়ে উঠলো বিভাজনের অস্ত্র।

আইপিএলে মুস্তাফিজ বাদ পড়া দিয়ে শুরু। ঢাকায় হওয়া অ্যাম্বাসি ফুটবল ফেস্টেও অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষমেষ তা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে ভারত।

ঢাকায় এই অ্যাম্বাসি ফুটবল ফেস্টের এবার ছিল ষষ্ঠ আসর। শুরুতে ভারতের অংশ নেওয়ার কথা বললেও পরে তারা আর খেলেনি।

জানতে চেয়েছিলাম ফুটবল ফেস্টের আয়োজক গেমপ্লে লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাকসুম-উল-হোসেনের কাছে।

তিনি বলছিলেন, “ভারত আর আগে পাঁচ আসরের চারটিতেই অংশ নিয়েছে। এবারও অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে শেষে এসে তারা খেলোয়াড় স্বল্পতার কথা বলে দল প্রত্যাহার করেছে।”

দিন কয়েক আগেই বাংলাদেশকে ‘নন-ফ্যামিলি মিশন’ ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। অর্থাৎ দেশটির কূটনীতিক ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে থাকবেন না।

যারা ছিলেন তারাও ফিরে যাবেন। এরই মধ্যে গেছেন অনেকে। এজন্যই এই খেলোয়াড় স্বল্পতার কথা জানা গেছে।

অ্যাম্বাসি ফুটবল ফেস্টের মতো ঘরোয়া একটি টুর্নামেন্টেও যখন ভারত খেলতে নারাজ হয় তখন বিষয়টির গভীরতা উদ্বেগজনক।

শুরুটা আইপিএলে

কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্কোয়াডে ৯ কোটি ২০ লাখ রূপিতে যুক্ত হয় বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। কিন্তু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে তাকে বাদ দিতে নির্দেশনা দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)।

এই সিদ্ধান্তের জেরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। নিরাপত্তা সংকটের কারণেই এমন সিদ্ধান্ত।

ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় খেলতে চেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই অনুরোধ ধোপে টেকেনি আইসিসির কাছে।

এরপর অনেক জল গড়িয়েছে। চিঠি চালাচালি হয়েছে। শেষ বেলায় সিদ্ধান্ত হলো বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবেই না। খেলবে স্কটল্যান্ড।

এ নিয়ে ক্রীড়া সাংবাদিক রানা হাসান বলছিলেন, “এটা দুঃখজনক। এখনকার পরিস্থিতি আমরা কোনোদিন দেখিনি। এটা একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি।”

“খেলা পৃথিবীজুড়েই সফট ডিপ্লোমেসির অংশ। দক্ষিণ এশিয়াতেও এটা ছিল। দুই দেশের মধ্যে কিছু হলেই খেলা হয়ে উঠতো সমাধানের উপায়। কিন্তু এবার যা হলো তা অকল্পনীয়”, যোগ করেন তিনি।

“এর আগেও এমন অনেক পরিস্থিতি হয়েছে। কিন্তু খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি কেউ। এটাতো ভারতের খেলা না, আইসিসির খেলা। নেগোসিয়েশনের কাজটা ছিল ক্রিকেট বোর্ডের। সরকারের অবস্থানতো থাকবেই। কিন্তু বিসিবি কী করলো?”, প্রশ্ন রানা হাসানের।

তিনি বলেন, “ভারত মুস্তাফিজকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না জানিয়ে বাদ দিয়েছে। বাংলাদেশতো নিরাপত্তা দিতে পারবে বলে নিজের খেলোয়াড় সাকিব আল হাসানকেই দেশে আসতে দিতে পারেনি। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইস্যু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খাটে না।”

“আমরা না খেলতে পারি, যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারি। কিন্তু দিন শেষে লসটা ক্রিকেটের”, উষ্মা জানিয়ে যোগ করেন রানা হাসান।

আরেক সাংবাদিক নোমান মোহাম্মদ বলেন, “দুই পক্ষ থেকেই যেসব সিদ্ধান্ত এসেছে সবগুলোই ছিল ’শকিং এবং পলিটিকস ড্রিভেন’। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সামনে নির্বাচন। মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল বাংলাদেশবিরোধী কার্ড। আবার বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ভারতবিরোধী কার্ড।”

ভারতের ক্রীড়া সাংবাদিক বরিয়া মজুমদার ফেইসবুকে লিখেছেন, “রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনই শেষ পর্যন্ত জিতে গেল।”

আসলেই কি তাই? বিবাদ মেটানোর ক্রীড়া যেন বিভাজন বাড়ালো। খেলাধূলাকে হারিয়ে জিতে গেল রাজনীতি।