ভোট যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে রাজনৈতিক দোলাচল ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জরিপ, মাঠের হিসাব আর প্রচারণার গতি-সব মিলিয়ে এমন ওঠানামা, রাজনৈতিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘মোমেন্টাম’ বা ‘ইলেক্টোরাল ভোলাটিলিটি’।
পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যে জামায়াতের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের মেলামেশা বেড়েছে। সম্প্রতি একের পর এক বৈঠকের খবর আসছে। ফাঁস হয়েছে গোপন বৈঠকের তথ্যও।
এসব বৈঠক নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তার ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থাকা বাংলাদেশের ইসলামপন্থি সবচেয়ে বড় দল জামায়াতে ইসলামী এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশবিরোধী ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামী ঐতিহাসিকভাবে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সেই দলটিই এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে।
কাতারভিত্তিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম আল জাজিরা এই পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছে রাজনৈতিক ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে।
অর্থাৎ, জামায়াতে ইসলামীকে কেন্দ্র করে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অবস্থান পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করে নিচ্ছে।
‘লিটমাস টেস্ট’ শব্দটি ব্যবহার হয় মূলত রাসায়নিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে। তবে রাজনীতিতে এর রূপক অর্থ আরও গভীর। এখানে এটিকে বোঝানো হয়-কোনো পক্ষ বা শক্তিকে বড় সিদ্ধান্তের আগে যাচাই করে দেখার চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটের মাঠে জামায়াতের সম্ভাব্য শক্ত অবস্থানের আভাস পেয়েই বিদেশি রাষ্ট্রগুলো তাদের কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। এটি যেমন ভবিষ্যৎ ক্ষমতার বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা, তেমনি নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের সম্পর্ক কেমন হবে, তারও আগাম প্রস্তুতি।
কূটনীতিকদের সঙ্গে ঘনঘন বৈঠক

জাতীয় নির্বাচনের প্রচারের উত্তাপ যখন সবেমাত্র ছড়াতে শুরু করেছে, তখনই গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের এক নীরব কূটনৈতিক বার্তা নিয়ে বাংলাদেশে শুরু হয় নতুন করে বিতর্ক।
আমেরিকার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ গড়তে আগ্রহী ওয়াশিংটন।
এই তথ্য সামনে আসার পর বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জামাতের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব, আসন্ন নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল এবং ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েন, সবকিছু মিলিয়েই নতুন এক শক্তির সমীকরণ পরিষ্কার হয়ে উঠছে ওই প্রতিবেদনে।
ওয়াশিংটনের আলোচনার মধ্যেই ঢাকায় ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে দেখা যায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের।
শনিবার রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ভারতীয় হাইকমিশন। সেখানে ছিলেন বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা।
ওই অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন অংশ নেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলকে স্বাগত জানান প্রণয় ভার্মা। গোলাম পরওয়ার দলটির আমীর শফিকুর রহমানের পক্ষ থেকে ভারতের জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তাদের সুখ-সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করেন।
একজন কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানাচ্ছেন, সাম্প্রতিক অতীতে ভারতীয় হাইকমিশনের অনুষ্ঠানে জামায়াত নেতাদের এমনভাবে দেখা যায়নি।
এর আগে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সাথে ভারতের একজন কূটনীতিকের বৈঠকের খবর সামনে চলে আসায় আলোচনার জন্ম দেয়।
রোববার আরও দুটি প্রভাবশালী দেশের প্রতিনিধি শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বসুন্ধরায় জামায়াতের আমীরের কার্যালয়ে গিয়ে বৈঠক করেন ব্রিটিশ হাই কমিশনার সারাহ কুক।
বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে দিল্লিতে কয়েক দফা বৈঠক করে বাংলাদেশের ফেরার পর এই সাক্ষাৎ হলো।
একইদিনে শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লেট।
কেন জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বিদেশিদের বৈঠক?

বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নির্বাচনেই সুবিধা করতে পারেনি জামায়াতে ইসলামী, এমনকি সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটগুলোতে জামায়াতের পক্ষে ছিলেন ১২ শতাংশের আশেপাশের ভোটার।
চব্বিশের অগাস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। ভোটে অংশ নিতে পারেনি দলটি।
এই অবস্থার মধ্যে ‘সক্রিয়ভাবে’ মাঠে উপস্থিত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এক সময় ভোটের মাঠে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকলেও, এবার দলটির বিরুদ্ধেই জোট গড়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে জামায়াত।
ভোটের মাঠের দৌড়ে ‘দুটো ঘোড়া’র একটি হওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে বিদেশিদের কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে বলে মনে করছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ।
“সবাই মনে করছে যে, দুটো ঘোড়া দৌড়াচ্ছে এখন বেশি। একটা হলো বিএনপি, আরেকটা হলো জামায়াত। সুতরাং দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখা। সেটাই তারা করছে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত মনে করেন, “এর থেকে এমন কোনো নিশ্চিত ইঙ্গিত পাওয়া যায় না যে, তারা মনে করছে, এই বুঝি জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসলো।”
“বিএনপির সঙ্গেও তাদের (বিদেশি কূটনীতিক) যোগাযোগ হচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগটা কম ছিল। সেটা একটু বৃদ্ধি করেছে,” যোগ করেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
“একসময় রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থাকা ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামি আবারও জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে নতুন জোট গড়ে তোলা জামায়াতকে আবারও রাজনৈতিক গুরুত্ব ফিরে পেতে সহায়তা করতে পারে।”
ভোটের আগের যেসব জরিপ হয়েছে, সেখানেও বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ‘শক্ত’ প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট বা আইআরআইয়ের ডিসেম্বরের এক জরিপে দেখা যাচ্ছে— বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ, আর জামায়াতের ২৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের কয়েকটি সংস্থার জরিপে জামায়াত আরও এগিয়ে রয়েছে বলে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ন্যারেটিভ, প্রজেকশন বিডি, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি) এবং জাগরণ ফাউন্ডেশনের যৌথ ওই জরিপে বিএনপির সমর্থন ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জামায়াতের সমর্থন ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এসব জরিপের প্রসঙ্গে মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, “অবশ্যই নতুন একটা পারসপেকটিভ তৈরি হয়েছে, তাই না? তাদেরকে (জামায়াত) এখন সিরিয়াসলি দেখছে সবাই। সুতরাং এই কথাটা যে, তারা আসতেও পারে। আমরাতো আর জানি না। যখন ইলেকশন হয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন হবে, তখন বোঝা যাবে।”
“অনেকে মনে করছেন যে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এ দুটোর মধ্যেই হবে। বিএনপি এগিয়ে আছে, এটাই বেশিরভাগ জায়গায় আমরা বুঝতে পারছি। তারপরও অঘটন ঘটে না, বা ঘটতে পারবে না–সেজন্যই সতর্ক হয়ে তারা (কূটনীতিকরা) একটা ব্যবস্থা নিচ্ছে।”
মুন্সী ফয়েজ আরো বলেন, “আগে জামায়াত সামনের দিকে ছিল না। এখন দুই ঘোড়ার মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে রেইস। সুতরাং দুইটার সাথেই তো যোগাযোগ রাখবে।”
ভোটে জামায়াত ‘ভালো ফল’ করলেও তাদের বিজয় নিয়ে সন্দিহান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ ও মিয়ানমারবিষয়ক সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কিয়ান।
আল জাজিরাকে তিনি বলেছেন, “নিশ্চিতভাবেই আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা ফলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে তাদের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আমি সন্দিহান।”
“আমরা এমন একটি দলের কথা বলছি, যারা আগে কখনও ২০টির বেশি আসন পায়নি বা মোট ভোটের ১২ শতাংশের বেশি অর্জন করতে পারেনি,” বলেছেন কিয়ান।


নির্বাচন ২০২৬: ধর্ম, বিষোদ্গারে কোণঠাসা উন্নয়ন আর প্রতিশ্রুতির বয়ান 
