জামায়াত, ওয়াশিংটন ও নির্বাচন: বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
জাতীয় নির্বাচনের প্রচারের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন উত্তাপ বাড়ছে, ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের এক নীরব কূটনৈতিক বার্তা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএমআপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
জাতীয় নির্বাচনের প্রচারের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন উত্তাপ বাড়ছে, ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের এক নীরব কূটনৈতিক বার্তা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ গড়তে আগ্রহী ওয়াশিংটন। আগে প্রকাশ না হওয়া একটি অডিও রেকর্ডের সূত্র ধরে এই তথ্য সামনে আসার পর বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্র ও জামাতের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব, আসন্ন নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল এবং ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েন সবকিছু মিলিয়েই নতুন এক শক্তির সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন পোস্টের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, রুদ্ধদ্বার বৈঠকের অডিও রেকর্ড রয়েছে তাদের কাছে। সেটা বিশ্লেষণ করেই তারা তথ্যগুলো পেয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামি দলটি আসন্ন নির্বাচনে সবচেয়ে ভালো করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই দলটিকে বাংলাদেশের ইতিহাস একাধিকবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশেষ শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালেও নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করে দলটিকে।
জামায়াতে ইসলামী নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, দলটি শরীয়াহ আইনের বাস্তবায়নের ব্যাপারে কথা বলে আসছে। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলছে যেন তারা সন্তানকে সময় দিতে পারে। তবে এবার তারা নিজেদের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তারা বলছে, তাদের লড়াই এখন দুর্নীতির সঙ্গে।
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তারা ইসলামিস্ট দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। ১লা ডিসেম্বর বাংলাদেশি নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে একজন অ্যামেরিকান কূটনীতিক বলেছেন, বাংলাদেশ এখন ইসলামিক হয়ে যাচ্ছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফল করবে। সেই বৈঠকটিরই অডিও রেকর্ড পেয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
অডিওতে সেই কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।” উপস্থিত সাংবাদিকদের ওই কূটনীতিক জিজ্ঞাসাও করেন যে তাদের অনুষ্ঠানে জামায়াতের ছাত্র সংস্থার প্রভাবশালী কাউকে আনতে পারবেন কি না।
নিরাপত্তার কারণে ওই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন পোস্ট। জামায়াত শরীয়াহ আইন চাপিয়ে দিতে পারে কি না এমন শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, “আমি বিশ্বাস করি না তারা শরীয়াহ আইন আরোপ করতে পারবে।”
তিনি দাবি করেন, এমন কিছু হলে প্রস্তুত আছে আমেরিকা। শরীয়াহ আইন আরোপ হলে পরদিনই ১০০ শতাংশ শুল্ক বসাবে তারা।
পোস্টকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেছেন, “ডিসেম্বরের মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে রুটিন বৈঠক ও অপ্রকাশযোগ্য আলোচনা হয়েছিল।
“তখন অনেক রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র কোনো একটি দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশের জনগণ যাকেই বেছে নিক, তার সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।”
জামায়াতে ইসলামীর আমেরিকার মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, “গোপন কূটনৈতিক বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে আমরা মন্তব্য করতে চাই না।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে প্রকাশ না হওয়া এসব মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে বিশেষ করে এমন এক সন্ধিক্ষণে, যখন দেশটি বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার পতন, নোবেল শান্তি বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের দায়িত্বগ্রহণ ও আসন্ন জাতীয় জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশের জন্য একটি গণতান্ত্রিক মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে নির্বাচনকে।
এমন প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের মধ্যে ‘আরও একটি ফাটল’ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক এমনিতেই এখন নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘাত, রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি, অমীমাংসিত বাণিজ্য চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বহু ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত কঠোর শুল্ক এই সবকিছু মিলেই দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
কুগেলম্যান বলেন, বাংলাদেশে নিয়ে অনেকদিন ধরেই ভারতের সবচেয়ে বড় ভয়ের নাম জামায়াত। তারা মনে করে এই দলটি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত। তাই জামায়াতের ক্ষমতায় আসা ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের জন্য হুমকি।
আর মনিকা শাই আরও লিখেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ডিসেম্বরের বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, “হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করা রাজনৈতিকভাবে বেশ জিনিয়াস ছিল। যদিও এ আদালত শতভাগ স্বচ্ছ বা নিরপেক্ষ ছিল না। কিন্তু হাসিনা ছিলেন দোষী। যা তারা তাদের ম্যান্ডেটের মধ্যে থেকে প্রমাণ করেছে। যা সত্যিই অসাধারণ ছিল।”
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। গত মাসে চট্টগ্রামে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করেছে ভারত। দিল্লিতে ডানপন্থী হিন্দুরা অধ্যাপক ইউনূসের ছবি পুড়িয়েছে। পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতিরও ঘটনা ঘটেছে বিক্ষোভকারীদের।
তবে এর মধ্যে বারবারই ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আয়োজনের কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত হতে পারে। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ থাকার পর নির্বাচনি প্রচারণার সময় দলটি নতুন করে গতি পেয়েছে এবং এখন তা ‘মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মুবাশ্বার হাসান।
আর জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, দলটি ‘দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন’—এই চারটি মূল বিষয়কে সামনে রেখে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নারীদের কাজের সময় কমানোর প্রস্তাব এখনো ‘প্রাথমিক পর্যায়ে’ রয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের কোনো পরিকল্পনা জামায়াতে ইসলামীর নেই।
বিএনপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানান, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান মনে করেন যে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে ভালো ফল করবে। কিন্তু তাদের সঙ্গে ঐকমত্যের সরকার করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
জামায়াতের আমীর বলেছেন বিএনপির সঙ্গে তারা কাজ করতে প্রস্তুত। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, সবগুলো দল চাইলে তারা একসঙ্গে সরকার চালাবেন।
২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের পতনের পর আমেরিকার সঙ্গে চারটি বৈঠক করেছে জামায়াতের নেতারা। পোস্টকে এমনটাই জানিয়েছে মোহাম্মদ রহমান। এ ছাড়া ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (ইউএসটিআর) এর জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গেও ১৬ জানুয়ারি বৈঠক করেছেন জামায়াতের নেতারা।
তবে ইউএসটিআর এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও জামায়তের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে কোনো মন্তব্য কতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
২০২৫ সালের অগাস্টে ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর আমীরের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক। সে সময় তিনি ওপেন হার্ট সার্জারি থেকে সেরে উঠছিলেন বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান।
বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
অন্যদিকে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে আয়োজিত এক বৈঠকে এক মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দেন, জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি বাংলাদেশে সক্রিয় অন্যান্য রক্ষণশীল ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশন।
এসব দলের মধ্যে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নামও উল্লেখ করা হয়।
ওই মার্কিন কূটনীতিক বলেন, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক। কারণ আমরা এমন অবস্থায় থাকতে চাই, যেখানে প্রয়োজনে ফোন তুলে বলা যাবে যে আপনারা যে বক্তব্যটি দিলেন, তার বাস্তব প্রভাব কীভাবে পড়তে পারে, সেটা আমরা এভাবে দেখছি।”
ওই কূটনীতিক আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামি যদি ক্ষমতায় এসে এমন নীতি বাস্তবায়ন করে, যা ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।
ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, “বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতি কার্যত নির্ভর করে তৈরি পোশাক খাতের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যায় এমন সব পোশাক ব্র্যান্ডে, যারা সামাজিকভাবে উদার মূল্যবোধ ধারণ করে। যদি বাংলাদেশ বলে নারীরা দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবে না, বা তাদের কাজ থেকে বাদ দেওয়া হবে, কিংবা শরিয়া আইন চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে আর কোনো অর্ডার থাকবে না। আর অর্ডার না থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিই থাকবে না।”
তবে জামায়াতে ইসলামি এমন কিছু করবে না বলেও মন্তব্য করেন ওই কূটনীতিক। তার ভাষায়, “জামায়াত সেটা করবে না। দেশটিতে অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত, বুদ্ধিমান মানুষ আছে। আমরা তাদের কাছে খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেব যে এর পরিণতি কী হতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ব্যাখ্যায় নয়াদিল্লির উদ্বেগ কমার সম্ভাবনা কম। ভারত ২০১৯ সালে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জামায়াতে ইসলামীর শাখাকে ‘অবৈধ সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৪ সালে সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদও নবায়ন করা হয়।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক যদি আরও ভালো অবস্থায় থাকত, তাহলে নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামি নিয়ে ভারতের উদ্বেগকে ওয়াশিংটন হয়তো বেশি গুরুত্ব দিত। কিন্তু তার ভাষায়, “বর্তমানে এই অংশীদারিত্ব এমন এক পর্যায়ে আছে, যাকে বলা যায় পুরোপুরি অগোছালো। এই বাস্তবতায় মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতীয় উদ্বেগের প্রতি অতটা মনোযোগী বা সংবেদনশীল বোধ করবেন, এমনটা মনে হয় না।”
মার্কিন অবস্থানেরই প্রতিফলন
ওয়াশিংটন পোস্টের এই প্রতিবেদন জামায়াতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, জামায়াত এখন ইনক্লুসিভ। অনেক নারী আছেন দলে। কেউ হিজাব পড়ছেন, কেউ পড়ছেন না। পশ্চিমাদের যে একটা কনসার্ন ছিল জামায়াতের নারী বিষয়ক পলিসি নিয়ে। সেখান থেকে তারা সরে এসেছে।
এসময় তিনি তুরস্কের উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি বলেন, তুরস্কের যে ইসলামটা চর্চা হয় সেটার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক আছে, রাশিয়ার সম্পর্ক আছে। জামায়াতও সেরকম আছে বলে মনে করেন এই বর্ষীয়ান সাংবাদিক।
তিনি বলেন, হযরত মুহাম্মদ (স.) বিদায় হজে বলেছিলেন খ্রিস্টান-ইহুদি-মুসলিম সবাই এক, সবাই আরব। জামায়াত এই বিষয়টিই ধরতে পেরেছে। তারা পরিবর্তন করেছে।
“আই ফাইন্ড অ্যা নিউ জামায়াত। আর সেজন্যই অ্যামেরিকা তাদের ব্যাপারে ইতিবাচক। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন টা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের জামায়াত নিয়ে অবস্থানেরই প্রতিফলন।”
দার্শনিক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলছেন, জামাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে সব সময় এমনই ছিল। জামাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক একাত্তর সাল থেকে পাকিস্তানের গণহত্যাকারী শাসক শ্রেণীর সমর্থক হিশাবে যেমন ছিল, এখনও তাই আছে। সব সময় এমনই ছিল, কখনই খারাপ ছিল না। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পরও জামায়াতে ইসলামি নাম বদলায় নি, গলে মার্কিন পরাশক্তির সঙ্গে জামায়াতের প্রীতি নতুন বা অবাক হবার মতো কিছু নয়।
তিনি বলেছেন, “নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অস্থিরতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য জামায়াতের মতো সংগঠন দরকার।বিশেষত উপমহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের চিন মোকাবিলা নীতি বাস্তবায়নের জন্য সংগঠিত ইসলামপন্থি দলের সহায়তা দরকার, এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।”
সালাউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াতের আমীর বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন। এটা প্লেজার ট্রিপ ছিল না। ওয়ার্কিং রিলেশনে গিয়েছিলেন। উনি অনেকগুলো দেশ গেছেন, আমেরিকা গেছেন।”
নারীদের স্বাধীনতা নিয়ে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে ইউরোপের একটা কনর্সার্ন ছিল উল্লেখ করে সালাউদ্দিন বাবর বলেন, জামায়াত নিশ্চিত করতে পেরেছে নিজেদের অবস্থান। আর সেজন্যই পশ্চিমারা তাদের ওপর ভরসা করছে।
ফরহাদ মজহারও মনে করেন, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে জামায়াতও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব পছন্দ করছে, এর দ্বারা জামাতে ইসলামী মহা শক্তিধর ইসরায়েলি-মার্কিন অক্ষ শক্তির সমর্থন পাবে। তিনি বলেন, “ইসরায়েল-মার্কিন অক্ষশক্তি বাংলাদেশে ৫ অগাস্ট্র ব্যর্থ গণভ্যুত্থানের পর জনগণকে ভবিষ্যতে দমন এবং আরেকটি গণঅভ্যুত্থান থেকে বিরত রাখবার জন্য ব্যবহৃত হবে। অন্যদিকে ভারত বিএনপিকে ব্যবহার করবে। আন্দোলনটা আর জনগণের কাছে নেই। সেটা ৮ তারিখে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। এখন দ্বন্দ্বটা মূলত উপমহাদেশে দিল্লির আধিপত্য বনাম মার্কিন আধিপত্যের প্রতিযোগিতা”
বিপরীতে দিল্লি সেকুলার শক্তিগুলো কিংবা বিএনপির পেছনে সমর্থন দেবে বলে মনে করেন এই দার্শনিক।
ফরহাদ মজহার বলেন, “দুর্বল রাষ্ট্রের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের মধ্য দিয়ে বা ইসলামি দলগুলোর মধ্য দিয়ে নিজে আধিপত্য রাখবে কারণ এটা ইজিয়ার।” “এখন বাংলাদেশে যেটা ঘটেছে, সেটা হলো, এক ধরনের গণঅভ্যুত্থান হয়েছে পাঁচ তারিখে, আট তারিখে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব হয়েছে। সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের পরে, আমরা দেখছি যে পুরনো ব্যবস্থাটা যেমন আছে তেমনি রয়েছে।”
নির্বাচনের পর কিছু পরিবর্তন হবে না মন্তব্য করে ফরহাদ মজহার বলেন,“ক্ষমতায় যেই আসুক লুটপাট চলবে। জামায়াত যত সুন্দর সুন্দর কথা বলুকই না কেন। ব্যবস্থাটা লুটপাটের।”
জামায়াত, ওয়াশিংটন ও নির্বাচন: বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
জাতীয় নির্বাচনের প্রচারের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন উত্তাপ বাড়ছে, ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের এক নীরব কূটনৈতিক বার্তা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে
জাতীয় নির্বাচনের প্রচারের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন উত্তাপ বাড়ছে, ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের এক নীরব কূটনৈতিক বার্তা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ গড়তে আগ্রহী ওয়াশিংটন। আগে প্রকাশ না হওয়া একটি অডিও রেকর্ডের সূত্র ধরে এই তথ্য সামনে আসার পর বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্র ও জামাতের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব, আসন্ন নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল এবং ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েন সবকিছু মিলিয়েই নতুন এক শক্তির সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন পোস্টের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, রুদ্ধদ্বার বৈঠকের অডিও রেকর্ড রয়েছে তাদের কাছে। সেটা বিশ্লেষণ করেই তারা তথ্যগুলো পেয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামি দলটি আসন্ন নির্বাচনে সবচেয়ে ভালো করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই দলটিকে বাংলাদেশের ইতিহাস একাধিকবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশেষ শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালেও নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করে দলটিকে।
জামায়াতে ইসলামী নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, দলটি শরীয়াহ আইনের বাস্তবায়নের ব্যাপারে কথা বলে আসছে। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলছে যেন তারা সন্তানকে সময় দিতে পারে। তবে এবার তারা নিজেদের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তারা বলছে, তাদের লড়াই এখন দুর্নীতির সঙ্গে।
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তারা ইসলামিস্ট দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। ১লা ডিসেম্বর বাংলাদেশি নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে একজন অ্যামেরিকান কূটনীতিক বলেছেন, বাংলাদেশ এখন ইসলামিক হয়ে যাচ্ছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফল করবে। সেই বৈঠকটিরই অডিও রেকর্ড পেয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
অডিওতে সেই কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।” উপস্থিত সাংবাদিকদের ওই কূটনীতিক জিজ্ঞাসাও করেন যে তাদের অনুষ্ঠানে জামায়াতের ছাত্র সংস্থার প্রভাবশালী কাউকে আনতে পারবেন কি না।
নিরাপত্তার কারণে ওই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন পোস্ট। জামায়াত শরীয়াহ আইন চাপিয়ে দিতে পারে কি না এমন শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, “আমি বিশ্বাস করি না তারা শরীয়াহ আইন আরোপ করতে পারবে।”
তিনি দাবি করেন, এমন কিছু হলে প্রস্তুত আছে আমেরিকা। শরীয়াহ আইন আরোপ হলে পরদিনই ১০০ শতাংশ শুল্ক বসাবে তারা।
পোস্টকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেছেন, “ডিসেম্বরের মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে রুটিন বৈঠক ও অপ্রকাশযোগ্য আলোচনা হয়েছিল।
“তখন অনেক রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র কোনো একটি দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশের জনগণ যাকেই বেছে নিক, তার সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।”
জামায়াতে ইসলামীর আমেরিকার মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, “গোপন কূটনৈতিক বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে আমরা মন্তব্য করতে চাই না।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে প্রকাশ না হওয়া এসব মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে বিশেষ করে এমন এক সন্ধিক্ষণে, যখন দেশটি বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার পতন, নোবেল শান্তি বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের দায়িত্বগ্রহণ ও আসন্ন জাতীয় জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশের জন্য একটি গণতান্ত্রিক মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে নির্বাচনকে।
এমন প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের মধ্যে ‘আরও একটি ফাটল’ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক এমনিতেই এখন নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘাত, রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি, অমীমাংসিত বাণিজ্য চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বহু ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত কঠোর শুল্ক এই সবকিছু মিলেই দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
কুগেলম্যান বলেন, বাংলাদেশে নিয়ে অনেকদিন ধরেই ভারতের সবচেয়ে বড় ভয়ের নাম জামায়াত। তারা মনে করে এই দলটি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত। তাই জামায়াতের ক্ষমতায় আসা ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের জন্য হুমকি।
আর মনিকা শাই আরও লিখেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ডিসেম্বরের বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, “হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করা রাজনৈতিকভাবে বেশ জিনিয়াস ছিল। যদিও এ আদালত শতভাগ স্বচ্ছ বা নিরপেক্ষ ছিল না। কিন্তু হাসিনা ছিলেন দোষী। যা তারা তাদের ম্যান্ডেটের মধ্যে থেকে প্রমাণ করেছে। যা সত্যিই অসাধারণ ছিল।”
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। গত মাসে চট্টগ্রামে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করেছে ভারত। দিল্লিতে ডানপন্থী হিন্দুরা অধ্যাপক ইউনূসের ছবি পুড়িয়েছে। পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতিরও ঘটনা ঘটেছে বিক্ষোভকারীদের।
তবে এর মধ্যে বারবারই ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আয়োজনের কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত হতে পারে। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ থাকার পর নির্বাচনি প্রচারণার সময় দলটি নতুন করে গতি পেয়েছে এবং এখন তা ‘মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মুবাশ্বার হাসান।
আর জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, দলটি ‘দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন’—এই চারটি মূল বিষয়কে সামনে রেখে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নারীদের কাজের সময় কমানোর প্রস্তাব এখনো ‘প্রাথমিক পর্যায়ে’ রয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের কোনো পরিকল্পনা জামায়াতে ইসলামীর নেই।
বিএনপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানান, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান মনে করেন যে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে ভালো ফল করবে। কিন্তু তাদের সঙ্গে ঐকমত্যের সরকার করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
জামায়াতের আমীর বলেছেন বিএনপির সঙ্গে তারা কাজ করতে প্রস্তুত। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, সবগুলো দল চাইলে তারা একসঙ্গে সরকার চালাবেন।
২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের পতনের পর আমেরিকার সঙ্গে চারটি বৈঠক করেছে জামায়াতের নেতারা। পোস্টকে এমনটাই জানিয়েছে মোহাম্মদ রহমান। এ ছাড়া ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (ইউএসটিআর) এর জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গেও ১৬ জানুয়ারি বৈঠক করেছেন জামায়াতের নেতারা।
তবে ইউএসটিআর এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও জামায়তের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে কোনো মন্তব্য কতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
২০২৫ সালের অগাস্টে ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর আমীরের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক। সে সময় তিনি ওপেন হার্ট সার্জারি থেকে সেরে উঠছিলেন বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান।
বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
অন্যদিকে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে আয়োজিত এক বৈঠকে এক মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দেন, জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি বাংলাদেশে সক্রিয় অন্যান্য রক্ষণশীল ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশন।
এসব দলের মধ্যে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নামও উল্লেখ করা হয়।
ওই মার্কিন কূটনীতিক বলেন, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক। কারণ আমরা এমন অবস্থায় থাকতে চাই, যেখানে প্রয়োজনে ফোন তুলে বলা যাবে যে আপনারা যে বক্তব্যটি দিলেন, তার বাস্তব প্রভাব কীভাবে পড়তে পারে, সেটা আমরা এভাবে দেখছি।”
ওই কূটনীতিক আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামি যদি ক্ষমতায় এসে এমন নীতি বাস্তবায়ন করে, যা ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।
ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, “বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতি কার্যত নির্ভর করে তৈরি পোশাক খাতের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যায় এমন সব পোশাক ব্র্যান্ডে, যারা সামাজিকভাবে উদার মূল্যবোধ ধারণ করে। যদি বাংলাদেশ বলে নারীরা দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবে না, বা তাদের কাজ থেকে বাদ দেওয়া হবে, কিংবা শরিয়া আইন চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে আর কোনো অর্ডার থাকবে না। আর অর্ডার না থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিই থাকবে না।”
তবে জামায়াতে ইসলামি এমন কিছু করবে না বলেও মন্তব্য করেন ওই কূটনীতিক। তার ভাষায়, “জামায়াত সেটা করবে না। দেশটিতে অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত, বুদ্ধিমান মানুষ আছে। আমরা তাদের কাছে খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেব যে এর পরিণতি কী হতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ব্যাখ্যায় নয়াদিল্লির উদ্বেগ কমার সম্ভাবনা কম। ভারত ২০১৯ সালে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জামায়াতে ইসলামীর শাখাকে ‘অবৈধ সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৪ সালে সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদও নবায়ন করা হয়।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক যদি আরও ভালো অবস্থায় থাকত, তাহলে নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামি নিয়ে ভারতের উদ্বেগকে ওয়াশিংটন হয়তো বেশি গুরুত্ব দিত। কিন্তু তার ভাষায়, “বর্তমানে এই অংশীদারিত্ব এমন এক পর্যায়ে আছে, যাকে বলা যায় পুরোপুরি অগোছালো। এই বাস্তবতায় মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতীয় উদ্বেগের প্রতি অতটা মনোযোগী বা সংবেদনশীল বোধ করবেন, এমনটা মনে হয় না।”
মার্কিন অবস্থানেরই প্রতিফলন
ওয়াশিংটন পোস্টের এই প্রতিবেদন জামায়াতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, জামায়াত এখন ইনক্লুসিভ। অনেক নারী আছেন দলে। কেউ হিজাব পড়ছেন, কেউ পড়ছেন না। পশ্চিমাদের যে একটা কনসার্ন ছিল জামায়াতের নারী বিষয়ক পলিসি নিয়ে। সেখান থেকে তারা সরে এসেছে।
এসময় তিনি তুরস্কের উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি বলেন, তুরস্কের যে ইসলামটা চর্চা হয় সেটার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক আছে, রাশিয়ার সম্পর্ক আছে। জামায়াতও সেরকম আছে বলে মনে করেন এই বর্ষীয়ান সাংবাদিক।
তিনি বলেন, হযরত মুহাম্মদ (স.) বিদায় হজে বলেছিলেন খ্রিস্টান-ইহুদি-মুসলিম সবাই এক, সবাই আরব। জামায়াত এই বিষয়টিই ধরতে পেরেছে। তারা পরিবর্তন করেছে।
“আই ফাইন্ড অ্যা নিউ জামায়াত। আর সেজন্যই অ্যামেরিকা তাদের ব্যাপারে ইতিবাচক। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন টা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের জামায়াত নিয়ে অবস্থানেরই প্রতিফলন।”
দার্শনিক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলছেন, জামাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে সব সময় এমনই ছিল। জামাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক একাত্তর সাল থেকে পাকিস্তানের গণহত্যাকারী শাসক শ্রেণীর সমর্থক হিশাবে যেমন ছিল, এখনও তাই আছে। সব সময় এমনই ছিল, কখনই খারাপ ছিল না। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পরও জামায়াতে ইসলামি নাম বদলায় নি, গলে মার্কিন পরাশক্তির সঙ্গে জামায়াতের প্রীতি নতুন বা অবাক হবার মতো কিছু নয়।
তিনি বলেছেন, “নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অস্থিরতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য জামায়াতের মতো সংগঠন দরকার।বিশেষত উপমহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের চিন মোকাবিলা নীতি বাস্তবায়নের জন্য সংগঠিত ইসলামপন্থি দলের সহায়তা দরকার, এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।”
সালাউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াতের আমীর বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন। এটা প্লেজার ট্রিপ ছিল না। ওয়ার্কিং রিলেশনে গিয়েছিলেন। উনি অনেকগুলো দেশ গেছেন, আমেরিকা গেছেন।”
নারীদের স্বাধীনতা নিয়ে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে ইউরোপের একটা কনর্সার্ন ছিল উল্লেখ করে সালাউদ্দিন বাবর বলেন, জামায়াত নিশ্চিত করতে পেরেছে নিজেদের অবস্থান। আর সেজন্যই পশ্চিমারা তাদের ওপর ভরসা করছে।
ফরহাদ মজহারও মনে করেন, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে জামায়াতও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব পছন্দ করছে, এর দ্বারা জামাতে ইসলামী মহা শক্তিধর ইসরায়েলি-মার্কিন অক্ষ শক্তির সমর্থন পাবে। তিনি বলেন, “ইসরায়েল-মার্কিন অক্ষশক্তি বাংলাদেশে ৫ অগাস্ট্র ব্যর্থ গণভ্যুত্থানের পর জনগণকে ভবিষ্যতে দমন এবং আরেকটি গণঅভ্যুত্থান থেকে বিরত রাখবার জন্য ব্যবহৃত হবে। অন্যদিকে ভারত বিএনপিকে ব্যবহার করবে। আন্দোলনটা আর জনগণের কাছে নেই। সেটা ৮ তারিখে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। এখন দ্বন্দ্বটা মূলত উপমহাদেশে দিল্লির আধিপত্য বনাম মার্কিন আধিপত্যের প্রতিযোগিতা”
বিপরীতে দিল্লি সেকুলার শক্তিগুলো কিংবা বিএনপির পেছনে সমর্থন দেবে বলে মনে করেন এই দার্শনিক।
ফরহাদ মজহার বলেন, “দুর্বল রাষ্ট্রের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের মধ্য দিয়ে বা ইসলামি দলগুলোর মধ্য দিয়ে নিজে আধিপত্য রাখবে কারণ এটা ইজিয়ার।”
“এখন বাংলাদেশে যেটা ঘটেছে, সেটা হলো, এক ধরনের গণঅভ্যুত্থান হয়েছে পাঁচ তারিখে, আট তারিখে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব হয়েছে। সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের পরে, আমরা দেখছি যে পুরনো ব্যবস্থাটা যেমন আছে তেমনি রয়েছে।”
নির্বাচনের পর কিছু পরিবর্তন হবে না মন্তব্য করে ফরহাদ মজহার বলেন,“ক্ষমতায় যেই আসুক লুটপাট চলবে। জামায়াত যত সুন্দর সুন্দর কথা বলুকই না কেন। ব্যবস্থাটা লুটপাটের।”